আবদোলকারিম সোরোশের "দ্য এক্সপানশন অফ প্রফেটিক এক্সপেরিয়েন্স" (The Expansion of Prophetic Experience) আধুনিক ইসলামি জ্ঞানতত্ত্ব (Epistemology) এবং কালাম শাস্ত্রের (Theology) অন্যতম প্রভাবশালী এবং একই সাথে বিতর্কিত একটি গ্রন্থ। ইরানি এই দার্শনিক ও চিন্তাবিদ তাঁর এই বইটিতে ওহি (Revelation), নবুয়ত (Prophethood) এবং ধর্মীয় আইনের প্রকৃতি নিয়ে এমন কিছু প্রশ্ন তুলেছেন, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা প্রথাগত ইসলামি চিন্তাধারার মূল ভিত্তিকে চ্যালেঞ্জ করে।
পূর্বে আলোচিত "ফিকহ ম্যাক্সিমালিজম" বা শরিয়াহর সর্বব্যাপীতার ধারণাকে তাত্ত্বিকভাবে খণ্ডন করার ক্ষেত্রে এই বইটি একটি মাস্টারপিস। নিচে বইটির একটি বিস্তারিত পর্যালোচনা তুলে ধরা হলো:
মূল দর্শন: ওহি এবং নবীর ভূমিকা
প্রথাগত ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, কোরআন হলো ঈশ্বরের আক্ষরিক বাণী, যেখানে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ভূমিকা ছিল অনেকটা একটি 'প্যাসিভ' বা নিষ্ক্রিয় বাহকের মতো—যিনি কেবল স্বর্গীয় বার্তা অবিকল মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। কিন্তু সোরোশ এই বইটিতে ওহির প্রকৃতিকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
তাঁর মতে, ওহি কোনো একতরফা ডিকটেশন (Dictation) বা শ্রুতিলেখন নয়। বরং এটি নবী এবং ঈশ্বরের মধ্যকার একটি মিথস্ক্রিয় বা ইন্টারঅ্যাকটিভ অভিজ্ঞতা (Interactive Experience)। সোরোশ যুক্তি দেন যে, নবীর নিজস্ব মনস্তত্ত্ব, তাঁর ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক পর্যায়, তৎকালীন আরব সমাজের সংস্কৃতি, ভাষা এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট—এসব কিছুই ওহি নাজিলের প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। অর্থাৎ, নবী কেবল বার্তার বাহক ছিলেন না, তিনি ছিলেন এই ঐশী অভিজ্ঞতার একজন সৃজনশীল অংশীদার।
বইটির মূল থিম বা ধারণাসমূহ
সোরোশ তাঁর দর্শনকে কয়েকটি মূল কাঠামোর ওপর দাঁড় করিয়েছেন:
১. ধর্মের 'সারবস্তু' (Essential) বনাম 'আপতিক' (Accidental) উপাদান
বইটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান হলো ইসলামকে 'এসেনশিয়াল' এবং 'অ্যাক্সিডেন্টাল'—এই দুই ভাগে বিভক্ত করা।
- সারবস্তু (Essentials): এগুলো হলো ধর্মের মূল আধ্যাত্মিক ও নৈতিক ভিত্তি। যেমন—ঈশ্বরের একত্ববাদ (তাওহীদ), পরকাল, ন্যায়বিচার এবং আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধি। এগুলো স্থান-কাল-পাত্র ভেদে অপরিবর্তনীয়।
- আপতিক (Accidentals): এগুলো হলো সেই ঐতিহাসিক বা পারিপার্শ্বিক আবরণ, যার মাধ্যমে ধর্মের সারবস্তু পৃথিবীতে প্রকাশিত হয়েছে। সপ্তম শতাব্দীর মক্কার ভাষা (আরবি), তৎকালীন আরবদের সামাজিক প্রথা, আইনি কাঠামো, বা যুদ্ধের নিয়মকানুন—এগুলো সবই সোরোশের মতে 'আপতিক'।
সোরোশের যুক্তি হলো, কোরআন যদি আরবের বদলে অন্য কোনো ভৌগোলিক অঞ্চলে অবতীর্ণ হতো, তবে ধর্মের 'সারবস্তু' একই থাকত, কিন্তু এর 'আপতিক' বা বাহ্যিক নিয়মকানুনগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন হতো।
২. ধর্মীয় অভিজ্ঞতার সম্প্রসারণ (Expansion of Experience)
বইয়ের শিরোনামটি মূলত এই ধারণা থেকেই এসেছে। সোরোশ বলেন, আইনি বা শরিয়াহর দিক থেকে নবুয়তের সমাপ্তি (খতমে নবুয়ত) ঘটেছে ঠিকই, কিন্তু নবীর যে আধ্যাত্মিক ও ঐশী অভিজ্ঞতা ছিল, তার সমাপ্তি ঘটেনি। সুফি, দরবেশ এবং সাধারণ মুমিনদের আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমে সেই "প্রফেটিক অভিজ্ঞতা" যুগে যুগে সম্প্রসারিত হয়। ধর্ম কেবল একটি ঐতিহাসিক টেক্সটে (Text) সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি চলমান আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা।
৩. ফিকহ বা আইনের সীমাবদ্ধতা (Minimalism)
