দি  ইন্সটিটিউট ফর কুরআনিক রিসার্চ এন্ড এ্যাপ্লিকেশন (ইক্বরা)

লক্ষ্য

ইক্বরার লক্ষ্য হলো বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য স্রষ্টার ঐশী বাণীর সমন্বিত অধ্যয়ন ও সার্বজনীন প্রয়োগের জন্য জ্ঞানদীপ্ত অনুশীলন।

উদ্দেশ্য

ইক্বরার উদ্দেশ্য হলো কুরআনের বাণীর উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ অনুধাবনের জন্য টেকসই ভিত্তি প্রস্তুত করা এবং জীবন ও সমাজের প্রায়োগিকতার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞানভিত্তিক ফ্রেমওয়ার্ক বা কাঠামো নির্মাণ।

প্রকাশিত বইসমূহ

কুরআনের আলোকে প্রাক-ইসলামি আরবের কুসংস্কার, সামাজিক প্রথা ও সংস্কার

১. প্রাক-ইসলামি আরবের ঐতিহাসিক ও আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট

ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরব উপদ্বীপের সামগ্রিক অবস্থাকে ঐতিহাসিকভাবে 'জাহিলিয়্যাত' বা অন্ধকারের যুগ হিসেবে অভিহিত করা হয়। তবে একাডেমিক দৃষ্টিকোণ থেকে 'জাহিলিয়্যাত' শব্দটি নিছক অক্ষরজ্ঞানহীনতা বা শিক্ষার অভাবকে নির্দেশ করে না; বরং এটি মূলত একটি নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং আধ্যাত্মিক শূন্যতার সমার্থক, যেখানে ঐশী জ্ঞান ও যৌক্তিকতার বদলে কুসংস্কার, গোঁড়ামি এবং অন্ধ আবেগের রাজত্ব ছিল 1। সেই যুগে আরব সমাজে কোনো সুসংগঠিত কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা, সংবিধান বা লিখিত আইনাবলি ছিল না 3। উত্তর আরবে বাইজেন্টাইন এবং দক্ষিণ আরবে পারস্য সাম্রাজ্যের আংশিক প্রভাব থাকলেও, বিস্তীর্ণ হেজাজ এবং নজদ অঞ্চল ছিল সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন 3

এই সমাজ পরিচালিত হতো মূলত গোত্রীয় আনুগত্য বা 'আসাবিয়্যাহ'-এর ভিত্তিতে। যাযাবর বেদুইন এবং শহরবাসী—এই দুই শ্রেণিতে বিভক্ত আরবদের প্রধান পেশা ছিল পশুপালন, কৃষিকাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং লুটতরাজ 3। মরুভূমির চরম শুষ্ক ও রূক্ষ পরিবেশে জীবনধারণের তাগিদে পানির উৎস, চারণভূমি এবং গৃহপালিত পশু নিয়ে গোত্রগুলোর মধ্যে নিরন্তর কলহ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ লেগেই থাকত। এই যুদ্ধগুলো কখনো কখনো দশকের পর দশক ধরে চলত, যা ইতিহাসে 'আইয়ামুল আরব' বা আরবের দিনসমূহ নামে পরিচিত 3

এই ধরনের অস্থিতিশীল, বিচ্ছিন্ন এবং সংঘাতময় আর্থ-সামাজিক কাঠামোর মধ্যে আরবরা অসংখ্য কুসংস্কার, পৌত্তলিক বিশ্বাস এবং অমানবিক সামাজিক রীতিনীতির জন্ম দিয়েছিল 4। তাদের দৈনন্দিন জীবন, অর্থনীতি, যুদ্ধনীতি, বিবাহ এবং পারিবারিক সম্পর্কগুলো এমন কিছু ভিত্তিহীন প্রথা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতো, যা মানুষের মর্যাদা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের সম্পূর্ণ পরিপন্থী ছিল 2। পবিত্র কুরআন এই সমাজে অবতীর্ণ হয়ে কেবল একটি নতুন ধর্মতত্ত্বই উপস্থাপন করেনি, বরং এটি তৎকালীন সমাজের কুসংস্কারাচ্ছন্ন আচার-আচরণগুলোর মূলে কুঠারাঘাত হেনেছিল। কুরআন মানুষের অন্ধ অনুকরণ (তাকলিদ)-এর বদলে যুক্তি (আকল) এবং প্রমাণের (বুরহান) ওপর জোর দিয়ে এক যুগান্তকারী সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংস্কার সাধন করে 7। এই বিশাল গবেষণাপত্রে প্রাক-ইসলামি আরবের এমন অসংখ্য সুনির্দিষ্ট কুসংস্কার, সামাজিক প্রথা এবং ভ্রান্ত ধারণার ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ করা হলো, যা কুরআন সরাসরি প্রত্যাখ্যান বা সংস্কার করেছে এবং ধর্ম ও সামাজিকতার নামে প্রচলিত সকল অমানবিক প্রথার বিরুদ্ধে একটি শ্বাশত মানদণ্ড স্থাপন করেছে।

২. জ্ঞানতাত্ত্বিক বিপ্লব: অন্ধ অনুকরণ বনাম যৌক্তিক চিন্তাধারার প্রতিষ্ঠা

প্রাক-ইসলামি আরবে কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক প্রথার বৈধতার একমাত্র মাপকাঠি ছিল পূর্বপুরুষদের অন্ধ অনুকরণ (তাকলিদ)। কোনো নতুন ধারণা, সত্য বা যৌক্তিক বিষয় তাদের সামনে উপস্থাপিত হলে তারা তা বুদ্ধি বা প্রজ্ঞা দিয়ে বিবেচনা না করে পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্যের দোহাই দিত 7। এই মানসিকতা সমাজের যেকোনো প্রগতিশীল চিন্তাধারা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

২.১ পূর্বপুরুষদের অন্ধ অনুকরণ (তাকলিদ) খণ্ডন

কুরআন বারবার তৎকালীন সমাজের এই যুক্তিবর্জিত মানসিকতার কঠোর সমালোচনা করেছে। মক্কার কুরাইশ এবং অন্যান্য আরবরা যখন তাদের মূর্তিপূজা এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন প্রথাগুলোর পক্ষে সাফাই গাইত, তখন তাদের একমাত্র যুক্তি ছিল যে, তারা তাদের পিতৃপুরুষদের এই পথেই পেয়েছে 10

সূরা আল-বাকারার ১৭০ নম্বর আয়াতে এই মানসিকতার একটি প্রামাণ্য চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। যখন তাদের বলা হয় আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তার অনুসরণ করো, তখন তারা দম্ভভরে বলে, "বরং আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদের যে পথের ওপর পেয়েছি, তারই অনুসরণ করব।" কুরআন এর প্রত্যুত্তরে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ও যৌক্তিক প্রশ্ন ছুড়ে দেয়: "এমনকি যদি তাদের পিতৃপুরুষরা কিছুই না বুঝত এবং সৎপথে পরিচালিত না হতো, তবুও কি?" 7। একই ধরনের আলোচনা সূরা আল-মায়িদার ১০৪ নম্বর আয়াতেও দেখা যায়, যেখানে অজ্ঞতার ওপর প্রতিষ্ঠিত সামাজিক ঐতিহ্যকে পরম সত্য হিসেবে মেনে নেওয়ার প্রবণতাকে বাতিল করা হয়েছে 7

কুরআনের এই সমালোচনার অন্তর্নিহিত অর্থ হলো, মানবসমাজে প্রচলিত ঐতিহ্য বা প্রথা কখনোই পরম সত্যের বা নৈতিকতার চূড়ান্ত মাপকাঠি হতে পারে না। সময়ের বিবর্তনে এবং অজ্ঞতার প্রভাবে যেকোনো প্রথার মধ্যে বিকৃতি আসা অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। সুতরাং, একটি সমাজকে তখনই সভ্য বলা যায়, যখন তার প্রতিটি প্রজন্ম তাদের নিজস্ব বুদ্ধি, প্রজ্ঞা এবং ঐশী নির্দেশনার আলোকে সত্যকে যাচাই করতে শেখে 7

২.২ প্রজ্ঞা (আকল), প্রমাণ (বুরহান) এবং সুনিশ্চিত জ্ঞান (ইলম)

আরব সমাজকে কুসংস্কারমুক্ত করতে কুরআন একটি সম্পূর্ণ নতুন জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি (Epistemological framework) তৈরি করে। কুরআন বারবার মানুষকে সৃষ্টিজগত, সমাজ এবং নিজের সত্তা নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা করতে উৎসাহিত করে। পবিত্র গ্রন্থে "আফালা তা'কিলুন" (তোমরা কি অনুধাবন করবে না?), "আফালা তাতাফাক্কারুন" (তোমরা কি চিন্তা করবে না?), এবং "তাদাব্বুর" (গভীরভাবে চিন্তা করা)-এর মতো শব্দগুচ্ছের বহুল ব্যবহার প্রমাণ করে যে, ইসলাম অন্ধ বিশ্বাসকে প্রশ্রয় দেয় না 7

