আবদোলকারিম সোরোশের "দ্য এক্সপানশন অফ প্রফেটিক এক্সপেরিয়েন্স" (The Expansion of Prophetic Experience) আধুনিক ইসলামি জ্ঞানতত্ত্ব (Epistemology) এবং কালাম শাস্ত্রের (Theology) অন্যতম প্রভাবশালী এবং একই সাথে বিতর্কিত একটি গ্রন্থ।
ইক্বরার লক্ষ্য হলো বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য স্রষ্টার ঐশী বাণীর সমন্বিত অধ্যয়ন ও সার্বজনীন প্রয়োগের জন্য জ্ঞানদীপ্ত অনুশীলন।
ইক্বরার উদ্দেশ্য হলো কুরআনের বাণীর উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ অনুধাবনের জন্য টেকসই ভিত্তি প্রস্তুত করা এবং জীবন ও সমাজের প্রায়োগিকতার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞানভিত্তিক ফ্রেমওয়ার্ক বা কাঠামো নির্মাণ।
আবদোলকারিম সোরোশের "দ্য এক্সপানশন অফ প্রফেটিক এক্সপেরিয়েন্স" (The Expansion of Prophetic Experience) আধুনিক ইসলামি জ্ঞানতত্ত্ব (Epistemology) এবং কালাম শাস্ত্রের (Theology) অন্যতম প্রভাবশালী এবং একই সাথে বিতর্কিত একটি গ্রন্থ। ইরানি এই দার্শনিক ও চিন্তাবিদ তাঁর এই বইটিতে ওহি (Revelation), নবুয়ত (Prophethood) এবং ধর্মীয় আইনের প্রকৃতি নিয়ে এমন কিছু প্রশ্ন তুলেছেন, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা প্রথাগত ইসলামি চিন্তাধারার মূল ভিত্তিকে চ্যালেঞ্জ করে।
পূর্বে আলোচিত "ফিকহ ম্যাক্সিমালিজম" বা শরিয়াহর সর্বব্যাপীতার ধারণাকে তাত্ত্বিকভাবে খণ্ডন করার ক্ষেত্রে এই বইটি একটি মাস্টারপিস। নিচে বইটির একটি বিস্তারিত পর্যালোচনা তুলে ধরা হলো:
প্রথাগত ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, কোরআন হলো ঈশ্বরের আক্ষরিক বাণী, যেখানে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ভূমিকা ছিল অনেকটা একটি 'প্যাসিভ' বা নিষ্ক্রিয় বাহকের মতো—যিনি কেবল স্বর্গীয় বার্তা অবিকল মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। কিন্তু সোরোশ এই বইটিতে ওহির প্রকৃতিকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
তাঁর মতে, ওহি কোনো একতরফা ডিকটেশন (Dictation) বা শ্রুতিলেখন নয়। বরং এটি নবী এবং ঈশ্বরের মধ্যকার একটি মিথস্ক্রিয় বা ইন্টারঅ্যাকটিভ অভিজ্ঞতা (Interactive Experience)। সোরোশ যুক্তি দেন যে, নবীর নিজস্ব মনস্তত্ত্ব, তাঁর ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক পর্যায়, তৎকালীন আরব সমাজের সংস্কৃতি, ভাষা এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট—এসব কিছুই ওহি নাজিলের প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। অর্থাৎ, নবী কেবল বার্তার বাহক ছিলেন না, তিনি ছিলেন এই ঐশী অভিজ্ঞতার একজন সৃজনশীল অংশীদার।
সোরোশ তাঁর দর্শনকে কয়েকটি মূল কাঠামোর ওপর দাঁড় করিয়েছেন:
বইটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান হলো ইসলামকে 'এসেনশিয়াল' এবং 'অ্যাক্সিডেন্টাল'—এই দুই ভাগে বিভক্ত করা।
সোরোশের যুক্তি হলো, কোরআন যদি আরবের বদলে অন্য কোনো ভৌগোলিক অঞ্চলে অবতীর্ণ হতো, তবে ধর্মের 'সারবস্তু' একই থাকত, কিন্তু এর 'আপতিক' বা বাহ্যিক নিয়মকানুনগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন হতো।
