আবদোলকারিম সোরোশের "দ্য এক্সপানশন অফ প্রফেটিক এক্সপেরিয়েন্স" (The Expansion of Prophetic Experience) আধুনিক ইসলামি জ্ঞানতত্ত্ব (Epistemology) এবং কালাম শাস্ত্রের (Theology) অন্যতম প্রভাবশালী এবং একই সাথে বিতর্কিত একটি গ্রন্থ।
ইক্বরার লক্ষ্য হলো বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য স্রষ্টার ঐশী বাণীর সমন্বিত অধ্যয়ন ও সার্বজনীন প্রয়োগের জন্য জ্ঞানদীপ্ত অনুশীলন।
ইক্বরার উদ্দেশ্য হলো কুরআনের বাণীর উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ অনুধাবনের জন্য টেকসই ভিত্তি প্রস্তুত করা এবং জীবন ও সমাজের প্রায়োগিকতার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞানভিত্তিক ফ্রেমওয়ার্ক বা কাঠামো নির্মাণ।
ইতিহাসের পাতা উল্টালে সপ্তম শতাব্দীতে আরবের বুকে ইসলামের উত্থানকে একটি বিস্ময়কর বাঁক হিসেবেই দেখতে হয়। ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় আলোচনায় বা প্রথাগত ইতিহাসে ইসলামকে সাধারণত এমন একটি ঐশ্বরিক ঘটনা হিসেবে তুলে ধরা হয়, যার সাথে সমসাময়িক বা পূর্ববর্তী সমাজ-সংস্কৃতির যেন কোনো যোগসূত্রই ছিল না। কিন্তু আধুনিক ইতিহাসবিদ ও গবেষকরা এখন ভিন্ন কথা বলছেন। তাদের মতে, ইসলামকে নিখুঁতভাবে বুঝতে হলে একে 'লেইট অ্যান্টিকুইটি' (Late Antiquity) বা প্রাচীনকালের শেষভাগের এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক বিবর্তনের ফ্রেমে রেখেই দেখতে হবে 1।
সাম্প্রতিক গবেষণার ওপর ভিত্তি করে আমরা এখানে একটি দারুণ থিসিস নিয়ে আলোচনা করব। থিসিসটি হলো: প্রাচীনকালের একেবারে শেষভাগে, অর্থাৎ নিজের শুরুর দিনগুলোতে ইসলাম এমন একটি ধর্মীয় আন্দোলন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল, যার সাথে আজকের দিনের 'পেরেনিয়ালিজম' (Perennialism) বা শাশ্বত দর্শনের ধারণাগত ও কাঠামোগত অদ্ভুত মিল রয়েছে 3।
চলুন, এই প্রবন্ধের মাধ্যমে আমরা একটু গভীরে গিয়ে খোঁজার চেষ্টা করি—কীভাবে আদি ইসলাম একটি পেরেনিয়ালিস্ট বা অন্তর্ভুক্তিমূলক একেশ্বরবাদী আন্দোলন হিসেবে কাজ করেছিল এবং ঠিক কী কারণে পরবর্তীতে এটি একটি সুনির্দিষ্ট ও সীমানাবদ্ধ ধর্মীয় পরিচয়ে রূপ নিল।
সহজ কথায়, পেরেনিয়ালিজম বা 'পেরেনিয়াল ফিলোসফি' (ল্যাটিন: philosophia perennis) হলো আধ্যাত্মিকতার এমন একটি ধারা, যা মনে করে পৃথিবীর সব বড় ধর্মের মূলেই একটি সাধারণ, সর্বজনীন এবং শাশ্বত সত্য লুকিয়ে আছে 5। পেরেনিয়ালিস্টদের মতে, ধর্মের বাইরের আচার-অনুষ্ঠান, পোশাক বা ঐতিহাসিক পটভূমি হয়তো ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু এদের সবার অন্তর্নিহিত লক্ষ্য এবং পরম সত্তা (স্রষ্টা) মূলত এক এবং অভিন্ন 5।
