আবদোলকারিম সোরোশের "দ্য এক্সপানশন অফ প্রফেটিক এক্সপেরিয়েন্স" (The Expansion of Prophetic Experience) আধুনিক ইসলামি জ্ঞানতত্ত্ব (Epistemology) এবং কালাম শাস্ত্রের (Theology) অন্যতম প্রভাবশালী এবং একই সাথে বিতর্কিত একটি গ্রন্থ।
ইক্বরার লক্ষ্য হলো বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য স্রষ্টার ঐশী বাণীর সমন্বিত অধ্যয়ন ও সার্বজনীন প্রয়োগের জন্য জ্ঞানদীপ্ত অনুশীলন।
ইক্বরার উদ্দেশ্য হলো কুরআনের বাণীর উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ অনুধাবনের জন্য টেকসই ভিত্তি প্রস্তুত করা এবং জীবন ও সমাজের প্রায়োগিকতার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞানভিত্তিক ফ্রেমওয়ার্ক বা কাঠামো নির্মাণ।
শারম্যান এ. জ্যাকসনের লেখা দ্য ইসলামিক সেক্যুলার (The Islamic Secular) সমসাময়িক ইসলামিক চিন্তাধারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সাহসী একটি বই। পশ্চিমা "সেক্যুলারিজম" (ধর্মহীনতা বা ধর্ম ও রাষ্ট্রের বিচ্ছেদ) এবং ইসলামিক আইনের (শরিয়াহ/ফিকহ) মধ্যে যে চিরস্থায়ী দ্বন্দ্বের ধারণা প্রচলিত, জ্যাকসন এই বইয়ে সেই দ্বন্দ্বের মূলে আঘাত করেছেন।
তাঁর মূল যুক্তি হলো: ইসলাম ঐতিহাসিকভাবেই মানবজীবনের এমন একটি পরিসরকে স্বীকৃতি দেয় যা সরাসরি শরিয়াহ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়, এবং একে তিনি "ইসলামিক সেক্যুলার" নাম দিয়েছেন।
শারম্যান এ. জ্যাকসন তাঁর দ্য ইসলামিক সেক্যুলার বইটিতে "সেক্যুলার" শব্দটিকে প্রচলিত পশ্চিমা রাজনৈতিক মতাদর্শ বা ধর্মহীনতার অর্থে ব্যবহার করেননি। পশ্চিমা ধারণায় সেক্যুলারিজম বলতে সাধারণত ধর্ম ও রাষ্ট্রের বিচ্ছেদ অথবা জনপরিসর থেকে ধর্মের অপসারণকে বোঝানো হয়। কিন্তু জ্যাকসনের সংজ্ঞায় "সেক্যুলার" বলতে এমন কিছু বোঝায় না যা ইসলামের সরাসরি বিরোধী বা ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতিপক্ষ। বরং তিনি এই শব্দটিকে ইসলামি কাঠামোর ভেতরের একটি পরিভাষা হিসেবে সম্পূর্ণ নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন।
লেখকের মতে, "ইসলামিক সেক্যুলার" হলো মানবজীবন ও জাগতিক কর্মকাণ্ডের এমন একটি সুনির্দিষ্ট পরিসর (Domain), যে বিষয়ে ইসলামি শরিয়াহ বা ফিকহ সরাসরি কোনো আইনি নির্দেশিকা বা হুকুম প্রদান করেনি। এটি হলো সেই উন্মুক্ত ক্ষেত্র যেখানে ওহি বা ঐশী গ্রন্থের সরাসরি নির্দেশের বদলে মানুষের নিজস্ব বুদ্ধি (আকল), অভিজ্ঞতা, বিজ্ঞান, সামাজিক প্রথা (উরফ) এবং সাধারণ জ্ঞান ব্যবহার করার পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। জ্যাকসনের মতে, এই পরিসরটি শরিয়াহর বাইরে অবস্থান করলেও এটি শরিয়াহর সাথে সাংঘর্ষিক নয়, বরং ইসলাম নিজেই মানুষের জাগতিক সমস্যা সমাধানের জন্য এই স্বাধীন জায়গাটি উন্মুক্ত রেখেছে।