কুরআনে 'ইলম' (সুনিশ্চিত জ্ঞান) এবং 'যান্ন' (ধারণা বা প্রমাণহীন অনুমান)-এর মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রেখা টানা হয়েছে। পৌত্তলিক আরবরা তাদের শিরক এবং কুসংস্কারের সপক্ষে প্রায়ই কপট যুক্তি দিত। যেমন, তারা বলত যে, "আল্লাহ চাইলে আমরা ও আমাদের পূর্বপুরুষরা শিরক করতাম না এবং কোনো বস্তুকে অযথাই হারাম করতাম না" 11। তখন কুরআন (৬:১৪৮) তাদের এই ধারণাকে 'যান্ন' বা ভিত্তিহীন অনুমান হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের কাছে সুনির্দিষ্ট জ্ঞান বা প্রমাণ দাবি করে: "বলুন, তোমাদের কাছে কি কোনো সুনিশ্চিত জ্ঞান (ইলম) আছে যা তোমরা আমাদের সামনে উপস্থাপন করতে পারো? তোমরা তো কেবল ধারণার (যান্ন) অনুসরণ করো এবং তোমরা কেবল মিথ্যাচার করো" 11

ইসলাম এই ধরনের অন্ধ বিশ্বাস ও ভিত্তিহীন রীতিনীতিকে প্রত্যাখ্যান করে এবং দাবি করে যে, মানুষের যেকোনো ধর্মীয়, সামাজিক বা মহাজাগতিক দাবিকে 'বুরহান' (যৌক্তিক প্রমাণ) এবং 'বায়্যিনাহ' (সুস্পষ্ট দলিল)-এর কষ্টিপাথরে উত্তীর্ণ হতে হবে 8। সূরা আল-বাকারার ১১১ নম্বর এবং সূরা আল-আম্বিয়ার ২৪ নম্বর আয়াতে কুরআন সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়: "তোমরা যদি সত্যবাদী হও, তবে তোমাদের প্রমাণ (বুরহান) নিয়ে এসো" 8। এই যৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি, প্রমাণ-নির্ভর যাচাই-বাছাই এবং সমালোচনামূলক চিন্তন (Critical thinking) সমাজ থেকে বংশপরম্পরায় চলে আসা কুসংস্কার দূর করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছিল 13

৩. মানবজীবনের পবিত্রতা ও জেন্ডার বৈষম্য: কন্যা সন্তান হত্যা (ওয়াদ আল-বানাত)

প্রাক-ইসলামি আরবের সবচেয়ে নৃশংস, হৃদয়বিদারক এবং অমানবিক প্রথাগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল নবজাতক কন্যা সন্তানকে জীবন্ত সমাহিত করা, যা আরবিতে 'ওয়াদ আল-বানাত' নামে পরিচিত 17। এটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ ছিল না, বরং সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের মাঝে এটি রীতিমতো সামাজিক প্রথায় পরিণত হয়েছিল, যা তৎকালীন সমাজের চরম নৈতিক অবক্ষয়ের প্রমাণ বহন করে।

৩.১ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং মনস্তাত্ত্বিক কারণ

ঐতিহাসিক, সমাজতাত্ত্বিক এবং কুরআনিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই বর্বরোচিত প্রথার পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ নিহিত ছিল:

প্রথমত, চরম অর্থনৈতিক দৈন্যদশা বা দারিদ্র্যের ভয় (খাশয়্যা ইমলাক)। মরুভূমির শুষ্ক, সম্পদহীন এবং প্রতিকূল পরিবেশে অনেক বেদুইন গোত্র কন্যা সন্তানকে অর্থনৈতিক বোঝা মনে করত। তৎকালীন অর্থনীতি মূলত শারীরিক শক্তি এবং যুদ্ধনির্ভর ছিল। পুরুষরা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে গনীমতের মাল বা সম্পদ লুণ্ঠন করে আনতে পারত এবং গোত্রের প্রতিরক্ষায় ভূমিকা রাখত। অন্যদিকে, কন্যা সন্তানদের অনুৎপাদনশীল এবং কেবল খাদ্যের ভাগীদার হিসেবে বিবেচনা করা হতো 18। গবেষণায় দেখা যায়, এই প্রথাটি যাযাবর বেদুইন গোত্রগুলোর মাঝে বেশি প্রচলিত ছিল, যেখানে বেঁচে থাকার সংগ্রাম ছিল অত্যন্ত তীব্র; কিন্তু শহরবাসী বা স্থায়ী বাসিন্দাদের মাঝে এর প্রচলন তুলনামূলকভাবে কম ছিল 17

দ্বিতীয়ত, সামাজিক সম্মানহানির আশঙ্কা এবং চরম পিতৃতান্ত্রিক অহংকার। আন্তঃগোত্রীয় যুদ্ধ বা 'আইয়ামুল আরব'-এর সময় পরাজিত গোত্রের নারী ও শিশুদের বন্দি করে দাস-দাসীতে পরিণত করা হতো বা পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা হতো। শত্রুর হাতে কন্যা বা বোন বন্দি হওয়াকে আরবরা চরম অপমানজনক (عار - 'আর) বিবেচনা করত। এই সম্ভাব্য অপমানের ভয়ে অনেক পিতা কন্যা জন্মের পরপরই তাকে হত্যা করে এই 'ঝুঁকি' থেকে মুক্ত হতে চাইত 17

তৃতীয়ত, পৌত্তলিক মানত বা অন্ধ ধর্মীয় বলিদান। সাম্প্রতিক গবেষণায় এবং তাফসির গ্রন্থগুলোর বিশ্লেষণে একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে যে, কন্যা সন্তান হত্যার পেছনে কেবল দারিদ্র্য বা সম্মানহানির ভয়ই ছিল না, বরং এর সাথে জাহিলি আরবদের মানত (Votive rituals) বা দেবতাদের সন্তুষ্ট করার অন্ধ বিশ্বাসের গভীর সম্পর্ক ছিল। অনেক আরব তাদের উপাস্যদের নৈবেদ্য হিসেবে নিজেদের সন্তানদের, বিশেষ করে কন্যাদের বলি দিত, যা কালক্রমে একটি ধর্মীয় প্রথায় রূপ নিয়েছিল 19

৩.২ কুরআনিক সংস্কার এবং জীবনদর্শনের পরিবর্তন

কুরআন এই অমানবিক প্রথার বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর, আবেগময় এবং দ্ব্যর্থহীন অবস্থান গ্রহণ করে মানবসমাজে জীবনের পবিত্রতা প্রতিষ্ঠা করে। সূরা আন-নাহলের ৫৮-৫৯ আয়াতে আরবদের সেই বিকৃত মনস্তত্ত্বের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে বলা হয়েছে: "যখন তাদের কাউকে কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয়, তখন তার মুখমণ্ডল কালো হয়ে যায় এবং সে অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট হয়। তাকে যে সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে, তার গ্লানি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সে নিজ সম্প্রদায়ের কাছ থেকে মুখ লুকিয়ে রাখে। সে চিন্তা করে যে, অপমান সহ্য করে তাকে বাঁচিয়ে রাখবে, নাকি তাকে মাটিতে পুঁতে ফেলবে? সাবধান! তারা যা সিদ্ধান্ত নেয়, তা কতই না নিকৃষ্ট!" 18

কুরআন এই প্রথাকে সরাসরি নাকচ করে এবং এর পেছনের মূল অজুহাতগুলোকে অসার প্রমাণ করে। সূরা বনী ইসরাঈলের ৩১ নম্বর আয়াতে (১৭:৩১) এবং সূরা আল-আনআমের ১৫১ নম্বর আয়াতে (৬:১৫১) আল্লাহ ঘোষণা করেন: "দারিদ্র্যের ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না। আমরাই তাদের রিজিক দিই এবং তোমাদেরও। নিশ্চয়ই তাদের হত্যা করা এক মহাপাপ" 22

