আবদোলকারিম সোরোশের "দ্য এক্সপানশন অফ প্রফেটিক এক্সপেরিয়েন্স" (The Expansion of Prophetic Experience) আধুনিক ইসলামি জ্ঞানতত্ত্ব (Epistemology) এবং কালাম শাস্ত্রের (Theology) অন্যতম প্রভাবশালী এবং একই সাথে বিতর্কিত একটি গ্রন্থ।
ইক্বরার লক্ষ্য হলো বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য স্রষ্টার ঐশী বাণীর সমন্বিত অধ্যয়ন ও সার্বজনীন প্রয়োগের জন্য জ্ঞানদীপ্ত অনুশীলন।
ইক্বরার উদ্দেশ্য হলো কুরআনের বাণীর উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ অনুধাবনের জন্য টেকসই ভিত্তি প্রস্তুত করা এবং জীবন ও সমাজের প্রায়োগিকতার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞানভিত্তিক ফ্রেমওয়ার্ক বা কাঠামো নির্মাণ।
অনেক কুরআনের পাঠক ধারনা করেন যে কিতাব মানেই ”বই“। যেহেতু আমরা ছাপাখানা আবিস্কারের পরের যুগের আধুনিক সময়ের মানুষ তাই আমাদের কাছে কিতাব বললেই দুই মলাট বিশিষ্ট ভেতরে ঝকঝকে ছাপা যুক্ত কিছু কাগজের বাইন্ডিং চোখে ভেসে ওঠে। কিন্তু মানব সভ্যতার ইতিহাসে আধুনিক বই সহজলভ্য ও সাধারন মানুষের হাতে এসেছে এই ছাপাখানা আবিস্কারের পরে। ১৪০০ সালে আবিস্কার হলেও ১৫০০ সালের দিকে প্রচলন শুরু হয় এবং তা সারা পৃথিবীতে ছড়াতে আরো অনেক সময় লেগে যায়, কারন প্রযুক্তি আগের যুগে এত দ্রুত এক দেশ, মহাদেশ থেকে আরে দেশ ও মহাদেশে ছড়াতে পারতো না।
সুতরাং এর আগে, অর্থাৎ ৫০০, ৬০০, ৮০০, ১০০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে শুরু করে ১৬০০, ১৭০০ খ্রিষ্টাব্দের আগে বইয়ের ধারনা কিন্তু অন্যরকম ছিলো। পুরো দেশে কতগুলো চামড়ায় বাধানো বই আছে যার প্রতিটা অক্ষর হাতে লেখা সেটা হয়তো একহাতে গুনেফেলা যেত। সেই প্রাচীণ বই বা স্তুপকৃত পাতা, ফলক হাতে হাতে ঘুরতো। লেখক থেকে লেখকের ছাত্র, সন্তান ও পরিবারে রক্ষিত থাকতো। প্রাচীণ কিছু সভ্যতায় লাইব্রেরী ছিলো এটা সত্য। কিন্তু পড়তে পারতো খুবই কম মানুষ।
কুরআন যখন নাজিল হয় তখন মক্কা, যেটা তৎকালীণ একটা কেন্দ্রিয় শহর ছিলো, এখানে কিছু পড়তে জানা মানুষ থাকলেও শহরের বাইরে পল্লী, বেদুইনদের মধ্যে পড়তে জানতো বললেই চলে। কারন পড়ার কোন প্রয়োজন তাদের যাযাবর / বেদুইন জীবনে ছিলো না। যারা ব্যবসা করতো দূরের শহর ও মানুষের সাথে তাদের ব্যবসার ব্যবহারিক প্রয়োজনে সীমিতভাবে লিখতে পড়তো জানতে হতো।
রাসুল বা তার সমাজ যে খুব একটা পড়ার অভ্যাসে ছিলো না তার সরাসরি প্রমাণ কুরআনের আয়াতের আছে।