এই সেক্যুলার পরিসরটিকে জ্যাকসন "ইসলামিক" বলেছেন কারণ এই স্বাধীনতায় ধর্মের নিজস্ব বৈধতা ও অনুমোদন রয়েছে এবং এটি বৃহত্তর ইসলামি নীতি ও উদ্দেশ্যের (মাকাসিদ) প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকেই কাজ করে। অর্থাৎ, যখন কোনো মুসলিম আধুনিক অর্থনীতি, রাষ্ট্র পরিচালনা, প্রযুক্তি বা চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলোতে সম্পূর্ণ মানবিক জ্ঞান ও প্রজ্ঞা ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত নেন, তখন তিনি ধর্মের বাইরে চলে যান না; বরং তিনি ধর্মের অনুমোদিত "ইসলামিক সেক্যুলার" ডোমেইনে বিচরণ করেন। জ্যাকসনের সংজ্ঞায়, এটি ধর্মকে অস্বীকার করা নয়, বরং পরিবর্তনশীল বাস্তবতার সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য স্রষ্টা প্রদত্ত মানবীয় স্বাধীনতার সর্বোত্তম ব্যবহার।
বইটির একটি বিস্তৃত পর্যালোচনা নিচে তুলে ধরা হলো:
জ্যাকসন শুরুতেই স্পষ্ট করেছেন যে, তাঁর ব্যবহৃত "সেক্যুলার" শব্দটি পশ্চিমা দর্শন থেকে ধার করা নয়। বরং এটি ইসলামের নিজস্ব কাঠামো থেকে উদ্ভূত একটি ধারণা।
তাঁর মতে, "শরিয়াহ ম্যাক্সিমালিজম" (Shari'ah Maximalism)—অর্থাৎ জীবনের প্রতিটি ছোট-বড় সমস্যা, রাজনীতি, অর্থনীতি বা আধুনিক প্রযুক্তির সমাধান ফিকহের বইতে খোঁজার প্রবণতা—আধুনিককালের একটি সৃষ্টি। শাস্ত্রীয় বা ক্ল্যাসিকাল যুগে মুসলিম পণ্ডিতরা স্বীকার করতেন যে, মানবজীবনের এমন অনেক ক্ষেত্র আছে যেখানে আল্লাহ বা রাসূল (সা.) সরাসরি কোনো আইন দেননি। এই পরিসরে মানুষের নিজস্ব যুক্তি, অভিজ্ঞতা, বিজ্ঞান এবং সাধারণ জ্ঞান (common sense) ব্যবহার করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। জ্যাকসন এই স্বাধীন পরিসরটিকেই "ইসলামিক সেক্যুলার" বলেছেন, যা শরিয়াহর বিরোধী নয়, বরং শরিয়াহর পাশাপাশি অবস্থান করে।
বর্তমান সময়ের পাঠক, বিশেষ করে যারা প্রযুক্তি, ব্যবসা, বা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সাথে যুক্ত, তাদের জন্য বইটি একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে:
বইটি যুগান্তকারী হলেও এর কিছু তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক দুর্বলতা রয়েছে:
দ্য ইসলামিক সেক্যুলার কোনো সহজ পাঠ্যের বই নয়, এটি একটি গভীর দার্শনিক বিশ্লেষণ। যারা মনে করেন ইসলাম মানেই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কঠোর আইনি শাসন (Rigid Legalism), এই বইটি তাদের চিন্তার ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেবে। আধুনিক পরিবর্তনশীল বিশ্বে ধর্মকে কীভাবে প্রাসঙ্গিক ও গঠনমূলক রাখা যায়, তা নিয়ে ভাবার জন্য এটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক হাতিয়ার।