সবচেয়ে মর্মস্পর্শী বর্ণনাটি এসেছে সূরা আত-তাকবীরে (৮১:৮-৯), যেখানে কিয়ামতের দিনের ভয়াবহতার চিত্রাঙ্কন করে বলা হয়েছে: "এবং যখন জীবন্ত সমাহিত কন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে, কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?" 20। এই আয়াতগুলো তৎকালীন আরবদের বিবেকে প্রচণ্ড নাড়া দেয়। ইসলাম কন্যা সন্তান হত্যাকে শুধু নিষিদ্ধই করেনি, বরং কন্যা সন্তান পালন করা, তাদের শিক্ষিত করা এবং আদর-যত্ন দেওয়াকে জান্নাত লাভের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে ঘোষণা করে সমাজের জেন্ডার দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি অভাবনীয় বিপ্লব সাধন করে 17

৪. বিবাহ প্রথা, নারীর অবমাননা এবং সামাজিক সংস্কার

জাহিলিয়্যাতের যুগে নারীর কোনো স্বাধীন আইনি বা সামাজিক সত্তা ছিল না। তাদেরকে অনেকটা স্থাবর সম্পত্তি বা গৃহপালিত পশুর মতো লেনদেন, উত্তরাধিকার এবং ভোগের সামগ্রী হিসেবে বিবেচনা করা হতো 23। সমাজের এই চরম পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোতে বিবাহ কোনো পবিত্র চুক্তি ছিল না; বরং এটি ছিল পরিবারের পুরুষদের দ্বারা পরিচালিত একটি বাণিজ্যিক বা সামাজিক লেনদেন। তৎকালীন আরবে এমন কয়েকটি বিবাহ প্রথা প্রচলিত ছিল, যা ছিল নারীর মর্যাদার চরম অবমাননাকর। ইসলামি শরিয়ত এবং কুরআন এই প্রথাগুলোকে সম্পূর্ণ বাতিল করে দেয়।

৪.১ প্রাক-ইসলামি আরবে প্রচলিত কলঙ্কজনক বিবাহ প্রথাসমূহ এবং কুরআনিক সংস্কার

তৎকালীন আরব সমাজে প্রচলিত বিভিন্ন বিবাহ প্রথার প্রকৃতি এবং সেগুলোর বিপরীতে ইসলামের যুগান্তকারী সংস্কারগুলো নিচে একটি সারণির মাধ্যমে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:

প্রাক-ইসলামি বিবাহ প্রথাঐতিহাসিক বর্ণনা ও প্রকৃতিসামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবকুরআনিক ও ইসলামি সংস্কার
নিকাহ আল-মাক্বত (উত্তরাধিকার সূত্রে বিবাহ)পিতার মৃত্যুর পর তার বিধবা স্ত্রীদের (সৎ মা) ওপর সন্তানদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হতো। বড় ছেলে তার সৎ মায়ের গায়ে কাপড় ছুড়ে দিয়ে তাকে নিজের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে পারত, অথবা জোরপূর্বক অন্যের কাছে বিয়ে দিয়ে মোহরানা আত্মসাৎ করত।এটি ছিল নারীর ইচ্ছার চরম অবমাননা এবং মানবীয় সম্পর্কের বিকৃতি, যেখানে মাতৃত্বের সম্মানকে ভূলুণ্ঠিত করে নারীকে সম্পত্তিতে পরিণত করা হয়েছিল।কুরআন (৪:২২) একে 'চরম নির্লজ্জতা (Fahishah)', 'ঘৃণ্য কাজ (Maqt)' এবং 'নিকৃষ্ট পথ (Saa'a Sabeela)' বলে চিরতরে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে 24। নারীর উত্তরাধিকার সত্তা বাতিল করা হয়।
নিকাহ আশ-শিগার (বিনিময় বিবাহ)মোহরানা ছাড়া দুই পরিবারের মধ্যে নারীদের বিনিময় প্রথা। এক ব্যক্তি তার কন্যা বা বোনকে অন্যের কাছে বিয়ে দিত, এই শর্তে যে অপর ব্যক্তিও তার কন্যা বা বোনকে মোহরানা ছাড়াই তার কাছে বিয়ে দেবে।এই প্রথায় নারীদেরকে নিছক 'বিনিময়ের বস্তু' বা পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এতে নারীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং বিয়ের ক্ষেত্রে নিজের মতামতের কোনো মূল্য ছিল না।ইসলাম এই প্রথা সম্পূর্ণরূপে বাতিল করে। 'মোহরানা'-কে (ইওয়াজ/Mahr) স্ত্রীর একচ্ছত্র এবং বাধ্যতামূলক আইনি অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়, যা নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করে 23
নিকাহ আল-ইসতিবদা (উন্নত বংশের আশায় প্রজনন)স্বামী তার স্ত্রীকে ঋতুস্রাব থেকে পবিত্র হওয়ার পর কোনো অভিজাত, শক্তিশালী বা সাহসী পুরুষের সাথে সহবাস করতে পাঠাত। স্ত্রী গর্ভবতী না হওয়া পর্যন্ত স্বামী তার থেকে দূরে থাকত।এটি মানব মর্যাদার চরম লঙ্ঘন। মূলত উন্নত বংশ বা সাহসী সন্তান লাভের জন্য নারীদের প্রজনন যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হতো, যেখানে নৈতিকতার কোনো স্থান ছিল না।এটি সরাসরি ব্যভিচার (যিনা) হিসেবে নিষিদ্ধ হয়। ইসলামি আইনে বিবাহের মূল ভিত্তি হিসেবে চুক্তি এবং 'মাওয়াদ্দাহ ওয়া রাহমাহ' (ভালোবাসা ও পারস্পরিক করুণা)-কে প্রতিষ্ঠিত করা হয় 28
বহুপতি বিবাহ (Polyandry)দশজনের কম পুরুষের একটি দল এক নারীর সাথে নিয়মিত শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করত। নারী গর্ভবতী হয়ে সন্তান প্রসব করার পর ওই পুরুষদের সবাইকে ডাকত এবং যাকে ইচ্ছা তাকে সন্তানের পিতা হিসেবে বেছে নিত।এটি সমাজে পিতৃপরিচয়ের সংকট তৈরি করত এবং পরিবার ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ অস্থিতিশীল করে তুলেছিল। নারীকে এখানে একাধিক পুরুষের মনোরঞ্জনের পাত্রী হিসেবে ব্যবহার করা হতো।কুরআন (৪:২৪) এর মাধ্যমে বিবাহিত নারীর সাথে অন্য পুরুষের মিলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। এর মাধ্যমে পিতৃত্বের আইনি ও বংশগত নিশ্চয়তা প্রদান করে একটি সুস্থ পারিবারিক কাঠামোর ভিত্তি রচিত হয় 28

৪.২ সামাজিক ন্যায়বিচার এবং আইনি সত্তা হিসেবে নারীর উত্থান

উপরিউক্ত সারণির বিশ্লেষণ থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, কুরআনের এই সংস্কারগুলোর দ্বিতীয় স্তরের (Second-order) তাৎপর্য ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। ইসলাম বিবাহকে একটি নিছক গোত্রীয় লেনদেন থেকে বের করে এনে আইনি চুক্তিতে (নিকাহ) রূপান্তরিত করেছে, যেখানে বর ও কনের স্বাধীন সম্মতি (ইজাব ও কবুল) অপরিহার্য করা হয়েছে 27। যৌতুক বা মোহরানা পিতার জন্য কোনো ক্ষতিপূরণ নয়, বরং এটি স্ত্রীর সম্মানজনক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত হয়, যা তার অর্থনৈতিক সুরক্ষার প্রথম ধাপ 23। এই পদক্ষেপগুলোর মাধ্যমে নারী সমাজ 'বিনিময়ের বস্তু' বা পরিবারের সম্পত্তি থেকে একটি স্বাধীন ও 'সার্বভৌম আইনি সত্তায়' উন্নীত হয় 23

৫. অর্থনৈতিক শোষণ, জুয়া এবং লটারি: মাইসির এবং আযলাম

জাহিলি যুগে আরবের অর্থনীতি ছিল চরম বৈষম্যমূলক। সেখানে যেমন একদিকে দারিদ্র্য ছিল, অন্যদিকে এক শ্রেণির মানুষের হাতে সম্পদ কুক্ষিগত ছিল। সম্পদের এই অসাম্য বৃদ্ধি এবং বিনোদনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল ভাগ্য গণনা এবং জুয়া। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত এবং ক্ষতিকর প্রথা ছিল 'মাইসির' (Maisir) এবং ভাগ্য নির্ধারণকারী তীর বা 'আযলাম' (Azlam), যা তৎকালীন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছিল 31

৫.১ মাইসির ও আযলামের প্রক্রিয়া এবং ঐতিহাসিক বিবরণ

'মাইসির' শব্দটি আরবি 'ইউসুর' বা সহজ শব্দ থেকে এসেছে। এর অর্থ হলো কোনো শারীরিক বা মানসিক শ্রম ছাড়াই অতি সহজে অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করা বা রাতারাতি বড়লোক হওয়ার চেষ্টা করা 31। সে যুগে 'আযলাম' নামক এক বিশেষ ধরনের জুয়া ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল, যা প্রধানত শীতকালে খেলা হতো, যখন চারণভূমি শুকিয়ে যেত এবং খাদ্যের অভাব দেখা দিত।

