দি  ইন্সটিটিউট ফর কুরআনিক রিসার্চ এন্ড এ্যাপ্লিকেশন (ইক্বরা)

লক্ষ্য

ইক্বরার লক্ষ্য হলো বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য স্রষ্টার ঐশী বাণীর সমন্বিত অধ্যয়ন ও সার্বজনীন প্রয়োগের জন্য জ্ঞানদীপ্ত অনুশীলন।

উদ্দেশ্য

ইক্বরার উদ্দেশ্য হলো কুরআনের বাণীর উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ অনুধাবনের জন্য টেকসই ভিত্তি প্রস্তুত করা এবং জীবন ও সমাজের প্রায়োগিকতার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞানভিত্তিক ফ্রেমওয়ার্ক বা কাঠামো নির্মাণ।

প্রকাশিত বইসমূহ

কোরআনে মহাবিশ্ব ও বিজ্ঞানের চমক: ১৪০০ বছর আগের যে বাণী আজ প্রমাণিত

কোরআনের বৈজ্ঞানিক ও গাণিতিক অলৌকিকতা: গাজী রাকায়েতের ইসলামে ফেরার কাহিনী

কোরআনের ভুল খুঁজতে গিয়ে কেন কাঁদলেন ২৮টি জাতীয় পুরস্কারজয়ী পরিচালক?

ভাবুন তো, একজন মানুষ পবিত্র কোরআনের বৈজ্ঞানিক ভুল (Scientific error) ধরার জন্য পড়া শুরু করলেন, কিন্তু শেষমেশ এর গাণিতিক নিখুঁত গাঁথুনি আর বৈজ্ঞানিক নিদর্শন দেখে নিজেই বিস্মিত হয়ে গেলেন! হ্যাঁ, ঠিক এমন একটি অবিশ্বাস্য ঘটনার কথাই সম্প্রতি আমার সামনে এসেছে।

তথ্যপ্রযুক্তি এবং গবেষণাধর্মী বিষয় নিয়ে কাজ করার সুবাদে বিভিন্ন বিশ্লেষণমূলক আলোচনা আমাকে সবসময়ই টানে। সম্প্রতি ইউটিউবে "Perspective Podcast with Yahia Amin"-এর একটি পর্ব দেখছিলাম। সেখানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক এবং ২৮টি জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব—গাজী রাকায়েত। একজন যুক্তিবাদী মানুষ হিসেবে আমি যখন তাঁর গল্পটি শুনছিলাম, আমার নিজের দৃষ্টিকোণ থেকেই ধর্ম এবং বিজ্ঞানের মেলবন্ধনের এক নতুন উপলব্ধি তৈরি হলো।

একসময়কার চরম বিজ্ঞানমনস্ক নাস্তিকতা থেকে ফিরে এসে তিনি কীভাবে কোরআনের সূরা, আয়াত এবং পবিত্র কাবার 'গোল্ডেন রেশিও' (১.৬১৮)-এর গাণিতিক অলৌকিকতায় (Mathematical Miracles) মুগ্ধ হয়েছেন, সেই গল্প সত্যিই শিহরণ জাগানোর মতো। আজকের এই ব্লগ পোস্টে আমি আপনাদের সাথে শেয়ার করব, কীভাবে ১৪০০ বছর আগের এক ঐশী বাণী আধুনিক বিজ্ঞান ও গণিতের মাপকাঠিতে এক বিস্ময়কর চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে এবং সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে একজন যুক্তিবাদী মানুষের জীবন।

চলুন, কোরআনের গাণিতিক ও বৈজ্ঞানিক রহস্যের সেই গভীরে ডুব দেওয়া যাক!

বিস্তারিত আলোচনার সারসংক্ষেপ:

  • [00:00:00] সূচনা ও ধর্ম থেকে দূরে সরে যাওয়া: গাজী রাকায়েত জানান যে, একসময় তিনি কোরআনের বৈজ্ঞানিক ভুল খুঁজতে গিয়ে এর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছিলেন। বুয়েটে পড়ার সময় এক আত্মীয়ের মৃত্যুতে মৃত্যুভয় তাকে পেয়ে বসে। স্টিফেন হকিং ও আইনস্টাইনের বই পড়ে তিনি ধর্মের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে নাস্তিকতায় ঝুঁকে পড়েন এবং জায়নামাজ ফেলে দেন।
  • [00:09:01] নাটক ও অভিনয় জগতে প্রবেশ: মানসিক শান্তির খোঁজে এবং বিষণ্ণতা কাটাতে তিনি নাট্যজগতে প্রবেশ করেন। এ সময় তিনি ধর্মবিরোধী লেখালেখি এবং আড্ডায় সময় কাটাতেন।
  • [00:12:50] কোরআন অনুবাদের খোঁজ: ২০০৬-০৭ সালের দিকে বন্ধুদের সাথে আড্ডায় তার মনে প্রশ্ন জাগে যে তিনি জীবনে অনেক বই পড়লেও কোরআন পড়েননি। এরপর তিনি বিচারপতি হাবিবুর রহমানের করা কোরআনের একটি ভালো বাংলা অনুবাদ সংগ্রহ করেন।
  • [00:15:35] পুনরায় ইসলামে ফেরা: কোরআনের সূরা হিজর-এর ২৬, ২৮ ও ২৯ নম্বর আয়াত পড়তে গিয়ে তিনি গভীরভাবে প্রভাবিত হন। বিশেষ করে আল্লাহ যখন বলেন মানুষের দেহে "আমার রুহ" ফুঁকে দেওয়া হবে, এই "আমার" শব্দটি তাকে আবার মুসলিম হতে সাহায্য করে।
  • [00:17:54] সূরা মায়েদার ৩২ নম্বর আয়াতের প্রভাব: বিবিসি-তে এক ধর্মান্তরিত ফায়ার ফাইটারের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তিনি সূরা মায়েদার এই আয়াতটি সম্পর্কে জানেন—"কেউ যদি একটি মানুষের প্রাণ রক্ষা করে, তবে সে যেন সমগ্র মানবজাতির প্রাণ রক্ষা করলো।" এই বাণী তাকে অবাক করে।
  • [00:22:15] কোরআন ও আধুনিক বিজ্ঞান: তিনি বিগ ব্যাং থিওরি, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ ও সংকোচন (Black hole) এবং সূরা আম্বিয়ার আয়াতগুলোর মাঝে অবিশ্বাস্য মিল খুঁজে পান।
  • [00:29:08] গ্রহ-নক্ষত্রের কক্ষপথের ধারণা: হাবল টেলিস্কোপ আবিষ্কারের আগে বিজ্ঞানীরা জানতেন না যে সূর্যেরও কক্ষপথ আছে। কিন্তু ১৪০০ বছর আগে কোরআনে সূর্য ও চন্দ্রের নিজস্ব কক্ষপথে বিচরণ করার কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকাটা তার চোখ খুলে দেয়।
  • [00:35:36] কোরআনের গাণিতিক অলৌকিকতা (Mathematical Miracles): করোনা মহামারীর সময় তিনি কোরআনের গাণিতিক কাঠামো নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। সূরা ফাতিহায় ৭ সংখ্যাটির গুরুত্ব, ১৯ জন ফেরেশতার কথা এবং কোরআনে 'গোল্ডেন রেশিও' (১.৬১৮) এর নিখুঁত ব্যবহার তাকে মুগ্ধ করে।
  • [00:43:03] কাবার পরিমাপ ও কোরআন: তিনি জানান, কাবা ঘরের চারপাশের আলাদা আলাদা পরিমাপগুলো যোগ করলে ঠিক ১১৪ হয়, যা কোরআনের মোট সূরার সংখ্যার সমান।
  • [00:46:00] গাণিতিক গবেষণার স্বপ্ন ও চ্যালেঞ্জ: তার একটি স্বপ্ন হলো কোরআন ও কাবার গাণিতিক গঠন নিয়ে একটি গবেষণা কেন্দ্র খোলা। তিনি বিশ্বের শ্রেষ্ঠ গণিতবিদদের এই নিখুঁত গাণিতিক কাঠামো যাচাই করে দেখার চ্যালেঞ্জ জানান।
  • [00:48:19] সূরা আল হাদিদ এবং লোহা: বিজ্ঞানে লোহার পারমাণবিক সংখ্যা (Atomic number) হলো ২৬। তিনি ব্যাখ্যা করেন কীভাবে সূরা আল হাদিদ (কোরআনের ৫৭ নম্বর সূরা) এবং এর আরবি শব্দের গাণিতিক মান (Abjad value) লোহার পারমাণবিক সংখ্যা ও আইসোটোপের সাথে হুবহু মিলে যায়।
  • [01:03:47] অর্থ বুঝে কোরআন ও নামাজ পড়ার গুরুত্ব: তিনি শুধু সুর করে আরবি না পড়ে, মাতৃভাষায় কোরআনের অর্থ বুঝে নামাজ আদায়ের পরামর্শ দেন। সূরা ফাতিহার অর্থ গভীরভাবে অনুধাবনের মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার সাথে সঠিক কথোপকথন (conversation) সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
  • [01:08:01] সূরা কাহাফ থেকে অহংকার ত্যাগের শিক্ষা: তিনি সূরা কাহাফে বর্ণিত দুই বাগানওয়ালার গল্পটি আবৃত্তি করে শোনান, যেখানে অহংকারের পতনের কথা বলা হয়েছে।
  • [01:14:57] উপসংহার: সর্বশেষে তিনি কোরআনের একটি আয়াতের উদ্ধৃতি দেন, যেখানে বলা হয়েছে—বিপদে হতাশ না হতে এবং সুখের সময় অহংকারী না হতে, কারণ আল্লাহ অহংকারীকে পছন্দ করেন না।

সম্পূর্ণ ট্রান্সক্রিপ্ট

আপনার দেওয়া দীর্ঘ টেক্সটটিতে বিরামচিহ্ন (Punctuation) যোগ করে এবং যৌক্তিকভাবে প্যারাগ্রাফে ভাগ করে নিচে দেওয়া হলো:


আমি কোরআনের সাইন্টিফিক এরর ধরতে গিয়ে কোরআনের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছি। আমি টিচার হতে চেয়েছিলাম বুয়েটে; আমার অনার্স মাইসের মত মার্ক ছিল। কিন্তু আমি ছিটকে পড়ে যাই। আমার একটি ক্ষোভ জন্মে সৃষ্টিকর্তার উপরে, ধর্মের উপরে এবং আমি জায়নামাজ ফেলে দিই। এটা হয়েছিল একটা মৃত্যু যন্ত্রণা থেকে। ডেথ থটস চিন্তা করে। আমার একটা ভাগ্নে মারা গিয়েছিল। তখন মনে হলো— আল্লাহ তুমি আমাকে সৃষ্টি করছো, আমি কেন মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যাব? আমি তোমারে বলছি সৃষ্টি করতে?

আইনস্টাইন তখন আমার পড়া হয়েছে, থিওরি অফ রিলেটিভিটি পড়া হয়েছে। আমার স্টিফেন হকিংস পড়া শেষ। আমি পুরোপুরি একজন অ্যাথিস্ট (নাস্তিক) হয়ে গেলাম। আমার বাবা মুসলিম, আমার এনভায়রনমেন্ট মুসলিম, আমার দাদী নামাজ পড়ে, আমার নানা নামাজ পড়ে, তারপরও আমি ইসলামকে পালন করি না। মুসলমান হিসেবে আমার কী অধিকার আছে? কিন্তু আমি তো কিচ্ছু জানিনা! তোমাকে আমি চাইলে তো আল্লাহরে দেখাইতে পারব না যে আল্লাহ আছে। এই কারণে তুমি বলো আল্লাহ নাই? তো তুমি কোন জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে বলো আল্লাহ নাই? কত জ্ঞানী তুমি? তুমি যতই পণ্ডিত হও, ৯৯ পর্যন্ত করবা কিন্তু তুমি ১০০ হবে না।

বিশ্বাস করবেন, এই ‘এক’ হচ্ছে আল্লাহ! এই ‘এক’ আমাকে ১০০ দিবে। যেদিন থেকে এই এক-কে আমি স্বীকার করেছি, সেদিন থেকে আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাকে সব দিয়ে দিয়েছেন। এত সম্মান! আর কত? ইসলাম এসেছে শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, মানুষের জন্য। আমাদের কোরআনে যে ২৮টা অ্যালফাবেট আছে, প্রত্যেকটা অ্যালফাবেটের একটা রিপ্লেসিং নাম্বার আছে; আল্লাহ এটাকে প্রফেসি নাম্বার বলে। যদি কোরআনের মত কোরআন আনার জন্য মানুষ ও জীন একযুগে চেষ্টা করে, তবুও তারা এর মত আনতে পারবে না। আল্লাহ কয়, তুই কত বড় ম্যাথমেটিশিয়ান তুই আমারে বলবি? আমি ১৫ দিন নিজে মাধবী এইটা বানাইতে চাইছিলাম, আমি ১৫ দিনের দিন অসুস্থ হয়ে গেছি! এইটা মানুষের পক্ষে করা সম্ভব না।

সূর্যের কক্ষপথ আছে কিনা সেটা মাত্র ডিসকভার হইছে হাবল টেলিস্কোপ আবিষ্কার হওয়ার পর। তাহলে ১৪০০ বছর আগে কীভাবে কোরআনে বলে যে, "আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন রাত্রি ও দিন এবং সূর্য ও চন্দ্রকে; প্রত্যেকে নিজ নিজ কক্ষপথে বিচরণ করে।" আল্লাহ একটা জায়গায় বলছেন, "পৃথিবীতে বা ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের যে বিপদ আপদ ঘটে তা লেখার পূর্বেই তা লেখা হয়। এজন্য যে তোমরা যা হারিয়েছ তার জন্য বিমর্ষ না হও। আর যা তিনি দিয়েছেন তার জন্য খুশিতে উল্লসিত না হও। আল্লাহ ভালোবাসেন না উদ্ধত অহংকারীকে।"

মানে পৃথিবীর এমন কোন বই আছে, যে বই এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে নাম্বারগুলো, অক্ষরগুলো এদিক-ওদিক করার কোন সম্ভাবনা নাই? এটা কোন মানুষের কাজ না। আমি চ্যালেঞ্জ করছি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ম্যাথমেটিশিয়ানদের, "ইউ কাম টু মি।" আমি তোমার সাথে ম্যাথমেটিক্যালি বসতে চাই। কীভাবে একটি কোরআন এত সুন্দর ম্যাথমেটিক্যালি একটা মানুষ তৈরি করতে পারে কিনা, আমি চ্যালেঞ্জ করলাম।

উপস্থাপক: আসসালামু আলাইকুম গাজী রাকায়েত ভাই, কেমন আছেন?

গাজী রাকায়েত: মাশাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ অনেক ভালো আছি।

উপস্থাপক: আলহামদুলিল্লাহ। ভাইয়া আপনি ২৮ টা জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন।

গাজী রাকায়েত: আলহামদুলিল্লাহ। আমার দুটো ছবি মিলে এবং অস্কারের রিমাইন্ডার লিস্টে গিয়েছে। হলিউডে আপনার চলচ্চিত্র এক্সেপ্টেড হয়েছে কমার্শিয়ালি।

উপস্থাপক: চলচ্চিত্র জগতে আপনি একজন উজ্জ্বল তারকা বাংলাদেশে। সেখানে শিল্পী বা শিল্প জগৎ সম্পর্কে মানুষের যেটা ধারণা যে, কোরআন তাদেরকে আকর্ষণ করে না, তাহলে ইসলাম থেকে তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে অথবা আগ্রহ নাই। সেখানে ইসলাম এবং কোরআন আপনাকে কেন এই বয়সে এসে, এখন আপনার ৬০ বছর বয়স, আপনাকে কোরআন এত বিস্মিত করে বা আগ্রহী করে তুললো?