শারম্যান এ. জ্যাকসনের দ্য ইসলামিক সেক্যুলার বইটির জন্য একটি সামগ্রিক উপসংহার নিচে দেওয়া হলো:
দ্য ইসলামিক সেক্যুলার নিছক কোনো প্রথাগত তাত্ত্বিক গ্রন্থ নয়, বরং এটি আধুনিক মুসলিম মননের জন্য একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বুদ্ধিবৃত্তিক রূপরেখা (Blueprint)। দীর্ঘকাল ধরে মুসলিম সমাজ ধর্ম ও আধুনিকতার—বিশেষ করে রাষ্ট্রনীতি, আধুনিক অর্থনীতি, প্রযুক্তি এবং জটিল সামাজিক কাঠামোগুলোর—মধ্যে যে মনস্তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক দ্বন্দ্ব অনুভব করে আসছে, জ্যাকসন তার একটি বাস্তবসম্মত দার্শনিক সমাধান দিয়েছেন।
বইটির সবচেয়ে বড় সার্থকতা হলো, এটি পাঠককে এই অনুধাবন দেয় যে—জীবনের প্রতিটি আধুনিক সমস্যা বা কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য প্রাচীন ফিকহের বইয়ে সরাসরি আইনি বৈধতা (Legal precedent) খোঁজার বাধ্যবাধকতা নেই। বরং মানবীয় প্রজ্ঞা, পেশাদারিত্ব, বিজ্ঞান এবং উদ্ভূত পরিস্থিতি অনুযায়ী নতুন সিস্টেম ডিজাইন করার যে ক্ষমতা মানুষের রয়েছে, তাকে কাজে লাগানো সম্পূর্ণভাবেই ইসলামিক চেতনার অংশ।
শব্দচয়ন বা পরিভাষাগত কিছু বিতর্ক থাকলেও, জ্যাকসনের এই কাজ মূলত ফিকহকে তার সীমানার বাইরে অতিরিক্ত বোঝা বহনের হাত থেকে রক্ষা করেছে। যারা ধর্মকে একটি অনড় অতীত হিসেবে না দেখে, পরিবর্তনশীল বর্তমানের সাথে প্রাসঙ্গিক ও গতিশীল রাখতে চান—সেই সকল চিন্তাবিদ, নীতি-নির্ধারক এবং আধুনিক পেশাজীবীদের জন্য এটি একটি যুগান্তকারী বই। সংক্ষেপে বলতে গেলে, এটি ধর্মকে তার উচ্চতর নৈতিক ও আধ্যাত্মিক মর্যাদায় সুরক্ষিত রেখে, পার্থিব জগত পরিচালনার ভার মানুষের মেধা ও স্বাধীন যুক্তির হাতে তুলে দেওয়ার এক অনন্য প্রামাণ্য দলিল।
আবদোলকারিম সোরোশের "দ্য এক্সপানশন অফ প্রফেটিক এক্সপেরিয়েন্স" (The Expansion of Prophetic Experience) আধুনিক ইসলামি জ্ঞানতত্ত্ব (Epistemology) এবং কালাম শাস্ত্রের (Theology) অন্যতম প্রভাবশালী এবং একই সাথে বিতর্কিত একটি গ্রন্থ।
শারম্যান এ. জ্যাকসনের লেখা দ্য ইসলামিক সেক্যুলার (The Islamic Secular) সমসাময়িক ইসলামিক চিন্তাধারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সাহসী একটি বই। পশ্চিমা "সেক্যুলারিজম" (ধর্মহীনতা বা ধর্ম ও রাষ্ট্রের বিচ্ছেদ) এবং ইসলামিক আইনের (শরিয়াহ/ফিকহ) মধ্যে যে চিরস্থায়ী দ্বন্দ্বের ধারণা প্রচলিত, জ্যাকসন এই বইয়ে সেই দ্বন্দ্বের মূলে আঘাত করেছেন।
ইবনে আশুর সেন্টারের পরিচালক ড. সোহাইব সাঈদ একটি ইউটিউব ভিডিওতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence / AI) এবং কুরআনের তাফসিরের সংযোগস্থল নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে ডিজিটাল মডেলিংয়ের মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে পাণ্ডিত্যপূর্ণ মতামতের সারসংক্ষেপ করা, ধ্রুপদী গ্রন্থ অনুবাদ করা এবং এমনকি ঐতিহাসিক পণ্ডিতদের মতো 'চিন্তা' করা সম্ভব। মূল বিষয়বস্তু: ভূমিকা এবং শিক্ষাগত পটভূমি […]
