দি  ইন্সটিটিউট ফর কুরআনিক রিসার্চ এন্ড এ্যাপ্লিকেশন (ইক্বরা)

লক্ষ্য

ইক্বরার লক্ষ্য হলো বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য স্রষ্টার ঐশী বাণীর সমন্বিত অধ্যয়ন ও সার্বজনীন প্রয়োগের জন্য জ্ঞানদীপ্ত অনুশীলন।

উদ্দেশ্য

ইক্বরার উদ্দেশ্য হলো কুরআনের বাণীর উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ অনুধাবনের জন্য টেকসই ভিত্তি প্রস্তুত করা এবং জীবন ও সমাজের প্রায়োগিকতার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞানভিত্তিক ফ্রেমওয়ার্ক বা কাঠামো নির্মাণ।

প্রকাশিত বইসমূহ

পবিত্রতার দোহাই দিয়ে হদের সীমা ডিঙানো কি ইসলামিক নাকি জুলুম?

লিখেছেন শেখ মুজাহিদ / প্রকাশিত দরসখানা - darskhana

মোকাদ্দিমা : আমরা কী বলতেছি আর কী বলতেছি না

২০২২ সালের ১০ নভেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক কৃষক পরিবারের বড় ছেলে নজরুল ইসলাম দালালের মাধ্যমে সৌদি আরবে যায় [১]। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় তার এই বিদেশযাত্রা; ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর, বুধবার, সৌদি সরকার তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে [২]। পরিবারের ভাষ্যে প্রায় তিন বছর তিন মাস নজরুল কারাগারে ছিল এবং প্রতি সপ্তাহে ফোন করে বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলত [৩]; প্রথম আলোর সাক্ষাৎকারে আসছে মাসে দুয়েক মিনিট। একই দিনে একই রায়ে প্রাণ গেছে টাঙ্গাইলের সুইটি (সিতি) আক্তারের। গণমাধ্যমে নজরুলের বয়স লেখা হইছে কোথাও বাইশ, কোথাও পঁচিশ। সুইটির নামের বানানও একেক পত্রিকায় একেক রকম : সিথি, সিতি, সুইটি [৪]।

কোনো মুসলিম নারী-পুরুষ যদি মসজিদের মতো পবিত্র জায়গায় ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে থাকে, তবে সেটা ভীষণ গুরুতর গুনাহ, তাদের তাওবা করতে হবে; এটাকে হালকা করে দেখতে চাওয়া উচিৎ না। কিন্তু এই লেখার মাকসাদ যেটা : কোরআন, সুন্নাহ ও ফিকহের মূলনীতির আলোকে ‘স্থানের পবিত্রতা’ নামের যুক্তিতে কোরআন-সুন্নাহর নির্ধারিত ব্যভিচারের শাস্তির সীমা ডিঙায়ে প্রাণদণ্ড দেওয়ার কোনো বৈধতা আছে কিনা, বিচারক এটাকে ‘তাজির’ নাম দিয়ে কার্যকর করলেই তার আইনি ভিত্তি তৈরি হয়ে যায় কিনা—তা খতিয়ে দেখা।

.

১. ঘটনার তথ্য : কী জানা গেছে, কী জানা যায় নাই

কোনো ফিকহি যুক্তি দাঁড় করানোর আগে আমাদের জানা দরকার ঠিক কী ঘটছিল; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে গল্পসল্প ঘুরতেছে, তার সঙ্গে সরকারি ও গণমাধ্যম-সূত্রের তথ্যের অমিল অনেক।

[যা নিশ্চিত]

সৌদি প্রেস এজেন্সির (SPA) মাধ্যমে প্রকাশিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হইছে, অপরাধের গুরুত্ব ও স্থানের পবিত্রতা লঙ্ঘনের বিষয়টা বিবেচনা করে ইসলামি আইনের ‘তাজির’ ধারায় এ দণ্ড দেওয়া হয়, আর রায়ের পর রাজকীয় আদেশে তা কার্যকর হয় [৫]। বিবৃতিতে ফাসাদ নিয়ে উদ্ধৃত হইছে কয়েকটা আয়াত, যার মধ্যে সুরা মায়েদার ৩৩ নম্বর আয়াতও আছে; আর অপরাধকে ‘পবিত্র মক্কা নগরীর একটা মসজিদের ভিতরে’ সংঘটিত ‘জঘন্য যৌন অবক্ষয়মূলক’ কাজ বলা হইছে [৬]। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ কোন মসজিদে ঘটনা ঘটছিল, অপরাধ ঠিক কী ধরনের ছিল বা কখন গ্রেপ্তার করা হইছিল, তার নির্দিষ্ট বিবরণ জানায় নাই [৭]।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র ও সরকারি নথির বরাতে প্রথম আলো জানাইছে, নজরুলকে ২০২৩ সালের ১ আগস্ট এবং সুইটিকে ২ আগস্ট আটক করা হয়; দুইজনই আল-মাজাল কোম্পানিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করত। একই প্রতিবেদনে বলা হইছে, সৌদি পক্ষ জেদ্দার বৈঠকে মৌখিকভাবে জানায় যে নিম্ন আদালত প্রথমে দণ্ড দেয়, আর ১৩ বিচারকের আপিল প্যানেল মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে [৮]। (অন্য এক নিবন্ধে এই ১৩ সংখ্যাকে সৌদি বিচারব্যবস্থার তিন ধাপের—৩-৫-৫—বিচারক যোগফল হিশেবে ব্যাখ্যা করা হইছে; কিন্তু দুই ব্যাখ্যার কোনোটাই সরকারিভাবে লিখিত নথি আকারে নিশ্চিত হয় নাই [৯]।)

সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৩০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের জেদ্দা কনস্যুলেটে যে দণ্ডিতদের তালিকা পাঠায়, তাতে নজরুলের নামের পাশে ‘সাইবার অপরাধ’ এবং সুইটির নামের পাশে ‘ব্যভিচার’-এর উল্লেখ ছিল, কিন্তু কারও সাজার বিস্তারিত বিবরণ ছিল না [১০]। অর্থাৎ দুইজনকে দুই ভিন্ন অভিযোগে দেখানো হইছিল, একই অভিযোগে না [১১]। বাংলাদেশের প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্যে, সৌদিতে বাংলাদেশ মিশনের শ্রম উইংয়ের তথ্যে দুইজনকে মক্কার একটা মসজিদের ভিতরে ব্যভিচারে লিপ্ত বলা হয়; কিন্তু ঢাকা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিস্তারিত তথ্য পায় নাই [১২]। বাংলাদেশ সরকার রায়ের কপি চাইছে এবং প্রতিমন্ত্রী ফেসবুকের পোস্ট দেখে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্তে না পৌঁছানোর আহ্বান জানাইছেন [১৩]।

[ফেসবুকে ঘুরে বেড়ানো যে কথাগুলি যাচাইয়ে টেকে নাই বা যাচাই হয় নাই]

আবদুর রাকিব মাদানি নামে একজন দাঈ যে পোস্ট দিছেন, কয়েকটা নির্দিষ্ট দাবি আছে তাতে [১৪]। তিনি বলছেন ঘটনা ঘটছে মসজিদুল হারামের ৮৫ থেকে ৮৭ নম্বর গেটের মাঝের সিঁড়ির ওপরের নির্জন কোঠায়—এর কোনো সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন পাওয়া যায় নাই; সৌদি বিবৃতি শুধু ‘মক্কার একটা মসজিদ’ বলছে। তিনি বলছেন তারা বিন লাদেন কোম্পানিতে কাজ করত, অথচ সরকারি নথিতে আসছে আল-মাজাল কোম্পানির নাম [১৫]। তিনি এক ভারতীয় বন্ধুর ভিডিও করা এবং তার ২০ বছরের কারাদণ্ডের কথা বলছেন, কিন্তু মেলে নাই এর কোনো স্বতন্ত্র সূত্র (যদিও তালিকায় নজরুলের নামের পাশে সাইবার অপরাধ লেখা থাকার বিষয়টার অন্য তাৎপর্য থাকতে পারে) [১৬]। তিনি ঘটনার সময় মে ২০২৩ বলছেন, অথচ সরকারি তথ্যে আটক আগস্টে; তাই ঘটনা ও গ্রেপ্তারের সময়ের ফারাক কতটা, তা অনিশ্চিত [১৭]।

অন্যদিকে ‘ওমরা করতে গিয়ে চুমু খাওয়া’র যে গুজব চলতেছে, তারও কোনো সরকারি ভিত্তি নাই। কাবার পাশে হাজরে আসওয়াদের কাছে এক পুরুষ-নারীর যে ভিডিও এই ঘটনার ‘প্রমাণ’বলে ছড়ানো হইছিল, সেটাকে সৌদির অফিশিয়াল অ্যাকাউন্ট ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর বলে ফ্যাক্ট-চেক করছে [১৮]। আবার নজরুলের বাবার ভাষ্য অনুযায়ী তারা স্বামী-স্ত্রী না, কিন্তু তাদের বৈবাহিক অবস্থা নিয়ে সরকারিভাবে নিশ্চিত কিছু জানা যায় নাই [১৯]। বিষয়টা জরুরি কারণ পুরা ফিকহি এনালাইসিসের একটা বড় অংশ এই প্রশ্নের ওপর দাঁড়ায়ে আছে।

এখানে নিজেদের নিরপেক্ষতার স্বার্থে একটা সতর্কতা রাখা ভালো : “হারামের মতো জায়গায় সবসময় মানুশ থাকে, এখানে নির্জন কোঠায় এমন ঘটবে কেমনে”—এই যুক্তিতে মূল ঘটনাটাকেই সাফ ইনকার করার যুক্তি দুর্বল, কারণ এত বিশাল স্থাপনায় সার্ভিস-রুম, সিঁড়ি বা ছাদ থাকা বিচিত্র কিছু না। তাই ঘটনার সত্যতা নিয়ে না, বরং সাজা ও বিচার-প্রক্রিয়া নিয়ে আমাদের তর্ক। ফলে এই লেখার সব ফিকহি এনালাইসিস এই শর্তের ওপর দাঁড়ায়ে যে : ধরে নিলাম, ঘটনা ঘটছিল এবং মক্কার পবিত্র সীমার ভিতরের একটা মসজিদেই ঘটছিল।

.