বইয়ের শিরোনামটি মূলত এই ধারণা থেকেই এসেছে। সোরোশ বলেন, আইনি বা শরিয়াহর দিক থেকে নবুয়তের সমাপ্তি (খতমে নবুয়ত) ঘটেছে ঠিকই, কিন্তু নবীর যে আধ্যাত্মিক ও ঐশী অভিজ্ঞতা ছিল, তার সমাপ্তি ঘটেনি। সুফি, দরবেশ এবং সাধারণ মুমিনদের আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমে সেই "প্রফেটিক অভিজ্ঞতা" যুগে যুগে সম্প্রসারিত হয়। ধর্ম কেবল একটি ঐতিহাসিক টেক্সটে (Text) সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি চলমান আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা।
সোরোশ দেখিয়েছেন যে, ফিকহ বা ইসলামি আইন মূলত সেই সময়ের জন্য একটি "মিনিমালিস্ট" বা ন্যূনতম আইনি কাঠামো ছিল, যা একটি সরল উপজাতীয় সমাজকে শৃঙ্খলায় আনার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু আধুনিক যুগে এসে ফিকহকে দিয়ে জটিল রাষ্ট্রযন্ত্র, আধুনিক অর্থনীতি বা মানবাধিকারের মতো বিশাল পরিসর নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করাটা (যাকে ফিকহ ম্যাক্সিমালিজম বলা হয়) একটি মারাত্মক জ্ঞানতাত্ত্বিক ভুল। ফিকহ মানবজীবনের কেবল বাহ্যিক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে, কিন্তু ধর্মের মূল উদ্দেশ্য হলো ভেতরের আধ্যাত্মিক রূপান্তর। ফিকহকে রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি বানালে ধর্মের আধ্যাত্মিক সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায় এবং এটি একটি শুষ্ক রাজনৈতিক মতাদর্শে পরিণত হয়।
যে আধুনিক শিক্ষিত মুসলিমরা বিজ্ঞান, মানবাধিকার এবং বিশ্বায়নের সাথে প্রথাগত ইসলামি আইনের (যেমন—দণ্ডবিধি, উত্তরাধিকার আইন বা নারী-পুরুষের ভূমিকার আইন) সংঘাত অনুভব করেন, সোরোশ তাদের জন্য একটি শক্তিশালী দার্শনিক ফ্রেমওয়ার্ক বা কাঠামো প্রদান করেছেন।
সোরোশের তত্ত্ব অনুযায়ী, আধুনিক যুগে মুসলমানদের সপ্তম শতাব্দীর 'আপতিক' বা ঐতিহাসিক আইনি কাঠামো হুবহু আঁকড়ে ধরে রাখার প্রয়োজন নেই। বরং ধর্মের মূল 'সারবস্তু' বা ন্যায়বিচারের চেতনাকে ধারণ করে আধুনিক যুগের উপযোগী নতুন আইন, কাঠামো বা সিস্টেম তৈরি করাটাই হলো ধর্মের প্রকৃত অনুসরণ। এটি ধর্মকে বাতিলের খাতায় ফেলে দেয় না, বরং তাকে আধুনিক বাস্তবতার সাথে নিরবচ্ছিন্নভাবে যুক্ত (Integrate) করার পথ দেখায়।
যেকোনো যুগান্তকারী দার্শনিক কাজের মতোই সোরোশের এই বইটিও তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে:
"দ্য এক্সপানশন অফ প্রফেটিক এক্সপেরিয়েন্স" কোনো সাধারণ ফিকহ বা তাফসিরের বই নয়; এটি মূলত ধর্মের ফিলোসফি বা দর্শনের একটি বই। আবদোলকারিম সোরোশ অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে ধর্মকে একটি স্থবির আইনগ্রন্থের জায়গা থেকে বের করে একটি জীবন্ত, স্পন্দিত এবং বিকাশমান আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
বইটির সব যুক্তির সাথে আপনি একমত না-ও হতে পারেন, কিন্তু এটি নিশ্চিতভাবেই আপনার চিন্তার জগতকে আলোড়িত করবে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, মানবাধিকার এবং পরিবর্তনশীল বিশ্বের সাথে ধর্মকে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা যায়—সেই পদ্ধতিগত উত্তর খোঁজার ক্ষেত্রে এই বইটি সমসাময়িক ইসলামি চিন্তাজগতের অন্যতম সেরা একটি সংযোজন।
আবদোলকারিম সোরোশের "দ্য এক্সপানশন অফ প্রফেটিক এক্সপেরিয়েন্স" (The Expansion of Prophetic Experience) আধুনিক ইসলামি জ্ঞানতত্ত্ব (Epistemology) এবং কালাম শাস্ত্রের (Theology) অন্যতম প্রভাবশালী এবং একই সাথে বিতর্কিত একটি গ্রন্থ।