এই খেলার প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। সাধারণত দশজন ব্যক্তি মিলে একটি উট ক্রয় করত এবং তা জবাই করে এর গোশতকে ২৮টি সমান ভাগে ভাগ করত 31। এরপর ভাগ্য নির্ধারণের জন্য ১০টি বিশেষ কাঠের টুকরো বা তীর (আযলাম বা আকলাম) ব্যবহার করা হতো। এই তীরগুলোর প্রতিটির গায়ে নির্দিষ্ট নাম এবং ভাগের পরিমাণ লেখা থাকত 31। এই ১০টি তীরের মধ্যে ৭টি ছিল বিজয়ী তীর এবং ৩টি ছিল পরাজিত বা দুর্ভাগা তীর।

বিজয়ী তীরগুলোর নাম ছিল যথাক্রমে: ফায (faz - ১ ভাগ), তাওয়াম (tawam - ২ ভাগ), রাকিব (raqib - ৩ ভাগ), হালাস (halas - ৪ ভাগ), নাফিস (nafis - ৫ ভাগ), মাসবাল (masbal - ৬ ভাগ), এবং মুআল্লা (mualla - ৭ ভাগ) 31। এই তীরগুলো উঠলে অংশগ্রহণকারীরা সে অনুযায়ী গোশতের ভাগ পেত। অন্যদিকে, তিনটি দুর্ভাগা তীরের নাম ছিল: মানাজ (manaj), সাফীহ (safih), এবং রাঘাদ (raghad) 31। দুর্ভাগ্যবশত যার লটারিতে এই তিনটি তীরের কোনো একটি উঠত, সে গোশতের কোনো ভাগ তো পেতই না, উল্টো শাস্তি হিসেবে তাকে পুরো উটটির দাম একাই পরিশোধ করতে হতো 31

৫.২ কুরআনিক নিষেধাজ্ঞা এবং আর্থ-সামাজিক দর্শন

কুরআন সূরা আল-মায়িদার ৯০-৯১ আয়াতে মাইসির এবং আযলামকে সরাসরি মদ ও মূর্তিপূজার সাথে সমতুল্য করে 'শয়তানের অপবিত্র কাজ' (Rijs) বলে আখ্যায়িত করেছে এবং তা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে 31

এই প্রথাগুলো নিষিদ্ধ করার পেছনে কুরআনের গভীর সামাজিক এবং মনস্তাত্ত্বিক দর্শন রয়েছে। জুয়া বা মাইসির সমাজে এমন এক শ্রেণির উদ্ভব ঘটায় যারা উৎপাদনশীল শ্রমে আগ্রহী হয় না। যেহেতু জুয়াড়িরা বিনা পরিশ্রমে অন্যের সম্পদ গ্রাস করে, তাই এটি পরাজিতদের মনে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিহিংসার জন্ম দেয়। কুরআন (৫:৯১) অত্যন্ত স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, শয়তান মদ ও জুয়ার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে কেবল "চরম শত্রুতা ও বিদ্বেষ (enmity and hatred)" সৃষ্টি করতে চায় এবং তাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চায় 31

ইসলামি অর্থনীতিতে সম্পদ উপার্জনের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক সম্মতিতে বৈধ ব্যবসা, বিনিয়োগ এবং শারীরিক বা মানসিক পরিশ্রম; কোনো প্রকার ভাগ্য, লটারি বা শূন্য-সমষ্টি গেমের (Zero-sum game) ওপর নির্ভর করে অন্যের সম্পদ গ্রাস করা নয় 33। এই কুসংস্কার বাতিল করে কুরআন সমাজে শ্রমের মর্যাদা, সম্পদের সুষম বণ্টন এবং অর্থনৈতিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করে, যা সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য 33

৬. পৌত্তলিকতা এবং পশুকেন্দ্রিক অমানবিক কুসংস্কার

ইসলাম আগমনের পূর্বে আরব উপদ্বীপে হযরত ইব্রাহিম (আ.) এবং ইসমাইল (আ.)-এর রেখে যাওয়া একেশ্বরবাদী ধর্মের (হানিফ) প্রভাব ছিল। কিন্তু কালক্রমে তা ম্লান হয়ে যায়। ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, 'আমর ইবনে লুহাই আল-খুজাঈ' নামক মক্কার এক প্রভাবশালী গোত্রপতি এবং পুরোহিত সিরিয়া (শাম) অঞ্চলে গিয়ে সেখানে মূর্তিপূজা দেখতে পান এবং সেখান থেকে 'হুবাল' নামক মূর্তি মক্কায় নিয়ে আসেন। তিনিই সর্বপ্রথম মক্কায় মূর্তিপূজা এবং পশু বলিদানের বিভিন্ন ভ্রান্ত রীতিনীতির প্রচলন করেন 34

এই মূর্তিপূজার সাথে তারা এমন কিছু কুসংস্কার যুক্ত করেছিল, যা তাদের অর্থনীতি ও জীবিকার প্রধান উৎস—গবাদি পশুর ওপর অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। তারা দেবতাদের নামে গবাদি পশুকে উৎসর্গ করার কিছু অদ্ভুত নিয়ম তৈরি করেছিল, যার ফলে স্বাস্থ্যবান পশুগুলো মানুষের কোনো উপকারে আসত না।

৬.১ চার প্রকার পশুকেন্দ্রিক কুসংস্কার

কুরআনের সূরা আল-মায়িদার ১০৩ নম্বর আয়াতে আরবে প্রচলিত এমন চারটি পশুকেন্দ্রিক প্রথার কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং তা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে 36:

১. বাহিরা (Bahira): যে উষ্ট্রী পাঁচবার বাচ্চা দিত এবং পঞ্চম বাচ্চাটি পুরুষ হতো, তার কান চিরে দিয়ে মূর্তির নামে বা দেবতাদের সম্মানে স্বাধীনভাবে চারণভূমিতে ছেড়ে দেওয়া হতো। এর দুধ পান করা, এর পিঠে বোঝা চাপানো বা আরোহণ করা মানুষের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল 36। 

২. সায়িবা (Saiba): কোনো ব্যক্তি রোগ থেকে মুক্তি পেলে বা কোনো বিপদ থেকে উদ্ধার পেলে মানত পূরণের উদ্দেশ্যে বা দেবতার সন্তুষ্টির জন্য যে উটকে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেওয়া হতো। একে কোনো কাজে লাগানো হতো না। 'আমর ইবনে লুহাই সর্বপ্রথম এই প্রথার প্রচলন করেন বলে হাদিসে উল্লেখ রয়েছে 35। 

৩. ওয়াসিলা (Wasila): যে ছাগী পরপর দুইবার জমজ মাদী বাচ্চা প্রসব করত বা এমনভাবে বাচ্চা দিত যেখানে পুরুষ বাচ্চার সাথে মাদী বাচ্চা সংযুক্ত থাকত, সেই ছাগীকে মূর্তির নামে উৎসর্গ করা হতো এবং তাকে হত্যা করা বা তার মাংস খাওয়া নিষেধ ছিল 36। 

৪. হাম (Ham): যে উটের ঔরসে নির্দিষ্ট সংখ্যক (যেমন দশটি) বাচ্চা জন্ম নিত, অর্থাৎ যে উট প্রজননের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সফল ছিল, তাকে আর কোনো প্রকার প্রজনন, বোঝা বহন বা অন্য কোনো কাজে ব্যবহার না করে দেবতার নামে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেওয়া হতো 36

৬.২ কুরআনিক খণ্ডন ও অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা

কুরআন (৫:১০৩) স্পষ্টভাবে এই অন্ধবিশ্বাসগুলোর মূলোৎপাটন করে ঘোষণা করে: "আল্লাহ বাহিরা, সায়িবা, ওয়াসিলা এবং হাম বলতে কোনো কিছু নির্ধারণ করেননি; বরং কাফিররা আল্লাহর ওপর মিথ্যা উদ্ভাবন করে, এবং তাদের অধিকাংশই বিবেক-বুদ্ধি রাখে না (লা ইয়া'কিলুন)" 36