২. প্রশ্নটা আশলে কী

পুরা আলোচনার ভিতরে চারটা আলাদা প্রশ্ন জড়ায়ে আছে, আর সেগুলাকে গুলায়ে ফেললে তর্ক আবশ্যিকভাবে ঘোলা হয়ে যাবে :

১. ব্যভিচারের হদ প্রমাণিত না হলে বিচারক কি তার জায়গায় তাজির দিতে পারেন? ২. তাজিরের সীমা কতদূর? ৩. তাজির কি প্রাণদণ্ড পর্যন্ত যেতে পারে? ৪. স্থান বা কালের পবিত্রতা কি শাস্তি বাড়ানোর বৈধ কারণ, আর বাড়ালে, তা কতটুকু বাড়াতে পারে?

সোশ্যাল মিডিয়ায় যারা রায়টাকে ডিফেন্ড করতেছেন, তারা প্রথম প্রশ্নের ‘হ্যাঁ’ থেকে সরাসরি তৃতীয় প্রশ্নের ‘হ্যাঁ’-তে লাফ দিতেছেন; সাফ এড়ায়ে যাইতেছেন মাঝখানের তাজিরের সীমার প্রশ্নটা। আর চতুর্থ প্রশ্নটাকে ব্যবহার করতেছেন সেই লাফের সমর্থনের কাজে। আমরা ধাপে ধাপে দেখাব, প্রতিটা ধাপে ফিকহের কী দলিল মেলে আর কোথায় এসে তা আটকায়ে যায়।

.

৩. ব্যভিচারের নির্ধারিত শাস্তি ও তার প্রমাণ-কাঠামো

ইসলামি ফৌজদারি আইনে অপরাধ মূলত তিন ভাগে বিভক্ত :

১. হদ (কোরআন-সুন্নাহর নির্ধারিত নির্দিষ্ট শাস্তি)

২. কিসাস (প্রাণ ও অঙ্গহানির প্রতিশোধ)

৩. তাজির (বিচারকের বিবেচনায় শিক্ষামূলক বা শৃঙ্খলামূলক সাজা) [২০]।

ব্যভিচার সব মাজহাবের নজরেই সুনির্দিষ্ট ‘হদ’-এর অপরাধ। কোরআনে অবিবাহিত নারী-পুরুষের জন্য স্পষ্ট শাস্তি আসছে :

(الزانية والزاني فاجلدوا كل واحد منهما مائة جلدة ولا تأخذكم بهما رأفة في دين الله إن كنتم تؤمنون بالله واليوم الآخر وليشهد عذابهما طائفة من المؤمنين) (সুরা নূর ২৪:২)

(ব্যভিচারিণী নারী ও ব্যভিচারী পুরুষ—তাদের প্রত্যেককে একশ বেত্রাঘাত করো। আর আল্লাহর দীনের বিষয়ে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদের অভিভূত না করে, যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিবসে ঈমান এনে থাকো; আর তাদের শাস্তির সময় মুমিনদের একটা দল যেন সেখানে উপস্থিত থাকে।)

এখানে বিরোধী পক্ষ দ্রুত বলে উঠবে : দেখেন, আয়াতে বলা হইছে “তাদের প্রতি যেন দয়া না হয়”। কিন্তু কঠোরতা বাড়ানো এ কথার অর্থ না—এখানে ‘রাফা’ শব্দের মানে হল এমন দয়া, হদের নির্ধারিত শাস্তি ছেড়ে দেওয়া বা কমায়ে দেওয়ার দিকে যেটা নিয়ে যায়। অর্থাৎ আয়াত নির্ধারিত শাস্তিকে কমানোর বিরুদ্ধে সতর্ক করতেছে, বাড়ানোর অনুমতি দিতেছে না। আয়াতে শাস্তির সংখ্যা স্পষ্ট—‘একশ’—আর এই সংখ্যা ছাড়ায়ে যাওয়ার কোনো ইশারা নাই আয়াতে।

সুন্নাহ এর সাথে যোগ করছে ‘নির্বাসন’ এবং বিবাহিতের সাজা করছে আলাদা। উবাদা ইবনুস সামিত রা. থেকে সহিহ মুসলিমে (হাদিস ১৬৯০) রাসুল সা. বলতেছেন :

(خذوا عني، خذوا عني، قد جعل الله لهن سبيلا: البكر بالبكر جلد مائة ونفي سنة، والثيب بالثيب جلد مائة والرجم)

(নাও আমার কাছ থেকে নাও—আল্লাহ তাদের জন্য পথ বের করে দিছেন—অবিবাহিত অবিবাহিতের সঙ্গে ব্যভিচার করলে একশ বেত ও এক বছরের নির্বাসন, আর বিবাহিত বিবাহিতের সঙ্গে করলে একশ বেত ও রজম।) (অধিকাংশ ফকিহ বিবাহিতের ক্ষেত্রে বেত ও রজম একসঙ্গে প্রয়োগ করেন না, সে মতভেদ আমাদের আলাপের বাইরে।)

ইসলামে ‘হদ’ প্রমাণের শর্ত বিশাল কঠিন। শরিয়ত ইচ্ছা করেই এই বিচারিক দরজাটারে সংকীর্ণ রাখছে। কোরআনে বলা হইছে :

(والذين يرمون المحصنات ثم لم يأتوا بأربعة شهداء فاجلدوهم ثمانين جلدة ولا تقبلوا لهم شهادة أبدا وأولئك هم الفاسقون) (নূর ২৪:৪)

(আর যারা সতীসাধ্বী নারীর নামে অপবাদ আরোপ করে এবং চারজন সাক্ষী উপস্থিত করতে পারে না, তাদের ৮০টা করে বেত্রাঘাত করো এবং তাদের সাক্ষ্য কখনো গ্রহণ করো না; তারা তো হল ফাসেক।)

আর ইফকের ঘটনায় আল্লাহ তাআলা বলেন :

(لولا جاءوا عليه بأربعة شهداء فإذ لم يأتوا بالشهداء فأولئك عند الله هم الكاذبون) (নূর ২৪:১৩)

(তারা কেন এ ব্যাপারে চারজন সাক্ষী আনল না? যেহেতু তারা সাক্ষী আনে নাই, তাই তারা আল্লাহর কাছে মিথ্যাবাদী।)

অর্থাৎ চারজন স্বচক্ষে দেখা আদেল প্রত্যক্ষদর্শী না থাকলে তাদের কথা আল্লাহর কাছে মিথ্যাচার। প্রমাণের বিকল্প পথ হচ্ছে অপরাধীর নিজের স্পষ্ট ও অবিকৃত স্বীকারোক্তি। আর সেখানেও নবীজির আচরণ লক্ষ্য করবার মতো। মায়িজ ইবনে মালেক রা. যখন স্বীকারোক্তি দিতে আসলেন—ইবনে আব্বাস রা. থেকে সহিহ বুখারিতে (হাদিস ৬৮২৪) তখনের কথা বর্ণিত আছে এভাবে :

(لما أتى ماعز بن مالك النبي قال له: لعلك قبلت أو غمزت أو نظرت؟ قال: لا يا رسول الله، قال: أنكتها؟ لا يكني، قال: فعند ذلك أمر برجمه)

(মায়িজ যখন নবিজির কাছে এলেন, নবি বললেন : হয়তো তুমি শুধু চুমু দিছ, বা ইশারা করছ, বা তাকাইছ মাত্র? মায়িজ বললেন : না ইয়া রাসুলাল্লাহ। তখন নবিজি সরাসরি সঙ্গমের কথা স্পষ্ট শব্দে জিজ্ঞেস করলেন। মায়িজ হ্যাঁ বলার পরই, তিনি রজমের নির্দেশ দিলেন।)

বুখারির ব্যাখ্যাকারেরা লিখছেন, হদ কোনো ইশারা বা অস্পষ্ট ধারণায় সাব্যস্ত হয় না; পরিষ্কার ঘোষণাই লাগে এতে [২১]। এই হাদিসের দুইটা বড় শিক্ষা আছে। প্রথমত, স্বয়ং নবিজি যেখানে চরম মুহূর্তেও ‘হয়তো শুধু চুমু বা স্পর্শ’ বলে আসামীকে বাঁচানোর পথ বের করতেছিলেন, সেখানে আজ সমাজে মানুশ ‘হয়তো কেবল চুমু ছিল’ বলে সন্দেহ প্রকাশ করলে তাদের দোষ দেওয়া যায় না, তারা নববি পদ্ধতিরই প্রতিধ্বনি করতেছে। দ্বিতীয়ত, দণ্ড আসছে শুধু স্পষ্ট ও অবিকৃত স্বীকারোক্তির পর। ইসলামি ফৌজদারি ব্যবস্থার মূল ফিলোসফিই হল—প্রাণহরণের মতো চরম শাস্তির জন্য, প্রমাণের মানও চরম হইতে হবে।

.

৪. দুই দুয়ার, বন্ধ দুই-ই

সৌদি বিবৃতি যখন নিজেই বলছে শাস্তিটা ‘তাজির’, তখন তারা স্বীকার করে নিছে যে এটা ‘হদ’ না। এখান থেকেই আমাদের যুক্তির মূল স্ট্রাকচার তৈরি হয় এক ডিলেমার মধ্য দিয়ে :

প্রথম দুয়ার : যদি হদের শর্ত পূরণ হয়ে থাকত (চার সাক্ষী বা অবিকৃত স্বীকারোক্তি থাকত), তবে বিবাহিত হলে রজম, অবিবাহিত হলে একশ বেত ও নির্বাসন লাজেম হত। এখানে প্রাণদণ্ডের পথ কেবল বিবাহিতের জন্য আর তার প্রমাণের মান সবচেয়ে কঠিন। সৌদি আদালত এই পথে হাঁটে নাই, কারণ তারা শাস্তিকে বলছে তাজির। অর্থাৎ অবিবাহিতের ক্ষেত্রে অভিযোগকারী পক্ষের সবচেয়ে অনুকূল চিত্রেও (হদ পুরাপুরি প্রমাণিত) শাস্তি হত একশ বেত ও নির্বাসন, সঙ্গে হারামের মর্যাদা লঙ্ঘনের জন্য বিচারকের বিবেচনায় সীমিত কিছু তাজির; প্রাণদণ্ড না।

দ্বিতীয় দুয়ার : যদি হদের শর্ত পূরণ না হয়ে থাকে, তবে সন্দেহের কারণে হদ হয়ে যায় রহিত। তিরমিজিতে (হাদিস ১৪২৪) আয়েশা রা.র সূত্রে বর্ণিত :

(ادرءوا الحدود عن المسلمين ما استطعتم، فإن كان له مخرج فخلوا سبيله، فإن الإمام لأن يخطئ في العفو خير من أن يخطئ في العقوبة)