শারম্যান এ. জ্যাকসনের লেখা দ্য ইসলামিক সেক্যুলার (The Islamic Secular) সমসাময়িক ইসলামিক চিন্তাধারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সাহসী একটি বই। পশ্চিমা "সেক্যুলারিজম" (ধর্মহীনতা বা ধর্ম ও রাষ্ট্রের বিচ্ছেদ) এবং ইসলামিক আইনের (শরিয়াহ/ফিকহ) মধ্যে যে চিরস্থায়ী দ্বন্দ্বের ধারণা প্রচলিত, জ্যাকসন এই বইয়ে সেই দ্বন্দ্বের মূলে আঘাত করেছেন।
ইবনে আশুর সেন্টারের পরিচালক ড. সোহাইব সাঈদ একটি ইউটিউব ভিডিওতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence / AI) এবং কুরআনের তাফসিরের সংযোগস্থল নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে ডিজিটাল মডেলিংয়ের মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে পাণ্ডিত্যপূর্ণ মতামতের সারসংক্ষেপ করা, ধ্রুপদী গ্রন্থ অনুবাদ করা এবং এমনকি ঐতিহাসিক পণ্ডিতদের মতো 'চিন্তা' করা সম্ভব। মূল বিষয়বস্তু: ভূমিকা এবং শিক্ষাগত পটভূমি […]
Dr. Sohaib Saeed, director of the Ibn ʿAshur Centre, discussed in an YouTube Video the intersection of Artificial Intelligence and Quranic exegesis (Tafsir). He explores how AI can be used to summarize scholarly positions, translate classical texts, and even "think" like historical scholars through digital modeling. Key Takeaways: Highlight Introduction and Academic Background The session […]
কোরআনের বৈজ্ঞানিক ও গাণিতিক অলৌকিকতা: গাজী রাকায়েতের ইসলামে ফেরার কাহিনী কোরআনের ভুল খুঁজতে গিয়ে কেন কাঁদলেন ২৮টি জাতীয় পুরস্কারজয়ী পরিচালক? ভাবুন তো, একজন মানুষ পবিত্র কোরআনের বৈজ্ঞানিক ভুল (Scientific error) ধরার জন্য পড়া শুরু করলেন, কিন্তু শেষমেশ এর গাণিতিক নিখুঁত গাঁথুনি আর বৈজ্ঞানিক নিদর্শন দেখে নিজেই বিস্মিত হয়ে গেলেন! হ্যাঁ, ঠিক এমন একটি অবিশ্বাস্য ঘটনার […]
ইতিহাসের পাতা উল্টালে সপ্তম শতাব্দীতে আরবের বুকে ইসলামের উত্থানকে একটি বিস্ময়কর বাঁক হিসেবেই দেখতে হয়। ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় আলোচনায় বা প্রথাগত ইতিহাসে ইসলামকে সাধারণত এমন একটি ঐশ্বরিক ঘটনা হিসেবে তুলে ধরা হয়, যার সাথে সমসাময়িক বা পূর্ববর্তী সমাজ-সংস্কৃতির যেন কোনো যোগসূত্রই ছিল না। কিন্তু আধুনিক ইতিহাসবিদ ও গবেষকরা এখন ভিন্ন কথা বলছেন। তাদের মতে, ইসলামকে নিখুঁতভাবে […]
১. প্রাক-ইসলামি আরবের ঐতিহাসিক ও আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরব উপদ্বীপের সামগ্রিক অবস্থাকে ঐতিহাসিকভাবে 'জাহিলিয়্যাত' বা অন্ধকারের যুগ হিসেবে অভিহিত করা হয়। তবে একাডেমিক দৃষ্টিকোণ থেকে 'জাহিলিয়্যাত' শব্দটি নিছক অক্ষরজ্ঞানহীনতা বা শিক্ষার অভাবকে নির্দেশ করে না; বরং এটি মূলত একটি নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং আধ্যাত্মিক শূন্যতার সমার্থক, যেখানে ঐশী জ্ঞান ও যৌক্তিকতার বদলে কুসংস্কার, গোঁড়ামি […]
ভূমিকা ইসলামিক জ্ঞানচর্চায় কুরআনকে সাধারণত আধ্যাত্মিক বা ধর্মীয় নির্দেশনার গ্রন্থ হিসেবে দেখা হয়। তবে মুসলিম আধুনিক চিন্তাবিদরা, বিশেষ করে টিউনিশিয়ান তাফসিরবিদ মুহাম্মাদ আল-তাহির ইবনে আশুর (Muhammad al-Tahir ibn Ashur), কুরআনকে শুধু আধ্যাত্মিক নৈতিকতা প্রদানের বই নয়, বরং একটি সভ্যতা নির্মাণের পরিকল্পনামূলক নীতি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর তাফসির Tahrir wa al-Tanwir এই দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। […]