আল কুরআনের আলোকে হিজাব

নারী-পুরুষের পোশাক ও পারস্পরিক যোগাযোগ শালীনতা ও শিষ্ঠাচারের নির্দেশনা

নারীর প্রকাশমান রূপসৌন্দর্যের পরিধি ও তার প্রকাশমানতার কারণ

নারীর প্রকাশমান রূপসৌন্দর্য সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক আয়াতসমূহের সমন্বিত অধ্যয়ন ও বাস্তবসম্মত যুক্তির ভিত্তিতে বুঝা যায় যে, এর পরিধি হচ্ছে ওজু করতে যে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধোয়া বা মাসেহ করার প্রয়োজন হয় তা। অর্থাৎ (১) সমস্ত মুখমণ্ডল (২) উভয় হাতের কনুই পর্যন্ত (৩) সমস্ত মাথা (৪) উভয় পায়ের টাখনু পর্যন্ত।

নিম্নে এর যুক্তি উপস্থাপন করা হলো:

(১) ওজুর অঙ্গসমূহ নারীর আওরাতের বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার উপযোগী বিষয় নয়। কারণ এগুলো নারীর নারীত্বের গঠনগত পার্থক্যের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের খুব কাছাকাছি অবস্থান করে না। এগুলো এমন নয় যে, নিছক তা খোলা রাখার কারণে পুরুষদের আকর্ষণ তৈরি হয়। এগুলো এমন নয় যে, পদচালনা বা পদাঘাতের কারণে তা অনাবৃত বা স্পষ্ট হয়ে পড়ে। এগুলো এমন নয় যে, ধর্মপণ্ডিতদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে ধর্মীয় নির্দেশনা হিসেবে গ্রহণ না করা অবস্থায় কোনো নারী অশালীনতা এড়াতে বা শালীনতা সংরক্ষণের জন্য এগুলোকে গোপনীয় তথা আবশ্যকীয়ভাবে ঢেকে রাখার যোগ্য অঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করবে। বিশেষ করে এর মধ্যে নারীর চেহারা একটা নারীর ব্যক্তিগত পরিচয়ে যেমন সে কার মা, বোন বা কন্যা?- সেই পরিচয়ে তাকে চেনার জন্য খোলা থাকাই স্বাভাবিক। এছাড়া চেহারা ঢেকে রাখার সাধারণ চর্চা থাকলে তা অপরাধীরা চেহারা ঢেকে অপরাধ সংঘটনের আশংকা তৈরি করে।

(২) সূরা মায়িদা ৫:৬ আয়াত অনুযায়ী ওজু করার জন্য সমস্ত মুখমণ্ডল ধৌত করতে হবে, উভয় হাত কনুই পর্যন্ত ধৌত করতে হবে, সমস্ত মাথা মাসেহ করতে হবে এবং উভয় পা টাখনু পর্যন্ত মাসেহ করতে হবে। এ থেকে বুঝা যায় যে, শরীরের এ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সাধারণভাবে খোলা রাখার সুযোগ রয়েছে, তাই তা সহজেই ধুলিমলিন হতে পারে, যা থেকে পরিচ্ছন্নতার জন্য এগুলোকে ওজুর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে যদি কখনো তা ঢাকা থাকে এবং সাধারণভাবে পরিষ্কার থাকে, তবুও ওজুর সর্বজনীন নিয়মানুসারে সালাতের শর্ত হিসেবে ওজু করতে হবে তথা এ অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো ধৌত ও মাসেহ করতে হবে। এ নিয়ম নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য প্রযোজ্য। যেহেতু এ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নারীদের আওরাতের বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সাথে সম্পর্কিত অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অংশ নয়, তাই নারীরা পুরুষের সামনে ওজু করতে পারবে না এমন কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। সুতরাং ওজুর বিধান অনুসারে যা উন্মুক্ত করা যেতে পারে সেই অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোই বিধিসঙ্গতভাবে প্রকাশমান সৌন্দর্যের অংশ।

(৩) বিশ্বের সাথে যোগাযোগ করার জন্য মানবদেহের পাঁচটি প্রাথমিক ইন্দ্রিয় রয়েছে। এগুলো হলো: ক. দৃষ্টি, খ. শ্রবণ, গ. গন্ধ, ঘ.স্বাদ এবং ঙ. স্পর্শ। এই প্রতিটি ইন্দ্রিয়ের অনন্য সেন্সিং ডিভাইস রয়েছে যা বিশেষ করে তাদের নিজ নিজ সেন্সিং ফাংশন সম্পন্ন করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। স্পর্শের অনুভূতি আমাদের শরীরের প্রতিটি অংশে ত্বক দ্বারা সম্পন্ন হয়। দৃষ্টি, শ্রবণ, গন্ধ এবং স্বাদের সেন্সরগুলি একটি নির্দিষ্ট জায়গায়, মানুষের মাথাতে কেন্দ্রীভূত। এর প্রাকৃতিক কারণ হলো, যেন এগুলো কোনো বাধা ছাড়াই সেরা কার্যকারিতায় কাজ করতে পারে সেজন্য সম্পূর্ণরূপে পরিবেশের সাথে উন্মুক্ত থাকতে পারে। অন্যকথায় মাথার সাথে সম্পর্কিত ইন্দ্রীয়সমূহের সর্বোত্তম কার্যকারিতার জন্য মাথা উন্মুক্ত থাকা একটি স্বাভাবিক বিষয়।

যদি আমাদের মুখ এবং নাক আমাদের বুকের উপর রাখা হতো যা মহিলাদের ঢেকে রাখতে হয়, তাহলে শার্ট/পোশাকের উপর দিয়ে শ্বাস নিতে অসুবিধা হতো, খেতে অসুবিধা হতো এবং আমাদের কণ্ঠস্বর এখনকার মতো স্পষ্ট শোনাতো না!