(তোমরা যথাসাধ্য মুসলিমদের থেকে হদ দূরে ঠেলে দাও; তার বের হওয়ার পথ থাকলে তাকে ছেড়ে দাও; বিচারক ক্ষমায় ভুল করলে, শাস্তিতে ভুল করার চেয়ে তা উত্তমই।) (হাদিসটার মারফু সনদ দুর্বল, তিরমিজি মাওকুফ বর্ণনাকে অধিক সহিহ বলছেন; তবে এ নীতি ফকিহদের কাছে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত।)

ইবনে আবেদিনের রদ্দুল মুহতার-এ (কিতাবুল হুদুদ, বাবুত তাজির) হদ ও তাজিরের ফারাক আসছে এভাবে :

(أن الحد مقدر والتعزير مفوض إلى رأي الإمام، وأن الحد يدرأ بالشبهات والتعزير يجب معها)

(হদ নির্ধারিত আর তাজির বিচারকের বিবেচনায়; সন্দেহ দ্বারা হদ রহিত হয়ে যায়, কিন্তু সন্দেহ থাকা সত্ত্বেও, বহাল থাকে তাজির।) [২২]

সন্দেহে হদ মাফ হলেও, অপরাধের জন্য তাজির বহাল থেকেই যায়। কিন্তু এই স্বীকৃতির পরেই আশল প্রশ্ন আসে যে—তাজির কতদূর পর্যন্ত যাইতে পারে? যে প্রমাণের দুর্বলতার কারণে ‘হদ’ দেওয়া গেল না, সেই একই দুর্বল প্রমাণের ওপর ভর করে হদের চেয়েও হাজার গুণ ভারী শাস্তি দেওয়া কি উসুলে ফিকহ সমর্থন করে? তাজিরকে মৃত্যুদণ্ডের পাশদুয়ার বানালে শরিয়তের চার সাক্ষীর কঠিন কাঠামোর কোনো অর্থই কি থাকে? শরিয়ত যে অপরাধে চারজন সাক্ষী চাইল, সেখানে প্রমাণ না থাকলেও যদি একজন বিচারক মৃত্যুদণ্ড দিয়ে দিতে পারেন, তবে চারজন সাক্ষীর শর্ত রেখে লাভ কী আশলে?

.

৫. তাজিরের সীমা: হাদিস ও চার মাজহাব

আবু বুরদা আনসারি রা. থেকে সহিহ বুখারিতে (হাদিস ৬৮৪৮) ও সহিহ মুসলিমে (হাদিস ১৭০৮) রাসুলুল্লাহ সা. বলতেছেন :

(لا يجلد فوق عشرة أسواط إلا في حد من حدود الله)

(আল্লাহর নির্ধারিত হদ ছাড়া কাউকে দশ বেতের ওপরে মারা যাবে না।)

এই হাদিসের ব্যাখ্যায় ফকিহ স্কলারদের মূলত তিনটা ধারা তৈরি হইছে :

[প্রথম ধারা নিছেন হাদিসের সরাসরি বাহ্যিক অর্থ]

কিতাব ফিকহে মুয়াসসারে বলা হইতেছে, আহমাদ রহ.র মশহুর বর্ণনা এবং শাফেয়ি রহ.র এক বর্ণনা মতে, যেই গুনাহের হদ নির্ধারিত নাই তার শাস্তি ১০ বেত বা তার কম। শানকিতির ব্যাখ্যায় ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহির মতও এটাই। তাঁদের মতে, আবু বুরদার হাদিসের এই ‘১০ বেত’-ই হল তাজিরের সর্বোচ্চ সীমা [২৩]।

[দ্বিতীয় ধারা নিছেন হাদিসের ‘সমজাতীয় অপরাধের হদ ছাড়াবে না’ অর্থ]

জমহুর ফোকাহাদের ব্যাখ্যায় হাদিসের ‘হদ’ শব্দ দিয়ে সংশ্লিষ্ট অপরাধের নির্দিষ্ট ক্যাটাগরির (বা জিনসের) হদকে বোঝানো হইছে। শানকিতি বলছেন এই ধারার ফকিহরা প্রতিটা অপরাধকে তার নিজের ‘জাত’ বা প্রকৃতির বা ক্যাটাগরির হদের সঙ্গে মিলায়ে দেখেন। ইবনে কুদামার আল-মুগনি-তে বলা হইতেছে :

(ويحتمل كلام أحمد و الخرقي أنه لا يبلغ بكل جناية حدا مشروعا في جنسها)

আর একই আলোচনার আরেক জায়গায় আছে :

(ما كان سببه الوطء جاز أن يجلد مائة إلا سوطا لينقص عن حد الزنا)

(আহমাদ ও খিরাকির কথার মূল অর্থ হল—বিচারক যখন কোনো অপরাধের শাস্তি ঠিক করবেন, তখন দেখতে হবে অপরাধটা কোন ক্যাটাগরির। যে অপরাধ যে ক্যাটাগরির, তাজিরের শাস্তি কোনোভাবেই সেই ক্যাটাগরির নির্ধারিত হদের সমান বা ওপরে পৌঁছাতে পারবে না। এই হিশেবে যৌন-সংক্রান্ত যেকোনো অপরাধে তাজির সর্বোচ্চ ৯৯ বেত পর্যন্ত মারা যাবে, যেন তা মূল ব্যভিচারের হদের চেয়ে এক বেত কম থাকে।) [২৪]

হাম্বলি মাজহাবের—যা সৌদির আইনি ব্যবস্থার মূল ভিত্তি—সর্বোচ্চ পরিসরের টেক্সটেও যৌন-অপরাধের তাজির ৯৯ বেতে যেয়ে থেমে যায়। এখানে প্রাণদণ্ডের কোনো নামগন্ধও নাই [২৫]।

[তৃতীয় ধারা অর্থ নিছেন হদের নিচে হতে হবে; সংখ্যায় নিয়ে তাদের এখতেলাফ]

আল-মুগনি-তেই অন্যান্য ইমামদের মত আসছে। শাফেয়ি মাজহাবে স্বাধীন লোকের তাজির ৩৯ বেতের বেশি না, এবং দাসের ক্ষেত্রে ১৯ বেত; ইবনে আবি লায়লা ও আবু ইউসুফের মতে তা ৭৯-এর বেশি না (যেহেতু সর্বনিম্ন হদ ৮০ বেত)। ফিকহে মুয়াসসারে আবু হানিফা ও শাফেয়িকে একই কাতারে রেখে বলা হইছে স্বাধীনের জন্য ৩৯ বেত। ইবনে আবেদিনের রদ্দুল মুহতার-এ আবু ইউসুফের ৭৫ বেতের কথা আসছে [২৬]।

সংখ্যা যা-ই হোক, মূল কথা হল : তাজির থাকবে সর্বদা নির্ধারিত হদের নিচে।

সৌদির সিনিয়র আলেম পর্ষদের সদস্য সালেহ আল-ফাওযানের আল-মুলাখখাসুল ফিকহি-তে (কিতাবুল হুদুদ ওয়াত-তাজিরাত) স্পষ্ট লেখা :

(فلا يبلغ بالتعزير الحد المقدر)

(তাজির কখনোই নির্ধারিত হদের সমপরিমাণ বা ওপরে পৌঁছাবে না।) [২৭]

[মালেকি ব্যতিক্রম]

ইমাম মালেক রহ.র মতে বিচারক তাজিরে হদের সীমা ছাড়াতে পারেন। মুগনি এর দলিল হিশেবে আনছে মান ইবনে যায়িদার ঘটনা, যিনি বাইতুল মালের সিলমোহরের নকশা জাল করছিলেন আর উমর রা. তাঁরে একশ বেত মারছিলেন। তাইসিরুল আল্লাম-এ মালেক রহ.র উক্তি হল এমন :

(التعزير على قدر الجرم، فإن كان جرمه أعظم من القذف ضرب مائة أو أكثر)

(তাজির অপরাধের পরিমাণ অনুযায়ী; অপরাধ কজফের (জিনার অপবাদের) চেয়ে বড় হলে বেত হবে ১০০ বা তার বেশি।) [২৮]

এখানে খেয়াল করার বিষয়—মালেকি মাজহাবের এই সর্বোচ্চতাও হল বেতের সংখ্যা নিয়ে, বেত থেকে প্রাণদণ্ডে যাওয়ার কথা বলা হয় নাই এখানে।

সালেহ আল-ফাওজানের বইয়ে ইবনে তাইমিয়ার যে উদ্ধৃতি আছে, তাতে ব্যভিচারের কাছাকাছি অপরাধে সালাফের সর্বোচ্চ তাজিরের নজির বর্ণিত হইছে :

(فقد أمر بضرب الذي أحلت له امرأته جاريتها مائة، وأبو بكر وعمر أمرا بضرب رجل وامرأة وجدا في لحاف واحد مائة مائة)

(নবীজি সেই পুরুষকে ১০০ বেতের নির্দেশ দিছিলেন যার স্ত্রী নিজ দাসীরে স্বামীর জন্য হালাল করে দিছিল; আর আবু বকর ও উমর রা. এক লেপের নিচে পাওয়া পুরুষ ও নারীকে ১০০ করে বেত মারতে বলছেন।) [২৯]

এই নজিরগুলির আশল শক্তি হল : সন্দেহযুক্ত বা অসম্পূর্ণ যৌন-অপরাধে (সন্দেহের কারণে রজম বা হদ মাফ হলেও) সালাফগণ সর্বোচ্চ বেতেই থেমে গেছেন, প্রাণহরণে যান নাই কেউই।

.