গাজী রাকায়েত: প্রথমে বলি, আল্লাহ যা চেয়েছেন তাই হয়েছে। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোন শক্তি নাই। আমার যা প্রাপ্তি সেটা… আমি তো একজন প্রকৌশলী এবং আমি এই বয়সে এসে কোরআন আমাকে অ্যাট্রাক্ট করেছে এটা আমি বলবো না। আমাকে কোরআন অ্যাট্রাক্ট করেছে, আমি যদি বলি তাহলে ২০০২ থেকে শুরু হয়েছে প্রক্রিয়াটা। ২০০২ থেকে প্রক্রিয়াটা শুরু হয়েছে। কিন্তু এটা ওয়ার্ক করা শুরু করেছে ২০০৫-০৬ এরকম সময়ে। আমি এক্সাক্টলি মনে করতে পারছি না।

আমি কোরআনের সাইন্টিফিক এরর (বৈজ্ঞানিক ভুল) ধরতে গিয়ে কোরআনের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছি। আমি আসলে মনে করি আমি তৈরি হইনি। আজকে আমি আপনার সামনে এসেছি তৈরি হয়ে। আমি মনে করেছি এখন আমার কথা বলার সময় এসেছে। আমি এখন কথা বলতে পারি। তাই না? তো আপনি যেটা বললেন যে আসলে শিল্পী যারা, যারা এত সুন্দর সুন্দর কাজ করে, যাদের মনটা এত সুন্দর— তার সাথে তো এই মহান শিল্পী সৃষ্টিকর্তারই ভালো সম্পর্ক থাকার কথা ছিল। কিন্তু অথচ উল্টো হয়েছে আর কি, তাই না?

তো আমি আসলে সত্যিকার অর্থে একটি মুসলমান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছি। আমার বাবা ৬৪ বছর বয়সে মারা গিয়েছেন, উনি নামাজ পড়তেন পাঁচ ওয়াক্ত এবং আমি একটি মুসলিম ঘরে জন্ম নেওয়ার পরে আমি অংকে সবসময় খুব কাঁচা ছিলাম। মানে উদাসীন ছিলাম। ক্লাস সেভেনে অংক পাঁচও পেয়েছি, কিন্তু ক্লাস এইটে গিয়ে মিরাকল— আমি অংকতে ৮৪ পেয়ে যাই। আমি স্কুলে ফার্স্ট হয়ে যাই। এই যে আমার অংক, আমার খুব প্রিয় একটি সাবজেক্ট। তো যে কারণে আমি পড়ালেখায়, আমি খুব ছোটবেলাতেই খুব পারফরমেন্স টেন্ডেন্সি ছিল আমার। পড়ালেখা থেকে ঝোঁক ছিল না।

আমি পড়ালেখায় মনোনিবেশ করলাম। করার পরে যেটা হলো— আমি স্কুলে ফার্স্ট হলাম। ম্যাট্রিকে পাঁচটা লেটার নিয়ে ফার্স্ট ডিভিশন পেলাম। আমি নটরডেম কলেজে চান্স পেলাম। আমি চিটাগাং মেডিকেল কলেজে ভর্তি হলাম। আমি বুয়েটে মেরিট লিস্টে ছিলাম, আমি ঢুকলাম এবং আমি প্রচুর পড়ালেখা করছিলাম। পড়ুয়া ছিলাম, পড়তাম কিন্তু নামাজ পড়তাম, রোজা রাখতাম, মসজিদে দিতাম। এটা আমার বাই বর্ন একটা ঘটনা ঘটেছে।

কিন্তু ঘটনাটা ঘটে যায় বুয়েটের একটা প্রিপারেটরি লিভে, পরীক্ষার তিনদিন আগে। আমার একটি দর্শন, একটি চিন্তা আমাকে লন্ডভন্ড করে দেয়। এরপর থেকে আমি টিচার হতে চেয়েছিলাম বুয়েটে, আমার অনার্স ম্যাথসের মত মার্ক ছিল; আমি ছিটকে পড়ে যাই। এবং আমার একটি ক্ষোভ জন্মে সৃষ্টিকর্তার উপরে, ধর্মের উপরে। এবং আমি জায়নামাজ ফেলে দিই, নামাজ থেকে দূরে সরে যাই, ধর্ম থেকে দূরে সরে যাই।

এটা হয়েছিল একটা মৃত্যু যন্ত্রণা থেকে, মৃত্যু বা ডেথ থটস চিন্তা করে। আমার একটা ভাগ্নে মারা গিয়েছিল তো ব্রেন টিউমারে, রাত্রে হঠাৎ একটা থটস আমার মাথার মধ্যে কাজ করে সেখান থেকেই যে— এই যে আমি-আপনি বসে আছি, বর্তমানটাই তো আসল। জাস্ট আই থিঙ্ক আই এম টেকিং ব্রেথ। এইযে ব্রেথটা নিচ্ছি এটাই হলো আসল। কালকে আমি কী দিয়ে ভাত খেয়েছি? ইলিশ মাছ দিয়ে খেয়েছি না মাংস দিয়ে? অস্কারে আমার পুরস্কার পেয়েছি, আমি ২০টা জাতীয় পুরস্কার পেয়েছি, কী ছিলাম? ইট ডাজন্ট ম্যাটার। ম্যাটার ইজ আই এম টেকিং ব্রেথ। ডেথ উইল কাম। আই এম টেকিং দ্য টেস্ট অফ ডেথ।

কষ্ট, মৃত্যুর যে যন্ত্রণা, ছোটবেলা থেকে যা শুনে আসছি ইমামদের মুখে মসজিদে, সবার কাছে ডেড বডি দেখে, আমার তখন মাথার মধ্যে ঢুকে গেল। এই অল্প বয়সের একটি ছোট্ট বাচ্চা, তার মাথার মধ্যে ঢুকে গেল— এত যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে আমি যাব কেন? আল্লাহ তুমি আমাকে সৃষ্টি করছো কেন? অ্যাডাম গন্ধম ফল খাইছে, তাতে আমার কী? আমি কেন মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যাব? আমি তোমারে বলছি সৃষ্টি করতে?

এই যে ফিলোসফিটা, ডে আফটার ডে, ডে আফটার ডে… আর চারিদিকে নানা মানে কী বলব, ধর্ম কিন্তু আমাদের একটা শিক্ষিত মানুষের হাতে… আমি যদি বলি ধর্মের গ্রাজুয়েশন লেভেলটা হচ্ছে ইসলাম। তো আপনি যদি গ্রাজুয়েট না করে হুট করে ক্লাস ফাইভে পড়ে যদি আপনি গ্রাজুয়েশনের অংক করতে বসেন, আপনি পারবেন না। ইসলামকে বুঝতে গেলে, ইসলাম যেই ধর্ম, কোরআনকে বুঝতে গেলে যেটা দরকার, যে শিক্ষাটা দরকার, সে শিক্ষাটা ছাড়া যদি ওটা নিয়ে কেউ নাড়াচাড়া শুরু করে সে কিন্তু মিসগাইড করবে।

তো এই ধরনের মিসগাইডের কারণেই নানা প্রশ্ন আমাকে শুরু করলো। আমার আইনস্টাইন তখন পড়া হয়েছে, থিওরি অফ রিলেটিভিটি পড়া, আমার স্টিফেন হকিংস পড়া। আমি পুরোপুরি একজন অ্যাথিস্ট হয়ে গেলাম। আই ডোন্ট বিলিভ। মানে আই ডোন্ট বিলিভ এনিথিং। এবং আমার সাথে একটা সৃষ্টিকর্তার একটা যুদ্ধের মত হলো যে, আমি তোমাকে… তুমি এটুকু ইচ্ছা করলে তুমি আমাকে সৃষ্টি করতে পারো না। আই ওয়াজ টোটালি আউট অফ রিলিজন। কিন্তু আমাকে, আমার অসুস্থ হয়ে যাচ্ছিলাম। আমার মানসিক স্বাস্থ্যটা যেহেতু জীবনে কোন আনন্দ নাই, হাসি নাই, আমি একদম একটা ভিন্ন জগতে যাচ্ছি।

তখন তো অনেকে ধর্মকর্ম বেশি করে, অনেকে পাগল হয়ে যায়। ওই সময় নাটক আমাকে বাঁচালো। নাটক আমাকে… জীবনটা তো একটা খেলা, আমরা সবাই খেলছি। ও আমাকে আবার একটা খেলার মধ্যে ঢুকায় দিল। আমি নাটক নাটক খেললাম। যেটা আমাদের একটা অ্যাবসার্ড নাটক বলে একটা নাটক আছে, সেখানে সবসময় একটা খেলা থাকে। খেলা শুরু করলাম। ভুলতে থাকলাম সেই সত্যটাকে। আর যত অ্যান্টি-ইসলাম, অ্যান্টি-ধর্ম বিষয় নিয়ে আমি লেখালেখিগুলোর মধ্যে ছিলাম।

প্রিয় ছিল আমার অনেকেই। যেমন আমাদের কোন এক অধ্যাপক বলেছিলেন, আস্তিক আর নাস্তিকের মধ্যে পার্থক্য কী? একটা ছেলে প্রশ্ন করেছিল, তখন সে অধ্যাপক বলেছিল পার্থক্য একই। কিরকম স্যার? পৃথিবীতে যদি ২০০টা ধর্ম থাকে ধরেন কথার কথা। তাহলে ৯৯টা বাদ দিয়ে আপনি ইসলাম গ্রহণ করবেন। আর যে নাস্তিক সে ২০০টা বাদ দিছে। আর যে ধার্মিক সে ১৯৯টা বাদ দিছে। পার্থক্য একের। এই ধরনের কথা কিন্তু একজন প্রফেসর যখন ছাত্রদের বলে, তখন এটা খুব দ্রুত স্প্রেড করে।

কিন্তু এখন আমি এটার অ্যানসার দিচ্ছি। ইসলাম একটা ধর্মনিরপেক্ষ ধর্ম। সব ধর্মকে ইনক্লুড করেছে ইসলাম। আমাদের আদি থেকে আমরা মাত্র ২৫ জন রসূলের নাম জানি কোরআনে। তাই না? কিন্তু এক লাখের উপরে আমি জানি যে পয়গম্বর আসছেন। তাদের আল্লাহ তো উল্লেখ করেন নাই। প্রত্যেকের আলাদা একটা ল্যাঙ্গুয়েজ ছিল। ইসলাম সবকিছুকেই তো ইনক্লুড করেছে। তো উনার কথাটা ঠিক না। আমি তো মনে করি ২০০ না, ইসলামের সাথে পার্থক্য ধর্মের ১৯৯।

এরকম মিসলিডিং কনসেপ্ট যেমন স্টিফেন হকিংসের বইতে একটা আছে। অগাস্টাইন নামে একজন বিখ্যাত, আমাদের গবেষক ম্যাথমেটিশিয়ান বলি বা ফিজিশিয়ান বলি। যারা জ্ঞানী লোক তারা তো একটু কম কথা বলে। তার শিষ্যরা অনেক বেশি পণ্ডিতি করে। আর তো উনি চুপচাপ কাজ করছিল, কোন কথা বলছে না। যেহেতু সে বিলিভার না, তাকে শুনিয়ে শুনিয়ে তারা রঙ্গ করছেন তার শিষ্যরা। একটা এভাবেই আছে, একজনকে আরেকজনকে প্রশ্ন করছে। প্রশ্নটা আমার মধ্যে এসে গেল— "হোয়াট ওয়াজ গড ডুইং বিফোর বিল্ডিং দ্য ইউনিভার্স?"

দেখেন, এই ধরনের মিসলিডিং একের পর এক। তো কোন একদিন আমার বড় সিনিয়র ভাইদের সাথে আড্ডায় আমি বসেছিলাম। এবং সবাই মোহাম্মদ (সা.) কয়টা বিয়ে করেছে এটা নিয়ে চিন্তিত। তো আমিও মজা করছি। তো হঠাৎ আমার প্রশ্ন হলো, "এই রাকায়েত, তুমি জীবনে এত বই পড়ছো, একটা বই কি পড়ছো তুমি? কোরআনটা জীবনে কোনদিন পড়ছো?" আর আমি না, আবাহনী-মোহামেডানের সবাই সাপোর্ট করে আমি যাই ব্রাদার্স ইউনিয়নে। মানে আমার সবাই যেদিকে যায় আমার ভাবটা উল্টা দিকে।

এই যে তারাবির নামাজ পড়ি, এই প্রশ্নগুলো আসা শুরু করলো। তারাবির নামাজ পড়ি দুই ঘণ্টা ধরে হুজুরের পিছনে, একটা ওয়ার্ডও বুঝিনা। মানে কী? আমার কাছে মনে হলো যে আমি কোরআনটা আরবি পড়ে গেলাম তাই না? আল্লাহর বাণী বুঝি বা না বুঝি ওইটা পড়ার মধ্যে তো ওটা শুনলেও কানের আল্লাহর এবাদত হয়, ওটার ই হয় সেটা আলাদা হিসাব। কিন্তু এটা একটা মেসেজ। ৬২৩৬ টা আয়াত আছে। প্রত্যেকটা আয়াত একটা বাণী। আমি কোন ল্যাঙ্গুয়েজে তার চেয়ে বড় কথা মূল বাণীটা তো আমি আগে বুঝি। তার কারণে যেটা হলো, আমার হঠাৎ করে মনে হলো আমার মোহাম্মদপুর ইসলামিয়া লাইব্রেরিতে গেলাম। টকিং অ্যাবাউট ২০০৬-০৭ এরকম। একটা ভাই, "আপনাকে, আমাকে একটু অনুবাদ দিবেন। একদম বাংলা, খুব ভালো শুধু বাংলা, আরবি থাকবে না, আছে?"

বিচারপতি হাবিবুর রহমানের, আমাদের জাস্টিস উনি, তো উনার একটা... তাই নাকি! আমি শুনেছি "কোরআন সূত্র" নামে একটি বই ট্রান্সলেট করেছেন। কারণ উনি তো রবীন্দ্রনাথ এক্সপার্ট, শেক্সপিয়ার এক্সপার্ট। উনার অনুবাদটা অনেকটা নিয়ার টু হতে পারে। এই বইটা নিয়ে আসলাম, খুব সুন্দর অনুবাদ। তো আমি তো কোরআনের সাইন্টিফিক এরর ধরার জন্য আসলাম। বইটা নিয়ে আসলাম। ওযু-টুযু করি না। নবম দিন আমি ওযু করলাম। আমার ভিতরে একটু ভয়ের সঞ্চার হলো পড়তে পড়তে।

স্টার্টিং, যে দুটো আয়াত আমাকে আবার মুসলমান করল। আমি জন্মগ্রহণ করেছিলাম মুসলমান হিসেবে, বিকজ মাই ফাদার ওয়াজ মুসলিম, আই এম এ মুসলিম। এইটা কোন কাজের কাজ না। আত্মসমর্পণকারী! বরঞ্চ আমাদের পানিশমেন্টটা অন্যদের চেয়ে আরো বেশি হবে। কারণ আমার এত কাছে থাইকাও আমরা ইসলামকে ঠিকমত পালন করি না। মানে এই যে যারা নিজেদেরকে মুসলমান বইলা মনে করতেছি— ওরা হিন্দু, ওরা খ্রিস্টান, আর আমরা মনে করতেছি আল্লাহ শুধু আমার! আমার ধর্মের হালটা তো সবার, তাই না?