এই কুসংস্কারগুলো কেবল ধর্মীয় দিক থেকেই পথভ্রষ্টতা বা শিরক ছিল না, বরং ম্যাক্রো-ইকোনমিক বা সামষ্টিক অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও ছিল চরম ক্ষতিকর। মরুভূমির মতো রুক্ষ পরিবেশে গবাদি পশু ছিল মানুষের টিকে থাকার প্রধান অবলম্বন। কিন্তু মূর্তিপূজার নামে সবচেয়ে সুস্থ, সবল এবং উর্বর পশুগুলোকে অব্যবহৃত অবস্থায় ফেলে রাখা ছিল সম্পদের চরম অপচয়। কুরআন এই প্রথা বাতিল করে প্রমাণ করেছে যে, ঐশী ধর্মে সম্পদের অযৌক্তিক অপচয়ের কোনো স্থান নেই। এর মাধ্যমে ইসলাম পশুসম্পদের যৌক্তিক, কল্যাণকর এবং মানবিক ব্যবহারের পথ সুগম করে 39

৭. প্রাকৃতিক ঘটনা এবং মনস্তাত্ত্বিক কুসংস্কারের অপসারণ

প্রকৃতি, মহাজাগতিক ঘটনাবলি এবং রোগব্যাধিকে কেন্দ্র করে প্রাক-ইসলামি আরবে অসংখ্য অমূলক কুসংস্কার প্রচলিত ছিল। মানুষের অজ্ঞতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রতি ভয় এবং মনোবিজ্ঞানের দুর্বলতাকে পুঁজি করে এই প্রথাগুলো সমাজে এক ধরনের কাল্পনিক ভয়ের রাজত্ব কায়েম করেছিল 13

৭.১ চিকিৎসা, প্রকৃতি এবং দৈনন্দিন জীবনের ভ্রান্ত বিশ্বাস

  • বৃষ্টির জন্য কুসংস্কার: আরবে যখন দীর্ঘস্থায়ী খরা দেখা দিত, তখন আরবরা 'সালা' এবং 'উশর' নামক গাছের সহজে দাহ্য ডালপালা একটি গরুর লেজের সাথে শক্ত করে বেঁধে তাকে কোনো পাহাড়ের চূড়ায় নিয়ে যেত এবং ডালগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিত। তাদের অন্ধ বিশ্বাস ছিল যে, আগুনের শিখা আকাশের বিদ্যুতের মতো এবং গরুর যন্ত্রণাকাতর আর্তনাদ মেঘের গর্জনের মতো শোনাবে, যা আকাশকে বৃষ্টি বর্ষণে বাধ্য করবে বা দেবতাদের সন্তুষ্ট করবে 40। এটি ছিল পশুর প্রতি চরম নিষ্ঠুরতা এবং যুক্তিবর্জিত আচরণের এক চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত।
  • রোগ নিরাময়ের ভ্রান্ত পদ্ধতি: গবাদি পশুর পালের কোনো উট অসুস্থ হলে বা গায়ে ঘা হলে, তারা অসুস্থ উটের চিকিৎসা না করে বরং একটি সম্পূর্ণ সুস্থ উট ধরে তার ঠোঁট, ঊরু ও পায়ে গরম লোহার ছ্যাঁকা দিত বা দাগিয়ে দিত। তাদের ভ্রান্ত ধারণা ছিল যে, সুস্থ উটকে পোড়ালে অসুস্থ উটের রোগ সেরে যাবে বা রোগ অন্য উটের মাঝে ছড়াবে না 40। গরুর পাল কোনো নদী বা জলাশয় থেকে পানি পান না করলে ষাঁড়কে পেটানো হতো এই বিশ্বাসে যে, ষাঁড়ের শিঙের মাঝে থাকা অশুভ আত্মা গরুকে পানি পানে বাধা দিচ্ছে 40
  • ভ্রমণ এবং অন্যান্য কুসংস্কার: কোনো অপরিচিত গ্রামে প্রবেশের সময় সংক্রামক ব্যাধি বা অশুভ আত্মার আক্রমণ থেকে বাঁচতে তারা গাধার মতো দশবার ডাকত 40। মরুভূমিতে পথ হারিয়ে ফেললে তারা নিজেদের গায়ের জামা উল্টো করে পরত। এছাড়া পাগল বা মানসিক রোগীদের সুস্থ করার জন্য মৃত ব্যক্তির হাড় তাদের গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হতো 40

৭.২ হামা (মৃত্যুর পেঁচা) এবং সফর মাসের অমঙ্গল

মৃত্যু এবং সময়কে কেন্দ্র করে আরবদের মধ্যে গভীর কুসংস্কার ছিল। তারা বিশ্বাস করত যে, নিহত ব্যক্তির আত্মা পাখির রূপ নিয়ে (যাকে তারা 'হামা' বা পেঁচা বলত) তার কবরের চারপাশে ঘুরতে থাকে এবং প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য রক্তের তৃষ্ণায় ছটফট করে 42

এছাড়া ইসলামি চন্দ্র পঞ্জিকার দ্বিতীয় মাস 'সফর'-কে তারা চরম অশুভ ও অমঙ্গলের মাস মনে করত। তাদের ধারণা ছিল, সফর হলো মানুষের পেটে বসবাসকারী এক প্রকার সাপ বা অশুভ আত্মা, যা এই মাসে জেগে ওঠে এবং বিভিন্ন রোগব্যাধি ও বিপদাপদ ছড়ায়। এই অন্ধবিশ্বাসের কারণে তারা এই মাসে বিয়ে, ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করা বা কোনো নতুন কাজে হাত দেওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকত 41

৭.৩ ইসলামি শরিয়তের যৌক্তিক হস্তক্ষেপ

ইসলামি শরিয়ত এবং স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) এই সমস্ত কুসংস্কার সরাসরি বাতিল ঘোষণা করেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, "ইসলামে কোনো অশুভ লক্ষণ (তাতাইয়্যুর) নেই, কোনো সংক্রামক ব্যাধি আল্লাহর হুকুম ছাড়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছড়ায় না, হামা বলতে কিছু নেই এবং সফর মাসের কোনো অশুভত্ব নেই" 43। কুরআন ও হাদিসের এই যৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে অদেখা অশুভ শক্তির কাল্পনিক ভয় থেকে চিরতরে মুক্ত করে। ইসলাম শেখায় যে, মহাবিশ্বের প্রতিটি ঘটনা প্রাকৃতিক কার্যকারণ (Cause and effect) এবং স্রষ্টার পূর্বনির্ধারিত নিয়মের (তাকদির) অধীন; কোনো পাখি, মাস বা প্রাণীর ওপর মানুষের ভাগ্য নির্ভর করে না 40

৮. পবিত্র সময়ের বিকৃতি এবং রাজনৈতিক মনোপলি: আন-নাসি (Al-Nasi)

প্রাক-ইসলামি আরবের সবচেয়ে সুচতুর, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং প্রতারণামূলক প্রথাগুলোর একটি ছিল 'আন-নাসি' বা পবিত্র মাস পিছিয়ে দেওয়ার প্রথা। আরবরা স্বভাবতই ইব্রাহিম (আ.)-এর আমল থেকে চলে আসা পবিত্র চারটি মাসের সম্মান করত। এই মাসগুলো হলো—জিলকদ, জিলহজ, মুহাররম এবং রজব। এই চার মাসে যেকোনো ধরনের যুদ্ধবিগ্রহ, রক্তপাত এবং লুটতরাজ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বা হারাম বলে পরিগণিত হতো 46

৮.১ নাসি প্রথার প্রক্রিয়া এবং নেপথ্যের কারণ

আরবদের অর্থনীতি মূলত নির্ভর করত লুটতরাজ এবং ব্যবসার ওপর। অনেক সময় তাদের গোত্রীয় যুদ্ধ বা লুণ্ঠন অভিযান পবিত্র মাস শুরু হওয়ার কারণে মাঝপথে থামিয়ে দিতে হতো। বিশেষ করে জিলকদ, জিলহজ এবং মুহাররম—এই তিনটি মাস পরপর হওয়ায় দীর্ঘ তিন মাস যুদ্ধ বা লুটপাট থেকে বিরত থাকা তাদের জন্য আর্থিকভাবে অসুবিধাজনক হয়ে দাঁড়াত 44। এই অর্থনৈতিক ও সামরিক স্বার্থ হাসিলের জন্য 'বনু কিনানাহ' গোত্রের এক বিশেষ অভিজাত পরিবার, যাদের প্রধানকে 'কালাম্মাস' বলা হতো, তারা হজের সময় উপস্থিত জনসমক্ষে ঘোষণা করত যে, এই বছর মুহাররম মাসকে পবিত্র মানা হবে না, বরং তার বদলে পরবর্তী মাস অর্থাৎ সফর মাসকে পবিত্র ধরা হবে 46