মানুষের মুখমণ্ডলে থাকা পেশীসমূহ কথা বলার সময় ব্যক্তির মানসিক অবস্থা প্রকাশ করার মতো অভিব্যক্তি তৈরি করে। যেমন কোনো বার্তার স্বীকৃতি, বিভ্রান্তি, বিস্ময়, আনন্দ, দুঃখবোধ ইত্যাদি। এটি যোগাযোগকে সাবলীল ও সুসংহত করতে সহায়ক হয়ে থাকে। এটিও মুখমণ্ডল খোলা রাখার একটি যৌক্তিক কারণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

সুতরাং আমরা প্রাকৃতিক কার্যকারণ যুক্তি বিবেচনার মাধ্যমেও “মা যহারা মিনহা” বা “রূপসৌন্দর্য থেকে যা স্বাভাবিক কারণে প্রকাশমান” এর পরিসর সম্পর্কে সাধারণ বোধ অর্জন করতে পারি। আর তা হলো মাথা ও মুখমন্ডল স্বাভাবিকভাবে খোলা রাখার যোগ্য এবং অনুরূপভাবে ওজুর সাথে সম্পর্কিত সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গই খোলা রাখা যেতে পারে, কারণ সাধারণ কার্য সম্পাদনে তা খোলা রাখা অনেক ক্ষেত্রে সহজতা তৈরি করে এবং তা অশালীনতা বুঝায় না।

কিন্তু ওজুর অঙ্গের চেয়ে বেশিমাত্রায় কোনো নারী সাধারণভাবে খোলা রাখবে না। যেমন আমরা সাবার রাণীর উদাহরণ থেকে দেখি যে, তিনি স্বচ্ছ কাঁচের মেঝেকে পানিপূর্ণ শৈল্পিক ডোবা মনে করে তা অতিক্রম করার প্রয়োজনে পায়ের গোছা উন্মুক্ত করেছিলেন। যা প্রমাণ করে যে, তাঁর পরিহিত শালীন পোশাকের দ্বারা তাঁর পায়ের গোছা ঢাকা ছিল এবং তিনি প্রয়োজন সাপেক্ষে তা উন্মুক্ত করেছিলেন। বস্তুত শালীনতার অংশ হিসেবে নারীদের পায়ের গোছা তাদের গোপনীয় বা ঢেকে রাখার যোগ্য যীনাতের অংশ, তা সাধারণভাবে প্রকাশমান যীনাতের অংশ নয়। আর ওজুর একটি অঙ্গ হিসেবে পায়ের টাখনু পর্যন্ত সাধারণভাবে প্রকাশমান থাকতে পারে, তা আবশ্যকীয়ভাবে ঢেকে রাখার যোগ্য নয়।

কণ্ঠাস্থি (Collar bone) একটি দৈহিক সীমা তৈরি করে যার নিচের অংশ নারীদের জুয়ূব বা বক্ষদেশের যীনাতের অন্তর্ভুক্ত। তাই নারীদেরকে অবশ্যই উঁচু গলার ব্লাউজ বা কামিজ পরা উচিত অথবা শাড়ি বা ওড়না এমনভাবে রাখা উচিত যেন তা ঢাকা যায়।

নারীদের বক্ষদেশের ওপর খিমার বা খুমুর পরার নির্দেশ

নারীদের ড্রেস কোড হিসেবে একটি বিশেষ নির্দেশ হলো- তাদেরকে তাদের বক্ষদেশের (জুয়ুব) ওপর ‘খিমার’ বা ‘খুমুর’ পরতে হবে।

এতে বক্ষদেশ বুঝাতে ‘জুয়ুব’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে যা ‘জায়ব’ শব্দের বহুবচন। ‘জায়ব’ শব্দটি ২৭:১২ ও ২৮:৩২ আয়াতে বক্ষদেশের পাশে থাকা (জামার) পকেট (জে’ব) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। (৭)


(৭) এছাড়া ‘জায়ব’ ক্রিয়াবিশেষ্য থেকে গঠিত ক্রিয়া ‘জাবূ’ অর্থ ‘তারা খোদাই করেছিলো’ (৮৯:৯:৩)


আর আয়াতে (২৪:৩১) ব্যবহৃত ‘খুমুর’ শব্দটি হলো ‘খিমার’ শব্দের বহুবচন। খিমার শব্দটির মূল অক্ষরসমূহ হলো ‘খ মীম র’। এ মূল অক্ষরসমূহ থেকে গঠিত ‘খামর’ শব্দের অর্থ হলো, মাদক যা মস্তিষ্ককে আচ্ছন্ন করে এবং প্রভাবকালীন সময়ে এর স্বাভাবিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটায়’। আর খিমার শব্দের দুটি প্রধান অর্থ (১) এমন কোনো বস্ত্রখণ্ড যা দ্বারা কোনো কিছুকে এমনভাবে ঢেকে দেয়া হয় যে, তার আকৃতিও অস্পষ্ট হয়ে পড়ে, (২) নারী ও পুরুষের মাথা ঢাকার ওড়না, স্কার্ফ বা পাগড়ি।

সাধারণভাবে cover (পর্দা) বুঝাতে ব্যবহৃত শব্দ হলো ‘গিত্বআ’ (যার মূল অক্ষরসমূহ হলো গাইন ত্ব ওয়াও), (দ্র: ১৮:১০১:৫, ৫০:২২:৯)। আর কোনো কিছুকে ঢেকে দেয়ার পাশাপাশি তার অবস্থা, প্রকৃতি বা আকৃতিকে অস্পষ্ট করে দেয়ার জন্য ব্যবহৃত হয় ‘খামর’ ও ‘খিমার’ (যার মূল অক্ষরসমূহ হলো খ মীম র), to cover and obscure the shape or condition of a thing।