তখনকার সময়ে ইহুদী গোত্রে কিছুটা পড়তে জানা মানুষ ছিলো কারন হলো তাদের তাওরাত, তালমুদ ইত্যাদি গ্রন্থের প্রচলন। আরও আগের সময়ে কেবলমাত্র উপসনালয়ের প্রধান বা তার দুই একজন সহকারীরাই কিতাব পড়ে শুনাতো বাকীদের। সাধারন মানুষ পড়তে পারতো না; তাদের সমাজে পড়তে পারার কোন প্রয়োজন ছিলো না।
এখন যে অর্থে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় আছে, তেমনটি প্রাচীন সমাজে ছিলো না; যে কারনে মলাট বন্দী বই কখনোই সাধারন মানুষের কাছে সহজলভ্য হওয়ার প্রয়োজন হয় নাই।
কিতাব শব্দটি যে তিনটি অক্ষর থেকে উদ্ভুত সেগুলো হলো: কাফ, তা, বা। কুরআন করপাসে এই মূল থেকে আসা সবগুলো শব্দ ও আয়াত দেখুন।
কিতাব শব্দের শাব্দিক অর্থ ‘লিখিত জিনিস’। কিন্তু প্রায়োগিকভাবে শব্দটি শুধুমাত্র ‘লিখিত জিনিস’ অর্থে ব্যবহৃত হয় না। বরং কিতাব শব্দটি বহু অর্থবোধক শব্দ। কুরআনে ‘কিতাব’ শব্দটি দ্বারা বিভিন্ন বিষয়কে বুঝানো হয়েছে। যেমন:
১. মানুষের হিদায়াত বা পথনির্দেশের জন্য আল্লাহর নাজিলকৃত তথ্য ও বিধি-বিধান সম্বলিত গ্রন্থ, যা লিখিত আকারেও নাযিল হতে পারে আবার নাযিলের পরও লিখিত হতে পারে। (৪:১৩৬, ৬:৭, ৮০:১১-১৬)
২. লিপিবদ্ধ / সংবিধিবদ্ধ (২:২৩৫)
৩. আল্লাহর নির্ধারিত বিধান (৪:২৪, ৪:১০৩, ৮:৬৮)
৪. প্রাকৃতিক নিয়মের কিতাব / নিবন্ধগ্রন্থ (৩:১৪৫, ৭:৩৭, ৬:৫৯, ১০:৬১, ১১:৬, ২২:৭০, ২৭:৭৫, ৩০:৫২, ৩৪:৩, ৩৫:১১, ৫৭:২২)
৫. সৃষ্টির প্রথম থেকে চলে আসা কিতাব / নিয়ম / বিধান (৯:৩৬, ১০:৩৮)
৬. উম্মুল কিতাব বা যে কিতাব থেকে প্রতি যুগের জন্য নির্ধারিত কিতাব / নির্দেশনা এসেছে (১৩:৩৮-৩৯, ৪৩:৪)
৭. প্রত্যেকের পরিস্থিতিগত বিবরণ ও আমলনামা / নিবন্ধনামা (২০:৫২, ২৩:৬২, ৪৫:২৮-২৯, ১৭:১৩-১৪, ১৮:৪৯, ৩৯:৬৯, ৬৯:১৯, ৬৯:২৫, ৭৮:২৯, ৮৩:৭, ৮৩:৯, ৮৩:১৮, ৮৩:২০, ৮৪:৭, ৮৪:১০)
৮. চুক্তিপত্র (২৪:৩৩)
৯. চিঠি (২৭:২৮-৩০)
উপরোক্ত আয়াতগুলো বিশেষ করে নির্ধারিত বিধান হিসেবে এবং চুক্তিপত্র / চিঠি হিসেবে যখন কিতাব শব্দের ব্যবহার দেখি তখন এটা স্পষ্ট যে শুধু মাত্র ঐশী গ্রন্থ বা দুই মলাটের বইয়ের মধ্যেই কিতাব শব্দটির প্রায়োগিক অর্থ সীমাবদ্ধ নয়।
কুরআন অধ্যায়ন করার ক্ষেত্রে যারা সঠিক অর্থ অনুধাবন করার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন তাদের জন্য কয়েক সঠিক অর্থে পৌছানোর জন্য কিছু ব্যাপার মনে রাখা প্রয়োজন।
প্রথমত: একটি উদাহরন থেকে বোঝা যেতে পারে যে কিভাবে যেকোন ভাষায় একই শব্দ পরিপ্রেক্ষিত অনুসারে ভিন্ন প্রায়োগিক অর্থ ধারন করতে পারে।
বাংলায় "সবুজ" শব্দটি নেওয়া যেতে পারে।
১ম উদাহরন বাক্য: সবুজ, ঐ ঘর থেকে আমার কলমটা এনে দাও।
২য় উদাহরন বাক্য: গাছের আমগুলো এখনো বেশ সবুজ।