৬. মানুশের রক্তের হুরমত

আল্লাহ তাআলা বলেন :

(ولا تقتلوا النفس التي حرم الله إلا بالحق ومن قتل مظلوما فقد جعلنا لوليه سلطانا فلا يسرف في القتل إنه كان منصورا) (সুরা ইসরা ১৭:৩৩)

(আল্লাহ যার প্রাণবধ হারাম করছেন, ন্যায্য কারণ ছাড়া তারে হত্যা করো না; আর কেউ মজলুম হয়ে নিহত হলে, তার অভিভাবককে আমি দিছি অধিকার, তবে সে যেন হত্যার ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন না করে।)

আর বনি ইসরাইলের বিধানের উদ্ধৃতিতে আসছে :

(من أجل ذلك كتبنا على بني إسرائيل أنه من قتل نفسا بغير نفس أو فساد في الأرض فكأنما قتل الناس جميعا ومن أحياها فكأنما أحيا الناس جميعا) (মায়িদা ৫:৩২)

(এ কারণেই বনি ইসরাইলের ওপর আমি বিধান দিলাম—কেউ যদি খুনের অপরাধ ছাড়া কিংবা জমিনে ফাসাদ সৃষ্টির কারণ ছাড়া অন্য কাউকে হত্যা করে, সে যেন সমগ্র মানুবকুলকে হত্যা করল।)

কোরআনের শর্ত 'বিল-হক' (ন্যায্য কারণ), আর সেই ন্যায্য কারণের ব্যাখ্যা আসছে হাদিসে-সুন্নাহে। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে সহিহ মুসলিমে (হাদিস ১৬৭৬; সহিহ বুখারি ৬৮৭৮-এও সামান্য ভিন্ন শব্দে বর্ণিত) :

(لا يحل دم امرئ مسلم يشهد أن لا إله إلا الله وأني رسول الله إلا بإحدى ثلاث: الثيب الزاني والنفس بالنفس والتارك لدينه المفارق للجماعة)

(কালেমায়ে শাহাদাত পড়া কোনো মুসলিমের রক্ত হালাল না—তিনটা ধরণ ছাড়া : বিবাহিত ব্যভিচারী, জীবনের বদলে জীবন (কিসাস), আর যে জামাত থেকে বিচ্ছিন্ন হইছে দীন ছেড়ে।)

তালিকায় বিবাহিত ব্যভিচারীর কথা আছে, অবিবাহিতের কথা কিন্তু নাই! এক ধাপে বলতেছি না আমরা যে অবিবাহিতের প্রাণদণ্ড কখনোই সম্ভব না—কারণ ফকিহরা ফাসাদ, হিরাবা বা গুপ্তচরবৃত্তির ক্ষেত্রে কতলে সিয়াসা (জনস্বার্থে/প্রশাসনিক দায়ে রাষ্ট্রীয় মৃত্যুদণ্ড)-এর কথা বলছেন। কিন্তু আমাদের মূল কথা হল যেটা : কোনো মানুশের রক্তের আশল হল সুরক্ষা, আর সেই সুরক্ষা ভাঙতে চাইলে নস বা টেক্সটের দলিলের দায় তার—যে চাইতেছে ভাঙতে। মাদানিদের পোস্টে এমন কোনো দলিল নাই, আছে কেবল "যা কোরআন ও সুন্নাহসম্মত" নামক ঘিছাপিটা এলান।

.

৭. তাজিরে কতল এবং 'ফাসাদ ফিল আরদ' ফ্রেমিং

[বিরোধী পক্ষের যা কিছু দলিল]

মিশরের দারুল ইফতার ফতোয়ায় ইবনুল হুমামের ফাতহুল কাদির (৪/২৭৫, হিদায়ার ব্যাখ্যা) থেকে হানাফি মত উদ্ধৃত হইছে যে, বারবার চুরি করা লোক ও গুপ্তচর “ভূমিতে ফাসাদে লিপ্ত” বলে সিয়াসাহ হিশেবে নিহত হয়। একই ফতোয়ায় ইবনে তাইমিয়ার আস-সিয়াসাতুশ শারইয়্যাহ (পৃ. ১৩৫) থেকে বলা হইছে মালেক ও অন্যান্য থেকে বর্ণিত কিছু অপরাধে তাজির কতল পর্যন্ত যায়, আর আবু হানিফা ‘বারবার ঘটা’ অপরাধে তাজিরে কতল বলেন [৩০]।

সালেহ আল-ফাওযানের আল-মুলাখখাসুল ফিকহি-তে ইবনে তাইমিয়ার সিদ্ধান্ত উদ্ধৃত হইছে এভাবে :

(إذا كان المقصود دفع الفساد، ولم يندفع إلا بالقتل قتل، وحينئذ فمن تكرر منه جنس الفساد، ولم يرتدع بالحدود المقدرة، بل استمر على الفساد فهو كالصائل الذي لا يندفع إلا بالقتل فيقتل)

(যদি উদ্দেশ্য হয় ফাসাদ দূর করা, আর কতল ছাড়া তা দূর না হয়, তবে কতল করা হবে; যার থেকে এই ক্যাটাগরির ফাসাদ বারবার ঘটছে এবং নির্ধারিত হদেও ফেরে নাই সে, সে ওই আক্রমণকারীর মতো যাকে কতল ছাড়া ঠেকানো যায় না, তাই, তাকে কতল করা হবে।) (ফাওযান সাহেব একই পৃষ্ঠায় গুপ্তচর ও বেদআতের প্রচারকের উদাহরণও দিছেন।)

[আমাদের জবাব : তিনটা শর্তের যাচাই]

এই নস থেকে তিনটা বাধ্যতামূলক শর্ত স্পষ্ট সামনে আসে :

১. তাকারার (পুনরাবৃত্তি) : অপরাধটা বারবার ঘটতে হবে (‘মান তাকাররারা মিনহু’)। আমাদের আলোচিত কেইসে বারবার ঘটার তথ্য নাই।

২. হদের পরেও না ফেরা : অপরাধীকে আগে নির্ধারিত হদ দেওয়া হইছিল, কিন্তু সে শুধরায় নাই (‘লাম ইয়ারতাদি বিল-হুদুদ’)—এখানে আগে কোনো হদের সাজা প্রয়োগই হয় নাই।

৩. অপরাধের প্রকৃতি কতলযোগ্য হওয়া : অবিবাহিত ব্যভিচারের ক্যাটাগরিটা শরিয়তে কতলযোগ্য না। একমাত্র বিবাহিত ব্যভিচার, কিসাস ও হিরাবার (সন্ত্রাসিতা) মতো নির্দিষ্ট কিছু ক্যাটাগরিই কতলযোগ্য।

বিরোধী পক্ষ বলতে পারে যে ‘যোগ্য কারণ’ হল হারামের পবিত্রতা, আর সেটাই কতলের যুক্তি। কিন্তু এটা ঠিক সামনে পরিষ্কার করা হবে যে : ক্লাসিক কোনো ফিকহ ও ফকিহ পবিত্র স্থানে অপরাধকে এমন কারণ মানেন নাই যা হদের মূল ক্যাটাগরি বা প্রকৃতিই বদলে দেবে।

[সিয়াসাহ-র শরয়ি মানকাঠি]

বিরোধী পক্ষ ইবনুল কাইয়্যিমের আত-তুরুকুল হুকমিয়্যাহ-ও সামনে আনবেন, যে উনি এখানে ইবনে আকিল রহ.র বিখ্যাত সংজ্ঞা উদ্ধৃত করছেন—সিয়াসাহ (পলিটিক্স) হল এমন পদক্ষেপ যাতে মানুশ কল্যাণের অধিক নিকটবর্তী আর ফাসাদ থেকে অধিক দূরবর্তী হয়, যদিও রাসুল তা নির্ধারণ করেন নাই বা ওহি নাজিল হয় নাই। কিন্তু একই বক্তব্যে শর্তটাও স্পষ্ট ভাষায় আছে :

(فإن أردت بقولك: إلا ما وافق الشرع، أي لم يخالف ما نطق به الشرع: فصحيح)

(তুমি যদি ‘শরিয়ার সঙ্গে মিললেই শুধু সিয়াসাহ’ বলে বোঝাও যে শরিয়া যা সুস্পষ্ট বলে দিছে তার বিরোধিতা করা যাবে না, তবে কথাটা ঠিক।) আর ইবনুল কাইয়্যিম নিজে দুই প্রান্তিক দলকেই বলছেন ভুল—এক দল হদ অচল করে হক নষ্ট করছে, আরেক দল সম্পর্কে তাঁর কথা :

(فسوغت من ذلك ما ينافي حكم الله ورسوله)

(তারা সিয়াসাহর নামে এমন কিছুকে বৈধ করছে যা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের হুকুমের বিপরীত।) [৩১]

(সততার খাতিরে বলা দরকার, একই অনুচ্ছেদে ইবনে আকিল খলিফাদের কঠোর সিয়াসাহর কিছু নজিরও এনেছেন, যেমন আলী রা.র যিন্দিকদের আগুনে পোড়ানো; সেগুলো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রের ঘটনা, আমরা তা গোপন করছি না।) কোরআন যেখানে ব্যভিচারের জন্য ‘একশ’ বলে দিছে, সেখানে সিয়াসাহর নামে প্রাণদণ্ড চাপানো ‘শরিয়াহ যা সুস্পষ্ট বলে দিছে তার বিরোধিতা’ হয়ে যায় কিনা—প্রশ্নটা আমরা এখানে রেখে গেলাম।

[ফাসাদ ও হিরাবার আয়াত]

সৌদি বিবৃতিতে সুরা মায়িদার ৩৩ নম্বর আয়াত আনা হইছে :

(إنما جزاء الذين يحاربون الله ورسوله ويسعون في الأرض فسادا أن يقتلوا أو يصلبوا أو تقطع أيديهم وأرجلهم من خلاف أو ينفوا من الأرض) (মায়িদা ৫: ৩৩)

ফকিহদের কাছে এই আয়াত হিরাবা, অর্থাৎ সশস্ত্র শক্তি দিয়ে জনআতঙ্ক সৃষ্টিকারী দস্যুতার বিধান। দুজন প্রাপ্তবয়স্কের নির্জন যৌনপাপ কি এই মানদণ্ডের সঙ্গে মেলে? কোন ক্লাসিক ফকিহ মসজিদে ব্যভিচারকে ‘ভূমিতে ফাসাদ’ হিশেবে চিহ্নিত করে কতল দিছেন? সেই কিতাব, সেই পৃষ্ঠা আমরা পাই নাই।

.

৮. স্থান ও কালের পবিত্রতা প্রশ্নে কী করে শরিয়ত?