আমি মুসলমান, কী অধিকার আমার? কিন্তু আমি তো কিচ্ছু জানিনা। আমি আমার বাবা মুসলিম, আমার এনভায়রনমেন্ট মুসলিম, আমার দাদি নামাজ পড়ে, আমার নানা নামাজ পড়ে, তারপরেও আমি পালন করি না ইসলামকে। আর যে লোকটা কিছুই জানে না, একটা সনাতনী ধর্মে বা অন্য কোন ধর্মে জন্ম করেছে, ওর তো আমার চেয়ে বেটার অবস্থা হবে। কারণ ওর কাছে এটা... আমি এত কিছু পার করি না, এই ধর্মের কোন ভ্যালু নাই।

তো যাই হোক, যে দুটো আয়াত আমাকে আবার মুসলমান করেছে, তখন আমার বয়স প্রায় ৩৮ ইয়ার্স ওল্ড। আসলে ৪০ বছরটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের কোরআনেও কয়েকটা আয়াত আছে— "যখন তুমি ৪০ বছর পৌঁছবে তখন..." এই গল্প মানে ৪০ বছরেই কিন্তু নবী আমাদের নবুয়ত প্রাপ্ত হয়েছেন। আমাদের যে অ্যানিমেল বডিটা এটা নানা রকম করবে, কিন্তু ৪০ বছরে এসে তার ভিতরে অনেক কিছু তৈরি হয়। আবার অনেকের হয় না। আমি ৩৮ বছর বয়সে এসে আমার মনে হয়েছে আমি ধরতে পেরেছি।

তো আমি দুইটা আয়াত একটু বলতে চাই। একটি আয়াত হচ্ছে সূরা আল হিজরের ২৬, ২৮, ২৯— এ পর্যন্ত আয়াত। আমি একটু আয়াতটা পড়ি:

"আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম। বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। আমি তো ছাঁচের ঢালা শুকন ঠনঠনে মাটি থেকে মানুষ সৃষ্টি করেছি। এর আগে গরম বাতাসের ভাপ থেকে জীন সৃষ্টি করেছি। আমি যখন তাকে সুঠাম করব আর তার দেহে আমার রুহ বা প্রাণ সঞ্চার করব, তখন তোমরা তাকে সেজদা করবে।"

আদমের কথা বলা হচ্ছে। সেখানে কিন্তু বলা হচ্ছে, "যখন আমি তাকে সুঠাম করব, তার দেহে আমার রুহু বা প্রাণ সঞ্চার করব, তখন তোমরা তাকে সেজদা করবে।" আমি না, ওই "আমার" শব্দটা পেয়ে... আমরা সুফিবাদী মানুষ বিশ্বাস করি আল্লাহ এখানে আছে। ওই "আমার" শব্দটা আমাকে নাড়িয়ে দিল। কী বলে আল্লাহ! তার নিজের রুহ সঞ্চালিত করেছেন। প্রত্যেকটা কোরআনে ঘুরে দেখি "আমার" টা আছে। এই "আমার" প্রথম।

আর আমি খুব তখন বিবিসি দেখতাম, একটু বলেই নেই। ইসলামকে বা ধর্মকে অস্বীকার করা এক ধরনের সাইন অফ ইন্টেলেকচুয়ালিজম, তাই না? কিছু লোক আছে যারা জ্ঞানের মাধ্যমে অস্বীকার করে, আমি তাদেরকে কিন্তু এক কথাতে ভালোই বলি। কিন্তু তাদেরকে অনুসরণকারী একটা শ্রেণী আছে, যেটা ওইটাকে ফলো করে যে— "আল্লাহকে মানি না, আমি অনেক জ্ঞানী মানুষ।" ওইটা আমার পছন্দ না আর কি।

যাই হোক, আমি এইটা পাওয়ার পর, আমি বিবিসি খুব প্রিয় ছিল। বিবিসি প্রায় কিছু কিছু অনুষ্ঠান দেখতাম। একটা অনুষ্ঠানে সেখানে বিভিন্ন ইউনিভার্সিটির প্রফেসররা, যারা এই ধর্মতত্ত্ব নিয়ে (সাবজেক্ট ভুলে গেলাম তাদের), সাবজেক্টটা ছিল "হোয়াই ইসলাম?" এত প্রসার হচ্ছে কেন, মানুষ কেন ইসলাম গ্রহণ করছে? এইটা বলার পর পরই আমি (সরি ফর মাই ল্যাঙ্গুয়েজ), একজন শ্বেতাঙ্গ, উনি বলার পর একটা শট দেখালেন বিবিসিতে উনি নামাজ পড়ছেন। তারপরে তাকে প্রশ্ন করা হচ্ছে হোয়াই হি হ্যাজ টেকেন ইসলাম? তখন উনি উনার পরিচয়টা বললেন।

উনি একজন ফায়ার ওয়ার্কার। হাইরাইজ বিল্ডিং এর ফায়ারওয়ার্কার। যারা ফায়ার ওয়ার্কার হয়, এরা একটু মানবকর্মী হয়। মানুষকে খুব ভালোবাসে এরা। এরা মানবতাবাদী মানুষ। তো উনি বলল যে, "আমি একটা আয়াত পেয়েছি, এই আয়াতের কারণে আমি মুসলমান হয়েছি।" কী সেই আয়াত? যে আয়াতটা আমাকেও পাগল করে দিছে! সেই আয়াতটা হচ্ছে সূরা মায়েদার ৩২ নাম্বার আয়াত। ভুল হতে পারে, আল্লাহ মাফ করে দিবেন, কিন্তু আমি আয়াতটা বলি।

সেটা হচ্ছে: "আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম। বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। এই কারণেই বনী ইসরাইলের উপর আমি বিধান দিলাম যে, নরহত্যা বা পৃথিবীতে ধ্বংসকার্য করা হেতু ব্যতিত কেউ কাউকে হত্যা করলে, সে যেন পৃথিবীর সকল মানুষকে হত্যা করল। কেউ কারো প্রাণ রক্ষা করলে, সে যেন পৃথিবীর সকল মানুষেরই প্রাণ রক্ষা করল। তাদের কাছে আমার রসূলরা স্পষ্ট প্রমাণ এনেছিল, কিন্তু অনেকেই সীমালংঘনকারী রয়ে গেল।"

ও মাই গড! একটা মানুষকে বাঁচালে সমগ্র মানবজাতি বাঁচানোর সওয়াব পাবে! কোন কজ ছাড়া একটা মানুষকে হত্যা করা মানে— যে পৃথিবীকে ধ্বংস করছে তাকে হত্যা করাটা জায়েজ, কিন্তু কোন যুক্তিযুক্ত কারণ যেটা ধ্বংস করে না এরকম যদি হয়, আপনি যদি একটা মানুষকে হত্যা করেন, তাহলে সমগ্র মানবজাতি হত্যার পানিশমেন্ট আপনি পাবেন। ওই ফায়ারওয়ার্কার বলতেছে যে, "একটা মানুষকে বাঁচালে যদি সমগ্র মানবজাতিকে বাঁচানোর সওয়াব পাওয়া যায়, এত বড় আয়াত তো আমি কোন গ্রন্থে পাই নাই।" উনি যখন এটা বলছে, তখন ওই আয়াতটা আমার মুখস্ত।

আরো অনেক আয়াত আছে। সূরা লোকমানের (মোস্ট প্রবাবলি ২৭ নাম্বার আয়াত হবে আমার যতদূর মনে পড়ছে), সেখানে বলছেন যে— "আল্লাহ পৃথিবীর সমস্ত গাছ যদি কলম হয়, আর এই যে সমুদ্র এর সঙ্গে আরো সাত সমুদ্র যোগ দিয়ে যদি কালি হয়, তবুও তোমরা আল্লাহর গুণাবলী লিখে শেষ করতে পারবে না। কারণ তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।" দিস ইজ মাই পয়েন্ট! শক্তিমান তত্ত্বজ্ঞানী। তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ তত্ত্বজ্ঞানী। এই সর্বশ্রেষ্ঠ তত্ত্বজ্ঞানীটা যে কতবার কোরআনে আল্লাহ বলেছেন! মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই তথ্য বলার পর পর উনি একটা অসাধারণ তথ্য দিয়ে দিয়েছেন।

সে আয়াতটা কী? আল্লাহ বলতেছেন, "তোমাদের সকলের সৃষ্টি ও পুনরুত্থান একটি মাত্র প্রাণীর সৃষ্টি ও পুনরুত্থানের সমান। আর আল্লাহ তো সব দেখেন ও শুনেন।" আপনি চিন্তা করতে পারেন? একটি প্রাণীর সৃষ্টি ও পুনরুত্থান তোমাদের সকলের সৃষ্টি ও পুনরুত্থানের সমান! বিবর্তনবাদের কথা বলতেছে কিনা নাই কোরআনে? যারা ভাই বুঝে না, যার জ্ঞান নাই, তারা উল্টাপাল্টা কথা বলা উচিত না। কোরআনকে বাদ দিয়ে আবারো বলছি, কোরআন অনেক জ্ঞানগর্ভ একটা বই।

আপনি চিন্তা করেন, একটা টিকটিকি যদি পৃথিবীতে থাকে, সেখান থেকে আল্লাহ আবার পুনরায় সৃষ্টি করতে পারেন। আমার কথা হচ্ছে, আজ পর্যন্ত মানুষ একটা অ্যামিবা সৃষ্টি করতে পারছে? কোন প্রাণী সৃষ্টি করতে পারছে মানুষ? একটা ধূলিকণা বা বালুকণা সৃষ্টি করতে পারে নাই। জাস্ট ডিসকভার। সে ধোলাবালি পরিষ্কার করে একটা নক্ষত্র আবিষ্কার করে, আর বলে আল্লাহ নাই, আল্লাহ নাই! ও একটা ধোলাবালি পরিষ্কার করে আবিষ্কার করে, এটা কিন্তু সৃষ্টি নয়। একটা বালুকণা আল্লাহ বানিয়ে ফেলবেন। তো বলতেছে, "আমি মানুষ বানাইছি।" এটা বলতে পারে কারণ আপনি তো ক্লোনিং করে ফেলছেন। গাছের যে কলম হয়, তো এক গাছ থেকে আরেক গাছ বানালে সেটা কি সৃষ্টি করা হলো? আপনি রূপান্তর করলেন। কিন্তু একটা বালু থেকে মানুষ সৃষ্টি করতে পারবে না।

এই যে আয়াতগুলো, দিনে দিনে আমাকে আস্তে আস্তে কোরআনের দিকে আকৃষ্ট করেছে। যেমন বিগ ব্যাং তত্ত্ব, মহাসংকোচন তত্ত্ব। বিগ ব্যাং তত্ত্বে স্পষ্টভাবে সূরা আম্বিয়াতে (৩০ নাম্বার আয়াত থেকে আয়াতটা শুরু হয়েছে):

"আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম। বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। অবিশ্বাসীরা কি ভেবে দেখে না আকাশ ও পৃথিবী ওতপ্রোতভাবে মিশেছিল? তারপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম। এবং প্রাণবান সবকিছু পানি থেকে সৃষ্টি করলাম।"

চিন্তা করছেন? ওয়াটার। আকাশ ও পৃথিবী, আকাশ ইজ আ সিম্বল অফ ইউনিভার্স। এ সবকিছু ওতপ্রোতভাবে ছিল, জমেছিল। ওদেরকে বিগ ব্যাং এর মত করে দিলাম।

এবার আমি আসি সূরা আম্বিয়ার ১০৪ নাম্বার আয়াতে। যেই কথাটা হকিংস অগাস্টাইনকে বলা হয়েছিল, সেটার উত্তর আমি এখন আপনাকে দিচ্ছি। সেখানে বলা হয়েছিল "ডুইং বিফোর বিল্ডিং ইউনিভার্স?" ১০৪ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ বলছেন:

"সেদিন আমি আকাশকে গুটিয়ে ফেলব, যেভাবে লিখিত কাগজ গোটানো হয়। যেভাবে প্রথম সৃষ্টি করেছিলাম সেভাবে পুনরায় সৃষ্টি করব। প্রতিশ্রুতি পালন আমার কর্তব্য, আমি তা করবই।"

লিখিত কাগজ গোটানো, বুঝতে পারছেন? ব্ল্যাক হোলসের মাধ্যমে আস্তে আস্তে কিন্তু সবকিছু আবার মহাসংকোচনে (আই থিঙ্ক স্টিফেন হকিং টোটালি রাইট) আবার একটা জায়গায় চলে আসবে। এই যে পৃথিবীটা, সূর্যটা যখন নিভে যাবে, এটা একটা ডার্ক ম্যাটারে পরিণত হবে। এবং যেটা হয়, এরকম জমতে জমতে জমতে একসময় মহাবিশ্বের সবগুলোকে সে একত্রে নিয়ে আসবে। তাহলে ওতপ্রোতভাবে এটা ছিল, আল্লাহ বিগ ব্যাং করলেন, আবার ওইটা আবার আগের জায়গায় চলে গেল। কী বলেছেন? "আমি তারপর আবার পুনরায় সৃষ্টি করব।" তার মানে এক বিগ ব্যাং থেকে মহাসংকোচন, আবার সেই মহাসংকোচন থেকে আবার বিগ ব্যাং। এটাও ইনফিনিট টাইম, দ্যাট ইজ আউট অফ কোয়েশ্চেন। এটা আমার প্রশ্নই হতে পারে না।

এক বিগ ব্যাং থেকে আরেক মহাসংকোচনের টাইমটা আমরা চিন্তা করতে পারি না। কাজেই আমার জ্ঞান দিয়ে আমি আল্লাহকে বিচার করছি! একটা মাত্র পৃথিবী আর এক মানুষ, আমার নিজের সাথে তুলনা করে পৃথিবীতে একটা না, কোরআনের আমি আপনাকে একদম আয়াত দেখায় দিব। ইনফিনিট! পৃথিবীতে আল্লাহ কীভাবে আমাদের নিয়েছেন, কোরআনটা পড়তে হবে জ্ঞানের সঙ্গে। আমাদের লিমিটেশন বা সংকীর্ণতা দিয়ে আমি আল্লাহর অসীমতাকে বোঝার চেষ্টা করছি। আল্লাহর অলমাইটিনেস নির্ভর করে আপনার নলেজের উপর। আপনি কুপমণ্ডূক হলে আপনি আল্লাহকে একভাবে দেখবেন, আর আপনি যত জ্ঞান অর্জন করবেন তত ভালোভাবে চিনবেন।

তো আমার কাছে ওই যে শব্দটা "আমার রুহু", এবং আমি আজকে মৃত্যুভয়ে ভীত নই। ওই আল্লাহর কাছে দোয়া করি যে, আল্লাহ তুমি আমাকে মৃত্যুর ঘুমের মধ্যে আমার মৃত্যুটা দিও। অপারেশন করলে যেরকম টের পাওয়া যায় না, জন্মের সময় যেভাবে টের পাইনি, সেভাবে তুমি আমার মৃত্যুটা দিও। আমাকে প্রশান্ত আত্মাদের অধিকারী করো। আমাকে তোমার সৎকর্মশীল বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করো।

এখন আবার আরেকটা সূরা, রুমের (সম্ভবত) একটা আয়াতের কথা মনে পড়লো। অসাধারণ। যারা আমাকে প্রশ্ন করে, তাদেরকে আমি বলছি। যারা বিশ্বাস করে না, আল্লাহ বলতেছেন, "ওরা কি স্রষ্টাহীন সৃষ্টি? না ওরা নিজেরাই নিজেদের স্রষ্টা? না ওরা আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছে? বরং ওরা অবিশ্বাসী।"

আপনি ক্যান ইউ ইমাজিন? আমি যাকে মানি না, আল্লাহ নাই, তাহলে এমনি হয়ে গেল এগুলো সব? এত সুন্দর, জোড়ায় জোড়ায়, এত চমৎকার এমনি হয়ে গেল? হতে পারে এটা? আর আমার জ্ঞান কতটুকু এই মহাবিশ্বে, এই ইনফিনিটি স্টেজে? আর আমি এত বড় জ্ঞানী হয়ে গেছি! আমি তোকে প্রমাণ দিতে পারতেছি না আল্লাহ আছে, কিন্তু আমি নিদর্শন পেয়ে গেছি। আমি, এই মানুষটি একটু হলেও টের পাচ্ছি আল্লাহর অস্তিত্ব, যে কারণে পাগল হয়ে গেছি। কিন্তু তোমাকে আমি চাইলে তো আল্লাহরে দেখাইতে পারব না যে আল্লাহ আছে। এই কারণে তুমি বলছ আল্লাহ নাই! কিন্তু তুমি কোন জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে বলো আল্লাহ নাই? কত জ্ঞানী তুমি? হ্যাঁ, এমনে এমনে সব এত চমৎকৃত শৃঙ্খলিত?