খামার ও খিমারের মূল অর্থের ধারণা পেতে Lane’s Lexicon এ উল্লেখিত নিম্নের উদ্ধৃতিসমূহ লক্ষণীয়:
خَمَرٌ also signifies The becoming changed, or altered, from a former state or condition. (Ḳ.) You say, خَمِرَ الشَّىْءُ The thing became changed
مَا شَمَّ خِمَارَكَ, a prov., (TA,) [meaning] † What hath changed thee from the state in which thou wast? What hath befallen thee? (৮)


http://lexicon.quranic-research.net/data/07_x/137_xmr.html


বস্তুত মাথার ওড়না বা পাগড়িও খিমার, কিন্তু খিমার মানেই মাথার ওড়না বা পাগড়ি নয়। মরুভূমিতে মাথাকে ধুলিঝড় থেকে রক্ষা করার জন্য ‘খিমার’ ব্যবহার করা একটি স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু যখন ‘খিমার’ দ্বারা বক্ষদেশ ঢাকতে বলা হয় তখন তা দ্বারা মাথার ওড়না দ্বারাই বক্ষদেশ ঢাকাকে নির্দিষ্ট করা হয় না, বরং যে কোনো বস্ত্রখন্ড যা দ্বারা বক্ষদেশ ঢাকা যেতে পারে তা দ্বারা বক্ষদেশ ঢাকাকেই বুঝায়। এমনকি পোশাকের মধ্যে যদি এমন কোনো বস্তখণ্ডের সংযুক্তি থাকে যা শুধুমাত্র বক্ষদেশের ওপর এমনভাবে একটি দ্বিতীয় আবরণ তৈরি করে যে বক্ষদেশের আকৃতি অস্পষ্ট করতে তা যথেষ্ট হয় তাহলে তাও খিমার হিসেবে সাব্যস্ত হবে, যদিও তা মূল পোশাকের সাথে সেলাই করা থাকে এবং তা মাথার ওপর থেকে বা মাথাকেসহ আবৃত না করে।

যেহেতু মাথা বা চুল ঢাকার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়নি বা তা বাধ্যতামূলক করা হয়নি, তাই কোনো নারী যদি মাথা বা চুল ঢাকে তা যেমন সে করতে পারে, তেমনি কোনো নারী যদি মাথা বা চুল না ঢাকে তাও সে করতে পারে। যা আল্লাহ বাধ্যতামূলক করেননি, তাকে অন্য কেউ দ্বীনের বাধ্যতামূলক বিধান হিসেবে আরোপ করতে পারে না। অনুরূপভাবে, যা আল্লাহ নিষিদ্ধ করেন নি, অন্য কেউ সেটাকে দ্বীনের নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত করতে পারে না। তাই কোনো নারী যদি তার মাথা বা চুল খোলা রাখে, কেউ সেটাকে নিষিদ্ধ করার অধিকার রাখে না, যেমন কোনো নারী যদি মাথা বা চুল ঢেকে রাখে কেউ সেটাকে নিষিদ্ধ করার অধিকার রাখে না।

আয়াতটিতে যা ঢাকতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে তা হলো ‘বক্ষদেশ’ আর যা দিয়ে ঢাকতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে তাকে বলা হয়েছে ‘খিমার’। এখন কোনো নারী যদি পূর্ব থেকে তার মাথায় কোনো ‘খিমার’ পরা থাকে এবং এ আয়াতের নির্দেশ পালন করতে গিয়ে মাথার খিমারটি সম্পূর্ণ খুলে তা কাঁধ থেকে নিচের দিকে বক্ষদেশকে আবৃত করার জন্য কাজে লাগায় তাতেও সে আয়াতের নির্দেশটিই পালন করলো এবং সে কোনো নির্দেশ লঙ্ঘন করলো না। কারণ আয়াতে মাথা বা চুল ঢাকতে নির্দেশ দেয়া হয়নি এবং মাথার খিমার দিয়ে মাথাসহ বক্ষদেশ ঢাকতেও নির্দেশ দেয়া হয়নি। বরং যেকোনো খিমার দিয়ে বক্ষদেশকে ঢাকতেই নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, চুলকে আরবিতে শায়ার বলা হয়, যেমন ১৬:৮০:২১ আয়াতে শায়ার এর বহুবচন ‘আশআর’ ব্যবহৃত হয়েছে। আর মাথাকে রা’ছ বলা হয়, যেমন ২০:৯৪:৭ আয়াতে ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু ‘নারীদেরকে খিমার দ্বারা তাদের বক্ষদেশ ঢাকার’ নির্দেশের পাশাপাশি ‘শায়ার’ (চুল) বা রা’ছ (মাথা) ঢাকার জন্য কোনো নির্দেশ দেয়া হয়নি। তাই মাথা বা চুল ঢাকাকে বাধ্যতামূলক বলা যায় না এবং ‘খিমার’ বলতেও শুধুমাত্র ‘মাথার খিমার’ বুঝার কোনো অবকাশ নেই এবং ‘মাথার খিমার’ দ্বারা মাথা ও বক্ষদেশ উভয়ই ঢাকতে হবে বলে বুঝারও কোনো অবকাশ নেই।

এমনকি প্রচলিত হাদীসগ্রন্থ যেমন বুখারীতেও এ প্রসঙ্গে যা উল্লেখ করা হয়েছে তা থেকেও প্রতীয়মান হয় যে, ‘খিমার’ বলতে শুধুমাত্র মাথার ‘খিমার’ বুঝায় না, এবং যখন এ নির্দেশ নাযিল হয় তখন নারীরা তাদের বক্ষদেশ ঢাকার জন্য মাথার খিমার নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়নি।

এ সম্পর্কিত বুখারীর হাদীসে বলা হয়েছে: ৪৩৯৮। আবূ নু’আইম (রহঃ) … সাফিয়া বিনতে শায়বা (রহঃ) থেকে বর্ণিত। আয়শা (রাঃ) বলতেন, যখন এ আয়াত, “তাদের গ্রীবা ও বক্ষদেশ যেন ওড়না দ্বারা আবৃত করে” অবতীর্ণ হল তখন মুহাজির মহিলারা তাদের তহবন্দের পার্শ্ব ছিঁড়ে তা ওড়না হিসাবে ব্যবহার করতে লাগল। (৯)