ইউরোপের রেনেসাঁ যুগে এর তাত্ত্বিক বীজ বোনা হয়েছিল। পঞ্চদশ শতাব্দীর দিকে মারসিলিও ফিচিনো এবং জিওভানি পিকো দেল্লা মিরান্দোলার মতো চিন্তাবিদরা দাবি করেছিলেন যে, সত্য কেবল কোনো একটি নির্দিষ্ট ধর্মগ্রন্থে আটকে নেই; বরং এটি সব যুগেই একটি 'প্রাচীন ধর্মতত্ত্ব' হিসেবে বিরাজমান ছিল 5। আধুনিক যুগে অ্যালডাস হাক্সলি তাঁর The Perennial Philosophy বইয়ের মাধ্যমে এই অতীন্দ্রিয় সর্বজনীনতাকে আরও জনপ্রিয় করে তোলেন 5।
বিংশ শতাব্দীতে এই দর্শনের সবচেয়ে শক্তিশালী রূপটি গড়ে ওঠে 'ট্র্যাডিশনালিস্ট স্কুল'-এর হাত ধরে। রেনে গেনো, ফ্রিটজফ শুয়ন, মার্টিন লিংস এবং সৈয়দ হোসেন নাসরের মতো স্কলাররা এর নেতৃত্ব দেন 6। মজার ব্যাপার হলো, আধুনিক পেরেনিয়ালিস্টরা মনে করেন, সব ধর্মের বাইরের খোলস (Exoteric) আলাদা হলেও ভেতরের আধ্যাত্মিক মজ্জাটি (Esoteric) পুরোপুরি এক 6। মার্টিন লিংস তো ধর্মগুলোকে সুউচ্চ পর্বতমালার সাথে তুলনা করেছেন—পাহাড়ের চূড়াগুলো আলাদা হলেও তারা সবাই পবিত্রতার একই পরম গন্তব্যে পৌঁছায় 6।
| মূল ধারণা | ইউনিভার্সালিজম (Universalism) | পেরেনিয়ালিজম (Perennialism) | ট্র্যাডিশনালিজম (Traditionalism) |
| সত্যের ধরন | সত্য আপেক্ষিক এবং একাধিক হতে পারে। | সত্য একটাই, যা নানা রূপে বিভিন্ন ধর্মে রয়েছে। | শাশ্বত সত্য অতীতের ঐতিহ্যবাহী কাঠামোর মধ্যেই সবচেয়ে খাঁটি রূপে রয়েছে। |
| ধর্ম নিয়ে ভাবনা | সব ধর্মই যার যার জায়গায় ঠিক। | বাইরের আচার ভিন্ন হলেও ভেতরের সারমর্ম এক। | আধুনিকতার চেয়ে অর্থোডক্স ধর্মীয় ঐতিহ্যের মাধ্যমেই সত্যে পৌঁছানো সম্ভব। |
(সারণি ১: ইউনিভার্সালিজম, পেরেনিয়ালিজম এবং ট্র্যাডিশনালিজমের একটি সহজ তুলনামূলক চিত্র 5)
আদি ইসলামকে পেরেনিয়ালিজমের আয়নায় দেখতে চাইলে আমাদেরকে আগে সপ্তম শতাব্দীর ভূ-রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিবেশটা বুঝতে হবে। প্রথাগত ইতিহাসে প্রাক-ইসলামিক আরবকে স্রেফ 'জাহিলিয়াত' বা অজ্ঞতার যুগ বলা হলেও আধুনিক ইতিহাসবিদরা একে একটি সম্পূর্ণ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখেন।