এত বছর আগে নক্ষত্ররা যে অস্তমিত হয় এ কথা তখন আবিষ্কার হয়েছিল? "কক্ষপথ" শব্দটি— আমার আরেকটা কথা এখানে উল্লেখ করা দরকার। আমি তখন একটা ডেইলি সোপে অভিনয় করছি। আমার সাথে অপর্ণা ঘোষ বলে একটা মেয়ে আছে। আর আমার খুবই রেসপেক্টেবল, মাই বেস্ট ওয়ান অফ অ্যাক্টরস আফরোজা বানু আপা উনিই আছেন, উনি আমার মেবি মায়ের রোল করছিলেন বা এরকম একটা কিছু। তো আমি বলছিলাম যে, সূর্যের কক্ষপথ আছে। শুনেন, আমি বলছি সূর্য তার নিজস্ব কক্ষপথে ঘোরে। উনি তখন রিয়্যাক্ট করলেন, "সবকিছুতে পণ্ডিতি করো না।"

উনি রাইট। আমি তার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলছি। "সূর্যের কক্ষপথ নাই, পৃথিবীর কক্ষপথ আছে সূর্যের চারিদিকে। সূর্যের কিসের কক্ষপথ?" আমি তো বললাম, "প্রমাণ দাও।" আমার তো ওই জায়গাটায় জ্ঞান কম ছিল। আমার অবস্থাটা দেখে রুমা বলে একটা নায়িকা ছিল, ওর বোনকে ফোন করল। আমার অবস্থাটা দেখে এরকম হয়ে গেল, ওখানে সে পড়ালেখা করছে ফিজিক্সের উপরে। ও বলতেছে, "আপু এটা আমার কোন ধারণা নাই।" তো আমি চুপ করে আছি। কিছু বলিনি কারণ আমি তো এখানে আটকে গেছি। আমার তো কিছু বলার নাই।

আমার একজন বিখ্যাত টিচার আছেন নটরডেম কলেজে, আমি যেহেতু নটরডেম কলেজ থেকে পড়েছি। সুশান্ত স্যার, পদার্থবিজ্ঞানের। বয়স হয়ে গেছে, আল্লাহ জানেন উনি বেঁচে আছেন কিনা। তো স্যারকে বললাম, "স্যার আমি রাকায়েত বলছি।" "তোকে আমি চিনি, নাটক করিস।" বললাম, "স্যার আমি তো একটা বিপদে পড়ছি।" স্যার এত সুন্দর উনি পড়াতেন। উনার প্রশ্নের ধরণটা আমাদেরকে এভাবে শিখিয়েছে যে, ঠেলাগাড়িকে বলা হলো, "তোমরা বাচ্চারা ব্যাখ্যা করো, ঠেলাগাড়িকে বলা হইলো এই ঠেলাগাড়ি ঠেলা দাও। সে বলে, ঠেলা দিব না স্যার, আমি নিউটনের সূত্র শিখছি। কী শিখছস? বলে, ঠেলাগাড়ি ঠেলা দিলে নিউটনের তৃতীয় সূত্র অনুযায়ী ও আমারে বিপরীত দিকে ঠেলা দিব, তাইলে তো গাড়ি আগাইবো না। এবার ব্যাখ্যা করো!" এরকম ধরনের খুব ক্রিয়েটিভ কোশ্চেন করতেন আর কি।

তো স্যার আমাদের খুব প্রিয় প্রাণবন্ত স্যার, পদার্থ বিজ্ঞানের। স্যারকে বললাম যে, "স্যার আমি তো একটা বিপদে পড়ছি। স্যার আমাকে তো এরকম আফরোজা আপার সাথে আমার একটু তর্ক হইছে। সূর্যের তো কক্ষপথ, সূর্যের কি কক্ষপথ আছে?" উনি তো একজন কলেজের টিচার। উনি যেটুক পড়েছেন, উনারও তো একটা সীমা আছে। উনি আমাকে বললেন যে, "আই এম সরি রাকায়েত, আমিও জানিনা এটার যে কক্ষপথ আছে, এটা আমার জ্ঞান নাই।" কেমন লাগে?

"আল্লাহ যে পর্বতে, মালীর ঘাড়ে সেঁচে দিল গাছের রেणु..." আমি হঠাৎ করে আমার লাইব্রেরিতে গিয়ে স্টিফেন হকিংস এর ওই বইটা ঘুরাইতে ঘুরাইতে গিয়ে একদম জায়গামত গিয়ে পড়ল। ওখানে পেলাম হাবল টেলিস্কোপের কথা। মাত্র ৯০ বছরও হয় নাই বা ১০০ বছর হয় নাই হাবল টেলিস্কোপ আবিষ্কার হইছে। যেইদিন থেকে হাবল টেলিস্কোপ আবিষ্কার হইছে, সেইদিনই আবিষ্কার হলো যে সূর্যের কক্ষপথ আছে। অর্থাৎ আমরা দেখবেন এই যে স্পাইরালের মত যেটা ছায়াপথ, আমাদের যে সূর্যের পরিবারগুলো, ওই যে ইঞ্জিনিয়াররা যেটা রড এরকম বাঁকায়, আরেকটা স্পাইরাল একটা ফর্ম আছে। প্রত্যেকটা সূর্য একটা কক্ষপথে ঘোরে। আমাদের যে সূর্যটা, সেই সূর্যটা দেড় কোটি আলোকবর্ষ পর আবার আগের জায়গায় চলে আসে। সুবহানাল্লাহ।

আজকে বলেন, তাহলে আমি আফরোজা আপাকে বলেছিলাম, কারণ কোরআনে বলেছিল যে, "আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন রাত্রি ও দিন এবং সূর্য ও চন্দ্রকে। প্রত্যেকে নিজ নিজ কক্ষপথে বিচরণ করে" (সূরা আম্বিয়া)। এইটাও আমাকে কোরআনের প্রতি আকৃষ্ট করার আরেকটি কারণ।

গ্যালিলিও নামক একটা নাটকে আমি অভিনয় করেছি। কোপার্নিকাসকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে তাই না? আমি ১১০ বছরের একটা রোলে অভিনয় করছিলাম। গ্যালিলিও দাঁড়িয়ে আছে, আমি তাকে চিৎকার করে বলছিলাম, "পৃথিবীতে বাস করে, পৃথিবীর খেয়ে পড়ে তুমি পৃথিবীকে অপমান করতে চাও? তোমাকে আমরা পুড়িয়ে মারব।" কারণ উনি গ্যালিলিও বলছিল পৃথিবীর কোন কিছু স্থির না, মহাবিশ্বের কিছু স্থির না। সূর্য স্থির না, কিন্তু সূর্যের কক্ষপথ আছে কিনা সেটা গ্যালিলিও বলে যায় নাই। সেটা মাত্র ডিসকভার হইছে হাবল টেলিস্কোপ আবিষ্কার হওয়ার পর।

তাহলে ১৪০০ বছর আগে কীভাবে কোরআনে বলে যে, "আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন রাত্রি ও দিন এবং সূর্য ও চন্দ্রকে। প্রত্যেকে নিজ নিজ কক্ষপথে বিচরণ করে"?

উপস্থাপক: আপনার একটা ব্যক্তিগত ফিলোসফির কথা বলতে গিয়ে এক এবং ৯৯ এর কথা বলছিলেন।

গাজী রাকায়েত: এক এবং ৯৯ এর কথা যেটা বলছিলাম যে, সেটা হচ্ছে যে আমার কাছে দেখলাম, দেখুন আমি ফার্স্ট হয়েছি নটরডেমে, আমার প্রায় অনেক ভালো মার্ক ছিল, আমার ৮০০ মার্ক ছিল, আমার স্ট্যান্ড হয় নাই কারণ আমার হাতের লেখা খুব খারাপ। আমি লিটারেচারে খুব ভালো ছিলাম, ইংরেজিতে খুব খারাপ ছিল।

আমি দেখলাম যখন আমি ধর্ম ত্যাগ করেছি, বুয়েট থেকে ছিটকে পড়েছি যেটা আমি গল্পটা আগে বলেছিলাম, এরপরে না আমি একদম... সবাই কিন্তু শেষে গিয়ে আমার কিছু হয় না। আমার সংসারটা ভেঙে গেল, আমার বিজনেস ভেঙ্গে যাচ্ছে, আমি অ্যাওয়ার্ড গোল দিয়ে পেতে গিয়েও পাই না। ৯৯ এ যাই আবার জিরো হয়ে যায়। একটা কথা আছে, সুমনের একটা গান আছে— "পাগল সাপলুডু খেলছে ভগবানের সাথে।" মানে ৯৯ এ যায় আবার সাপে কেটে নিচে নামিয়ে দেয়।

আপনি ৯৯ পারলেই যে আপনার ১০০ হবে তা নয়। এই তখন আমার গোরের ফিলোসফিটা আমার মাথার মধ্যে কাজ করলো। ও লোকটা ৯৯ করে মারা যায়, ১০০ করতে পারে না। ১০০ গোল করতে পারে না। সেখানে আমার মনে হইলো যে এই 'এক' হচ্ছে আল্লাহ। এই 'এক' আমাকে ১০০ দিবে। ১০০ মানে হচ্ছে পিস, শান্তি। ১০০ মানে হচ্ছে প্রাপ্তি, সব। সো উইদাউট ওয়ান, ১০০ হবে না। তুমি যতই পণ্ডিত হও, ৯৯ পর্যন্ত করবা, কিন্তু তুমি ১০০ হবে না। এরকম একটা আমার ভাবনা কাজ করা শুরু করল। কারণ আমার তো কাটছে না কিছুই।

বিশ্বাস করবেন, যেদিন থেকে এই এক-কে আমি স্বীকার করেছি, সেদিন থেকে আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাকে সব দিয়ে দিয়েছেন। সব, এত সম্মান! আর কত! আমি যখন অ্যাওয়ার্ডটা নিচ্ছিলাম ওই সময় প্রাইম মিনিস্টারের হাত থেকে, তখন হুজুর এক ইমাম একটু কোরআনের আয়াত পড়ছিলেন, যে আয়াতটা দিয়ে আমি নামাজ পড়তাম। তখন ওর চোখ ছলছল করে উঠলো। সে আয়াতটা হচ্ছে সূরা নাহলের ৯৭ নাম্বার আয়াত। এরকম কাছাকাছি:

"আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম। বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। বিশ্বাসী হয়ে পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে কেউ সৎকর্ম করবে, তাকে আমি আনন্দপূর্ণ জীবন দান করব। তাদের কর্মের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার তাদেরকে দান করব।"

এটা উনি পাঠ করলেন। আমার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগলো, ইমোশনাল হয়ে গেলাম আমি। উনি এত সুন্দর জায়গাটা সিলেক্ট করলেন এই জাতীয় পুরস্কারের অনুষ্ঠানে! বাহ দারুণ!

তো আমি মনে করি আমার যে মোদ্দা কথা, আমার হয়তো ব্যাংক ব্যালেন্স নাই। হয়তো আমার গাড়িটাও ২৫ বছর, ২০ বছর ধরে একই গাড়ি চালাই। হয়তো আমার জুতাটা ক্ষয়ে গেছে। হয়তো আমি সাদা এই ড্রেস ধারণ করেছি। এটাও একটা কারণ আছে। এখন এটা এক ধরনের... যে হজে গেলে সাদা কাফনের কাপড় পড়ে যেরকম। আমি যেদিন তাঁর কাছে সারেন্ডার করেছি পুরোপুরি, সেদিন থেকে আমি সাদা পড়ি। আর এটা কিন্তু সাদা না, ইটস এ কম্বিনেশন অফ সেভেন কালারস। সাতটা রং এটার মধ্যে আছে। সাদা খুব প্রিয় আল্লাহর, তাই না?

তো আমার কাছে মনে হয়েছে, আমি যেটা বলে যাই, যে বিশ্বাসী হয়ে যে সৎকর্ম করবে তার হয়তো প্রাচুর্য হবে না, কিন্তু প্রাচুর্য হলে কি সুখী হওয়া যায়? ঝকঝকে অ্যাপার্টমেন্টের চেয়েও একজন রিকশাচালক অনেক সুখে আছে। কারণ আপনি একজন মনোবিজ্ঞানী, আপনি জানেন যে আসলে শান্তিটা মনের। তো আমার কাছে যেটা মনে হয়েছে, আর কত সম্মান দিবে আল্লাহ আমাকে!

নত হয়ে পড়ছি। তবে অবাক হচ্ছি ইদানিং, আমার বিশ্বাসটা হয়েছিল হয়তো পয়েন্ট ওয়ান পারসেন্ট। আস্তে আস্তে আস্তে আস্তে কোরআন পড়ে পড়ে পড়ে পড়ে, প্রতিবছর লেয়ার টু লেয়ারে যেতে যেতে যেতে যেতে, এখন আমার বিশ্বাসটা আস্তে আস্তে বাড়ছে। এই বাড়াটা কোরআন ছাড়া সম্ভব নয়। কোরআন এবং গণিতের মধ্যে অনেক সুন্দর কিছু সামঞ্জস্যপূর্ণ বিষয় আছে। চিন্তা করেন, গবেষণা করেন, যেটা সম্পর্কে আমাদের শিক্ষিত সমাজ একেবারেই জানে না।

উপস্থাপক: তো কীভাবে এটা আপনার শুরু হইলো? মানে কেন কোরআনের বিষয়ে জায়গায় আপনি গণিতকে কীভাবে মিলাইলেন? এবং সেখানে আপনি যদি কিছু আমাদেরকে যদি উদাহরণ দেন যে, কেন কোরআনের একটা গাণিতিক ভাষা অথবা কোরআনের একটা গাণিতিক অলৌকিকতা আপনাকে মুগ্ধ করল?