হাদীসটির বিবরণ দাবি করে যে, মহিলারা মাথার স্কার্ফকে নয়, বরং কোমরে বাঁধা কাপড়কে ‘খুমুর’ হিসেবে বুঝেছে এবং সেটাকেই তারা বক্ষদেশ ঢাকার খুমুর হিসেবে ব্যবহার করেছে। তারা যে কাপড়কে ‘খুমুর’ হিসেবে বুঝেছে সেটাকে বুখারীর ৪৭৫৮ নং হাদীসে مُرُوْطَ হিসেবে এবং ৪৭৫৯ নং হাদীসে الْحَوَاشِيْ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, এবং এ উভয়টি ‘কোমরে বাঁধা কাপড়’ বুঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। আর এই কোমরে বাঁধা কাপড়কে তারা ‘খিমার হিসেবে ব্যবহার’ করেছে, যা বুঝাতে উভয় হাদীসে বলা হয়েছে فَاخْتَمَرْنَ بِهَا (তারা সেটাকে খিমার হিসেবে ব্যবহার করেছে)। নিম্নে হাদীস দুটির আরবি পাঠ ও একটি প্রচলিত অনুবাদ দেয়া হলো:

وَقَالَ أَحْمَدُ بْنُ شَبِيْبٍ حَدَّثَنَا أَبِيْ عَنْ يُوْنُسَ قَالَ ابْنُ شِهَابٍ عَنْ عُرْوَةَ عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ يَرْحَمُ اللهُ نِسَاءَ الْمُهَاجِرَاتِ الْأُوَلَ لَمَّا أَنْزَلَ اللهُ {وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلٰى جُيُوْبِهِنَّ} شَقَّقْنَ مُرُوْطَهُنَّ فَاخْتَمَرْنَ بِهَا

‘আয়িশাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ আল্লাহ্ তা‘আলা প্রাথমিক যুগের মুহাজির মহিলাদের উপর রহম করুন, যখন আল্লাহ্ তা‘আলা এ আয়াত “তাদের গ্রীবা ও বক্ষদেশ যেন ওড়না দ্বারা আবৃত করে” অবতীর্ণ করলেন, তখন তারা নিজ চাদর ছিঁড়ে তা দিয়ে মুখমণ্ডল ঢাকল। [৪৭৫৯] (আ.প্র. অনুচ্ছেদ, ই.ফা. অনুচ্ছেদ) (১০)


(৯) http://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=4680

(১০) http://ihadis.com/books/bukhari/hadis/4758


أَبُوْ نُعَيْمٍ حَدَّثَنَا إِبْرَاهِيْمُ بْنُ نَافِعٍ عَنِ الْحَسَنِ بْنِ مُسْلِمٍ عَنْ صَفِيَّةَ بِنْتِ شَيْبَةَ أَنَّ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا كَانَتْ تَقُوْلُ لَمَّا نَزَلَتْ هَذِهِ الْآيَةُ {وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلٰى جُيُوْبِهِنَّ} أَخَذْنَ أُزْرَهُنَّ فَشَقَّقْنَهَا مِنْ قِبَلِ الْحَوَاشِيْ فَاخْتَمَرْنَ بِهَا.

সফীয়্যাহ বিন্তে শাইবাহ (রহ.) থেকে বর্ণিতঃ ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলতেন, যখন এ আয়াত “তাদের গ্রীবা ও বক্ষদেশ যেন ওড়না দ্বারা আবৃত করে” অবতীর্ণ হল তখন মুহাজির মহিলারা তাদের তহবন্দের পার্শ্ব ছিঁড়ে তা দিয়ে মুখমণ্ডল ঢাকতে লাগল। [৪৭৫৮] (আ.প্র. ৪৩৯৬, ই.ফা. ৪৩৯৮) (১১)


(১১) http://ihadis.com/books/bukhari/hadis/4759


প্রচলিত অনুবাদে فَاخْتَمَرْنَ بِهَا (তারা সেটাকে খিমার হিসেবে ব্যবহার করেছে) এর স্থানে লেখা হয়েছে ‘তারা সেটা দ্বারা মাথার চুল ও মুখ ঢেকেছে’। যেখানে আয়াতের নির্দেশ হলো ‘বক্ষদেশ ঢাকা’, সেখানে ‘খিমার হিসেবে ব্যবহার করার’ অর্থ ‘বক্ষদেশ ঢাকা’ এর পরিবর্তে ‘মাথার চুল ও মুখ ঢাকা’ কীভাবে হতে পারে? প্রচলিত এ ধরনের অনুবাদ হাদীসের প্রথমাংশের সাথে দ্বিতীয়াংশের স্ববিরোধ তৈরি করে এবং এরূপ অনুবাদ গ্রহণযোগ্য নয়। বরং فَاخْتَمَرْنَ بِهَا (তারা সেটাকে খিমার হিসেবে ব্যবহার করেছে) এর সঠিক তাৎপর্য হবে, “তারা সেটাকে খিমার হিসেবে ব্যবহার করে বক্ষদেশ আবৃত করলো।”

উপরোক্ত হাদীসদ্বয় থেকে যে বিষয়টি প্রতীয়মান হয় তা হলো তৎকালীন সময়ে নারীরা ‘খুমুর’ দ্বারা বক্ষদেশ ঢাকার নির্দেশ পালনের জন্য পূর্ব থেকে মাথায় পরা কাপড়কে বক্ষদেশ ঢাকার জন্য ব্যবহার করাকে নয়, বরং যেকোনো বস্ত্রখণ্ড, যেমন কোমরে বাঁধা কাপড়ের অংশ কেটে নেওয়া টুকরো কাপড়কেও ‘খিমার হিসেবে ব্যবহার’ করার মাধ্যমে ঐ নির্দেশ পরিপালন করেছিলো। যেহেতু ‘খিমার’ দ্বারা বক্ষদেশ ঢাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, তাই তা পরিপালনস্বরূপ কোনো কাপড়কে ‘খিমার হিসেবে ব্যবহার’ করার মানেই হলো সেটাকে বক্ষদেশ ঢাকার জন্য ব্যবহার করা।