ইতিহাসবিদ গার্থ ফাউডেন তাঁর সাড়াজাগানো গবেষণায় এই সময়কালকে 'প্রথম সহস্রাব্দ' (First Millennium) হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন 1। ফাউডেনের মতে, ইসলাম এমন কোনো হঠাৎ গজিয়ে ওঠা শক্তি ছিল না যা প্রাচীনকালকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। বরং এটি ছিল প্রাচীনকালের 'স্বাভাবিক পরিণতি' বা শেষ ধাপ 9। আজিজ আল-আজমেহ একে 'প্যালিও-ইসলাম' নাম দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, রোমান বা পারস্য সাম্রাজ্যের মতো ইসলামী সভ্যতাও আসলে ওই যুগেরই সবচেয়ে সফল একটি ফসল 11।
সেই সময়ের আরবের ধর্মীয় পরিবেশটা কেমন ছিল ভাবুন তো! কেবল পৌত্তলিকতাই নয়, ইহুদি, খ্রিষ্টান (নেস্টোরিয়ান ও মিয়াফিসাইট) এবং জরথুস্ট্রীয় ধর্মের বেশ শক্ত অবস্থান ছিল সেখানে 12। ঠিক এমন একটি বহু-ধর্মীয় কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে অবতীর্ণ কোরআনকে গবেষক অ্যাঞ্জেলিকা নিউউইর্থ একটি 'পলিফোনিক' বা বহুমাত্রিক পাঠ্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, কোরআন শুধু একা কথা বলেনি, বরং এটি সেকালের ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের সাথে এক গভীর বিতর্কে অংশ নিয়েছিল এবং প্রাচীন আখ্যানগুলোকে দারুণ মুন্সিয়ানার সাথে ঢেলে সাজিয়েছিল 1।
আদি ইসলাম যে আসলেই তার শুরুর দিকে একটি পেরেনিয়ালিস্ট বা অন্তর্ভুক্তিমূলক রূপ নিয়ে চলেছিল, তার সবচেয়ে জোরালো প্রমাণ দেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফ্রেড ডোনার। তাঁর মতে, একদম আদি পর্যায়ে ইসলাম আজ আমরা যাকে 'মুসলিম' বলি সেরকম কোনো গণ্ডিবদ্ধ ধর্ম ছিল না। বরং এটি ছিল একটি 'বিলিভার্স মুভমেন্ট' বা মুমিনদের আন্দোলন 3।
এই আন্দোলনের নিয়ম ছিল খুবই সহজ ও সর্বজনীন: ১. এক স্রষ্টায় বিশ্বাস (তৌহিদ)। ২. শেষ বিচারের দিনের ভয়। ৩. সৎ জীবনযাপন 3।
ডোনার বলছেন, সমসাময়িক ইহুদি এবং খ্রিষ্টানরাও তো মূলত এক স্রষ্টায় বিশ্বাস করত। তাই এই তিনটি শর্ত মেনে পুণ্যবান ইহুদি ও খ্রিষ্টানরাও এই 'মুমিন' আন্দোলনের অংশ হতে পারত 3। তাদেরকে নিজেদের ধর্ম বা ঐশ্বরিক আইন (তৌরাত ও ইঞ্জিল) ছাড়তে হতো না 3।
একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, এই দৃষ্টিভঙ্গিটা হুবহু পেরেনিয়ালিজমের সেই নীতির মতো, যেখানে ধর্মের বাহ্যিক লেবেলের চেয়ে ঐশ্বরিক ভিত্তির প্রতি আত্মসমর্পণকেই বড় করে দেখা হয় 3। তৎকালীন শিলালিপি (এপিগ্রাফি) এবং ধর্মনিরপেক্ষ ঐতিহাসিক প্রমাণগুলোও ডোনারের এই তত্ত্বকে জোরালো সমর্থন দেয় 17।