গাজী রাকায়েত: রাইট। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমি যখন কোরআনের সৌন্দর্য দিয়ে আকৃষ্ট হচ্ছিলাম তখন গণিতটা আমাকে... আমি গণিতের দিকে যাইনি। আমি তখন কিছু সুন্দর সুন্দর ভার্স ফিলোসফিক্যালি আগাচ্ছিলাম। করোনার সময়, আমি করোনা আক্রান্ত হয়েছিলাম। করোনার সময়ে দুইটা সংখ্যা— একটা ৭, আরেকটা ১৯। ৭৪ থেকে ৮৪ এরকম জায়গা পর্যন্ত, ৭ এর যে মহত্ব। যেমন সূরা ফাতিহার ৭টি আয়াত, তারপরে ৭টা আকাশ, ৭টা মহাদেশ তাই না? ৭টা রং। এই যে ৭ এর যে চমৎকার... আপনি সূরা ফাতিহার ৭ এর যে ম্যাথমেটিক্যাল মানে অংক আছে, এটা দেখলে আপনি পাগল হয়ে যাবেন। ৭ নিয়ে গবেষণা করে ফেলেছে রিসার্চাররা।

১৯ যে সংখ্যাটা, যেটা কোরআনের মধ্যে আল্লাহ বলতেছেন, সূরা মুদ্দাসসিরের ৩০ নাম্বার আয়াতে যে, "এর উপর নিযুক্ত আছে ১৯ জন প্রহরী।" এই ১৯ সংখ্যার মধ্যে চিন্তাশীলদের জন্য কোরআনে নিদর্শন আছে। তো ১৯ নিয়েও অনেক গবেষণা হয়েছে এবং ১৯ অসাধারণ। এটাও সূরা ফাতিহা, ৭ আর ১৯ এর রিসার্চাররা গত ৭৪ সাল থেকে এটা নিয়ে কাজ করেছে।

আমি গোল্ডেন রেশিও, ১.৬১৮। এটা ক্যামেরার রেশিও আছে ১.৬১৮, গোল্ডেন রেশিও। তো এটা বলে শেষ করা যাবে না। আজকের এইটা খুব রিসেন্টলি আবিষ্কার হয় নাই, কোরআনের মধ্যে যে গোল্ডেন রেশিওটা আছে। দেখেন ১.৬১৮, এটা নবীর সময় ছিলই না। শূন্য ছিল না তখন। শূন্য আবিষ্কার হয়েছে আরো পরে। এক ইন্ডিয়ান পণ্ডিত এটা আবিষ্কার করেছেন অনেক পরে। শূন্য আমাদের ম্যাথমেটিক্সকে একটা কমপ্লিটনেস আনছে, শূন্য ছাড়া ম্যাথমেটিক্স হবে না। এটা ভুল। ওই সময় শূন্য ছিল না। কিন্তু ১.৬১৮ পয়েন্ট সামথিং, এটা তো নবী করীমের সময় ছিল না। কীভাবে কাটায় কাটায় এগুলো মিলে যাচ্ছে কোরআনের মধ্যে!

যেমন ধরেন ৭৮৬। ৭৮৬, এই ৭৮৬ টার একটা মহত্ব আছে। এটা কিন্তু, যে এটাকে আবজাদ ভ্যালু বলে বা জিওমেট্রিক ভ্যালু বলে। আমাদের কোরআনে যে ২৮টা আলফাবেট আছে, প্রত্যেকটা আলফাবেটের একটা রিপ্লেসিং নাম্বার আছে। আল্লাহ এটাকে প্রফেসি নাম্বার বলে। আল্লাহ এই নাম্বারটা দিয়েছেন কোরআনের এরাবিক ল্যাঙ্গুয়েজটার সাথে সাথে।

এখন মজার ব্যাপারটা হচ্ছে যে এই গোল্ডেন রেশিওটা সূরা ফাতিহার মধ্যে আছে। কীভাবে? ধরেন, আমাদের মানে সূরা, আমি যেটা গবেষণাটা করেছি সেটা হচ্ছে যে, কোরআনের প্রত্যেকটা সূরার একটা ম্যাথমেটিক্যাল ভ্যালু দেওয়ার চেষ্টা করেছি। ধরেন সূরা বাকারার ২৮৬টা আয়াত আছে। তাহলে এটার ম্যাথমেটিক্যাল ভ্যালু হবে ২.২৮৬, যদি এটা আমি ডেসিমেলে নিয়ে আসি। ডেসিমেল ভ্যালু।

সূরা আল মা'আরিজের ৪৪ টা আয়াত আছে কিন্তু এটা চ্যাপ্টার নাম্বার হচ্ছে ৭০। তাহলে এটা আমরা বলতেছি ৭০.৪৪। এখন কোনটায় কোন আয়াত বেশি, যেমন আল ইমরানে বেশি, সূরা আন নাসে বেশি, কিন্তু সূরা আল ফালাক বা সূরা নাসে কিন্তু আয়াত কম। সূরা ইখলাসে তো আরো কম। বা সূরা কাউসারে তো মাত্র তিনটা আয়াত। তাহলে ওই তিনটা আয়াতের ডিজিটাল ভ্যালুটা আর দশমিক ভ্যালুটা কিন্তু সূরা বাকারার এক না, বুঝতে পারছেন? আলাদা। তার পজিশন অনুযায়ী বার করলাম।

তার মানে এভাবে আমি সূরাগুলো বার করলাম। করার পরে, তাহলে কোরআনে টোটাল ১১৪ টা সূরার মধ্যে দুইটা সূরাতে বিসমিল্লাহ নাই। এক নাম্বার, সূরা তওবায় কোন বিসমিল্লাহ নাই, ৯ নাম্বার চ্যাপ্টার। আর সূরা ফাতিহার যে বিসমিল্লাহটা আছে, সেই বিসমিল্লাহটা... এটা আমার কথা না, রিসার্চারদের কথা, সূরা ফাতিহার বিসমিল্লাহটা ৭টা আয়াতের ভেতরে ইনক্লুডেড, ঠিক আছে? তার মানে ১১২ টা বিসমিল্লাহ আলাদা। আর সূরা ফাতিহার বিসমিল্লাহটা ধরলে পুরা কুরআনে আয়াত সংখ্যা হচ্ছে ৬২৩৬ টা। তার সঙ্গে আপনি যদি ১১২ যোগ করেন, তাহলে এটা হবে ৬৩৪৮। এটা হচ্ছে টোটাল আয়াত।

এখন প্রত্যেকটা সূরার আগে যে বিসমিল্লাহ, বিসমিল্লাহর আগে কোন নাম্বার নাই। কিন্তু কোরআনের প্রত্যেকটা ভার্সের আগে নাম্বার আসছে। তাহলে সূরা বাকারার ২৫৫ নাম্বার আয়াত, আয়াতুল কুরসির যে দশমিক ভ্যালু, আর সূরা ফাতেহার আরেকটা আয়াতের দশমিক ভ্যালু— পার্থক্য আছে। কারণ এটা ১.৬। এখন বিসমিল্লাহ যেহেতু নাম্বার নাই, তাহলে যার নাই তার তো একটা এভারেজ ভ্যালু করা উচিত, তাই না? আপনি দেখেন, ১১৪ কে আপনি যদি ৬৩৪৮ দিয়ে ভাগ দেন, আপনি ভাগফলটা পাবেন .০১৭৯ সামথিং। মানে যেটা এভারেজ করলে হয় .০১৮ বিসমিল্লাহ।

এখন সূরা ফাতিহার মধ্যে বিসমিল্লাহ একটা ঢুকে আছে। তাহলে প্রত্যেক বিসমিল্লাহর দশমিক ভ্যালু যদি .০১৮ হয়, তাহলে এইটার তো তাই হবে। এটা তো আলাদা হবে না। তাহলে এইটা বাদে থাকে কয়টা? ছয়টা। তাহলে সূরা ফাতিহার মান কত? ১.৬। এই ১.৬ কিন্তু আসল গোল্ডেন রেশিও। কারণ হচ্ছে, আমি আসতেছি এটা পরে। ১.৬, এই ১.৬ এর সাথে এবার বিসমিল্লাহর ভ্যালুটা যোগ করেন .০১৮। কত হয়? ১.৬১৮।

এবং সূরা যে আল মা'আরিজ, সূরা আল মা'আরিজ হচ্ছে ৭০ নাম্বার চ্যাপ্টার। কিন্তু সেখানে কয়টা আয়াত আছে? ৪৪ টা। ইন্টারেস্টিংলি, সূরা মা'আরিজের পর ৪৪ টা সূরা আছে। সুবহানাল্লাহ। আপনি দেখেন, এমন একটা সূরা... আমাদের নাভিটা যে বেলি বাটন, এটা আমার বডির গোল্ডেন সেন্টার। কাবা আমাদের পৃথিবীর গোল্ডেন সেন্টার। এবং কোরআনের গোল্ডেন সেন্টার হচ্ছে সূরা আল মা'আরিজ। সেখানে, সেটার ভ্যালু কত ছিল? ৭০.৪৪। এবং ৭০.৪৪, এটার সাথে যদি একটা বিসমিল্লাহ আছে ওটা যোগ করেন, তাহলে ওটা যোগ করার পর সামথিং পাবেন। ১১৪ কে ৭০.৪৪ দিয়ে ভাগ দেন, দেখবেন ১.৬১৮। এরকম।

যেমন আমি রিসার্চারদের সাথে... রিসার্চার, এগুলো তো বাংলাদেশের রিসার্চাররা কম করেছে। সিরিয়া, জর্ডানে এগুলো হয়ে গেছে। আমার কাছে একটা সফটওয়্যার আছে। এটা সিরিয়ার এক ইঞ্জিনিয়ারের। আমি শুধু এটুকুই আমি আপনাকে বলি। ম্যাথমেটিশিয়ানস আর একজন ইঞ্জিনিয়ারের মধ্যে পার্থক্য আছে। ইঞ্জিনিয়াররা ম্যাথমেটিক্সটা রেগুলার প্র্যাকটিস করে। আর ম্যাথমেটিশিয়ানরা হলো তাত্ত্বিক। সো ইঞ্জিনিয়াররা... আমি যেহেতু ইঞ্জিনিয়ার, আমি কিন্তু পয়েন্ট জিরো ফাইভ থেকে শুরু করে এগুলি নিয়েই আছি সবসময়।

কাবার চারটা ডাইমেনশন আমার মুখস্ত। কাবা ঘরের কোন ডাইমেনশন... আল্লাহ আমাকে এখনো হজ্বে নেয়নি। ইনশাল্লাহ যাবো। কিন্তু কাবা ঘরের হাইট, ডাইমেনশন সব আমার মুখস্ত। আমি বলি, কাবার এক সাইডের ডাইমেনশন হচ্ছে যেটা সামনে যেটাকে হাতিম বা হিজর ইসমাইল বলে, তাই না? যেটা সেমি সার্কুলার। ওই ডাইমেনশন ৯.৯ মিটার। তার ডান পাশে যেটা, সেটার মাপ হচ্ছে ১২.০৪ মিটার। আর তার বাম পাশেরটা হচ্ছে ১১.৬৮। আরেকটা হচ্ছে ১০.১৮। তাহলে আপনি যদি কাবাকে বর্গাকৃতি বলেন, তাহলে কিন্তু ভুল। এই চারটা, চার রকমের মাপই এমন... কাবা শরীফের সমস্ত মাপগুলো যোগ করার পর কাটায় কাটায় ১১৪ হচ্ছে।

শুধু কোরআনে না, এই ম্যাথমেটিক্যাল বিউটিটা আমাদের কাবা শরীফের মধ্যে আছে, মানুষের মধ্যে আছে। এবং আপনি অবাক হবেন, কোরআনে, আমাদের নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময় যখন কোরআনটা নাযিল হয়, তখন কোন জবর, জের ছিল না এবং তখন ছিল ২৮ টা আলফাবেট। এবং পুরা কোরআনে, মানে এটা আমি নই, এটা রিসার্চ করে সফটওয়্যার এখন এটা পাওয়া যায়, বের করা হয়েছে ৩ লাখ ২৫ হাজার ৩শ ৮৪ টা লেটার আসছে। আর শব্দ আছে ৭৭ হাজার ৪শ ৩০ টা। আমার রিসার্চ বলে ৭৭ হাজার ৪শ ২৯ টা, সূরা তহার সাথে আমি একটা মিল পেয়েছি। যাই হোক।

এখন এই যে ৩ লাখ ২৫ হাজার ৩শ ৮৪ টা লেটার, এটার প্রত্যেকটা লেটারের যে রিপ্লেসিং আবজাদ ভ্যালু, সেটা যদি বসাই, তাহলে যে সংখ্যাটা হয় সেটা হচ্ছে ২৩৫০৬৫৪। আর ৬২৩৬ টা যে আয়াত আছে, প্রত্যেকটা আয়াতের আগে যে নাম্বারগুলো আছে, এগুলো আমার সব বার করা আছে। সেই নাম্বারগুলো যদি আপনি যোগ করেন, তাহলে সে নাম্বারটা হয় ৩৩৩৬৭১। ইন্টারেস্টিং হলো, এই ২৩৫০৬৫৪ কে আপনি যদি ৩৩৩৬৭১ দিয়ে ভাগ দেন, তাহলে হয় ৭.০৪৫ সামথিং। যেটা সূরা আল মা'আরিজের সমান নাম্বার এবং যেটাকে ১১৪ দিয়ে ভাগ দিলে হয় ১.৬১৮।

পৃথিবীর এমন কি কোন বই আছে, যে বই এমনভাবে করা হয়েছে যে নাম্বারগুলো, অক্ষরগুলো এদিক ওদিক করার কোন সম্ভাবনা নাই? এটা কোন মানুষের কাজ নয় আসলে। আমার প্রায় ১০০ র অধিক অবজারভেশন বেরিয়ে গেছে এই করোনার পর থেকে। আমি ম্যাথমেটিক্যালি একটি গবেষণা করছি। আমার একটা স্বপ্ন আছে ইনশাল্লাহ, আল্লাহ যেন আপনাদের সহযোগিতায়, সবার উদ্দেশ্যে একটি গবেষণা কেন্দ্র করার তৌফিক দেন। সেটা হচ্ছে কুরআনের ও কাবার গাণিতিক গবেষণা কেন্দ্র।

আমি শুধু ম্যাথমেটিক্সেই থাকতে চাই। আমি তর্কে যেতে চাই না, বুঝছেন? মানবিক বিষয়গুলো তো খালি তর্কাতর্কি করে, একজন আরেকজনের সাথে ডিভাইড। তুমি এটা মানো না, সেটা... আরে কত ভাগ! আমাদেরই তো কত ভাগ। অংকে কোন ভাগ নাই। সরল অংক এক লাইনে যেতে হবে। আমি অংকেতে আছি। আমি আপনার এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এক্সপোনেনশিয়াল, লগারিদম থেকে শুরু করে আমি চ্যালেঞ্জ করছি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ম্যাথমেটিশিয়ানদের— "ইউ কাম টু মি এন্ড টেল মি।" আমি তোমার সাথে ডুয়েল ম্যাথমেটিক্যালি বসতে চাই, যে কীভাবে একটি কোরআন এত সুন্দর ম্যাথমেটিক্যালি একটা মানুষ করতে পারে কিনা, আমি চ্যালেঞ্জ করলাম।

আমাকে একজন শিল্পী ভাবলে হবে না। আমি একজন বুয়েটিয়ান। নটরডেমিয়ান। সারাজীবন অংকতে ১০০, আল্লাহর রহমতে ৯৯, ১০০ পেয়েছি। সো আমি অংক... অংক আমার মেডিটেশন। অংক আমি ভালোবাসি। আমি পৃথিবীর সমস্ত ম্যাথমেটিশিয়ানদেরকে আহবান জানালাম, "ইউ কাম টু মি এন্ড টেল মি।"