কোরআনে হারামের পবিত্রতা আসছে নিরাপত্তার ভাষায় :

(فيه آيات بينات مقام إبراهيم ومن دخله كان آمنا) (আলে ইমরান ৩: ৯৭)

(وإذ جعلنا البيت مثابة للناس وأمنا وعهدنا إلى إبراهيم وإسماعيل أن طهرا بيتي للطائفين والعاكفين والركع السجود) (বাকারা ২: ১২৫)

যে কেউ ওখানে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ। বিরোধী পক্ষ ‘তাহহিরা বাইতি’ (আমার ঘর পবিত্র করো) অংশের কথা তুলতে পারেন; কিন্তু এই পবিত্রকরণ ইবাদতকারীদের আশ্রয়-পরিবেশ রক্ষার দেওয়া নির্দেশ, মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার দলিল এটা না।

[ইবনে আব্বাস রা.-এর ফয়সালায় হারামে অপরাধ]

হারামের ভিতরে সংঘটিত অপরাধের শাস্তি নিয়ে ইবনে আব্বাস রা.-এর একটা সহিহ সনদের আসার আছে :

(من سرق أو قتل في الحل ثم دخل الحرم فإنه لا يجالس ولا يكلم ولا يؤوى، ولكنه يناشد حتى يخرج، فيؤخذ فيقام عليه الحد، وإن سرق أو قتل في الحرم أقيم عليه في الحرم)

(যে ব্যক্তি হারামের বাইরে চুরি বা হত্যা করে হারামে ঢুকে পড়ে, তার সঙ্গে ওঠাবসা, কথা বলা বা তাকে আশ্রয় দেওয়া যাবে না; তাকে অনুরোধ করা হবে বেরিয়ে আসতে, বের হলে ধরে তার ওপর হদ কায়েম করা হবে; আর যে ব্যক্তি হারামের ভিতরেই চুরি বা হত্যা করে, তার ওপর হারামের ভিতরেই (হদ) কায়েম করা হবে।) [৩২]

এখানে হারামের হুরমত অপরাধীকে বাঁচায় না, এটা সাহাবির বিচার-নীতি; আমরাও সেটা মানি। কিন্তু লক্ষণীয়, হারামের ভিতরে অপরাধ হলেও যা কার্যকর হচ্ছে তা সেই অপরাধের হদ—হারামের কারণে শাস্তির ধরন বদলানোর কথা এই আসারে আসে নাই।

[২২: ২৫ আয়াত : ইলহাদের হুমকি]

বিরোধী পক্ষের প্রিয় আয়াত :

(ومن يرد فيه بإلحاد بظلم نذقه من عذاب أليم) (হজ্জ ২২: ২৫)

এখানে শাস্তির কর্তা হচ্ছেন আল্লাহ নিজে ('নুযিকহু'—আমি চাখাব), কোনো রাষ্ট্রীয় বিচারককে এখানে কর্তা বলা হয় নাই; তাছাড়া মুফাসসিরদের কাছে ‘ইলহাদ বি-জুলম’-এর ব্যাখ্যা ফৌজদারি সাজা সম্পর্কিতও না।

[সালাফের নজির]

আমরা বিরোধী পক্ষের সবচেয়ে ভালো নজিরগুলা নিজেরাই সাজায়ে দিচ্ছি।

১. আলী রা. ও নাজাশির ঘটনা : ইবনে হাজমের আল-মুহাল্লা-য় (৬/১৮৪) আসছে, রমজানে মদ পান করায় আলী রা. নাজাশি আল-হারিসিকে ৮০ বেতের সাথে অতিরিক্ত ২০ বেত মেরে বলছিলেন :

(أن علي بن أبي طالب أتي بالنجاشي قد شرب الخمر في رمضان، فضربه ثمانين، ثم ضربه من الغد عشرين، وقال: ضربناك العشرين لجرأتك على الله و إفطارك في رمضان)

(আমরা তোমাকে ২০ বেত বেশি মারলাম আল্লাহর ওপর দুঃসাহস দেখানোর কারণে এবং রমজানের ইফতার ভঙ্গের (হুরমত নষ্টের) কারণে।) [৩৩]

এখানে বৃদ্ধি করা হইছিল মূল হদের ২৫ শতাংশ এবং তা ছিল বেতের মাধ্যমেই। আলী রা. বেতকে প্রাণদণ্ডে রূপান্তর করেন নাই। (উমর রা. থেকেও রমজানে মদপায়ী বৃদ্ধকে ৮০ বেত মেরে শামে নির্বাসনের আসার পাওয়া যায়; অন্য এক বর্ণনায় রমজানে মদপায়ীকে ৮০ বেতের সঙ্গে আরও ২০ বেত তাজিরের কথাও আছে।)

২. দিয়তের তাগলিজ (আর্থিক ক্ষতিপূরণের ভারীকরণ) : শাফেয়ি মাজহাবে হারামে হত্যাকাণ্ডে দিয়াত ১/৩ অংশ বাড়ে; হাম্বলিদের মধ্যে এ নিয়ে ভিন্নমত আছে (আল-মুগনি)। নসটা এমন :

(لكل واحد من الحرمات ثلث الدية، فإذا اجتمعت الحرمات الثلاث وجبت ديتان)

(প্রতিটা হুরমতের জন্য দিয়তের এক-তৃতীয়াংশ ওয়াজিব হয়, আর তিনটা হুরমত একত্র হলে হয় দুই দিয়ত।) [৩৪]

মুগনির এই এক-তৃতীয়াংশ মাপকাঠি যদি বেতেও প্রয়োগ করা যায়, তবে ১০০ বেতের ওপর স্থান ও কালের (দুই হুরমতের) জন্য যোগ হয়ে সর্বোচ্চ ১৬৬ বেত দাঁড়ায়। এটা অনুমোদিত সাজা—তা না, জাস্ট দেখানোর জন্য হিশেব যে—বিরোধী পক্ষের সবচেয়ে বড় ক্লাসিক মাপকাঠিও প্রাণদণ্ড স্পর্শ করতেছে না!

[রাসুল হুরমত লঙ্ঘনের মুখে কী করছেন]

এক বেদুইন মসজিদে প্রস্রাব করলে লোকেরা তার ওপর ঝাঁপায়ে পড়ল, নবিজি বললেন : ওকে ছেড়ে দাও, আর ওর প্রস্রাবের ওপর এক বালতি পানি ঢেলে দাও, তোমাদের তো পাঠানো হইছে সহজকারী হিশেবে, কঠিনকারী হিশেবে না। — এখানে হুরমত লঙ্ঘন তুলনামূলক লঘু ছিল, এবং আমরা দুই ঘটনারে একও করতেছি না; আমরা দেখাইতে চাইতেছি হুরমতের মুখে নববি স্বভাব ছিল কিরকম।

বিরোধী পক্ষ এখানে বুখারিতে আযয়েশা রা.র হাদিস (৩৫৬০) তুলবেন :

(ما خير رسول الله صلى الله عليه وسلم بين أمرين إلا أخذ أيسرهما ما لم يكن إثما، فإن كان إثما كان أبعد الناس منه، وما انتقم رسول الله صلى الله عليه وسلم لنفسه في شيء قط إلا أن تنتهك حرمة الله فينتقم لله بها)

রাসুল দুটা বিষয়ের মধ্যে বেছে নেওয়ার সুযোগ পেলে সহজটাই নিতেন যদি তা গুনাহ না হতো, আর তিনি কখনো নিজের জন্য প্রতিশোধ নেন নাই, তবে আল্লাহর হুরমত লঙ্ঘিত হলে আল্লাহর জন্য প্রতিশোধ নিতেন। — এই হাদিস সত্য, আর এটাই বিরোধী পক্ষের সবচেয়ে ভালো দলিল।

কিন্তু ‘আল্লাহর হুরমত লঙ্ঘনের চরম মুহূর্তে কী প্রয়োগ করছেন নবি?’

মাখযুমিয়্যা নারীর চুরির ঘটনায় উসামা রা. সুপারিশ করলে বুখারিতে (হাদিস ৩৪৭৫) আসছে :

(أتشفع في حد من حدود الله؟ ... وايم الله لو أن فاطمة بنت محمد سرقت لقطعت يدها)

(তুমি কি আল্লাহর হদের ব্যাপারে সুপারিশ করতেছ? ... আল্লাহর কসম, মুহাম্মাদের কন্যা ফাতেমাও চুরি করলে আমি তার হাত কেটে দিতাম।)

এই ঘটনা ঘটছিল স্বয়ং মক্কা বিজয়ের অভিযানের সময়। আয়েশা রা.র বর্ণনায় আছে :

(أن قريشا أهمهم شأن المرأة التي سرقت في عهد النبي صلى الله عليه وسلم في غزوة الفتح)

(কুরাইশরা চিন্তায় পড়ছিল সেই নারীর ব্যাপারে, যে নবিজির যুগে ফাতহের অভিযানের সময় চুরি করছিল।) [৩৫]

সেখানে ‘আল্লাহর হুরমত’ রক্ষার চরম মুহূর্তে প্রয়োগ হইছিল নির্ধারিত হদ—তার এক চুল বেশি না।

কোরআন আমাদের শিখাইছে আনুপাতিকতা : (وجزاء سيئة سيئة مثلها) (শুরা ৪২: ৪০)।

আর সীমা ডিঙানোকে আল্লাহ বলেছেন জুলুম : (تلك حدود الله فلا تعتدوها ومن يتعد حدود الله فأولئك هم الظالمون) (বাকারা ২: ২২৯)

.

৯. ইতিহাসের নজির

আমাদের দেখাদেখিতে অবিবাহিত, সম্মতিতে, একবারের ব্যভিচারে, তাজিরের নামে মৃত্যুদণ্ডের কোনো ক্লাসিক ফিকহি রায় বা বিশ্বাসযোগ্য ঐতিহাসিক নজির মেলে না।

নসের ভিত্তিতে প্রাণদণ্ড : বাবার স্ত্রীকে বিয়ে করা লোক (আবু দাউদ ৪৪৫৭, তিরমিজি ১৩৬২) বা লাওয়াতাত (আবু দাউদ ৪৪৬২)—এগুলো নির্দিষ্ট নসভিত্তিক ব্যতিক্রম ঘটনা, বিচারকের স্বাধীন তাজির না এগুলি [৩৬]।

সাহাবিদের তাজির : উমর রা.র মান ইবনে যায়িদাকে ১০০ বেত (জালিয়াতি), আলীর নাজাশিকে ৮০-২০ বেত, উমরের মদপায়ী বৃদ্ধকে ৮০ বেত ও নির্বাসন—সবগুলি বেতের সীমানাতেই ঘটছে।

তাজিরে কতলের ফিকহি স্বীকৃতি : শুধু গুপ্তচর, পুনরাবৃত্ত অপরাধী ও বেদআতের প্রচারকের ক্ষেত্রে—নির্দিষ্ট কঠোর শর্ত সহকারে।

আধুনিক সৌদি প্র্যাকটিস : তাজিরে মৃত্যুদণ্ডের ব্যাপক ব্যবহার সৌদির বাস্তব প্র্যাকটিসেই আছে, আর আন্তর্জাতিক মহল এ নিয়ে আগে থেকেই প্রশ্ন তুলতেছে। আমনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এনালাইসিস অনুযায়ী ২০২৪ সালে মাদক-সংক্রান্ত যে ১২২টা মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হইছে তার সবকটিই তাজির, আর ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত নথিভুক্ত মৃত্যুদণ্ডের অন্তত ৪৭.৫ শতাংশ তাজিরভিত্তিক; অথচ যুবরাজের আগের দাবি ছিল তাজিরে মৃত্যুদণ্ড সীমিত করা হচ্ছে [৩৭]। ঘটনাগুলো মাদকসংক্রান্ত, আমাদের আলোচিত কেইসের সঙ্গে সরাসরি তুলনীয় না; আমরা শুধু দেখাইতেছি, ‘তাজিরে কতল’ সৌদির প্র্যাকটিসে কতখানি বিস্তৃত।

যারা এ বিষয়ে আরও বইপত্র দেখতে চান, সন্ধানের জায়গা : ইবনে ফারহুনের তাবসিরাতুল হুক্কাম, কারাফির ‘আল-ফুরুক’, ইবনুল কায়্যিমের ‘আত-তুরুকুল হুকমিয়্যাহ’, আবু যাহরার ‘আল-জারিমা ওয়াল উকুবা’, আবদুল কাদির আওদার ‘আত-তাশরিউল জিনাই’ এবং রুডলফ পিটার্সের ‘Crime and Punishment in Islamic Law’ [৩৮]।

.