পেরেনিয়ালিজমের অন্যতম শর্ত হলো একটি আদিম ও বিশুদ্ধ সত্যের অস্তিত্ব, যা সব ধরনের মানবসৃষ্ট মতবাদের ঊর্ধ্বে 5। কোরআন ঠিক এই কৌশলটাই নিয়েছিল 'মিল্লাতে ইব্রাহিম' এবং 'হানিফ' শব্দের মাধ্যমে 20।
কোরআন আসার আগে 'হানিফ' বলতে আরবে বোঝানো হতো এমন কাউকে, যে প্রচলিত সমাজ বা ধর্ম থেকে ছিটকে পড়েছে 22। কিন্তু কোরআন শব্দটির অর্থ একেবারে উল্টে দিল। কোরআন বলল, হানিফ কোনো বিপথগামী নয়, বরং সেই হলো আসল হানিফ, যে সমাজের প্রচলিত সব বিকৃত ধর্মীয় পরিচয় ছুড়ে ফেলে সরাসরি এক স্রষ্টায়র দিকে নিজের মনকে স্থির করে 22।
কোরআন ইব্রাহিম (আ.)-কে এই আদিম একেশ্বরবাদের মডেল হিসেবে দাঁড় করাল। কোরআনে সরাসরি বলা হলো, "ইব্রাহিম ইহুদিও ছিলেন না, খ্রিষ্টানও ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ মুসলিম (হানিফান মুসলিমান)..." 20। এর মাধ্যমে কোরআন পেরেনিয়ালিজমের সুরে সুর মিলিয়ে প্রমাণ করল যে, ঐশ্বরিক সত্য কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের পৈত্রিক সম্পত্তি নয়, এটি সবার জন্য উন্মুক্ত 21। একই কথা খাটে 'ফিতরাত' বা মানুষের সহজাত ঐশ্বরিক প্রবৃত্তির ক্ষেত্রেও, যা মানুষকে প্রাকৃতিকভাবেই স্রষ্টার দিকে টানে 20।
তত্ত্ব তো অনেক হলো, এবার আসি বাস্তবে। সূরা বাকারার ৬২ নম্বর আয়াতটি খেয়াল করুন: "নিশ্চয়ই যারা মুমিন এবং যারা ইহুদি, খ্রিষ্টান ও সাবেয়ী—তাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকাজ করে, তাদের জন্য... কোনো ভয় নেই।" 25। এই আয়াতটি ফ্রেড ডোনারের তত্ত্ব এবং পেরেনিয়ালিস্ট দৃষ্টিভঙ্গিকে সরাসরি সমর্থন করে, যেখানে পরিত্রাণের জন্য কেবল স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস আর সৎকর্মকেই শর্ত হিসেবে দেওয়া হয়েছে 3।
আরেকটি দারুণ ঐতিহাসিক উদাহরণ হলো নাজরানের খ্রিষ্টান প্রতিনিধিদলের মদিনা সফর (৬৩১ খ্রিষ্টাব্দ)। মহানবী (সা.) এই খ্রিষ্টানদের মদিনার মসজিদে নববীর ভেতরেই তাদের নিজস্ব ধর্মীয় রীতি মেনে, পূর্ব দিকে মুখ করে প্রার্থনা করার অনুমতি দিয়েছিলেন 27। লেইট অ্যান্টিকুইটির চরম অসহিষ্ণুতার যুগে এমন ঘটনা চিন্তা করাও কঠিন। এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, আদি ইসলাম কতটা ইকুমেনিকাল ও পেরেনিয়ালিস্ট মানসিকতা ধারণ করত 28।
এই পর্যায়ে এসে একটি বড় প্রশ্ন জাগে: যদি ইসলামের শুরুটা এমন অন্তর্ভুক্তিমূলকই হয়, তবে আজকের প্রাতিষ্ঠানিক ও সুনির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয়টা এল কোথা থেকে?