৩য় উদাহরন বাক্য: ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা, ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ, আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।
এখানে একই শব্দ সবুজ যার শব্দমূল একই হলেও, বানান এবং উচ্চারণ একই হওয়ার পরেও; যেকোন বাংলাভাষাভাষী বুঝতে পারে যে ১ম উদাহরনে এটি একটি মানুষের নাম; ২য় উদাহরনের এর অর্থ অপরিপক্ক বা কাঁচা এবং ৩য় বাক্যে কাব্যিকভাবে ব্যবহৃত সবুজ অর্থ নবীন, তরুন, অনভিজ্ঞ।
যেকোন ভাষাতেই ব্যবহারিক ও প্রয়োগিক ক্ষেত্রে একই শব্দের এই ভিন্ন ভিন্ন অর্থ ধারন করা খুব স্বাভাবিক। কুরআনের আরবিও এর থেকে আলাদা নয়।
সুতরাং পরের প্রশ্ন হলো: তা হলে কুরআনে একটি শব্দের অর্থ যে ভিন্ন ভিন্ন হতে পরে এই সম্ভাবনা মাথায় রেখে কখন কোন অর্থটি গ্রহন করা উচিত হবে?
এর জন্য আমরা ৪টি ধাপ চিহ্নিত করতে পারি:
১. কুরআনের যত জায়গায় শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, সবগুলো আয়াতকে স্বস্ব কনটেক্সটে অধ্যয়ন করা
২. রুট ওয়ার্ড ভিত্তিক যতগুলো অর্থ সম্ভব সেগুলোকে সম্ভাব্য অর্থ হিসেবে ধরে নেওয়া
৩. কনটেক্সট ভিত্তিক যে অর্থটি সবচেয়ে প্রযোজ্য হয় সেটি নির্বাচিত করা
৪. তারপরেও যদি একাধিক সম্ভাব্য অর্থ হয়, সেক্ষেত্রে কোন অর্থটি যুক্তি ও বিবেকের সাথে সবচেয়ে সংগতিপূর্ণ যা প্রাকৃতিক ও স্বাভাবিক সেটির প্রাধান্য দেওয়া। কুরআনের কোন আয়াতের অর্থই বিবেক বিরোধী হবে না।
আরো পড়ার জন্য রেফারেন্স:
আবদোলকারিম সোরোশের "দ্য এক্সপানশন অফ প্রফেটিক এক্সপেরিয়েন্স" (The Expansion of Prophetic Experience) আধুনিক ইসলামি জ্ঞানতত্ত্ব (Epistemology) এবং কালাম শাস্ত্রের (Theology) অন্যতম প্রভাবশালী এবং একই সাথে বিতর্কিত একটি গ্রন্থ।
শারম্যান এ. জ্যাকসনের লেখা দ্য ইসলামিক সেক্যুলার (The Islamic Secular) সমসাময়িক ইসলামিক চিন্তাধারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সাহসী একটি বই। পশ্চিমা "সেক্যুলারিজম" (ধর্মহীনতা বা ধর্ম ও রাষ্ট্রের বিচ্ছেদ) এবং ইসলামিক আইনের (শরিয়াহ/ফিকহ) মধ্যে যে চিরস্থায়ী দ্বন্দ্বের ধারণা প্রচলিত, জ্যাকসন এই বইয়ে সেই দ্বন্দ্বের মূলে আঘাত করেছেন।
ইবনে আশুর সেন্টারের পরিচালক ড. সোহাইব সাঈদ একটি ইউটিউব ভিডিওতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence / AI) এবং কুরআনের তাফসিরের সংযোগস্থল নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে ডিজিটাল মডেলিংয়ের মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে পাণ্ডিত্যপূর্ণ মতামতের সারসংক্ষেপ করা, ধ্রুপদী গ্রন্থ অনুবাদ করা এবং এমনকি ঐতিহাসিক পণ্ডিতদের মতো 'চিন্তা' করা সম্ভব। মূল বিষয়বস্তু: ভূমিকা এবং শিক্ষাগত পটভূমি […]