উপরোল্লেখিত আলোচনা থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ২৪:৩১ আয়াতটিতে নারীদেরকে তাদের খিমার বা খুমুর দ্বারা বক্ষদেশ ঢাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং খিমার বা খুমুর বলতে বুঝায় যেকোনো বস্ত্রখণ্ড যা দ্বারা বক্ষদেশকে এমনভাবে ঢাকা যায় যে, তাতে বক্ষদেশের আকৃতি অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। খিমার বা খুমুর বলতে শুধুমাত্র মাথার কাপড়কে বুঝায় না যা দ্বরা মাথা বা চুল ঢেকে রাখা হয়। এছাড়া মাথা বা চুল ঢাকতে হবে বলে কুরআন কোনো নির্দেশ দেয় না, তাই তা বাধ্যতামূলক নয়। তা সত্ত্বেও পরবর্তীকালে ধর্মীয় পণ্ডিতদের ব্যক্তিগত মাছালা বা ফতোয়া অনুসারে মাথা ও চুল ঢাকাকে আবশ্যকীয় মনে করা হয়েছে, প্রকৃতপক্ষে কুরআনে যার কোনো ভিত্তি নেই। সেই সাথে ধর্মীয় পণ্ডিতদের ব্যক্তিগত মাছালা ও ফতোয়ার অনুকূলে ‘খিমার’ বা ‘খুমুর’ বলতে ‘মাথার কাপড়, যা দ্বারা মাথা ও চুল ঢাকা হয়’ অনুবাদ করা হয়ে থাকে, যে অনুবাদের ফলে এ বিষয়ে ব্যাপকভাবে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে।

নবীর স্ত্রীদের গৃহে তাঁদের থেকে কিছু চাইতে হলে হিজাব বা পর্দার আড়াল থেকে চাওয়ার নির্দেশনা

৩৩:৫৩ আয়াতে নবীর স্ত্রীদের কাছ থেকে তাঁদের গৃহে কিছু চাওয়ার ক্ষেত্রে মু’মিনদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, “আর যখন তোমরা তাদের কাছে (তথা নবীর স্ত্রীদের কাছে) কোনো প্রয়োজনীয় তথ্য বা জিনিসের প্রার্থী হও, তখন হিজাবের (গৃহের অভ্যন্তরীণ কক্ষের পর্দার) আড়াল থেকে প্রার্থিতা প্রকাশ করো। সেটাই অধিক পবিত্র নিয়ম তোমাদের মনের জন্য এবং তাদের মনের জন্য।”

মনে রাখা দরকার যে সময়ের কনটেক্সটে এই আয়াত নাজিল হচ্ছে সেখানে নবী মুহাম্মদ স. একই সাথে রাসুল এবং রাষ্ট্রনায়ক। সুতরাং হেড অফ স্টেটের যে বিশেষ প্রোটোকল থাকে, সেটিকে মাথায় রেখে এই আয়াত বুঝলে আমরা আক্ষরিকতার চোরা বালিতে পড়বো না বলে আশা থাকে।

উপরোল্লেখিত আয়াতে কোন মু’মিন পুরুষদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে তার ব্যাখ্যা পাওয়া যায় পরবর্তীতে উল্লেখিত ৩৩:৫৫ আয়াত থেকে। আয়াতটিতে বলা হয়েছে, “তাদের পিতা, পুত্র, ভাই, ভাইয়ের পুত্র, বোনের পুত্র, তাদের নিজেদের (বিশ্বস্ত) নারী এবং তাদের কর্তৃক নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির আওতায় অধীনস্তগণের ক্ষেত্রে (অনুমতি সাপেক্ষে হিজাবের ভিতর সচরাচর যাতায়াতে) তাদের কোনো দোষ নেই।” এ থেকে বুঝা যায় যে, যেসব মু’মিন পুরুষ ৩৩:৫৫ আয়াতে উল্লেখিত শ্রেণিভুক্ত নয়, এমন মু’মিন পুরুষদেরকেই নির্দেশ দেয়া হয়েছে নবীর গৃহে তার স্ত্রীদের কাছে হিজাবের (তাঁদের গৃহের অভ্যন্তরীণ কক্ষের পর্দার) বাহির থেকে কিছু চাইতে হবে, সরাসরি তাঁদের ব্যক্তিগত কক্ষে প্রবেশ করা যাবে না।

এখানে একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, এতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে মু’মিন পুরুষদেরকে, নবীর স্ত্রীদেরকে নয়। মু’মিন পুরুষরা তাঁদের ব্যক্তিগত কক্ষে প্রবেশ করবে না, কিন্তু তাঁরা তাঁদের ব্যক্তিগত কক্ষের বাইরে আসতে পারবেন না বা মু’মিন পুরুষদের সামনে আসতে পারবেন না- এরূপ নির্দেশ দেয়া হয়নি।

নবীর স্ত্রীদেরকে মু’মিনদের মায়ের মর্যাদায় অভিষিক্ত করা হয়েছে (৩৩:৬) এবং তাঁদেরকে নবীর পরবর্তীতে অন্য কেউ বিয়ে করাকে অবৈধ করা হয়েছে (৩৩:৫৩)। নবীর স্ত্রীদের এই মাতৃত্বের মর্যাদা একটি বিশেষায়িত মর্যাদা, যা আল্লাহর ঘোষণার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটি একটি বিশেষ প্রোটোকল বা মর্যাদার প্রসঙ্গ। আধুনিক কনটেক্টটে আমরা রাষ্ট্র প্রধানের স্ত্রীকে অনেক দেশে ফার্স্ট লেডী বলা হয় যা বিশেষ মর্যাদার আখ্যা বা উপাধি। মু’মিনদের মধ্যে তাঁদের এই মর্যাদার মনোভাব যথাযথ রাখতে এবং সচরাচর তাঁদের ব্যক্তিগত কক্ষে ঢুকে পড়ার প্রেক্ষিতে যেন তাঁদের মনেও কোনো মু’মিনের প্রতি বিরক্তিবোধের সৃষ্টি না হতে পারে সেজন্য বলা হয়েছে যে, এ নিয়ম মু’মিনদের ও নবীর স্ত্রীদের মনের জন্য অধিক পবিত্র নিয়ম।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, কোনো নিয়মকে ‘অধিক পবিত্র’ (আতহার) বলার একমাত্র অর্থ ‘যৌন আকর্ষণ থেকে নিরাপদ থাকা’কে বুঝায় না। বরং যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত মানসিক ভাবান্তর ও পরিস্থিতি এড়ানো প্রসঙ্গে তা বলা যায়। যেমন: ২:২৩২ আয়াতে তালাকপ্রাপ্তা নারীকে তার প্রস্তাবিত স্বামীর সাথে বিবাহের ক্ষেত্রে বাধা প্রদান না করাকে ‘আতহার’ বা ‘অধিক পবিত্র’ নিয়ম বলা হয়েছে এবং ৫৮:১২ আয়াতে সমষ্টিগত অবস্থা থেকে ভিন্নভাবে রসূলের সাথে একাকী কথা বলার সময় নেয়ার জন্য পূর্বে ‘সদাক্বাহ’ জমা দেয়ার বিধানকে ‘আতহার’ বা ‘অধিক পবিত্র’ নিয়ম বলা হয়েছে।