এর প্রধান ধর্মতাত্ত্বিক কারণ হলো 'তাহরীফ' বা পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থ বিকৃতির ধারণা। পেরেনিয়ালিস্টরা মনে করেন বর্তমানের সব ধর্মই সত্যে পৌঁছানোর জন্য সমানভাবে কার্যকর 6। কিন্তু কোরআন এবং ইসলামী ধর্মতত্ত্ব তা মানে না। ইসলামের দাবি হলো, ইহুদি ও খ্রিষ্টান ধর্মগুলো একসময় ঐশ্বরিক থাকলেও মানুষের হস্তক্ষেপ ও কারসাজিতে (তাহরীফ) তারা তাদের আদি রূপ হারিয়ে ফেলেছে 6। যদি পেরেনিয়ালিজমের দাবি সত্যি হতো এবং সব ধর্মই সমান কাজ করত, তবে তো নতুন করে ইসলাম প্রচারের বা নতুন ধর্মীয় সম্প্রদায় গড়ার কোনো দরকারই ছিল না 6।
এছাড়া কোরআনের অন্যান্য আয়াতে (যেমন- ৩:৮৫) স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, ইসলাম পূর্ববর্তী সমস্ত বিধানকে রহিত করেছে এবং পরিত্রাণের জন্য একমাত্র ইসলামই গ্রহণযোগ্য 6।
এর পেছনে একটি বড় রাজনৈতিক কারণও ছিল। প্রথম শতাব্দীর মধ্যেই আরব মুসলমানরা এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলে 33। সেই বিশাল সাম্রাজ্যে মুষ্টিমেয় আরব শাসকদের জন্য এমন একটি নিজস্ব ও শক্তিশালী 'পরিচয়' খুব দরকার হয়ে পড়েছিল, যা তাদেরকে বাকি বিপুল সংখ্যক প্রজা (ইহুদি, খ্রিষ্টান, জরথুস্ট্রীয়) থেকে আলাদা করবে 3। ঠিক এই রাষ্ট্রগঠনের তাগিদেই উমাইয়া যুগে সেই নমনীয় 'মুমিন' পরিচয়টি সঙ্কুচিত হয়ে কঠোর আইন-কানুন ও নির্দিষ্ট আচারযুক্ত 'মুসলিম' পরিচয়ে রূপান্তরিত হয় 3।
আধুনিক পেরেনিয়ালিজমের চশমা দিয়ে দেখলে লেইট অ্যান্টিকুইটির ইসলামের এক অভাবনীয় সুন্দর রূপ আমাদের সামনে ফুটে ওঠে। আদি ইসলাম মোটেও কোনো আকস্মিক বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল প্রাচীনকালের খণ্ডিত সত্যগুলোকে ইব্রাহিমীয় আদিমতার সুতোয় গেঁথে এক করার একটি দারুণ প্রচেষ্টা।
ফ্রেড ডোনারের তত্ত্ব বা কোরআনের হানিফ ধারণা প্রমাণ করে যে, শুরুর দিকের ইসলাম মানুষের ভেতরের প্রাকৃতিক সত্যকে মূল্যায়ন করেছিল এবং বাহ্যিক বিভাজনের দেয়াল ভেঙে সবাইকে এক কাতারে আনার ডাক দিয়েছিল। কিন্তু ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই পেরেনিয়াল রূপটি ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। 'তাহরীফ'-এর মতবাদ, নতুন ওহীর শ্রেষ্ঠত্ব এবং সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখার স্বার্থে একটি নিজস্ব কাঠামোগত পরিচয়ের প্রয়োজন ইসলামকে শেষ পর্যন্ত একটি সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মে পরিণত করে। আর এই দুইয়ের অদ্ভুত মিশ্রণই ইসলামকে মানব ইতিহাসের অন্যতম প্রভাব বিস্তারকারী শক্তিতে পরিণত করেছে।
আবদোলকারিম সোরোশের "দ্য এক্সপানশন অফ প্রফেটিক এক্সপেরিয়েন্স" (The Expansion of Prophetic Experience) আধুনিক ইসলামি জ্ঞানতত্ত্ব (Epistemology) এবং কালাম শাস্ত্রের (Theology) অন্যতম প্রভাবশালী এবং একই সাথে বিতর্কিত একটি গ্রন্থ।
শারম্যান এ. জ্যাকসনের লেখা দ্য ইসলামিক সেক্যুলার (The Islamic Secular) সমসাময়িক ইসলামিক চিন্তাধারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সাহসী একটি বই। পশ্চিমা "সেক্যুলারিজম" (ধর্মহীনতা বা ধর্ম ও রাষ্ট্রের বিচ্ছেদ) এবং ইসলামিক আইনের (শরিয়াহ/ফিকহ) মধ্যে যে চিরস্থায়ী দ্বন্দ্বের ধারণা প্রচলিত, জ্যাকসন এই বইয়ে সেই দ্বন্দ্বের মূলে আঘাত করেছেন।