১০. প্রক্রিয়া প্রশ্ন

ফিকহ তো শুধু শাস্তির পরিমাণই না, বিচার-প্রক্রিয়ার ন্যায্যতাও দাবি করে ফিকহ। আলী রা.কে রাসুলুল্লাহ উপদেশ দিছিলেন (আবু দাউদ ৩৫৮২, তিরমিজি ১৩৩১) :

(إذا تقاضى إليك رجلان فلا تقض للأول حتى تسمع كلام الآخر، فسوف تدري كيف تقضي)

(দুজন বিবাদী তোমার কাছে আসলে প্রথমজনের পক্ষে রায় দিয়ো না অন্যজনের কথা শোনো আগ তরি; তবেই তুমি বুঝবে কিভাবে ফয়সালা করতে হবে।) এই নীতির কাছাকাছি প্রশ্ন আমাদেরও।

প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেদ্দা মিশনের বার্তায় উদ্ধৃত হইছে যে, চারিত্রিক স্খলনে ৩০৬ জন বাংলাদেশি আটকের মধ্যে কারও মৃত্যুদণ্ডের নজির নাই। পরিবার অভিযোগ করছে না জানিয়ে ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে সাজা দেওয়া হইছে [৩৯]। যদিও সৌদি পক্ষ জেদ্দার বৈঠকে জানাইছে যে যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই বিচার সম্পন্ন হইছে [৮]; আমরা দাবি করতেছি না যে এসব অধিকার লঙ্ঘিত হইছে—আমাদের প্রশ্ন, এসব গোপন রাখা কি খোদ ইসলামি বিচারনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক না? ভিয়েনা কনভেনশনের ৩৬ ও ৩৭ অনুচ্ছেদ কনস্যুলার সুবিধা ও যোগাযোগের কথা বলে, আর আরব মানবাধিকার সনদের ৬ অনুচ্ছেদ মৃত্যুদণ্ডকে রাখে ‘সবচেয়ে গুরুতর অপরাধে’ সীমিত, আর ন্যায্য বিচারের অনুচ্ছেদগুলো আত্মপক্ষ সমর্থনের কথা বলে [৪০]। — যে বিচারে আসামিপক্ষ, রাষ্ট্র ও পরিবার কিছুই জানে না, সেখানে প্রমাণের মান বা বিচারিক সততা বাইরের কেউ যাচাই-ই করতে পারতেছে না!

এখানে সবচেয়ে বড় আইনি ও মানবিক প্রশ্নটা দাঁড়ায় সময় নিয়ে। সরকারি আটকের তারিখ ধরে প্রায় তিন বছর দুই মাস নজরুল ও সুইটিকে জেলের অন্ধ প্রকোষ্ঠে আটকে রাখা হইছিল। ইসলামি বিচারে কিংবা যেকোনো ন্যায়সংগত আইনি কাঠামোতে তিন বছরেরও বেশি সময় বন্দি রাখা নিজেই একটা বিশাল ও চরম তাজিরের সাজা। যে অপরাধের ক্ষেত্রে প্রমাণের ঘাটতির কারণে তাৎক্ষণিক শরয়ি ‘হদ’ প্রয়োগ করা গেল না, সেখানে তিন বছর জেল খাটানোর পর হঠাৎ রাজকীয় আদেশে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা মানে একই অপরাধের জন্য দ্বৈত জুলুম চালানো! যদি শুরুতেই তাদের অপরাধ মৃত্যুদণ্ডযোগ্য হতো, তবে তাৎক্ষণিক বিচার না চালআয়ে কেন এত বছর ঝুলায়ে রাখা হলো? নাকি প্রমাণের দুর্বলতা ঢাকতেই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার নাম করে বিষয়টা গোপন রাখা হইছিল?

.

১১. মানবিক ও সামাজিক দিক

নজরুল ইসলামের বাবা-মা ছেলের লাশটা শুধু একবার দেখতে চাইছেন, আর ছেলের মৃত্যুদণ্ডের খবর শুনে নজরুলের আপন ফুফু হার্ট এটাক করে গেছেন মারা [৪১]। ঠিক এই সময়ে আমাদের এক সংসদ সদস্য বলছেন ‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক চাই না’—বলার পর ক্ষমাও চাইছেন—কিন্তু কথাটা যে আসছিল, তা খুলে দিছে মানুশের আশল মুখ—যে সমাজের একটা অংশ কত সহজে ‘পাপী’ লেবেল লাগায়ে মানুশরে মানুশের কাতার থেকে বাইরে ঠেলে দিতে পারে, ডিহিউমানাইজ করতে পারে [৪২]।

তবে এই টাইমিং ও রাজকীয় সিদ্ধান্তের নেপথ্যে আরেকটা গুরু রাজনৈতিক প্রশ্নও এড়ায়ে যাওয়া যায় না। আমরা দেখছি, সৌদিতে বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের ওপর চলা অমানবিক নির্যাতন, কফিলদের যৌন নিপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ওপর যখনই অনুসন্ধানমূলক সংবাদমাধ্যমগুলোতে (যেমন নেত্র নিউজের করা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে) তোলপাড় তৈরি হল, ঠিক তার কয়েকদিনের মাথায় হঠাৎ এই মৃত্যুদণ্ডের খবর সামনে আসল। নজরুলের ওপর ‘সাইবার ক্রাইম’ আর সুইটির ওপর ‘ব্যভিচার’—পৃথক দুই অভিযোগ থাকার পরেও এবং বন্দিতালিকায় কোনো সাজার উল্লেখ না থাকা সত্ত্বেও, হঠাৎ গোপনীয়তার মধ্যে তড়িঘড়ি কেন তাদের শিরচ্ছেদ করা হল? প্রবাসীদের ওপর রাজকীয় নিপীড়নের আন্তর্জাতিক খবর থেকে জনমানুশের ক্ষোভকে অন্যদিকে ঘোরাতে দুইটা দুর্বল প্রবাসীরে বলির পাঁঠা বানানো হইল কিনা, সেই প্রশ্নও কি এড়ানো যায়?

রাসুলুল্লাহর সুন্নাহ অপরাধীর প্রতিও কেমন ছিল, তা ইমরান ইবনে হুসাইন রা. থেকে সহিহ মুসলিমে (হাদিস ১৬৯৬) জুহাইনা গোত্রের রজমপ্রাপ্ত নারীর ঘটনায় দেখা যায় :

(فقال له عمر: تصلي عليها يا نبي الله وقد زنت؟ قال: لقد تابت توبة لو قسمت بين سبعين من أهل المدينة لوسعتهم، وهل وجدت أفضل من أن جادت بنفسها لله تعالى؟)

(উমর বললেন, হে আল্লাহর নবি, আপনি তার জানাজা পড়তেছেন, সে যে ব্যভিচার করছে? নবি বললেন, সে এমন তওবা করছে যা মদিনার সত্তরজনের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হতো, যথেষ্ট হতো।)

ব্যভিচারের শরয়ি সাজা পাওয়া নারীর জানাজা খোদ নবিজি নিজে পড়ছেন, আর আমরা তাদের লাশ ফেরত চাওয়ারে মাথা হেইট হওয়ার কারণ মনে করতেছি!

একটা কঠিন সামাজিক প্রশ্নও আছে, যা আমরা সাবধানে বলতেছি কারণ আমরা পাপের অজুহাত দিতে চাই না। বুখারিতে (হাদিস ৫০৬৬) আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত :

(يا معشر الشباب من استطاع منكم الباءة فليتزوج، فإنه أغض للبصر وأحصن للفرج، ومن لم يستطع فعليه بالصوم فإنه له وجاء)

(নওজোয়ানেরা! তোমাদের মধ্যে যে বিয়ের সামর্থ্য রাখে সে বিয়ে করুক—বিয়ে দৃষ্টিকে অবনত রাখে ও লজ্জাস্থানকে হেফাজত করে; আর যে পারে না সে রোজা রাখুক, রোজা তার জন্য ঢালস্বরূপ।)

বছরের পর বছর পরিবার থেকে দূরে, গাদাগাদি আবাসে থাকা, ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে বিদেশে যাওয়া তরুণ শ্রমিকদের জীবন সমাজের একটা বড় কাঠামোগত প্রশ্ন, এর ব্যাখ্যা গুনাহের অজুহাত না যদিও, তবে রিয়ালিটি। আর সামাজিক মাধ্যমে ঘটনার সব তথ্য অনুমানে ভরে ফেলা, মৃত দুইজন মানুশকে ‘পাপী’ বলে খারিজ করে দেওয়া আর রাষ্ট্রের ব্যর্থতা ঢেকে দেওয়ার এই সুযোগকে আমরা নীরবে বইতে দিতেও পারি না। রাষ্ট্রের জন্য মুহূর্তের দায়িত্ব ছিল গ্রেপ্তারের সময় থেকে আইনজীবী, দোভাষী ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ, আর সেটা কেউ করেছে এমন তথ্য সরকারি কোনো সূত্রে আমরা পাই নাই।

প্রথম আলোর এক বিশ্লেষক লিখছেন, মৃত্যুদণ্ডযোগ্য মামলায় দূতাবাসের দায় গ্রেপ্তারের দিন থেকে প্রতিটা মুহূর্ত জানা : অভিযোগপত্র, আইনজীবী, দোভাষীর নিরপেক্ষতা, আপিল, রায় ও পরিবার জানে কি না [৪৫]।

.