সোরোশ দেখিয়েছেন যে, ফিকহ বা ইসলামি আইন মূলত সেই সময়ের জন্য একটি "মিনিমালিস্ট" বা ন্যূনতম আইনি কাঠামো ছিল, যা একটি সরল উপজাতীয় সমাজকে শৃঙ্খলায় আনার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু আধুনিক যুগে এসে ফিকহকে দিয়ে জটিল রাষ্ট্রযন্ত্র, আধুনিক অর্থনীতি বা মানবাধিকারের মতো বিশাল পরিসর নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করাটা (যাকে ফিকহ ম্যাক্সিমালিজম বলা হয়) একটি মারাত্মক জ্ঞানতাত্ত্বিক ভুল। ফিকহ মানবজীবনের কেবল বাহ্যিক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে, কিন্তু ধর্মের মূল উদ্দেশ্য হলো ভেতরের আধ্যাত্মিক রূপান্তর। ফিকহকে রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি বানালে ধর্মের আধ্যাত্মিক সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায় এবং এটি একটি শুষ্ক রাজনৈতিক মতাদর্শে পরিণত হয়।
আধুনিক পাঠকের জন্য প্রাসঙ্গিকতা
যে আধুনিক শিক্ষিত মুসলিমরা বিজ্ঞান, মানবাধিকার এবং বিশ্বায়নের সাথে প্রথাগত ইসলামি আইনের (যেমন—দণ্ডবিধি, উত্তরাধিকার আইন বা নারী-পুরুষের ভূমিকার আইন) সংঘাত অনুভব করেন, সোরোশ তাদের জন্য একটি শক্তিশালী দার্শনিক ফ্রেমওয়ার্ক বা কাঠামো প্রদান করেছেন।
সোরোশের তত্ত্ব অনুযায়ী, আধুনিক যুগে মুসলমানদের সপ্তম শতাব্দীর 'আপতিক' বা ঐতিহাসিক আইনি কাঠামো হুবহু আঁকড়ে ধরে রাখার প্রয়োজন নেই। বরং ধর্মের মূল 'সারবস্তু' বা ন্যায়বিচারের চেতনাকে ধারণ করে আধুনিক যুগের উপযোগী নতুন আইন, কাঠামো বা সিস্টেম তৈরি করাটাই হলো ধর্মের প্রকৃত অনুসরণ। এটি ধর্মকে বাতিলের খাতায় ফেলে দেয় না, বরং তাকে আধুনিক বাস্তবতার সাথে নিরবচ্ছিন্নভাবে যুক্ত (Integrate) করার পথ দেখায়।
সমালোচনা এবং সীমাবদ্ধতা (Critiques and Cons)
যেকোনো যুগান্তকারী দার্শনিক কাজের মতোই সোরোশের এই বইটিও তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে:
- ঐশী পবিত্রতা ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা: প্রথাগত স্কলারদের সবচেয়ে বড় আপত্তি হলো, কোরআনকে যদি আংশিকভাবে নবীর মনস্তত্ত্ব ও তৎকালীন সংস্কৃতির ফসল হিসেবে মেনে নেওয়া হয়, তবে কোরআনের নিরঙ্কুশ ঐশী (Divine) মর্যাদা হুমকির মুখে পড়ে। এটি কোরআনকে একটি ঐতিহাসিক ডকুমেন্টে পরিণত করার ঝুঁকি তৈরি করে।
- পিক-অ্যান্ড-চুজ (Pick and Choose) প্রবণতা: কোনটি ধর্মের 'সারবস্তু' আর কোনটি 'আপতিক'—তার সুনির্দিষ্ট কোনো বৈজ্ঞানিক মাপকাঠি সোরোশ দিতে পারেননি। ফলে ব্যক্তি নিজের সুবিধামতো ধর্মের যেকোনো আইনকে 'আপতিক' বা 'ঐতিহাসিক' বলে বাতিল করে দিতে পারে, যা ধর্মের শৃঙ্খলার জন্য হুমকিস্বরূপ।
- সুফিবাদ এবং মুতাজিলা দর্শনের অতি-প্রভাব: সোরোশ তাঁর তত্ত্বে মাওলানা রুমি এবং ক্ল্যাসিকাল মুতাজিলা (যৌক্তিকতাবাদী) দর্শনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করেছেন। যারা ইসলামকে একটি সুনির্দিষ্ট আইনি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে দেখতে চান (যেমন—রাজনৈতিক ইসলামপন্থিরা), তাদের কাছে সোরোশের এই আধ্যাত্মিক-দার্শনিক পদ্ধতি অত্যন্ত দুর্বল এবং অগ্রহণযোগ্য মনে হয়।
উপসংহার
"দ্য এক্সপানশন অফ প্রফেটিক এক্সপেরিয়েন্স" কোনো সাধারণ ফিকহ বা তাফসিরের বই নয়; এটি মূলত ধর্মের ফিলোসফি বা দর্শনের একটি বই। আবদোলকারিম সোরোশ অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে ধর্মকে একটি স্থবির আইনগ্রন্থের জায়গা থেকে বের করে একটি জীবন্ত, স্পন্দিত এবং বিকাশমান আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
বইটির সব যুক্তির সাথে আপনি একমত না-ও হতে পারেন, কিন্তু এটি নিশ্চিতভাবেই আপনার চিন্তার জগতকে আলোড়িত করবে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, মানবাধিকার এবং পরিবর্তনশীল বিশ্বের সাথে ধর্মকে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা যায়—সেই পদ্ধতিগত উত্তর খোঁজার ক্ষেত্রে এই বইটি সমসাময়িক ইসলামি চিন্তাজগতের অন্যতম সেরা একটি সংযোজন।