কেমিস্ট্রি, ফিজিক্স তো রয়েই গেছে, সেগুলি তো রয়েই গেছে। একটা কথা আমার এখন কেমিস্ট্রির কথা বলার পরে মনে পড়ে গেল। যারা সায়েন্সের ছাত্র তাদেরকে আমি বলছি, আবজাদ ভ্যালু না বুঝলে, জিওমেট্রিক ভ্যালু। জিওমেট্রিক ভ্যালু হিব্রু ভাষায়ও ছিল। হিব্রু ভাষায় ২২ টা লেটার ছিল আলফাবেট, আমাদের ২৮টা। আপনারা জানেন যে অ্যাটমিক নাম্বার। অ্যাটমিক নাম্বার কাকে বলে? অ্যাটমিক নাম্বার হচ্ছে নাম্বার অফ প্রোটনস। প্রোটনের সংখ্যাই অ্যাটমিক নাম্বার। একটা পার্টিকেলের অণুর মধ্যে প্রোটন আর নিউট্রন থাকে। ইলেকট্রন তো মাইনাস, ওটার কোন ভর নাই। নিউট্রন আর প্রোটন সমান থাকে।

আর একই ম্যাটার, কিন্তু অনেক রকমের ফর্ম আছে। যেমন আয়রনের তিন-চারটা ফর্ম আছে। তাই না? তো প্রোটনটা একই থাকে। প্রোটন যদি চেঞ্জ হয়ে যায়, তাহলে ম্যাটার চেঞ্জ। আর নিউট্রনটা এদিক ওদিক হয়। মনে করেন আয়রন। এটা দিয়ে আমি বুঝাই। আয়রন, আমাদের কোরআনে একটা সূরা আছে। সেই সূরাটার নাম আল হাদিদ। ৫৭ নাম্বার চ্যাপ্টার।

এখন এই যে পৃথিবীর কেন্দ্রে কী আছে? লোহা। একদম গলিত লাভা এবং এই লোহাটা কিন্তু বিগ ব্যাং এর সময় হিলিয়াম প্রসেস হয়ে হয়ে কিন্তু এই লোহাটা আসছে। লোহাটা কিন্তু বলে না বাইর থেকে আসছে। বাইর থেকে আল্লাহ কি লোহা পাঠাইছে নাকি? এটা বিগ ব্যাং এর সময় সেন্টারে লোহাটা আছে। আমার কথা হলো, পৃথিবীর কেন্দ্রে যে লোহা আছে, এটা কি নবী করীম তখন জানতেন? জানা সম্ভব ছিল ওই সময়? কিন্তু উনি ১১৪ র একদম সেন্টারে ৫৭ নাম্বার চ্যাপ্টারটা কী হলো? পৃথিবীর সেন্টারেও আয়রন, কোরআনের সেন্টারেও! আচ্ছা, এটা কোইনসিডেন্স? সব কোইনসিডেন্স?

এরপরে আসি, এর পরের স্টেজটায় আসি। আপনার সূরা এই আল হাদিদের... আপনি যদি আরবি না বুঝি, যেমন হাদিদ— হা, দাল, ইয়া, দাল। তাহলে কত হলো? হা=৮, দাল=৪, ইয়া=১০, দাল=৪। তাহলে ৮+৪+১০+৪ = ২৬। হাদিদের ভ্যালু ২৬। লোহার অ্যাটমিক নাম্বার ২৬। এটাও কোইনসিডেন্স?

শুধু কি তাই? সূরা... আপনারা যারা সায়েন্সের তাদেরকে বলছি। "আল হাদিদ", এটার মানে হচ্ছে "দ্য আয়রন"। "আল" মানে দ্য, আয়রন। তাহলে ২৬ ঠিক আছে। ২৬ আর আলিফ হচ্ছে ১, লাম হচ্ছে ৩০। কত হয়? ২৬ আর ৩১ = ৫৭। আল হাদিদ = ৫৭। এটাও কোইনসিডেন্স?

না। আরেকটি মজার ব্যাপার যেটা খুবই আমাকে আলোকিত করেছে, সেটা হলো ধরেন আইসোটোপ। যারা সায়েন্সের ছাত্র তারা জানবেন। আইসোটোপ অফ পার্টিকলস, নিউট্রন-প্রোটনের। এখন এই লোহার সাত ধরনের লোহা আছে পৃথিবীতে। তার মধ্যে চারটা লোহা পারমানেন্ট ফর্মের। অনেকগুলো আছে, আর তিনটা লোহা দুই বছরের মধ্যে নিউক্লিওসিন্থেসিস বলে, এটা অন্য ম্যাটার হয়ে যায়। একটা ফর্ম আছে ওটা মনে হয় দুই তিন মাস থাকে। আরেকটা আড়াই বছরের মধ্যে শেষ হয়ে যায়।

মানে পারমানেন্ট ফর্ম হচ্ছে চারটা লোহার। এই চারটা লোহার নিউট্রন-প্রোটনের যে আইসোটোপ মাপা হইছে। কোনটা পাওয়া গেছে ৫৪, কোনটা ৫৬, কোনটা ৫৭, কোনটা ৫৮। এই চারটা লোহার এভারেজ আইসোটোপ হচ্ছে ৫৬.৮ সামথিং বা ৫৭। এটাও কোইনসিডেন্স?

এবং সবচেয়ে সবচেয়ে ইম্পর্টেন্ট আরেকটি সূরা আমি আপনাদেরকে বলছি। সেটা হচ্ছে সূরা আর রহমানের (সম্ভবত), যেখানে আল্লাহ বলতেছেন:

"আর তিনি প্রবাহিত করেছেন দুটো সাগর, যার একটির পানি সুমিষ্ট ও সুপেয়, অপরটির পানি লবণাক্ত ও বিস্বাদ। আর দুইয়ের মাঝে রেখে দিয়েছেন এক ব্যবধান, এক অনতিক্রম্য বাধা।"

ভাই, প্রিয় আপনার মাধ্যমে আমি দর্শকদেরকে বলছি, ইউটিউবে সার্চ দেন। আপনি দুইটা সমুদ্রের, এই যে মিষ্টি ও নোনা দুইটা সমুদ্রের মাঝখানে একদম ভিডিও আছে। একদম একটা ব্যবধানটা বুঝা যায়। কিন্তু এটা তো নবী করীম সাল্লাল্লাহু সাল্লামের সময় নাবিকরা এসে তারে বলছে, তিনি সেইটা শুইনা লিখছেন। তাইতো? এটাই তো সবাই বলবেন যে, "আর দুয়ের মাঝে রেখে দিয়েছেন এক ব্যবধান।" এটা তো ঠিক আছে। কিন্তু এর পরের লাইনটাই হচ্ছে ডেঞ্জারাস। "আর তাদের উভয়ের মাঝে রেখে দিয়েছেন এক ব্যবধান, এক অনতিক্রম্য বাধা।"

ও মাই গড! এটার মানে কী? বাধার কথা বলবেন কেন? উনি যদি শুনেই লিখতেন তাহলে তো ব্যবধান দিলেই শেষ। বাধার কথা কেন বলবেন? এই ব্যবধানটা হচ্ছে, যারা কেমিস্ট্রির ছাত্র তাদেরকে বলছি, এই দুইটা ঘনত্বের কারণে ওখানে একটা মেমব্রেন তৈরি হয়। আপনারা এখন এগুলি সায়েন্স, ১০০ বছর হইছে সায়েন্স এগুলো আবিষ্কার করছে। ওই মেমব্রেনটা অটো প্রসেসেই একটার সাথে আরেকটাকে মিশতে দেয় না। একটা মেমব্রেন তৈরি হয়। তাহলে এত বছর আগে আমারে আপনি বলেন, ইজ ইট পসিবল যে এরকম একটা অনতিক্রম্য বাধার কথা নবী করীম সাল্লাল্লাহু ওয়াসাল্লাম কীভাবে বলবেন? এতে কি প্রমাণ করে না দ্যাট ইটস নট মেড বাই হিউম্যান? টোটালি ডিভাইন বুক।

এরকম শুধু সায়েন্স, মনোবিজ্ঞানের কথা কী বলব? এটা তো আর বলে শেষ করা যাবে না। প্রত্যেকটা সাবজেক্টে, ফিজিক্স, রসায়ন...। কিন্তু না, আমি... আমার কাছে খুব দুঃখ লেগেছে, আমি অনেক হুজুরকে, আমি তাদের টকশোতে দেখেছি যে, "কোরআনে সম্ভবত ৬৬৬৬, এই কয়টা আয়াত থাকতে পারে।" সম্ভবত কেন? আরে কোরআনের আয়াত নাম্বার তো লেখা আছে। এটা কি আপনি সারাজীবন গুনতে পারেন নাই? আপনার তো এটা জানতে হবে ৬২৩৬ টা আয়াত। ১১২ টা বিসমিল্লাহ।

অ্যাকচুয়ালি বিসমিল্লাহ ১১৪ টাই আছে। সূরা ফাতিহার একটা। আরেকটা হচ্ছে ২৭ নাম্বার যে সূরাটা, সেটা হচ্ছে সূরা নামল (পিপীলিকা)। সেটার মধ্যে কিন্তু সুলাইমান আলাইহিস সালাম রানীর কাছে যে চিঠিটা লেখেন, সেখানে কিন্তু "বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম" আছে। এখানে আল্লাহ কিন্তু ১১৪ টা বিসমিল্লাহই রেখেছেন।

তো যাই হোক, আবজাদ ভ্যালুটা জানা দরকার। কারণ এই যে "আর রাহমানুর রাহিম", এই আর রহমানুর রাহিমের আবজাদ ভ্যালু হচ্ছে ৬১৮। নবী করীম সাল্লাল্লাহু ওয়াসাল্লাম পরম করুণাময় ছিলেন। কিন্তু তিনি... আমি সূরা ফাতেহার সাতটা আয়াতের মধ্যে প্রথম তো "বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম"। প্রথম তিনটা আয়াত হচ্ছে আল্লাহর গুণাবলী। পরের তিনটা হচ্ছে আল্লাহর কাছে আমরা প্রার্থনা করছি "তুমি আমাদের এটা দাও।" নাকি? এই তিনটা গুণাবলীর মধ্যে একটা গুণাবলী নবীরও ছিল। আমার নবী করীম সাল্লাল্লাহু সাল্লাম পরম করুণাময় পরম দয়াময় ছিলেন। পরম প্রশংসিত, পরম প্রশংসাকারী ছিলেন। কিন্তু এই পরম করুণাময় পরম দয়াময় ৬১৮। আপনি যদি আল্লাহ সুবহানাতালার "এক" যোগ করেন, তাহলে সেটা হয় ৬১৯।

আর এই ৬১৯ হচ্ছে ভ্যালু অফ "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ"। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ, এটার আবজাদ ভ্যালু হচ্ছে ৬১৯।

নাযিল হয়েছে তো সূরা আন নাসর, ১১০ নাম্বার সূরা। নাকি? এই ১১০ নাম্বার সূরাতে যে আয়াত সংখ্যাটা আছে, সে আয়াত সংখ্যার সাথে আপনি যদি চ্যাপ্টার নাম্বার ১১০ যোগ করেন, আর সূরাতে যেই কয়টা লেটার আছে সেই লেটারের ভ্যালু হচ্ছে ৬২৩... এই ৬২৩ র সাথে যদি আপনি আয়াত সংখ্যার চ্যাপ্টার সংখ্যা যোগ করেন, তাহলে হয় ৬২৩৬। অর্থাৎ টোটাল নাম্বার অফ ভার্সেস। যেহেতু আল্লাহ বলতেছেন, "যেদিন তুমি দেখবে দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করছে..." মানে ইসলাম যেদিন শেষ, মানে ৬২৩৬ শেষ। ইনডিরেক্টলি কোন ইন্টেলেকচুয়ালদের জন্য এটা, আপনি বুঝতে পারছেন?

এবং বলেছে যে, "তোমরা যদি পারো আমার মত একটা সূরা অন্তত আনো।" আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। একটা আয়াত বলতেছি, বল যে, "কোরআনের মত কোরআন আনার জন্য" (এটাকে চ্যালেঞ্জ ভার্স বলা হয়), বল, "যদি কোরআনের মত কোরআন আনার জন্য মানুষ ও জীন একযুগে চেষ্টা করে, তবু তারা এর মত আনতে পারবে না।"

একটা সূরা আনতে বলছে। কিন্তু সেই আনাটা মানে কী? একটা যে কোন একটা লোক আইসা বললো কী? "এইযে দেখেন আমার কাছে একটা সূরা নাযিল হইছে। লাভ লাভ লাভ লাভ..." আল্লাহ কি এটা বুঝাইছে? ওই সূরাটার মধ্যে যে ম্যাথমেটিক্যাল, যে স্ট্রাকচারাল, যেই ভাষাগত যে জায়গাটা আছে, ওটা কোন মানুষের পক্ষে করা সম্ভব না। এই কারণেই বলছে, "তুমি আমার মত আরেকটা সূরা তুমি আনতে পারবে না।"

তাহলে এইটা বুঝতে গেলে ভাই আপনার কোরআনের ম্যাথমেটিক্যাল ল্যাঙ্গুয়েজ বুঝতে হবে। পুরা কোরআনটা ম্যাথমেটিক্যাল ল্যাঙ্গুয়েজের উপর। এবং সেটা আল্লাহ এমনভাবে করেছেন যাতে এটা কেউ পরিবর্তন করতে পারে না।

আমার এক বন্ধু, ও মক্কা থেকে ঘুরে আসার পর, একজন আর্কিটেক্ট এবং সে খুব ঈমানদার, নামাজী। অনেক বড় আর্কিটেক্ট, নাম না বলি। তার সঙ্গে একসময় কথা বলতে হতো। বললেন যে, "নবী করীম সাল্লাল্লাহু ওয়াসাল্লাম কোরআনটা নাযিল করে যাওয়ার পর সূরাগুলো এদিক ওদিক করেছেন। পরে খলিফারা মানে এটাকে এদিক ওদিক করে নাকি কোরআনটাকে সংকলন করা হয়েছে।" আমি বললাম, নো! এই পৃথিবীতে প্রথম হাফেজ হচ্ছেন আমাদের নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। জিব্রাইল আলাইহি সালাম তাকে মুখস্ত করিয়েছেন পুরা কোরআনটা।

কোরআনটা উনি হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহুকে দিয়ে গিয়েছেন। হযরত আবু বকর এটা হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহুকে দিয়ে গেছেন। হযরত হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহা ছিলেন সবচাইতে জ্ঞানী এবং আরেকজন হাফেজা, তাই না? সেই কোরআনটা যখন... আমাদের অনেক সাহাবীরা যখন যুদ্ধে শহীদ হলেন, তখন কিন্তু হযরত উসমান রাদিয়াল্লাহু তাদেরকে ডাকলেন, অনেককে ডাকলেন এবং যে ডায়ালেক্টিক কোরআনগুলোকে ধ্বংস করলেন। এবং উনি আমাদের হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছ থেকে সে কোরআনটি নিয়ে, সে কোরআনের সংকলন করে, কপি করে উনি আবার সেটা হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে ফেরত দেন। অনেক সম্মানীয় একজন নারী আমাদের ইসলামে। এবং এরপরে কিন্তু কোরআনটা উনি ছড়িয়ে দিলেন।

সেই কোরআনের কোন চ্যাপ্টারের পরে কয়টা সূরা কী? এইটা গোল্ডেন রেশিওর মাধ্যমে... আপনি, আমি একটু বলে দেই তাহলে আপনি শুনতে পারবেন। সেটা হচ্ছে, আপনি... আমি দর্শকদেরকেও বলছি, আপনারা একটা কাজ করবেন। কোরআনের সূরা নাম্বারগুলো একপাশে লিখবেন এক থেকে ১১৪। আর প্রত্যেকটা সূরা নাম্বারের পাশে আয়াত সংখ্যাটা লিখবেন। আয়াত সংখ্যাটা লিখার পর প্রত্যেকটা সূরার নাম্বারের সাথে আয়াত সংখ্যাটা যোগ দিবেন। যোগ দেওয়ার পর আরো ১১৪ টা নাম্বার পাবেন তাহলে।

মজার ব্যাপার কী জানেন? এই ১১৪ টা নাম্বারের ৫৭ টা জোড়। ৫৭ টা বেজোড়। শুধু তাই না, ওই জোড় সংখ্যার যোগফল করলে, যোগ করলে হয় ৬,২৩৬! টোটাল নাম্বারস অফ ভার্সেস! আর বেজোড় গুলো যোগ করলে হয় ৬৫৫৫! করে দেখেন ভাই, তর্কের কিছু নেই।

তো ৬৫৫৫ কোত্থেকে আসলো? আপনি এক থেকে ১১৪ যে সংখ্যা, সূরা চ্যাপ্টার, এগুলো যোগ করেন। একের সাথে দুই, দুই এর সাথে তিন, তিনের সাথে চার... এভাবে যোগ করে আপনি ১১৪ পর্যন্ত যদি আসেন, তাহলে সেই সংখ্যাটা হবে ৬৫৫৫! তাইলে জোড়গুলোর যোগফল হচ্ছে ৬২৩৬ আর বেজোড়গুলোর যোগফল হচ্ছে ৬৫৫৫! শুধু তাই না। আপনারা অনেক রিসার্চাররা বলবে, "আরে রাখেন ভাই, এটা নবী হিসাব করে গেছে।" আল্লাহ কয়, "তুই কত বড় ম্যাথমেটিশিয়ান তুই আমারে বলবি?"