১২. সম্ভাব্য বিরোধিতা ও জবাব

১. ‘তাজির বিচারকের এখতিয়ার’ : এখতিয়ারের সীমা আছে; হাম্বলি কিতাবে তা ৯৯ বেতে গিয়ে থামে, শায়েখ ফাওযানের কিতাবেও তা হদের নিচেই আছে। তাছাড়া ফকিহদের মূলনীতিই হল—শাসকের প্রতিটা সিদ্ধান্ত প্রজার কল্যাণে বাঁধা (تصرف الإمام على الرعية منوط بالمصلحة); ইমাম শাফেয়ি বলছেন, প্রজার সঙ্গে ইমামের সম্পর্ক এতিমের সঙ্গে অভিভাবকের মতো [৪৬]।

২. ‘মালেকি মাজহাব হদ পাড়াইতে দেয়’ : দেয় কিন্তু তা বেতের সংখ্যাতেই (১০০ বা তার বেশি বেত)।

৩. ‘ইবনে তাইমিয়া তাজিরে কতল মানেন’ : মানেন কিন্তু পুনরাবৃত্তি, হদে না ফেরা ও কতলযোগ্য জাত/প্রকৃতি—এই ৩ শর্তে।

৪. ‘আলী রা. রমজানে সাজা বাড়াইছেন’ : ২০ বেত বাড়াইছেন, বেতের স্তরেই বাড়াইছেন।

৫. ‘হারামে দিয়ত ভারী হয়’ : তা আর্থিক, এবং সর্বোচ্চ ১/৩ অংশ।

৬. ‘রাসুল সা. হুরমতের জন্য প্রতিশোধ নিতেন’ : সেই প্রতিশোধ ছিল নির্ধারিত হদ (বুখারি ৩৪৭৫)।

৭. ‘এটা ফাসাদ ফিল আরদ (৫: ৩৩)’ : হিরাবা মানে শক্তিপ্রয়োগে জনআতঙ্ক—নির্জন পাপে এগুলি মেলে না।

৮. ‘১৩ জন বিচারক রায় দিছেন’ : বিচারকের সংখ্যা শরয়ি দলিল না।

৯. ‘হারামাইনের আলেমদের ভুল ধরা বেয়াদবি’ : ইমাম মালেকের বিখ্যাত কওল—কবরওয়ালা (নবিজি) ছাড়া সবার কথাই গ্রহণ ও বর্জনযোগ্য।

আল্লাহ তাআলা বলেন : (يا أيها الذين آمنوا كونوا قوامين بالقسط شهداء لله ولو على أنفسكم أو الوالدين والأقربين) (নিসা ৪: ১৩৫)

হে ঈমানদারগণ! ন্যায়ের প্রতি সুপ্রতিষ্ঠ ও আল্লাহর জন্য সাক্ষ্যদাতা হও যদিও তা তোমাদের নিজেদের কিংবা মাতা-পিতা এবং আত্মীয়গণের বিরুদ্ধে হয়, কেউ ধনী হোক বা দরিদ্র হোক, আল্লাহ উভয়েরই ঘনিষ্ঠতর। অতএব প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না যাতে তোমরা ন্যায়বিচার করতে পার এবং যদি তোমরা বক্রভাবে কথা বল কিংবা সত্যকে এড়িয়ে যাও তবে নিশ্চয় তোমরা যা করছ, আল্লাহ সে বিষয়ে সম্পূর্ণ অবগত।

আর সহিহ মুসলিমে (হাদিস ৫৫) আসছে :

(الدين النصيحة) (দীন হলো নসিহা, কল্যাণকামনা।)

.

[উপসংহার]

আমাদের তিনটা মূল অবস্থান : ১. কোরআন ও সুন্নাহ ব্যভিচারের শাস্তি নির্ধারণ করছে; পবিত্র স্থানের হুরমত পাপের ওজন বাড়ালেও, তাজিরকে হদের প্রকৃতি পার করে প্রাণদণ্ডে নিয়ে যাওয়ার আইনি ভিত্তি তা হতে পারে না। ২. ইসলামি ফিকহের কতলে সিয়াসাহ পুনরাবৃত্তি ও জনক্ষতির কঠোর শর্তে বাঁধা, এই ঘটনায় যা অনুপস্থিত। ৩. প্রমাণের অস্বচ্ছতা ও আত্মপক্ষের সুযোগহীন বিচার শরিয়তের ইনসাফের কাঠামোর পরিপন্থী।

আল্লাহ তাআলা দুজন বান্দারে ক্ষমা করেন, তাদের পরিবারগুলোরে ধৈর্য দেন। আর যাদের হাতে থাকে বিচারের ভার, তাদের আখেরাতের বিচারের কথা মনে করায়ে দেন।

.

.

.

[তথ্যসূত্র]

[১] ইত্তেফাক, “সৌদিতে নজরুলের মৃত্যুদণ্ডের খবর শুনে ফুফুর মৃত্যু, কী ঘটেছিল জানালেন বাবা-মা” (নিউজ আইডি ৮১৫৯৪১); প্রথম আলো, “বন্দিতালিকায় দুজনের নাম থাকলেও শাস্তির তথ্য কেন ঊহ্য রাখা হলো, প্রশ্নঢাকার”, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

[২] সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ), সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি, ১৪ অক্টোবর ২০২৬; ডেইলি স্টার বাংলা, “সৌদি আরবে মসজিদে ‘অনৈতিক কাজের’ দায়ে ২ বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর”।

[৩] “বিরামপুর থেকে মক্কা, তারপর নীরবতা : নজরুল ও সুইটির তিন বছর, আর দুই সরকারের ব্যর্থতা”; প্রথম আলো, ১৯ অক্টোবর ২০২৬ (সূত্র ১)।

[৪] টিবিএস/ইউএনবি, “দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: সৌদি রাষ্ট্রদূতকে ডেকে বিস্তারিত তথ্য চাইলো ঢাকা”, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

[৫] এসপিএ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি, ১৪ অক্টোবর ২০২৬; ডেইলি স্টার বাংলা (সূত্র ২)।

[৬] এসপিএ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি, ১৪ অক্টোবর ২০২৬; ইনসাইড দ্যা হারামাইন কর্তৃক প্রকাশিত ইংরেজি পাঠ।

[৭] ডেইলি স্টার বাংলা (সূত্র ২)।

[৮] প্রথম আলো, ১৯ অক্টোবর ২০২৬ (সূত্র ১)।

[৯] সৌদি বিচার বিভাগ আইন, অনুচ্ছেদ ১০, ১৫, ২০; সৌদি ফৌজদারি কার্যবিধি, অনুচ্ছেদ ১০, ১৯৪, ১৯৯

[১০] প্রথম আলো, ১৯ অক্টোবর ২০২৬ (সূত্র ১)।

[১১] প্রথম আলো, ১৯ অক্টোবর ২০২৬ (সূত্র ১)।

[১২] টিবিএস/ইউএনবি, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ (সূত্র ৪)।

[১৩] প্রথম আলো/বাসস, “সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের রায়ের কপি চেয়েছে ঢাকা”, ২০ অক্টোবর ২০২৬

[১৪] আবদুর রাকিব মাদানি (দাঈ, হাওইয়া দাওয়াহ সেন্টার, তায়েফ), ফেসবুক পোস্ট।

[১৫] প্রথম আলো, ১৯ অক্টোবর ২০২৬ (সূত্র ১); আবদুর রাকিব মাদানির ফেসবুক পোস্ট (সূত্র ১৪)।

[১৬] প্রথম আলো, ১৯ অক্টোবর ২০২৬ (সূত্র ১)।

[১৭] আবদুর রাকিব মাদানির ফেসবুক পোস্ট; প্রথম আলো, ১৯ অক্টোবর ২০২৬ (সূত্র ১)।

[১৮] ঢাকা মেইল, “মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড নিয়ে ছড়ানো ভিডিওটি ‘ভুয়া’ : সৌদি”।

[১৯] আজকের পত্রিকা, “সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: নজরুল-সুইটি স্বামী-স্ত্রী নয় দাবি বাছিরের”।

[২০] আল-মাওয়ার্দি, আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা, তাজির অধ্যায়; ইবনু আবিদিন, রদ্দুল মুহতার, কিতবুল হুদুদ, বাবুত তাজির।

[২১] সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৮২৪-এর শারহ (ফাতহুল বারি ১২/১৩৮-এ হাদিসটির অবস্থান)।

[২২] ইবনে আবেদিন, রদ্দুল মুহতার, কিতাবুল হুদুদ, বাবুত তাজির।

[২৩] আল-ফিকহুল মুয়াসসার ৭/২১০, “আত-তাজির বিল-জালদ”; মুহাম্মাদ মুখতার আশ-শানকিতি, শারহু যাদিল মুসতাকনি, বাবুত তাজির।

[২৪] ইবনু কুদামা, আল-মুগনি, কিতাবুল হুদুদ, বাবুত তাজির।

[২৫] Rudolph Peters, Crime and Punishment in Islamic Law: Theory and Practice from the Sixteenth to the Twenty-First Century (Cambridge University Press, 2005)

[২৬] ইবনে কুদামা, আল-মুগনি, বাবুত তাজির; আল-ফিকহুল মুয়াসসার ৭/২১০; ইবনে আবেদিন, রদ্দুল মুহতার, বাবুত তাজির।

[২৭] সালিহ ইবনে ফাওযান আল-ফাওযান, আল-মুলাখখাসুল ফিকহি, ২/৫৪৭, বাব ফি আহকামিত তাজির।

[২৮] ইবনে কুদামা, আল-মুগনি, বাবুত তাজির; আবদুল্লাহ আল-বাসসাম, তাইসিরুল আল্লাম শারহু উমদাতিল আহকাম, বাবুত তাজির, পৃ. ৬৭৯

[২৯] সালিহ আল-ফাওযান, আল-মুলাখখাসুল ফিকহি ২/৫৪৭, ইবনু তাইমিয়া, আস-সিয়াসাতুশ শারইয়্যাহ থেকে উদ্ধৃত।

[৩০] দারুল ইফতা আল-মিসরিয়্যাহ, ফতোয়া নং ১১৪৭০; ইবনুল হুমাম, ফাতহুল কাদির ৪/২৭৫; ইবনে তাইমিয়া, আস-সিয়াসাতুশ শারইয়্যাহ, পৃ. ১৩৫