এছাড়া, চন্দ্রবর্ষ সাধারণত সৌরবর্ষ থেকে ১১ দিন ছোট হয়। এর ফলে হজের মৌসুম প্রতি বছর আলাদা আলাদা ঋতুতে পড়ত। কিন্তু আরবরা চাইত হজের সময়টি যেন সর্বদা ফসল তোলার নির্দিষ্ট ঋতুতে বা বাণিজ্যের জন্য সুবিধাজনক সময়ে পড়ে। এই কারণে তারা ইহুদিদের ক্যালেন্ডারের অনুকরণে ২ বা ৩ বছর পর পর একটি অতিরিক্ত মাস যুক্ত করে (Intercalation) চন্দ্রবর্ষকে সৌরবর্ষের সাথে মিলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করত 47

৮.২ কুরআনের কঠোর সমালোচনা এবং বর্ষপঞ্জির সংস্কার

সূরা আত-তাওবার ৩৭ নম্বর আয়াতে কুরআন এই নাসি প্রথাকে সরাসরি 'কুফরির আধিক্য' (excess of disbelief) বলে আখ্যায়িত করেছে। আয়াতে বলা হয়েছে: "নিশ্চয়ই মাস পিছিয়ে দেওয়া কুফরিরই নামান্তর; এর মাধ্যমে কাফিরদেরকে বিভ্রান্ত করা হয়। তারা কোনো বছর একে হালাল করে এবং অন্য বছর একে হারাম করে, যাতে তারা আল্লাহর নির্ধারিত পবিত্র মাসগুলোর সংখ্যা পূর্ণ করতে পারে এবং আল্লাহ যা হারাম করেছেন, তারা তাকে হালাল করে নিতে পারে" 47

'নাসি' প্রথা নিষিদ্ধ করার পেছনে গভীর রাজনৈতিক ও ধর্মতাত্ত্বিক তাৎপর্য নিহিত রয়েছে। এটি ছিল স্রষ্টার চিরায়ত আইনের ওপর মানুষের খবরদারি বা হস্তক্ষেপের চূড়ান্ত রূপ। কালাম্মাস এবং অভিজাত গোত্রগুলো নিজেদের সুবিধামতো ধর্মের নিয়ম পরিবর্তন করত, যার ফলে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হতো এবং গোত্রগুলোর মধ্যে ক্ষমতার অসমতা তৈরি হতো 47। ১০ম হিজরিতে বিদায় হজের সময় রাসূল (সা.) নাসি প্রথা চিরতরে বাতিল করে ঘোষণা করেন যে, সময় আবার তার নিজস্ব আবর্তনে ফিরে গেছে, যেমনটি আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন ছিল 47। এর মাধ্যমে একটি বিশুদ্ধ চন্দ্র পঞ্জিকা প্রতিষ্ঠিত হয়, ধর্মের ওপর কোনো নির্দিষ্ট গোত্রের রাজনৈতিক মনোপলি খর্ব হয় এবং ঐশী আইনের নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।

৯. কুসংস্কারের শৃঙ্খল মোচন: 'ইসর' এবং 'আগলাল'-এর অন্তর্নিহিত দর্শন

জাহিলিয়্যাতের যুগের এই বিচিত্র প্রথা, ভিত্তিহীন ধর্মীয় আচার, অন্ধ ঐতিহ্য এবং কঠোর সামাজিক রীতিনীতিগুলো আরবদের জীবনকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছিল। তারা নিজেদের তৈরি করা এই শৃঙ্খল বা বেড়াজালের মধ্যেই অবরুদ্ধ ছিল, যা তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক, অর্থনৈতিক এবং আত্মিক স্বাধীনতাকে সম্পূর্ণ রুদ্ধ করে দিয়েছিল 40

কুরআন সূরা আল-আরাফের ১৫৭ নম্বর আয়াতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অন্যতম প্রধান ও ঐশী দায়িত্ব হিসেবে এই শৃঙ্খল মোচনের বিষয়টি উল্লেখ করেছে। আয়াতে বলা হয়েছে: "...তিনি তাদেরকে সৎকাজের নির্দেশ দেন এবং অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করেন, তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করেন এবং অপবিত্র বস্তু হারাম করেন। আর তিনি তাদের ওপর থেকে 'ইসর' (ভারী বোঝা) এবং 'আগলাল' (শৃঙ্খল) নামিয়ে দেন, যা তাদের ওপর চেপে বসেছিল..." 39

এই আয়াতে উল্লেখিত 'ইসর' (ভারী বোঝা) এবং 'আগলাল' (শৃঙ্খল) কোনো লোহার তৈরি শেকল বা বাহ্যিক বোঝা নয়; বরং এটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে 40। প্রাক-ইসলামি আরবে 'আগলাল' বলতে বোঝাত সেইসব অন্ধবিশ্বাস এবং সামাজিক প্রথাকে, যেগুলো মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল। 

উদাহরণস্বরূপ—পশুকে মূর্তির নামে উৎসর্গ করে অযথা সম্পদ নষ্ট করা, বিনা কারণে পবিত্র ও হালাল বস্তুকে হারাম বানিয়ে নেওয়া, কাল্পনিক অশুভ শক্তির (যেমন সফর মাস বা পেঁচা) ভয়ে দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত করা, এবং আভিজাত্যের অহংকারে নারী, এতিম ও দুর্বলদের অধিকার হরণ করা 39

তৎকালীন সমাজের পুরোহিত এবং গোত্রপতিরা নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য সাধারণ মানুষের ওপর এইসব কৃত্রিম বিধি-নিষেধ চাপিয়ে দিয়েছিল। কুরআনের বিধানগুলো এই অপ্রয়োজনীয় বিধি-নিষেধ এবং অন্ধবিশ্বাসের দেয়াল ভেঙে দেয়। ইসলাম মানুষকে এই বার্তা দেয় যে, স্রষ্টার বিধান মানুষের জীবনকে কঠিন করার জন্য নয়, বরং সহজ করার জন্য। এর মাধ্যমে সমাজ একটি যৌক্তিক, মানবিক এবং ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা উপহার পায়, যেখানে মানুষের বিবেক ও বুদ্ধি তার প্রাপ্য মর্যাদা লাভ করে 52

১০. উপসংহার

প্রাক-ইসলামি আরবের প্রেক্ষাপটে পবিত্র কুরআনের অবতরণ মানব ইতিহাসের অন্যতম যুগান্তকারী বুদ্ধিবৃত্তিক, সামাজিক এবং নৈতিক বিপ্লবের সূচনা করে। উপরের সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ থেকে এটি সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, কুরআন কেবল কিছু পৌত্তলিক উপাসনার অবসান ঘটিয়ে একটি নতুন ধর্মতত্ত্বই প্রতিষ্ঠা করেনি; বরং এটি মানবসমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করা কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস এবং অমানবিক প্রথাগুলোর মূলোৎপাটন করেছিল।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, আরবের জাহিলি প্রথাগুলো নিছকই কিছু এলোমেলো বিশ্বাস বা নির্বিষ প্রথা ছিল না; বরং এগুলো ছিল সামাজিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক শোষণ এবং মনস্তাত্ত্বিক ভয়ের এক সুপরিকল্পিত ও জটিল জাল। কন্যা সন্তান হত্যার মাধ্যমে জীবনের পবিত্রতা ও নারীর অধিকার হরণ, নিকাহ আল-মাক্বত বা শিগার-এর মতো প্রথার মাধ্যমে নারীকে পণ্যে রূপান্তর, মাইসির ও আযলামের মতো জুয়ার মাধ্যমে শ্রম ছাড়াই অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ এবং নাসি প্রথার মাধ্যমে ধর্মীয় পবিত্রতাকে রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থে ব্যবহার করা—এই সবকিছুই ছিল একটি বিশৃঙ্খল ও শোষণমূলক সমাজের প্রতিচ্ছবি।

কুরআন এই রুগ্ন সমাজকে সংস্কার করতে গিয়ে সবচেয়ে বড় যে আঘাতটি হেনেছিল, তা হলো পূর্বপুরুষদের অন্ধ অনুকরণ বা তাকলিদকে প্রত্যাখ্যান করা। কুরআন মানুষের চিন্তাশক্তি (আকল), সুনিশ্চিত জ্ঞান (ইলম) এবং প্রমাণের (বুরহান) ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করেছে, যা যেকোনো আধুনিক জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোর মূল ভিত্তি। বাহিরা বা সায়িবার মতো পশুকেন্দ্রিক কুসংস্কার বাতিল করে কুরআন সম্পদের সদ্ব্যবহার ও অর্থনৈতিক অপচয় রোধ নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে, বৃষ্টি নামানোর অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি বা সফর মাসের মতো মনস্তাত্ত্বিক অশুভ লক্ষণকে মিথ্যা প্রমাণ করে মানুষের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে।