Dr. Sohaib Saeed, director of the Ibn ʿAshur Centre, discussed in an YouTube Video the intersection of Artificial Intelligence and Quranic exegesis (Tafsir). He explores how AI can be used to summarize scholarly positions, translate classical texts, and even "think" like historical scholars through digital modeling. Key Takeaways: Highlight Introduction and Academic Background The session […]
কোরআনের বৈজ্ঞানিক ও গাণিতিক অলৌকিকতা: গাজী রাকায়েতের ইসলামে ফেরার কাহিনী কোরআনের ভুল খুঁজতে গিয়ে কেন কাঁদলেন ২৮টি জাতীয় পুরস্কারজয়ী পরিচালক? ভাবুন তো, একজন মানুষ পবিত্র কোরআনের বৈজ্ঞানিক ভুল (Scientific error) ধরার জন্য পড়া শুরু করলেন, কিন্তু শেষমেশ এর গাণিতিক নিখুঁত গাঁথুনি আর বৈজ্ঞানিক নিদর্শন দেখে নিজেই বিস্মিত হয়ে গেলেন! হ্যাঁ, ঠিক এমন একটি অবিশ্বাস্য ঘটনার […]
ইতিহাসের পাতা উল্টালে সপ্তম শতাব্দীতে আরবের বুকে ইসলামের উত্থানকে একটি বিস্ময়কর বাঁক হিসেবেই দেখতে হয়। ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় আলোচনায় বা প্রথাগত ইতিহাসে ইসলামকে সাধারণত এমন একটি ঐশ্বরিক ঘটনা হিসেবে তুলে ধরা হয়, যার সাথে সমসাময়িক বা পূর্ববর্তী সমাজ-সংস্কৃতির যেন কোনো যোগসূত্রই ছিল না। কিন্তু আধুনিক ইতিহাসবিদ ও গবেষকরা এখন ভিন্ন কথা বলছেন। তাদের মতে, ইসলামকে নিখুঁতভাবে […]
১. প্রাক-ইসলামি আরবের ঐতিহাসিক ও আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরব উপদ্বীপের সামগ্রিক অবস্থাকে ঐতিহাসিকভাবে 'জাহিলিয়্যাত' বা অন্ধকারের যুগ হিসেবে অভিহিত করা হয়। তবে একাডেমিক দৃষ্টিকোণ থেকে 'জাহিলিয়্যাত' শব্দটি নিছক অক্ষরজ্ঞানহীনতা বা শিক্ষার অভাবকে নির্দেশ করে না; বরং এটি মূলত একটি নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং আধ্যাত্মিক শূন্যতার সমার্থক, যেখানে ঐশী জ্ঞান ও যৌক্তিকতার বদলে কুসংস্কার, গোঁড়ামি […]
ভূমিকা ইসলামিক জ্ঞানচর্চায় কুরআনকে সাধারণত আধ্যাত্মিক বা ধর্মীয় নির্দেশনার গ্রন্থ হিসেবে দেখা হয়। তবে মুসলিম আধুনিক চিন্তাবিদরা, বিশেষ করে টিউনিশিয়ান তাফসিরবিদ মুহাম্মাদ আল-তাহির ইবনে আশুর (Muhammad al-Tahir ibn Ashur), কুরআনকে শুধু আধ্যাত্মিক নৈতিকতা প্রদানের বই নয়, বরং একটি সভ্যতা নির্মাণের পরিকল্পনামূলক নীতি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর তাফসির Tahrir wa al-Tanwir এই দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। […]