[৩১] ইবনুল কাইয়্যিম, আত-তুরুকুল হুকমিয়্যাহ ফিস সিয়াসাতিশ শারইয়্যাহ, ‘ফাসল: আস-সিয়াসাতুশ শারইয়্যাহ’ (ইবনে আকিল, আল-ফুনুন থেকে উদ্ধৃত)।

[৩২] আবদুর রাযযাক, আল-মুসান্নাফ (হাদিস ৯২২৬); বায়হাকি, আস-সুনানুল কুবরা (হাদিস ১৮৮২০); ইবনুল মুনযির, আত-তাফসির (হাদিস ৭৩৯); শুআইব আল-আরনাউত, তাখরিজু যাদিল মাআদ ৩/৩৯৩; আত-তাবারি, জামিউল বায়ান, সুরা আলে ইমরান ৩:৯৭-এর তাফসির; আত-তাহাভি, শারহু মুশকিলিল আসার ৯/৩৭৬

[৩৩] ইবনে হাযম, আল-মুহাল্লা বিল-আসার ৬/১৮৪; ইবনে আবি শাইবা, আল-মুসান্নাফ (হাদিস ২৯২১৮, ২৯২৮৪, ৮৭৪১); বায়হাকি, আস-সুনানুল কুবরা (হাদিস ১৮০০১, ১৭৩২৪); আবদুর রাযযাক, আল-মুসান্নাফ (হাদিস ১৩৫৫৬, ১৭০৪২; আবদুল্লাহ ইবনে আবিল হুযাইল সূত্রে উমর রা.র আসারসহ); আল-জামি লি-আহকামিস সিয়াম।

[৩৪] ইবনে কুদামা, আল-মুগনি, কিতাবুদ দিয়াত, ‘ফাসল : আদ-দিয়াতু তুগাল্লাযু বি-সালাসাতি আশইয়া’; ইসলামওয়েব ফতোয়া নং ১৪৯০৫৩

[৩৫] সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৪৭৫, ৪৩০৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬৮৮

[৩৬] সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪৪৫৭, ৪৪৬২; জামে তিরমিজি, হাদিস ১৩৬২, ১৪৫৬

[৩৭] Amnesty International, “Saudi Arabia: New report denounces alarming escalation in executions including of foreign nationals convicted of drug-related offences” (জুলাই ২০২৫); Amnesty International, "Saudi Arabia 2025" (দেশ-প্রতিবেদন)।

[৩৮] ইবনে ফারহুন, তাবসিরাতুল হুক্কাম; আল-কারাফি, আল-ফুরুক; ইবনুল কায়্যিম, আত-তুরুকুল হুকমিয়্যাহ; মুহাম্মাদ আবু যাহরা, আল-জারিমা ওয়াল উকুবা ফিল ফিকহিল ইসলামি; আবদুল কাদির আওদা, আত-তাশরিউল জিনাই আল-ইসলামি।

[৩৯] প্রথম আলো, ১৯ অক্টোবর ২০২৬; টিবিএস, "সৌদিতে বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর: খবর শুনে ফুফুর মৃত্যু; পরিবারে শোকের মাতম"।

[৪০] Vienna Convention on Consular Relations (1963), Articles 36, 37; Arab Charter on Human Rights (2004), Article 6 এবং ন্যায্য বিচার-সংক্রান্ত অনুচ্ছেদগুলি।

[৪১] টিবিএস, “সৌদিতে বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর: খবর শুনে ফুফুর মৃত্যু; পরিবারে শোকের মাতম”; ইত্তেফাক (নিউজ আইডি ৮১৫৯৪১)।

[৪২] টিবিএস, “‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক চাই না’—সৌদিতে ২ বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড নিয়ে মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের এমপি”।

[৪৩] সহিহ বুখারি, হাদিস ৬০৬৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৯৯০, ২৬৯৯

[৪৪] সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৯০৫, ৪৯০৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৮৪।

[৪৫] প্রথম আলো, “সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কেন চূড়ান্ত সতর্কতা–ঘণ্টা”।

[৪৬] আস-সুয়ুতি, আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ির, পৃ. ১২১ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ সংস্করণ), ইমাম শাফিয়ির উক্তিসহ; দারুল ইফতা আল-মিসরিয়্যাহ, ফতোয়া নং ১৭২০২

দরসখানা - darskhana ফেসবুক থেকে

ট্যাগ / কী-ওয়ার্ড:

অন্যান্য প্রবন্ধ

October 23, 2026
পবিত্রতার দোহাই দিয়ে হদের সীমা ডিঙানো কি ইসলামিক নাকি জুলুম?

লিখেছেন শেখ মুজাহিদ / প্রকাশিত দরসখানা - darskhana মোকাদ্দিমা : আমরা কী বলতেছি আর কী বলতেছি না ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক কৃষক পরিবারের বড় ছেলে নজরুল ইসলাম দালালের মাধ্যমে সৌদি আরবে যায় [১]। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় তার এই বিদেশযাত্রা; ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর, বুধবার, সৌদি সরকার তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে [২]। […]

October 17, 2026
সাতক্ষীরায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে যুবককে পিটিয়ে হত্যা প্রসঙ্গে ‘দি ইনস্টিটিউট ফর কুরআনিক রিসার্চ এন্ড অ্যাপ্লিকেশন (দি ইক্বরা)’-এর অবস্থান ও পর্যালোচনামূলক বক্তব্য

১. ঘটনার প্রেক্ষাপট ও চরম মানবিক উদ্বেগ সম্প্রতি সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার সুবর্ণাবাদ গ্রামে কথিত ‘ধর্ম অবমাননা’ বা ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’-এর অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম (৩৮) নামের এক যুবককে উন্মত্ত জনতার (মব) মাধ্যমে দফায় দফায় মধ্যযুগীয় কায়দায় পিটিয়ে হত্যা করার যে লোমহর্ষক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, তাতে দি ইনস্টিটিউট ফর কুরআনিক রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাপ্লিকেশন (দি ইক্বরা) গভীরতম শোক, […]

July 26, 2026
আবদোলকারিম সোরোশের "দ্য এক্সপানশন অফ প্রফেটিক এক্সপেরিয়েন্স" - বইয়ের পর্যালোচনা

আবদোলকারিম সোরোশের "দ্য এক্সপানশন অফ প্রফেটিক এক্সপেরিয়েন্স" (The Expansion of Prophetic Experience) আধুনিক ইসলামি জ্ঞানতত্ত্ব (Epistemology) এবং কালাম শাস্ত্রের (Theology) অন্যতম প্রভাবশালী এবং একই সাথে বিতর্কিত একটি গ্রন্থ।

July 26, 2026
দ্য ইসলামিক সেক্যুলার - বইয়ের রিভিউ

শারম্যান এ. জ্যাকসনের লেখা দ্য ইসলামিক সেক্যুলার (The Islamic Secular) সমসাময়িক ইসলামিক চিন্তাধারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সাহসী একটি বই। পশ্চিমা "সেক্যুলারিজম" (ধর্মহীনতা বা ধর্ম ও রাষ্ট্রের বিচ্ছেদ) এবং ইসলামিক আইনের (শরিয়াহ/ফিকহ) মধ্যে যে চিরস্থায়ী দ্বন্দ্বের ধারণা প্রচলিত, জ্যাকসন এই বইয়ে সেই দ্বন্দ্বের মূলে আঘাত করেছেন।

March 26, 2026
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্রা কি কোরানের মুফাসসিরের ভূমিকা রাখতে পারে? কোরানের ব্যাখ্যার ভবিষ্যত

ইবনে আশুর সেন্টারের পরিচালক ড. সোহাইব সাঈদ একটি ইউটিউব ভিডিওতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence / AI) এবং কুরআনের তাফসিরের সংযোগস্থল নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে ডিজিটাল মডেলিংয়ের মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে পাণ্ডিত্যপূর্ণ মতামতের সারসংক্ষেপ করা, ধ্রুপদী গ্রন্থ অনুবাদ করা এবং এমনকি ঐতিহাসিক পণ্ডিতদের মতো 'চিন্তা' করা সম্ভব। মূল বিষয়বস্তু: ভূমিকা এবং শিক্ষাগত পটভূমি […]

March 19, 2026
Can AI Become a Mufassir? The Future of Quranic Interpretation

Dr. Sohaib Saeed, director of the Ibn ʿAshur Centre, discussed in an YouTube Video the intersection of Artificial Intelligence and Quranic exegesis (Tafsir). He explores how AI can be used to summarize scholarly positions, translate classical texts, and even "think" like historical scholars through digital modeling. Key Takeaways: Highlight Introduction and Academic Background The session […]

March 17, 2026
কোরআনে মহাবিশ্ব ও বিজ্ঞানের চমক: ১৪০০ বছর আগের যে বাণী আজ প্রমাণিত

কোরআনের বৈজ্ঞানিক ও গাণিতিক অলৌকিকতা: গাজী রাকায়েতের ইসলামে ফেরার কাহিনী কোরআনের ভুল খুঁজতে গিয়ে কেন কাঁদলেন ২৮টি জাতীয় পুরস্কারজয়ী পরিচালক? ভাবুন তো, একজন মানুষ পবিত্র কোরআনের বৈজ্ঞানিক ভুল (Scientific error) ধরার জন্য পড়া শুরু করলেন, কিন্তু শেষমেশ এর গাণিতিক নিখুঁত গাঁথুনি আর বৈজ্ঞানিক নিদর্শন দেখে নিজেই বিস্মিত হয়ে গেলেন! হ্যাঁ, ঠিক এমন একটি অবিশ্বাস্য ঘটনার […]

March 13, 2026
প্রাচীনকালের শেষে ইসলাম এবং পেরেনিয়ালিজম: একটি নতুন ঐতিহাসিক পাঠ

ইতিহাসের পাতা উল্টালে সপ্তম শতাব্দীতে আরবের বুকে ইসলামের উত্থানকে একটি বিস্ময়কর বাঁক হিসেবেই দেখতে হয়। ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় আলোচনায় বা প্রথাগত ইতিহাসে ইসলামকে সাধারণত এমন একটি ঐশ্বরিক ঘটনা হিসেবে তুলে ধরা হয়, যার সাথে সমসাময়িক বা পূর্ববর্তী সমাজ-সংস্কৃতির যেন কোনো যোগসূত্রই ছিল না। কিন্তু আধুনিক ইতিহাসবিদ ও গবেষকরা এখন ভিন্ন কথা বলছেন। তাদের মতে, ইসলামকে নিখুঁতভাবে […]