নারীদের কাছে তাদের গৃহে কোনো তথ্য বা বস্তুসামগ্রী চাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের অভ্যন্তরীণ কক্ষের পর্দার আড়াল থেকে চাওয়ার বিষয়টি নবীর স্ত্রীদের প্রসঙ্গে এসেছে, সর্বসাধারণ নারীদের প্রসঙ্গে নয়। যদিও এ থেকে সবার জন্য অনুপ্রেরণা ও শিক্ষা রয়েছে। কিন্তু কুরআনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নবীর স্ত্রীরা সাধারণ নারীদের মত নয়। তাই স্বাভাবিকভাবে মু’মিনদের জন্য সাধারণ নারীদের ক্ষেত্রে এ বিষয়ে তাদের অনুমতি সাপেক্ষে নমনীয়তার অবকাশ রয়েছে।

হিজাব নারীদের পোশাক এবং সমস্ত শরীর বা মাথা, চুল ও মুখ ঢাকার সাথে সম্পর্কিত নয়

৩৩:৫৩ আয়াতে প্রদত্ত নবীর স্ত্রীদের কাছ থেকে কোনো মু’মিন পুরুষ যদি কোনো জিনিস চায় তবে তারা তা হিজাবের আড়াল থেকে চাইতে হবে- এই নির্দেশনা থেকে নারীদের জন্য হিজাব পরিধান করাকে বাধ্যতামূলক বলে দাবি করা হয়। আর প্রচলিত অর্থে হিজাব বলতে বুঝানো হয় বোরখা বা এজাতীয় পোশাক যা দ্বারা নারীদের মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢাকা থাকবে (চোখ জোড়া ছাড়া) অথবা সংকীর্ণ অর্থে হিজাব বলতে বুঝানো হয় যা দ্বারা নারীদের মাথা, চুল ও মুখ ঢেকে রাখা হবে। অথচ আয়াতটিতে এরূপ কোনো নির্দেশনা নেই।

বস্তুত হিজাব নারীদের পোশাক এবং সমস্ত শরীর বা মাথা, চুল ও মুখ ঢাকার সাথে সম্পর্কিত নয়। বরং গৃহের হিজাব হচ্ছে গৃহের কোনো কক্ষের দরজায় টানানো পর্দা অথবা যে পর্দার মাধ্যমে গৃহের মধ্যে আলাদা কক্ষ তৈরি হয়। যেমন, কারো গৃহে তাদেরকে সালাম জানিয়ে ও তাদের অনুমতি সাপেক্ষে প্রবেশের সাধারণ অনুমতি রয়েছে (২৪:২৭)। আর হিজাব সম্পর্কিত আয়াতটিতে (৩৩:৫৩) নবীর গৃহে নবীর স্ত্রীদের কাছ থেকে কিছু চাওয়ার বিষয়ে হিজাবের আড়াল থেকে চাওয়ার কথা বলা হয়েছে এবং মু’মিন পুরুষরা যে নবীর গৃহে যেতে পারবে ও খেতে পারবে তাও আয়াতটিতে স্পষ্ট। সুতরাং এটি গৃহের অভ্যন্তরীণ কক্ষের সাথে সম্পর্কিত বা নবীর স্ত্রীদের ব্যক্তিগত কক্ষের সাথে সম্পর্কিত।

যদি হিজাবকে সমস্ত শরীর ঢাকার পোশাক অথবা মাথা, চুল ও মুখ ঢাকার পর্দা হিসেবে মেনে নেওয়া হয়, তাহলেও প্রশ্ন হলো, ৩৩:৫৩ আয়াতে কাদেরকে হিজাবের আড়াল থেকে চাইতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে? অর্থাৎ নির্দেশটি মু’মিন পুরুষদের প্রতি না নবীর স্ত্রীদের প্রতি? আয়াতটিতে স্পষ্টভাবে মু’মিন পুরুষদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সুতরাং একটি পোশাক বা মুখ ঢাকার পর্দা হিসেবে হিজাব পরিধান করা আবশ্যক হলে সেই নির্দেশটি নবীর স্ত্রীদের প্রতি নয়, বরং মু’মিন পুরুষদের প্রতি আরোপিত হয়। অন্য কথায়, সেক্ষেত্রে হিজাব দ্বারা সমস্ত শরীর এবং মাথা, চুল ও মুখ ঢাকার দায়িত্ব পুরুষদের উপর প্রযোজ্য হয়, তা নারীর পোশাক হিসেবে প্রযোজ্য হয় না।

বস্তুত হিজাবের আড়াল থেকে চাইতে আদেশ দেয়া হয়েছে মু’মিন পুরুষদেরকে এবং হিজাব সম্পর্কিত সকল ব্যবহার থেকে স্পষ্ট যে, এটি পোশাক বা মাথা, চুল ও মুখ ঢাকার কাপড়ের সাথে সম্পর্কিত নয়। না মু’মিন পুরুষদেরকে হিজাব পরিধান করতে এবং মাথা, চুল ও মুখ ঢাকতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, আর না নারীদেরকে হিজাব পরিধান করতে এবং মাথা, চুল ও মুখ ঢাকতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

হিজাব শব্দটি বস্তুগত ও অবস্তুগত বা মনস্তাত্ত্বিক পর্দা উভয় অর্থে ব্যবহৃত হয়, যা হিজাবের দুই পাশের ব্যক্তি বা বস্তুর মধ্যে আড়াল বা বাধার সৃষ্টি করে। হিজাব শব্দটি অন্য যেসব আয়াতে ব্যবহৃত হয়েছে নিম্নে সেগুলো উল্লেখ করা হলো:

وَبَيْنَهُمَا حِجَابٌ وَعَلَى الْأَعْرَافِ رِجَالٌ يَعْرِفُونَ كُلًّا بِسِيمَاهُمْ وَنَادَوْا أَصْحَابَ الْجَنَّةِ أَن سَلَامٌ عَلَيْكُمْ لَمْ يَدْخُلُوهَا وَهُمْ يَطْمَعُونَ

৭:৪৬ :: আর তাদের (জান্নাতবাসীদের ও জাহান্নামবাসীদের) মধ্যবর্তীতে হিজাব (প্রতিবন্ধক পর্দা) থাকবে। আর কিছু লোক থাকবে আ’রাফে, যারা সবাইকে তাদের লক্ষণসমূহ দ্বারা চিনতে পারবে। আর তারা জান্নাতবাসীদেরকে ঢেকে বলবে, “আপনাদের উপর সালাম/শান্তি।” তারা তাতে প্রবেশ করেনি কিন্তু তারা আশাবাদী থাকবে।

وَإِذَا قَرَأْتَ الْقُرْآنَ جَعَلْنَا بَيْنَكَ وَبَيْنَ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِالْآخِرَةِ حِجَابًا مَّسْتُورًا

১৭:৪৫ :: আর যখন তুমি কুরআন পাঠ করো তখন আমরা তোমার এবং যারা আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে না তাদের মধ্যে এক প্রচ্ছন্ন হিজাব (পর্দা) স্থাপন করি।

فَاتَّخَذَتْ مِن دُونِهِمْ حِجَابًا فَأَرْسَلْنَا إِلَيْهَا رُوحَنَا فَتَمَثَّلَ لَهَا بَشَرًا سَوِيًّا

১৯:১৭ :: তারপর সে (মারইয়াম) তাদের থেকে হিজাব (পর্দার অন্তরাল) গ্রহণ করলো। তারপর আমি তার নিকট আমার রুহকে (জিবরীল) পাঠালাম, সে তার নিকট পূর্ণ মানবাকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করলো।

فَقَالَ إِنِّي أَحْبَبْتُ حُبَّ الْخَيْرِ عَن ذِكْرِ رَبِّي حَتَّىٰ تَوَارَتْ بِالْحِجَابِ

৩৮:৩২ :: সে (সুলাইমান) বললো, “আমি আমার প্রভুর স্মরণে কল্যাণকর সম্পদের ভালবাসাকে পছন্দ করেছি”- যতক্ষণ না সেগুলো (যুদ্ধের ঘোড়াগুলো) হিজাবের (পর্দা) আড়ালে চলে গেলো।

وَقَالُوا قُلُوبُنَا فِي أَكِنَّةٍ مِّمَّا تَدْعُونَا إِلَيْهِ وَفِي آذَانِنَا وَقْرٌ وَمِن بَيْنِنَا وَبَيْنِكَ حِجَابٌ فَاعْمَلْ إِنَّنَا عَامِلُونَ

৪১:৫ :: আর তারা (কাফিররা) বললো, “তুমি (মুহাম্মাদ) আমাদেরকে যেটার দিকে সেই বিষয়ে আমাদের অন্তর রক্ষিত রয়েছে (আমাদের অন্তরে কুরআনের কোনো প্রভাব পড়বে না) এবং আমাদের কানে বধিরতা রয়েছে আর আমাদের ও তোমার মধ্যে একটি হিজাব (পর্দা) রয়েছে। সুতরাং তুমি (তোমার কাজ) করতে থাকো এবং নিশ্চয় আমরাও (আমাদের কাজে) কর্মরত।”

وَمَا كَانَ لِبَشَرٍ أَن يُكَلِّمَهُ اللَّهُ إِلَّا وَحْيًا أَوْ مِن وَرَاءِ حِجَابٍ أَوْ يُرْسِلَ رَسُولًا فَيُوحِيَ بِإِذْنِهِ مَا يَشَاءُ إِنَّهُ عَلِيٌّ حَكِيمٌ

৪২:৫১ :: আর কোনো মানুষের জন্য সম্ভব নয় যে, আল্লাহ তার সাথে বাক্যালাপ করবেন, এছাড়া যে, তা হবে ওয়াহী (অনুপ্রেরণা), অথবা হিজাবের (পর্দা) আড়াল থেকে অথবা তার কাছে কোনো রসূল পাঠাবেন যাতে সে (রসূল) তার কাছে ঐ ওয়াহী (অনুপ্রেরণা) দেয় তাঁর (আল্লাহর) অনুমতিক্রমে, যা তিনি ইচ্ছা করেন। নিশ্চয় তিনি মহাজ্ঞানী, মহাবিজ্ঞ।

বিশেষ পরিস্থিতিতে নারীদেরকে বাইরে যাতায়াতকালে জিলবাব (চাদর) পরিধানের নির্দেশ

৩৩:৫৯ আয়াতে বিশেষ পরিস্থিতিতে নারীদেরকে বাইরে যাতায়াতকালে জিলবাব (চাদর) পরিধানের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আয়াতটির বিশেষ পরিস্থিতি বুঝার জন্য ৩৩:৫৯-৬২ আয়াত একসাথে দেখা প্রয়োজন। নিম্নে আয়াতগুলো উল্লেখ করা হলো:

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِّأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَابِيبِهِنَّ ذَٰلِكَ أَدْنَىٰ أَن يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا

৩৩:৫৯ :: হে নবী, তোমার স্ত্রীদেরকে এবং তোমার কন্যাদেরকে এবং মু’মিনদের নারীদেরকে বলো, যেন তারা তাদের উপর তাদের জিলবাব/ চাদর জড়িয়ে রাখে। এটাই এ সম্ভাবনার নিকটতর যে, তাদেরকে চিনতে পারা যাবে (বিশেষ মর্যাদা বা প্রোটোকলের পূর্বশর্ত হলো চেনা), ফলে তাদেরকে কষ্ট দেয়া (হয়রানি করা) হবে না। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল দয়ালু।