এর পরের যে ঘটনাটা সেটা ভয়াবহ। ভেরি ভেরি ইন্টারেস্টিং। ম্যাথমেটিক্যালি, এই যে যোগ করার পর ১১৪ টা যে নাম্বার পাওয়া গেল, ৫৭টা ইভেন, ৫৭টা অড। সেই নাম্বারের আমরা যেটা করেছি, রিপিট গুলো একসাথে করেছি, আনরিপিট গুলো একসাথে। ৭৪ টার মত রিপিট নাম্বার আছে। এই রিপিট নাম্বারের যোগফল হচ্ছে ৪৬৯৬। রিপিট নাম্বার গুলোর যোগফল। আর আনরিপিট নাম্বার যোগফল হচ্ছে ৪৮৫৯। এবার ৪৬৯৬ কে ৪৮৫৯ দিয়ে ভাগ দেন। পয়েন্ট ৯৬৬... যেটার ইনভার্স হচ্ছে ১.৬১৮! গোল্ডেন রেশিও!

ক্যান ইউ ইমাজিন? আপনি চ্যাপ্টার নাম্বার আর ভার্স নাম্বারকে যোগ করার পর রিপিট-আনরিপিট করে আলাদা করবেন, তারপর আনরিপিট নাম্বারগুলোকে রিপিট নাম্বার দিয়ে ভাগ দেওয়ার পর গোল্ডেন রেশিও হবে! আমি ১৫ দিন নিজে মাধবুরি করে এইটা বানাইতে চাইছিলাম, আমি ১৫ দিনের দিন অসুস্থ হয়ে গেছি। এইটা মানুষের পক্ষে করা সম্ভব না।

তার মানে আমি বলতে চাই, কোরআনের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত যেইভাবে সাজানো আছে, কোনটার পরে কোনটা আয়াত হবে, কোনটার পরে কোনটা সূরা হবে— এইটা কিন্তু সত্যিকার অর্থে নবী করীম সাল্লাল্লাহু ওয়াসাল্লাম, আল্লাহ জিব্রাইল আলাইহিস সালামের মাধ্যমে কমপ্লিট করে নিয়েছেন। কোরআনের একটি জিনিস এদিক থেকে ওদিক করার কোন স্কোপ নাই। এবং আল্লাহ বলেছেন, "পিছন দিক থেকে, সামনের দিক থেকে, কোন দিক থেকে এটাকে কেউ পরিবর্তন করতে পারবে না।"

আমি মাত্র আপনাদের ২০০ ম্যাথমেটিক্যাল অবজারভেশনের মাত্র দুই-তিনটা শেয়ার করলাম। আমি এ কারণে বলছি, এটা এক প্রোগ্রামে হবে না। আমি চ্যালেঞ্জ করছি ম্যাথমেটিশিয়ানদের। আপনি এক্সপোনেনশিয়াল, লগারিদম নিয়ে আসেন। আমি আপনাকে দেখাবো এটা মানুষের কাজ নয়।

উপস্থাপক: কোরআন আমার কাছে যেটা মনে হয় খুব ধীরস্থিরভাবে, অর্থপূর্ণভাবে, সুন্দরভাবে বুঝতে হবে। আপনি খুব সুন্দর উপস্থাপনা করেন। আপনি যদি কোরআনের কোন একটা অংশ উপস্থাপনা করতেন যেটা আপনার খুব প্রিয়...

গাজী রাকায়েত: আমি সূরা ফাতিহাটা বাংলায় এত দ্রুত বলতে পারব, আপনি এত দ্রুত আরবিতে বলতে পারবেন না। আমি একটু বলি তাহলে?

"সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহরই যিনি পরম করুণাময় পরম দয়াময় বিচার দিনের মালিক আমরা তোমারই উপাসনা করি তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি তুমি আমাদেরকে চালিত করো সঠিক পথে তাদের পথে যাদেরকে তুমি অনুগ্রহ দান করেছ যারা তোমার রোষে পতিত হয়নি পথভ্রষ্ট হয়নি..."

কী করছি এগুলো আমরা? এর মানে আছে কোন? কিন্তু সূরা ফাতিহার অনুবাদটা পড়লে চোখে জল চলে আসে। আমি যদি বলি:

"বিতাড়িত শয়তানের প্ররোচনা হতে আল্লাহ তাআলার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। পরম করুণাময় পরম দয়াময় আল্লাহর নামে।

সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহরই।

যিনি পরম করুণাময়, পরম দয়াময়।

বিচার দিনের মালিক।

আমরা তোমারই উপাসনা করি, তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি।

তুমি আমাদেরকে চালিত করো সঠিক পথে।

তাদের পথে যাদেরকে তুমি অনুগ্রহ দান করেছ,

যারা তোমার রোষে পতিত হয়নি, পথভ্রষ্ট হয়নি।"

আলহামদুলিল্লাহ। আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম। বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন। আর রাহমানির রাহিম। মালিকি ইয়াউমিদ্দিন। ইয়াকা নাবুদু ওয়া ইয়াকা নাস্তাইন। ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকিম। সিরাতল্লাজিনা আনআমতা আলাইহিম, গাইরিল মাগদুবি আলাইহিম ওয়ালাদ দাল্লিন।

সুন্দর। আমি এখন যেটা আরবিতে পড়লাম, প্রত্যেকটা ওয়ার্ড বুঝি, যে কারণে আমি এটা ফিল করি। এবং দেখেন, সূরা ফাতিহাটা "আমরা" দিয়ে বলা আছে, "আমি" দিয়ে নয়। এর মানে হচ্ছে আমি আল্লাহর নবীর উম্মত হিসেবে সমগ্র মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব করে, মুসলমানদের হয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি। সূরা ফাতিহাটা যদি না বুঝি... আমার যেটা মনে হয়, ভালো অনুবাদগুলো মুখস্ত করা উচিত।

যেমন অনেককে আমি দেখেছি, আমি তো মসজিদে নামাজ পড়ি, জুমার নামাজ পড়ি। আয়াতটা বলার পরে তারপর তার মত করে সে অনুবাদটা বলে। এতে করে অনেক তথ্য ছুটে যায়। অনেক দ্যুতি নষ্ট হয়ে যায়। আমি সংলাপের, আমাদের যে অভিনয় করি না, সংলাপের দ্যুতিটা নষ্ট হওয়ার একটা উদাহরণ দেই তাহলে বুঝতে পারবেন।

আমার "গোর" নাটকের একটা সংলাপ আমি বলছি। বলতেছে এক হিন্দু বিধবা। আগের দিনে নিয়ম আছিল, স্বামীরা যখন মারা যাইতো, স্বামীগো চিতার লগে বউগো আগুনে ঝাঁপ দিতে হইতো। "এই নিয়মই ভালো ছিল, সারাজীবন আগুনে পুড়ার চাইতে একদিনে চিতার আগুনে পুড়া অনেক ভালো।"

এই যে এটার মধ্যে একটা পয়েট্রি আছে, এটার মধ্যে একটা দ্যুতি আছে সংলাপে। সে দ্যুতিটা যদি আমি একটু বানাই বুনাদি করি, তাহলে কিন্তু দ্যুতিটা নষ্ট হয়ে যাবে। ঠিক যেই অনুবাদটা অ্যারাবিক অনুবাদটাকে সুন্দরভাবে এরকম দ্যুতিময়তা রেখে, কাব্যময়তা রেখে অনুবাদ করেছে, সেইটা কিন্তু কাছাকাছি যাবে।

তাহলে আমার অনুরোধ থাকবে, যারা হাফেজ তারা... আমি অনেককে বলেছি যে সে সুর ছাড়া বলতে পারে। সুরে সুরে মুখস্ত করছে, "আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন..." আমি কি এভাবে বলতে পারি না? নামাজটা আমাকে সবাইকে কি এভাবেই বলতে হবে? "আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন।" অনেক সময় তো আল্লাহ ধমকের সুরে কথা বলছেন, আর কখনো বা দয়ার সুরে।

উপস্থাপক: আল্লাহু আকবার সুরে করলে হবে না।

গাজী রাকায়েত: হবে না তো! তাহলে আপনি যখন বলবেন যে "কুল হুয়াল্লাহু আহাদ", "বল" টা এক ধরনের শপথ করতে বলছে। "শপথ কর আমার সাথে, তুই বল!" এটা এক ধরনের আমরা স্কুলে শপথ করি না? শপথ। সূরা আল কাফিরুন, তাই না? "বল, হে অবিশ্বাসীরা..." আমি এই সূরাটা আমার কাছে ইনজাস্টিস মনে হতো, কেন এইটা দিয়ে নামাজ পড়ব? কিন্তু আসলে কিন্তু এই আল্লাহ এটা দিয়া শপথ করাচ্ছে যাতে তোর ভিতরে এই ধর্মের জিনিসটা ক্লিয়ার হয়। অনেক রকমের ব্যাখ্যা আছে। আমার কাছে যেটা মনে হয়, অর্থ না বুঝে কোন কিছু করা উচিত নয়।

আমি সূরা কাহাফের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা... এবং নামাজ কিন্তু একটা পারফরমেন্স, এটা বুঝতে হবে। সামটাইম আল্লাহ ইজ টেলিং ইউ সামথিং অ্যান্ড সামটাইম ইউ আর টেলিং আল্লাহ। পুরাটাই তো একটা কনভারসেশন, তাই না? আমি নামাজ পড়ার সময় দোয়া করি যে, আল্লাহ তাশাহুদের মাধ্যমে তুমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু সাল্লামকে রহমত, বরকত ও শান্তি দান করেছো এবং সেই তাশাহুদে সে আবার তার উম্মতকে রেফার করেছে। সেই রেফার অনুযায়ী তুমি তোমার রহমত, বরকত ও সালাম আমার এই সালাম ফিরানোর মাধ্যমে পৃথিবীর সমস্ত যা আছে— মুসলমান, বিশ্বাসী এবং সমস্ত প্রাণীকুল, সবার কাছে পৌঁছে দাও।

এটাই হচ্ছে উম্মতে মুহাম্মদী (সা.) এর আসল কাজ। আজকে কিন্তু আমাদের নবী করীম সাল্লাল্লাহু সাল্লাম মারা তো যান নাই, আল্লাহ তো সূরা বাকারায় বলেছেন যে যারা আল্লাহর পথে মারা যায় তাদেরকে মৃত বলো না। কিন্তু উনি তো এখন দুনিয়াবি কর্ম করতে পারবেন না। উনি যে শ্রেষ্ঠত্ব দান করে গেছেন, সে উম্মতের দায়িত্ব হচ্ছে এখন তার কাজটা করা, তাই না? এই যে সালামটা ফিরাচ্ছি আমরা না বুঝে, অনেকে বলে দুই কান্ধে দুই ফেরেশতার জন্য নাকি সালাম পাঠাইছে। এটা আমি কী বলব?

সূরা কাহাফের একটু খুব গুরুত্বপূর্ণ... যারা খুব অহংকারী, তাদের উদ্দেশ্যে আমার এই আবৃত্তিটা আমি করছি:

"আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম। বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।

তুমি ওদের কাছে একটি উপমা বয়ান করো দুই ব্যক্তির। ওদের একজনকে আমি দিয়েছিলাম দুটো আঙ্গুরের বাগান। আর এই দুটোকে আমি খেজুর গাছ দিয়ে ঘিরে দিয়েছিলাম। আর দুইয়ের মাঝে দিয়েছিলাম শস্যক্ষেত। দুটো বাগানই ফল দিত। তাতে কোন কসুর করতো না। আর দুইয়ের ফাঁকে ফাঁকে আমি নদী বইয়ে দিয়েছিলাম। আর তার প্রচুর ধন সম্পদ ছিল।

তারপর কথায় কথায় সে তার বন্ধুকে বলল, 'ধন সম্পদে আমি তোমার থেকে বড়। জনবলও তোমার চেয়ে শক্তিশালী।' এভাবে নিজের উপর অত্যাচার করে সে তার বাগানে ঢুকলো।

সে বলল, 'আমি মনে করি না যে এই বাগান কখনো ধ্বংস হবে। আমি মনে করি না যে কিয়ামত হবে। আর যদি আমাকে আমার প্রতিপালকের কাছে ফিরিয়ে নেয়াই হয়, তবে আমি তো নিশ্চয় এর চেয়ে ভালো জায়গা পাবো।'

তার বন্ধু তার তর্কের উত্তরে তাকে বলল, 'তুমি কি তাঁকে অস্বীকার করছো যিনি তোমাকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন? তারপর শুক্রাণু থেকে, তারপর পূর্ণ করেছেন মানুষের অবয়বে? আল্লাহই আমার প্রতিপালক, আমি কাউকে আমার প্রতিপালকের শরীক করি না। তুমি যখন ধন ও সন্তানে আমাকে তোমার চেয়ে কম দেখলে, তখন তোমার বাগানে ঢুকে তুমি কেন বললে না— মাশাআল্লাহ, আল্লাহ যা চেয়েছেন তাই হয়েছে, আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোন শক্তি নেই? হয়তো আমার প্রতিপালক আমাকে তোমার বাগানের চেয়ে আরো ভালো কিছু দিবেন, আর তোমার বাগানে আকাশ থেকে আগুন ঝড়াবেন, যার ফলে গাছপালা শূন্য হয়ে তা কাদামাটি হয়ে যাবে। বা ওর পানি মাটির নিচে হারিয়ে যাবে, যা তুমি কখনো ফিরিয়ে আনতে পারবে না।'

শেষ পর্যন্ত তার ফলগুলো ধ্বংস হয়ে গেল। আর সেখানে সে যা ব্যয় করেছিল তার মাচা সমেত যখন পড়ে গেল, সে হাত কচলিয়ে আক্ষেপ করতে লাগল। সে বলতে লাগলো, 'হায়! আমি যদি কাউকে আমার প্রতিপালকের শরীক না করতাম।'

আর আল্লাহ ছাড়া তাকে সাহায্য করার কোন লোক ছিল না। এক্ষেত্রে অভিভাবকত্বের অধিকার সেই সত্য আল্লাহর। তিনিই শ্রেষ্ঠ পুরস্কার দানে এবং শ্রেষ্ঠ পরিণাম নির্ণয়ে।"

এই যে দেখেন, এখানে কি পারফরমেন্স নাই?