পরিশেষে বলা যায়, কুরআন ধর্মের নামে, ঐতিহ্যের নামে বা সামাজিকতার নামে তৈরি হওয়া মানুষের নিজস্ব কুসংস্কার ও ক্ষতিকর প্রথার বিরোধী এক অনড় ও আপসহীন অবস্থান বজায় রেখেছে। কুরআন মানবজাতিকে যেই 'ইসর' ও 'আগলাল' বা কুসংস্কারের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করেছিল, সেই মুক্তির বার্তা ও যৌক্তিক চিন্তাধারার আহ্বান আজও যেকোনো যুগ ও সমাজের জন্য সামাজিক ন্যায়বিচার, বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষ এবং মানবিক মর্যাদার এক অকাট্য মানদণ্ড হিসেবে চিরভাস্বর হয়ে আছে।

তথ্যসূত্র:

  1. Saudi academic Marzouk bin Tenbak argues that burial of newborn girls was not a common practice in pre-Islamic Arabia. Does modern academic research show that the negative stereotypes regarding pre-Islamic Arabia were a much later development in Islamic history? - Reddit, accessed March 9, 2026, https://www.reddit.com/r/AcademicQuran/comments/148yo4g/saudi_academic_marzouk_bin_tenbak_argues_that/
  2. Jahiliyyah - Wikipedia, accessed March 9, 2026, https://en.wikipedia.org/wiki/Jahiliyyah
  3. প্রাক ইসলামি যুগে শহরবাসি ও মরুবাসি যাযাবরদের জীবনে আর্থসামাজিক রাজনৈতিক ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অবস্থার প্রভাবসমূহের তুলনামূলক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করো। - Result Checker, accessed March 9, 2026, https://eresultchecker1.files.wordpress.com/2021/07/ssc-islamic-history-1st.pdf
  4. Qur'anic Attitudes to Pre-Islamic Society and Customs - Islam21c, accessed March 9, 2026, https://www.islam21c.com/history/198-quranic-attitudes-to-pre-islamic-society-and-customs/
  5. Al-Āfāq Islamic Research Journal From Jahiliyyah to Justice: Islamic Social Reforms, accessed March 9, 2026, http://alaafaqjournal.com/index.php/alaafaq/article/download/175/105/261
  6. Socioeconomic Analysis of Jahiliyyah Arabia | PDF | Arabian Peninsula | Marriage - Scribd, accessed March 9, 2026, https://www.scribd.com/document/483150653/islamic-project
  7. Blind Following - Quran's Message, accessed March 9, 2026, https://www.quransmessage.com/articles/blind%20following%20FM3.htm
  8. Chapter 6: Validation (Burhan, Bayyina): The Logic of Proof and Evidence 6.1 The Qur'anic Ethos of Verification - KMF Publishers, accessed March 9, 2026, https://kmf-publishers.com/wp-content/uploads/2026/02/Chapter-6.pdf
  9. The Dangers of Blind following (At-Taqleed): Returning to Qur'an and Sunnah, accessed March 9, 2026, https://rafeeqee.com/the-dangers-blind-following/
  10. Following the Forefathers: A Comparative Look at 2:170 and 5:104 - MuslimMatters.org, accessed March 9, 2026, https://muslimmatters.org/2008/09/15/following-the-forefathers-a-comparative-look-at-2170-and-5104/
  11. Logical Challenges in the Quran : r/islam - Reddit, accessed March 9, 2026, https://www.reddit.com/r/islam/comments/16lmj3j/logical_challenges_in_the_quran/
  12. FIKR AND' AQL THINKING AND REASONING - The Quran Blog, accessed March 9, 2026, https://thequranblog.wordpress.com/wp-content/uploads/2008/06/fikr-and-aql.pdf
  13. What Islam Says About Superstition - Thaqlain, accessed March 9, 2026, https://thaqlain.org/what-islam-says-about/superstition/
  14. Conjecture, Knowledge, and Truth in the Quran: A Scientific, Philosophical, and Theological Commentary, accessed March 9, 2026, https://thequran.love/2025/10/08/conjecture-knowledge-and-truth-in-the-quran-ascientific-philosophical-and-theologicalcommentary/
  15. 0812-Fundamentals of Knowledge, Usuul Al Ilm - ISLAMIC MEDICAL EDUCATION RESOURCES-05, accessed March 9, 2026, https://omarkasule-05.tripod.com/id47.html
  16. The Qur'ān and the development of rational thinking - PMC - NIH, accessed March 9, 2026, https://pmc.ncbi.nlm.nih.gov/articles/PMC4374248/
  17. Dirasat, accessed March 9, 2026, https://eservices.ju.edu.jo/HSS/Article/ViewArticle?volume=36&issue=1&articleId=168
  18. Female Infanticide in Pre-Islamic Arab Society: A Quranic and Historical Perspective, accessed March 9, 2026, https://www.researchgate.net/publication/361885912_Female_Infanticide_in_Pre-Islamic_Arab_Society_A_Quranic_and_Historical_Perspective
  19. The Impact of Religious Practices on Shaping Cultural Habits: The Case of Child Sacrifice among the Pre-Islāmic Arabs from the Qur'ānic Perspective - MDPI, accessed March 9, 2026, https://www.mdpi.com/2077-1444/15/8/1019
  20. How Islam Transformed the Arabs. The advent of Islam in the 7th century… | by HowToMuslim | Medium, accessed March 9, 2026, https://medium.com/@howtomuslimnow/how-islam-transformed-the-arabs-c4c8e1672ad0
  21. Essay - Historical Background - Muslim Women's League, accessed March 9, 2026, https://www.mwlusa.org/topics/history/herstory.html
  22. The social customs of the Arabs – I - إسلام ويب, accessed March 9, 2026, https://www.islamweb.net/en/article/152722/the-social-customs-of-the-arabs-%E2%80%93-i
  23. Reform of Mahar Law: An Analysis of the Pre-Islamic Shigar Marriage Tradition | Jurnal Marital: Kajian Hukum Keluarga Islam, accessed March 9, 2026, https://ejurnal.iainpare.ac.id/index.php/marital_hki/article/view/15028
  24. Surah An-Nisa Ayat 22 (4:22 Quran) With Tafsir - My Islam, accessed March 9, 2026, https://myislam.org/surah-an-nisa/ayat-22/
  25. Surah 4: an-Nisa' Ayat 22 - Qur'an Wiki, accessed March 9, 2026, https://www.quran-wiki.com/ayat.php?sura=4&aya=22
  26. Tafsirs for Qur'an 4.22 An Nisa (The women) النساء, accessed March 9, 2026, https://quranx.com/Tafsirs/4.22
  27. Marriage in Islam - Wikipedia, accessed March 9, 2026, https://en.wikipedia.org/wiki/Marriage_in_Islam
  28. Concept of Marriage and Divorce in Pre-Islam Era - EMAANLIBRARY, accessed March 9, 2026, https://www.emaanlibrary.com/wp-content/uploads/2025/04/Concept-of-Marriage-and-Divorce-in-Pre-Islam-Era.pdf
  29. Marriage in the pre-Islamic era - إسلام ويب, accessed March 9, 2026, https://www.islamweb.net/en/fatwa/195983/marriage-in-the-pre-islamic-era
  30. What is the explanation of Quran 4:22-25? - Quora, accessed March 9, 2026, https://www.quora.com/What-is-the-explanation-of-Quran-4-22-25
  31. Fourteenth Greater Sin: Gambling | Greater Sins - Volume 1 | Al ..., accessed March 9, 2026, https://al-islam.org/greater-sins-volume-1-sayyid-abdul-husayn-dastghaib-shirazi/fourteenth-greater-sin-gambling
  32. Why Is Gambling Haram? - Islam Question & Answer, accessed March 9, 2026, https://islamqa.info/en/answers/4013
  33. Practical Implications Of The Prohibition Of Gambling In Islamic Economic Principles - Jurnal UPI, accessed March 9, 2026, https://ejournal.upi.edu/index.php/mimbardik/article/viewFile/81186/30475
  34. Amr ibn Luhay - Wikipedia, accessed March 9, 2026, https://en.wikipedia.org/wiki/Amr_ibn_Luhay
  35. Hadith on Shirk: First man to bring idolatry into Arabia - Faith in Allah, accessed March 9, 2026, https://www.abuaminaelias.com/dailyhadithonline/2021/09/28/first-arab-mushrik/
  36. Verse (5:103) - English Translation - The Quranic Arabic Corpus, accessed March 9, 2026, https://corpus.quran.com/translation.jsp?chapter=5&verse=103
  37. Quran 5:103 in English Compare Multiple Translations | al-Ma'idah 103, accessed March 9, 2026, https://www.quranv.com/en/5/103/
  38. regarding 5:103 and 6:143, 6:144 - Quran's Message, accessed March 9, 2026, http://quransmessage.com/forum/index.php?topic=1635.0
  39. Tafsirs for Qur'an 7.157 Al-A'raaf (The Heights) الأعراف, accessed March 9, 2026, https://quranx.com/Tafsirs/7.157
  40. Superstitions and Myths of the Arabs before Islam – Shia Studies ..., accessed March 9, 2026, https://shiastudies.com/en/2449/superstitions-and-myths-of-the-arabs-before-islam/
  41. Superstition and the Month of Safar - Chicago Hilal, accessed March 9, 2026, https://chicagohilal.org/superstition-and-the-month-of-safar/
  42. Bad Luck, Evil Eyes & The Month of Safar - What's True? - Light Upon Light by IslamiCity - Episode 19, accessed March 9, 2026, https://www.islamicity.org/105406/bad-luck-evil-eyes-the-month-of-safar-whats-true-light-upon-light-by-islamicity-episode-19/
  43. No 'Adwa, nor Haamah, nor Safar - Various Scholars - Islamway, accessed March 9, 2026, https://en.islamway.net/article/42043/no-adwa-nor-haamah-nor-safar
  44. The Month of Safar and Baseless Superstitions - Jamiatul Ulama KZN, accessed March 9, 2026, https://jamiat.org.za/the-month-of-safar-and-baseless-superstitions/
  45. Month of Safar: common superstitions and time related good or bad omen - IslamOnline, accessed March 9, 2026, https://islamonline.net/en/month-of-safar-common-superstitions-and-time-related-good-or-bad-omen/
  46. Nasi' - Wikipedia, accessed March 9, 2026, https://en.wikipedia.org/wiki/Nasi%27
  47. Theories on the origins of the Hijri calendar and al-Nasi' – 1 – Almuslih, accessed March 9, 2026, https://almuslih.org/blog/2023/11/07/theories-on-the-origins-of-hijri-calendar-and-al-nasi-1/
  48. Reflections on Hijrah and the Muslim Calendar | IlmGate, accessed March 9, 2026, https://www.ilmgate.org/reflections-on-hijrah-and-the-muslim-calendar/
  49. Nasi' - Grokipedia, accessed March 9, 2026, https://grokipedia.com/page/Nasi'
  50. On the Origins of the Hijrī Calendar: A Multi-Faceted Perspective Based on the Covenants of the Prophet and Specific Date Verification - MDPI, accessed March 9, 2026, https://www.mdpi.com/2077-1444/12/1/42
  51. Calendars in pre-Islamic Arabia - Wikipedia, accessed March 9, 2026, https://en.wikipedia.org/wiki/Calendars_in_pre-Islamic_Arabia
  52. Surah Al-A'raf 7:152-157 - Towards Understanding the Quran - Islamicstudies.info, accessed March 9, 2026, https://www.islamicstudies.info/tafheem.php?sura=7&verse=157
  53. Tafsir Surah Al-A'raf - 157 - Quran.com, accessed March 9, 2026, https://quran.com/7:157/tafsirs/en-tafsir-maarif-ul-quran
  54. Surah Al-A'raf Ayat 157 (7:157 Quran) With Tafsir - My Islam, accessed March 9, 2026, https://myislam.org/surah-al-araf/ayat-157/
ট্যাগ / কী-ওয়ার্ড:

অন্যান্য প্রবন্ধ

March 9, 2026
কুরআনের আলোকে প্রাক-ইসলামি আরবের কুসংস্কার, সামাজিক প্রথা ও সংস্কার

১. প্রাক-ইসলামি আরবের ঐতিহাসিক ও আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরব উপদ্বীপের সামগ্রিক অবস্থাকে ঐতিহাসিকভাবে 'জাহিলিয়্যাত' বা অন্ধকারের যুগ হিসেবে অভিহিত করা হয়। তবে একাডেমিক দৃষ্টিকোণ থেকে 'জাহিলিয়্যাত' শব্দটি নিছক অক্ষরজ্ঞানহীনতা বা শিক্ষার অভাবকে নির্দেশ করে না; বরং এটি মূলত একটি নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং আধ্যাত্মিক শূন্যতার সমার্থক, যেখানে ঐশী জ্ঞান ও যৌক্তিকতার বদলে কুসংস্কার, গোঁড়ামি […]

March 4, 2026
কুরআন যেভাবে একটি সভ্যতা নির্মাণের গ্রন্থ — ইবনে আশুরের দৃষ্টিকোণ থেকে

ভূমিকা ইসলামিক জ্ঞানচর্চায় কুরআনকে সাধারণত আধ্যাত্মিক বা ধর্মীয় নির্দেশনার গ্রন্থ হিসেবে দেখা হয়। তবে মুসলিম আধুনিক চিন্তাবিদরা, বিশেষ করে টিউনিশিয়ান তাফসিরবিদ মুহাম্মাদ আল-তাহির ইবনে আশুর (Muhammad al-Tahir ibn Ashur), কুরআনকে শুধু আধ্যাত্মিক নৈতিকতা প্রদানের বই নয়, বরং একটি সভ্যতা নির্মাণের পরিকল্পনামূলক নীতি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর তাফসির Tahrir wa al-Tanwir এই দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। […]

March 3, 2026
সূরা আল-বাকারা ২:১১ ও আধুনিক আন্তর্জাতিক রাজনীতি - একটি তুলনামূলক রাজনৈতিক-নৈতিক বিশ্লেষণ

পটভূমি সাম্প্রতিক সময়ে ইজরায়েল ও আমেরিকা পরিচালিত ইরানের উপরে ২৮ ফেব্রুয়ারীর যৌথ আক্রমন আমাদের সূরা বাকারার ২:১১ নাম্বার আয়াতকে পুন:পাঠ করতে অনুপ্রাণিত করে। ওয়া = আর। ইযা কীলা = যখন বলা হয়। লাহুম = তাদের উদ্দেশ্যে। লা তুফসিদু = তোমরা ফাসাদ/ বিপর্যয় সৃষ্টি/ অশান্তি সৃষ্টি করো না। ফিল আরদি = পৃথিবীতে। ক্বলূ = তারা বলে। […]

March 3, 2026
ইবনে আশুরের “তাহরির ওয়া আল-তানভীর” বইয়ের রিভিউ

ভূমিকা ইবনে আশুর (১৮৭৯–১৯৭৩) ছিলেন টিউনিশিয়ার একজন বিশিষ্ট ইসলামিক চিন্তাবিদ। তিনি কুরআনের আধুনিক ও প্রায় সমন্বিত ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন তাহরির ওয়া আল-তানভীর (Tahrir wa al-Tanwir)–এ। প্রচলিত তাফসিরগুলো সাধারণত কেবল আইন (ফিকহ) বা ভাষাগত ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে। কিন্তু ইবনে আশুর দেখিয়েছেন কুরআন শুধু আধ্যাত্মিক নির্দেশনার বই নয়, বরং এটি একটি সভ্যতা গড়ার নীতি গ্রন্থ। তার […]

December 12, 2025
জিব্রাইল / গ্যাব্রিয়েল অর্থ কি? কোরআন থেকে বিশ্লেষণ

কুরআন গবেষক ড. সিরাজ ইসলামের গবেষণা ও লেখনী থেকে অনুবাদ জিব্রাইল হলেন আমাদের ভেতরে অনুপ্রেরণার শক্তি জিব্রাইল হলেন একটি কুরআনের রূপক (নোট ১) যা আমাদের মনের ভেতরে অনুপ্রেরণার প্রাকৃতিক শক্তিকে প্রতিনিধিত্ব করে। আমাদের গভীর চিন্তাভাবনার সময় এটি কার্যকর হয়ে ওঠে যখন এটি আমাদের কাছে সচেতনতা এবং অন্তর্দৃষ্টির ঝলক প্রকাশ করে। কুরআনে এই নামটি তিনবার এসেছে […]

June 7, 2025
শেষ জামানা সম্পর্কে কুরআন কি বলে?

শেষ জামানা বা আখিরুজ্জামান সম্পর্কে কুরআনে কি বলে? বিস্তারিত জানাচ্ছেন একজন কুরআনের স্কলার

May 30, 2025
প্রচলিত কুরবানি: কুরআন থেকে পর্যালোচনা

প্রচলিত কুরবানিকে যদি আমরা কুরআন থেকে পর্যালোচনা করি, তাহলে কি পাই?

May 16, 2025
Explaining the Qur'an through the Qur'an

Introductory presentation for a series applying the intratextual approach to the exegesis of Surat al-An'am, here on CASQI's channel.