ইবনে আশুর সেন্টারের পরিচালক ড. সোহাইব সাঈদ একটি ইউটিউব ভিডিওতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence / AI) এবং কুরআনের তাফসিরের সংযোগস্থল নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে ডিজিটাল মডেলিংয়ের মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে পাণ্ডিত্যপূর্ণ মতামতের সারসংক্ষেপ করা, ধ্রুপদী গ্রন্থ অনুবাদ করা এবং এমনকি ঐতিহাসিক পণ্ডিতদের মতো 'চিন্তা' করা সম্ভব। মূল বিষয়বস্তু: ভূমিকা এবং শিক্ষাগত পটভূমি […]
Dr. Sohaib Saeed, director of the Ibn ʿAshur Centre, discussed in an YouTube Video the intersection of Artificial Intelligence and Quranic exegesis (Tafsir). He explores how AI can be used to summarize scholarly positions, translate classical texts, and even "think" like historical scholars through digital modeling. Key Takeaways: Highlight Introduction and Academic Background The session […]
কোরআনের বৈজ্ঞানিক ও গাণিতিক অলৌকিকতা: গাজী রাকায়েতের ইসলামে ফেরার কাহিনী কোরআনের ভুল খুঁজতে গিয়ে কেন কাঁদলেন ২৮টি জাতীয় পুরস্কারজয়ী পরিচালক? ভাবুন তো, একজন মানুষ পবিত্র কোরআনের বৈজ্ঞানিক ভুল (Scientific error) ধরার জন্য পড়া শুরু করলেন, কিন্তু শেষমেশ এর গাণিতিক নিখুঁত গাঁথুনি আর বৈজ্ঞানিক নিদর্শন দেখে নিজেই বিস্মিত হয়ে গেলেন! হ্যাঁ, ঠিক এমন একটি অবিশ্বাস্য ঘটনার […]
ইতিহাসের পাতা উল্টালে সপ্তম শতাব্দীতে আরবের বুকে ইসলামের উত্থানকে একটি বিস্ময়কর বাঁক হিসেবেই দেখতে হয়। ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় আলোচনায় বা প্রথাগত ইতিহাসে ইসলামকে সাধারণত এমন একটি ঐশ্বরিক ঘটনা হিসেবে তুলে ধরা হয়, যার সাথে সমসাময়িক বা পূর্ববর্তী সমাজ-সংস্কৃতির যেন কোনো যোগসূত্রই ছিল না। কিন্তু আধুনিক ইতিহাসবিদ ও গবেষকরা এখন ভিন্ন কথা বলছেন। তাদের মতে, ইসলামকে নিখুঁতভাবে […]
১. প্রাক-ইসলামি আরবের ঐতিহাসিক ও আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরব উপদ্বীপের সামগ্রিক অবস্থাকে ঐতিহাসিকভাবে 'জাহিলিয়্যাত' বা অন্ধকারের যুগ হিসেবে অভিহিত করা হয়। তবে একাডেমিক দৃষ্টিকোণ থেকে 'জাহিলিয়্যাত' শব্দটি নিছক অক্ষরজ্ঞানহীনতা বা শিক্ষার অভাবকে নির্দেশ করে না; বরং এটি মূলত একটি নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং আধ্যাত্মিক শূন্যতার সমার্থক, যেখানে ঐশী জ্ঞান ও যৌক্তিকতার বদলে কুসংস্কার, গোঁড়ামি […]
ভূমিকা ইসলামিক জ্ঞানচর্চায় কুরআনকে সাধারণত আধ্যাত্মিক বা ধর্মীয় নির্দেশনার গ্রন্থ হিসেবে দেখা হয়। তবে মুসলিম আধুনিক চিন্তাবিদরা, বিশেষ করে টিউনিশিয়ান তাফসিরবিদ মুহাম্মাদ আল-তাহির ইবনে আশুর (Muhammad al-Tahir ibn Ashur), কুরআনকে শুধু আধ্যাত্মিক নৈতিকতা প্রদানের বই নয়, বরং একটি সভ্যতা নির্মাণের পরিকল্পনামূলক নীতি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর তাফসির Tahrir wa al-Tanwir এই দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। […]