উপস্থাপক: অবশ্যই আছে।

গাজী রাকায়েত: আল্লাহ যখন বলেন, সূরা হিজরের যেটা, "আমি তো ছাঁচের ঢালা শুকন ঠনঠনে মাটি থেকে মানুষ সৃষ্টি করেছি। যখন আমি তাকে সুঠাম করবো, তার দেহে আমার রুহ বা প্রাণ সঞ্চার করবো..." এই যে এই কথাটা কার? আল্লাহর কথা। কখনো আল্লাহ বলতেছেন সূরা মাউনে... আমরা যেটা পড়ি। তিনি কী বলছেন?

"আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম। বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। তুমি কি দেখেছো তাকে যে কর্মফল দিবসকে অস্বীকার করে? সে তো ওই ব্যক্তি যে এতিমকে রূঢ়ভাবে তাড়িয়ে দেয়, এবং অভাবগ্রস্তকে অন্নদানে উৎসাহিত করে না। সুতরাং দুর্ভোগ সেসব সালাত আদায়কারীর, যারা তাদের সালাত সম্বন্ধে উদাসীন। যারা লোক দেখানোর জন্য তা করে, এবং যারা গৃহস্থালির ছোটখাট সাহায্য দানেও বিরত থাকে।"

এখন এইটা যদি আমি না বুঝে পড়ি, এটার মানে কী হতে পারে? সো অনেক আগে শামসুর রাহমান একটা কথা বলেছিলেন, আমার খুব প্রিয় কবি। উনি বলেছিলেন যে, "উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ।" এটাই উদ্ভট উট, আমরা সঠিক পথটা নিতে পারি নাই।

আমি কতগুলো মানুষকে খুব স্মরণ করি সবসময়। তার মধ্যে একজন অন্যতম হচ্ছে মাওলানা ভাসানী, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এবং আমাদের যে ভ্রমণ কাহিনী লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী। সৈয়দ মুজতবা আলী ১৫-১৬ টা ল্যাঙ্গুয়েজ শিখেছেন। আরে ভাই, আপনার বয়স ৭০ বছর, তাতে কী? কালকে থেকে শুরু করেন আপনি আরবি ভাষা শিখা। কারণ ভাষা শিখলে কী হয় জানেন? বিদেশীরা, ফরেনাররা, ওরা ওদের মাতৃভাষার পাশে দুই তিনটা করে ভাষা শিখে। কেন জানেন? ব্রেনটা কাজ করে। ব্রেনটা কাজ করে, যেটা বুড়ো বয়সে স্মরণ শক্তি, সেই স্মরণ শক্তিটা সতেজ থাকে।

আমি বলছি যে, "আপনি ভাবছেন আমার তো বুড়া বয়স হয়ে গেছে, আর কে শিখাবে?" আপনি আরবি ভাষাটা বিসমিল্লাহ বলে শিখা শুরু করেন। আপনি যে কটা শিখতে পারবেন সেটাই লাভ। যেমন না পারলে কিছু সূরার ওই ওয়ার্ডগুলোর অর্থটাও যদি আপনি জানেন, "আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লাহুয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুম।" আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোন উপাস্য নেই। তিনি চিরঞ্জীব, চিরস্থায়ী। এরকম ওয়ার্ডগুলো বুঝতে পারেন।

আরবি ভাষাটা শিখলে দুটো লাভ। একটা হচ্ছে আপনার স্মৃতিশক্তি বেড়ে যাবে। দুই নাম্বার হচ্ছে, যে ভাষাতে আমাদের কোরআন নাযিল হয়েছে, সেই ভাষাটা আপনি জানতে পারবেন। তবে এই পড়ার কোন অর্থ নাই, যার আমি একটা শব্দও বুঝি না।

আসলে আমি খুবই ক্ষুদ্র একটি মানুষ এবং আমার যে জ্ঞান, আমার যে পড়ালেখা, সেটা এতই সীমিত, এতই কম। তারপর ওই অল্প জ্ঞানে আমি যে আমার মহান আল্লাহ তাআলার অস্তিত্বটা যে একটু টের পাচ্ছি, উনি আছেন, এতেই আমি ধন্য। আমরা যদি কোরআনটাকে সুন্দর করে বুঝি, অর্থ করে পড়ি এবং ইসলামটাকে সঠিকভাবে মেনে চলি, এবং "আমি" টা যেন বড় না হয়ে যায়— "আমি যেটা বলেছি সেটাই ঠিক"— এই অহংকার থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তাহলে আমার মনে হয় আমাদের এই দেশটাকে...

আমার বাপ-দাদারা, তার দাদারা অনেক ভালো মুসলমান ছিলেন আমাদের চেয়ে। দিন দিন আমরা খুব খারাপ মুসলিম হয়ে যাচ্ছি। আমরা আমাদের পুরনো সেই সুন্দর ঐতিহ্যকে ফিরে পেতে চাই। আমাদের দেশে আবারো মাওলানা ভাসানীর মত এরকম একজন লিডার আসুক এবং ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মত এরকম আরো গুণীজন আসুক। কাউকে কখনো তুচ্ছ করা উচিত না। তার মধ্যে আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব আছে। আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব সবার মধ্যে আছে। ওই খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষটি, যাকে আমি ঘৃণা করছি, যার উপরে আমার এত বাজে দৃষ্টি— তার উপরই হয়তো আল্লাহ মহা কল্যাণ রেখেছেন। কাজেই মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো যাবে না। মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানোটাও খারাপ।

আল্লাহর একটা কোরআনের আয়াত দিয়ে আমি শেষ করতে চাই। আল্লাহ একটা জায়গায় বলছেন,

"আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম। বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। পৃথিবীতে বা ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের যে বিপদ আপদ ঘটে তা সৃষ্টির পূর্বেই কিতাবে লিপিবদ্ধ থাকে। এটা এ জন্য যে, তোমরা যা হারিয়েছো তার জন্য যেন বিমর্ষ না হও। আর যা তিনি দিয়েছেন তার জন্য যেন খুশিতে উল্লসিত না হও। আল্লাহ কোন উদ্ধত, অহংকারীকে ভালোবাসেন না।" (সূরা হাদিদ, আয়াত ২২-২৩)

উপস্থাপক: থ্যাংক ইউ ভাইয়া। অনেক গুরুত্বপূর্ণ জিনিস শিখলাম। আপনি এত ভালো বলতেছিলেন যে এজন আমি প্রশ্নও করি নাই। কারণ আমি জাস্ট শুনতে চাচ্ছিলাম। আমি মনে করি যে আমরা আরো অনেক কিছু আপনার কাছে শিখতে পারব। অনেক কিছু আমরা খুব ব্রিফলি গেছি। যেমন গাণিতিক বিষয়টা, মুসলমানদের ব্যবহারের বিষয়টা, সংস্কৃতি ও ইসলামের মেলবন্ধনের বিষয়টা। সেগুলো নিয়ে আপনার কাছ থেকে আরো ইনশাল্লাহ শিখবো। আমি সিওর আমাদের অডিয়েন্স এটা থেকে অনেক কিছু শিখবে, উপকৃত হবে।

সো আপনাকে আপনার সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। আপনি অনেক ব্যস্ততার মধ্যে সময় দিয়েছেন। সো ইনশাল্লাহ আমরা যেন সবাই কোরআনকে আঁকড়ে ধরি, সেই প্রত্যাশা রেখে আজকে শেষ করছি।

গাজী রাকায়েত: আমি তোমাকে একটু কথা বলতে চাই। সেটা হচ্ছে যে, তোমার সাথে, আপনার সাথে আমার যে পরিচয়টা, সেটা খুব কাকতালীয় এবং কীভাবে যেন হয়ে গেল। এবং আমি এই প্রথম... ধর্ম নিয়ে আমি পাবলিকলি কথা বলতাম না, এবং সেটা কিন্তু আল্লাহ তোমার মাধ্যমেই করলো। আল্লাহকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

উপস্থাপক: ঠিক।

ট্যাগ / কী-ওয়ার্ড:

অন্যান্য প্রবন্ধ

March 17, 2026
কোরআনে মহাবিশ্ব ও বিজ্ঞানের চমক: ১৪০০ বছর আগের যে বাণী আজ প্রমাণিত

কোরআনের বৈজ্ঞানিক ও গাণিতিক অলৌকিকতা: গাজী রাকায়েতের ইসলামে ফেরার কাহিনী কোরআনের ভুল খুঁজতে গিয়ে কেন কাঁদলেন ২৮টি জাতীয় পুরস্কারজয়ী পরিচালক? ভাবুন তো, একজন মানুষ পবিত্র কোরআনের বৈজ্ঞানিক ভুল (Scientific error) ধরার জন্য পড়া শুরু করলেন, কিন্তু শেষমেশ এর গাণিতিক নিখুঁত গাঁথুনি আর বৈজ্ঞানিক নিদর্শন দেখে নিজেই বিস্মিত হয়ে গেলেন! হ্যাঁ, ঠিক এমন একটি অবিশ্বাস্য ঘটনার […]

March 13, 2026
প্রাচীনকালের শেষে ইসলাম এবং পেরেনিয়ালিজম: একটি নতুন ঐতিহাসিক পাঠ

ইতিহাসের পাতা উল্টালে সপ্তম শতাব্দীতে আরবের বুকে ইসলামের উত্থানকে একটি বিস্ময়কর বাঁক হিসেবেই দেখতে হয়। ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় আলোচনায় বা প্রথাগত ইতিহাসে ইসলামকে সাধারণত এমন একটি ঐশ্বরিক ঘটনা হিসেবে তুলে ধরা হয়, যার সাথে সমসাময়িক বা পূর্ববর্তী সমাজ-সংস্কৃতির যেন কোনো যোগসূত্রই ছিল না। কিন্তু আধুনিক ইতিহাসবিদ ও গবেষকরা এখন ভিন্ন কথা বলছেন। তাদের মতে, ইসলামকে নিখুঁতভাবে […]

March 9, 2026
কুরআনের আলোকে প্রাক-ইসলামি আরবের কুসংস্কার, সামাজিক প্রথা ও সংস্কার

১. প্রাক-ইসলামি আরবের ঐতিহাসিক ও আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরব উপদ্বীপের সামগ্রিক অবস্থাকে ঐতিহাসিকভাবে 'জাহিলিয়্যাত' বা অন্ধকারের যুগ হিসেবে অভিহিত করা হয়। তবে একাডেমিক দৃষ্টিকোণ থেকে 'জাহিলিয়্যাত' শব্দটি নিছক অক্ষরজ্ঞানহীনতা বা শিক্ষার অভাবকে নির্দেশ করে না; বরং এটি মূলত একটি নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং আধ্যাত্মিক শূন্যতার সমার্থক, যেখানে ঐশী জ্ঞান ও যৌক্তিকতার বদলে কুসংস্কার, গোঁড়ামি […]

March 4, 2026
কুরআন যেভাবে একটি সভ্যতা নির্মাণের গ্রন্থ — ইবনে আশুরের দৃষ্টিকোণ থেকে

ভূমিকা ইসলামিক জ্ঞানচর্চায় কুরআনকে সাধারণত আধ্যাত্মিক বা ধর্মীয় নির্দেশনার গ্রন্থ হিসেবে দেখা হয়। তবে মুসলিম আধুনিক চিন্তাবিদরা, বিশেষ করে টিউনিশিয়ান তাফসিরবিদ মুহাম্মাদ আল-তাহির ইবনে আশুর (Muhammad al-Tahir ibn Ashur), কুরআনকে শুধু আধ্যাত্মিক নৈতিকতা প্রদানের বই নয়, বরং একটি সভ্যতা নির্মাণের পরিকল্পনামূলক নীতি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর তাফসির Tahrir wa al-Tanwir এই দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। […]

March 3, 2026
সূরা আল-বাকারা ২:১১ ও আধুনিক আন্তর্জাতিক রাজনীতি - একটি তুলনামূলক রাজনৈতিক-নৈতিক বিশ্লেষণ

পটভূমি সাম্প্রতিক সময়ে ইজরায়েল ও আমেরিকা পরিচালিত ইরানের উপরে ২৮ ফেব্রুয়ারীর যৌথ আক্রমন আমাদের সূরা বাকারার ২:১১ নাম্বার আয়াতকে পুন:পাঠ করতে অনুপ্রাণিত করে। ওয়া = আর। ইযা কীলা = যখন বলা হয়। লাহুম = তাদের উদ্দেশ্যে। লা তুফসিদু = তোমরা ফাসাদ/ বিপর্যয় সৃষ্টি/ অশান্তি সৃষ্টি করো না। ফিল আরদি = পৃথিবীতে। ক্বলূ = তারা বলে। […]

March 3, 2026
ইবনে আশুরের “তাহরির ওয়া আল-তানভীর” বইয়ের রিভিউ

ভূমিকা ইবনে আশুর (১৮৭৯–১৯৭৩) ছিলেন টিউনিশিয়ার একজন বিশিষ্ট ইসলামিক চিন্তাবিদ। তিনি কুরআনের আধুনিক ও প্রায় সমন্বিত ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন তাহরির ওয়া আল-তানভীর (Tahrir wa al-Tanwir)–এ। প্রচলিত তাফসিরগুলো সাধারণত কেবল আইন (ফিকহ) বা ভাষাগত ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে। কিন্তু ইবনে আশুর দেখিয়েছেন কুরআন শুধু আধ্যাত্মিক নির্দেশনার বই নয়, বরং এটি একটি সভ্যতা গড়ার নীতি গ্রন্থ। তার […]

December 12, 2025
জিব্রাইল / গ্যাব্রিয়েল অর্থ কি? কোরআন থেকে বিশ্লেষণ

কুরআন গবেষক ড. সিরাজ ইসলামের গবেষণা ও লেখনী থেকে অনুবাদ জিব্রাইল হলেন আমাদের ভেতরে অনুপ্রেরণার শক্তি জিব্রাইল হলেন একটি কুরআনের রূপক (নোট ১) যা আমাদের মনের ভেতরে অনুপ্রেরণার প্রাকৃতিক শক্তিকে প্রতিনিধিত্ব করে। আমাদের গভীর চিন্তাভাবনার সময় এটি কার্যকর হয়ে ওঠে যখন এটি আমাদের কাছে সচেতনতা এবং অন্তর্দৃষ্টির ঝলক প্রকাশ করে। কুরআনে এই নামটি তিনবার এসেছে […]

June 7, 2025
শেষ জামানা সম্পর্কে কুরআন কি বলে?

শেষ জামানা বা আখিরুজ্জামান সম্পর্কে কুরআনে কি বলে? বিস্তারিত জানাচ্ছেন একজন কুরআনের স্কলার