Dr. Sohaib Saeed, director of the Ibn ʿAshur Centre, discussed in an YouTube Video the intersection of Artificial Intelligence and Quranic exegesis (Tafsir). He explores how AI can be used to summarize scholarly positions, translate classical texts, and even "think" like historical scholars through digital modeling. Key Takeaways: Highlight Introduction and Academic Background The session […]
কোরআনের বৈজ্ঞানিক ও গাণিতিক অলৌকিকতা: গাজী রাকায়েতের ইসলামে ফেরার কাহিনী কোরআনের ভুল খুঁজতে গিয়ে কেন কাঁদলেন ২৮টি জাতীয় পুরস্কারজয়ী পরিচালক? ভাবুন তো, একজন মানুষ পবিত্র কোরআনের বৈজ্ঞানিক ভুল (Scientific error) ধরার জন্য পড়া শুরু করলেন, কিন্তু শেষমেশ এর গাণিতিক নিখুঁত গাঁথুনি আর বৈজ্ঞানিক নিদর্শন দেখে নিজেই বিস্মিত হয়ে গেলেন! হ্যাঁ, ঠিক এমন একটি অবিশ্বাস্য ঘটনার […]
ইতিহাসের পাতা উল্টালে সপ্তম শতাব্দীতে আরবের বুকে ইসলামের উত্থানকে একটি বিস্ময়কর বাঁক হিসেবেই দেখতে হয়। ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় আলোচনায় বা প্রথাগত ইতিহাসে ইসলামকে সাধারণত এমন একটি ঐশ্বরিক ঘটনা হিসেবে তুলে ধরা হয়, যার সাথে সমসাময়িক বা পূর্ববর্তী সমাজ-সংস্কৃতির যেন কোনো যোগসূত্রই ছিল না। কিন্তু আধুনিক ইতিহাসবিদ ও গবেষকরা এখন ভিন্ন কথা বলছেন। তাদের মতে, ইসলামকে নিখুঁতভাবে […]
১. প্রাক-ইসলামি আরবের ঐতিহাসিক ও আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরব উপদ্বীপের সামগ্রিক অবস্থাকে ঐতিহাসিকভাবে 'জাহিলিয়্যাত' বা অন্ধকারের যুগ হিসেবে অভিহিত করা হয়। তবে একাডেমিক দৃষ্টিকোণ থেকে 'জাহিলিয়্যাত' শব্দটি নিছক অক্ষরজ্ঞানহীনতা বা শিক্ষার অভাবকে নির্দেশ করে না; বরং এটি মূলত একটি নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং আধ্যাত্মিক শূন্যতার সমার্থক, যেখানে ঐশী জ্ঞান ও যৌক্তিকতার বদলে কুসংস্কার, গোঁড়ামি […]
ভূমিকা ইসলামিক জ্ঞানচর্চায় কুরআনকে সাধারণত আধ্যাত্মিক বা ধর্মীয় নির্দেশনার গ্রন্থ হিসেবে দেখা হয়। তবে মুসলিম আধুনিক চিন্তাবিদরা, বিশেষ করে টিউনিশিয়ান তাফসিরবিদ মুহাম্মাদ আল-তাহির ইবনে আশুর (Muhammad al-Tahir ibn Ashur), কুরআনকে শুধু আধ্যাত্মিক নৈতিকতা প্রদানের বই নয়, বরং একটি সভ্যতা নির্মাণের পরিকল্পনামূলক নীতি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর তাফসির Tahrir wa al-Tanwir এই দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। […]