لَّئِن لَّمْ يَنتَهِ الْمُنَافِقُونَ وَالَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ وَالْمُرْجِفُونَ فِي الْمَدِينَةِ لَنُغْرِيَنَّكَ بِهِمْ ثُمَّ لَا يُجَاوِرُونَكَ فِيهَا إِلَّا قَلِيلًا

৩৩:৬০ :: যদি (এখন থেকে) মুনাফিক্বরা এবং যাদের মনে রোগ রয়েছে তারা এবং যারা শহরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ভীষণভাবে কাঁপিয়ে তোলে তারা (মুরজিফুন)(যৌন হয়রানি করা থেকে) বিরত না থাকে, তাহলে আমি তোমাকে তাদের বিষয়ে তেজোদ্দীপ্ত করবো, তারপর তারা স্বল্প সময় ব্যতীত তোমার প্রতিবেশি হিসেবে থাকতে পারবে না।

مَّلْعُونِينَ أَيْنَمَا ثُقِفُوا أُخِذُوا وَقُتِّلُوا تَقْتِيلًا

৩৩:৬১ :: (তাও থাকবে) অভিশপ্ত অবস্থায়। তাদেরকে যেখানেই পাওয়া যাবে, পাকড়াও করা হবে এবং একে একে তাদের সকলকে হত্যা করা হবে (মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে)।

سُنَّةَ اللَّهِ فِي الَّذِينَ خَلَوْا مِن قَبْلُ وَلَن تَجِدَ لِسُنَّةِ اللَّهِ تَبْدِيلًا

৩৩:৬২ :: ইতোপূর্বে যারা অতীত হয়েছে তাদের ক্ষেত্রেও এটাই ছিল আল্লাহর সুন্নাত (দণ্ডবিধি)। আর তুমি আল্লাহর সুন্নাতে (মূলনীতি বা বিচারনীতিতে) কোনো পরিবর্তন পাবে না।

উপরোল্লেখিত আয়াতসমূহ থেকে স্পষ্ট যে, এতে আধুনিক কনটেক্সটে রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে অথবা নবী হিসেবে তার গৃহের নারীদের যে বিশেষ মর্যাদা তার প্রসঙ্গে তাদের বিশেষ ড্রেসকোড ও প্রোটোকলের নির্দেশনা রয়েছে।

সাধারণ অবস্থায় নারীরা লজ্জা নিবারণ এবং বক্ষদেশের ওপর উহার আকৃতিকে অস্পষ্ট করে দেয়ার মতো ওড়না বা বস্ত্রখণ্ড পরিধানের পাশাপাশি অনুমোদিত শ্রেণির বাইরে অন্য পুরুষদের সামনে যাতায়াতের ক্ষেত্রে যা সাধারণভাবে বা বিধিসঙ্গতভাবে প্রকাশযোগ্য তথা ওজুর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছাড়া তাদের রূপসৌন্দর্য ঢেকে রাখাই যথেষ্ট, যা ২৪:৩১ আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে।

আয়াতটিতে যে বিশেষ পোশাক পরিধান করতে বলা হয়েছে তার নাম হিসেবে ‘জালাবীব’ (جَلَابِيب) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। ‘জালাবীব’ শব্দটি ‘জিলবাব’ (جِلْبَاب) শব্দের বহুবচন। ‘জিলবাব’ শব্দটি ‘জালবাবা’ ক্রিয়া থেকে গঠিত এবং ‘জালবাবা’ ক্রিয়ার ত্রিআক্ষরিক মূল ক্রিয়া হলো ‘জালাবা’।

Lane’s Lexicon এ ‘জালাবা’ ক্রিয়ার যেসব অর্থ সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে তার মধ্যে যে অর্থে শব্দটি কুরআনে ব্যবহৃত হয়েছে নিম্নে তা তুলে ধরা হলো:
It is said in a well known prov., جَلَبَتْ جَلْبَةً ثُمَّ أَمْسَكَتْ It, i. e. a cloud (سَحَابَة), thundered, then refrained from raining: applied to a coward, who threatens, and then is silent.

وَأَجْلِبْ↓ عَلَيْهِمْ, in the Ḳur [xvii. 66], means: And collect thou against them [thy forces], and threaten them with evil.

কুরআনে ১৭:৬৪ আয়াতে হুমকি সৃষ্টির অর্থে ‘জালাবা’ ক্রিয়াটিকে নির্দেশবাচক ক্রিয়া ‘আজলিব’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

এছাড়া, ‘জিলবাব’ এর তাৎপর্য নির্ণয়ের জন্য Lane’s Lexicon এ ‘জালাবা’ ক্রিয়ার যেসব অর্থ রয়েছে তা থেকে আরেকটি বিবেচনাযোগ্য অর্থ নিম্নরূপ:

جَلَبَ, aor. ـِ {يَجْلِبُ} and ـُ {يَجْلُبُ}, (Ṣ, Ḳ,) It (a wound) healed: (Ḳ:) or it (an ulcer, Aṣ, or a wound, Ṣ) became covered with a skin in healing: (Aṣ, Ṣ:)

আর ‘জিলবাব’ শব্দটি যে ক্রিয়া (জালবাবা) থেকে এসেছে Lane’s Lexicon এ তার অর্থটি যেভাবে লেখা হয়েছে তা নিম্নরূপ:

جَلْبَبَهُ, (Ḳ,) or جلببهُ جِلْبَابًا, (TA,) … He put on him a garment of the kind called جِلْبَاب. (Ṣ, Ḳ.) (১২)


(১২) http://lexicon.quranic-research.net/data/05_j/121_jlb.html


উপরোল্লেখিত বিশ্লেষণ অনুসারে ‘জালাবীব’ বা ‘জিলবাব’ শব্দটি ত্রিআক্ষরিক শব্দমূল ‘জীম লাম বা’ এর সাথে সম্পর্কিত এবং কুরআনে এ শব্দমূল থেকে দুটি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, একটি হলো ‘আজলিব’ যার অর্থ ‘হুমকি সৃষ্টি করো’ এবং অন্যটি হলো ‘জালাবীব’ (যার একবচন ‘জিলবাব’)। যে ধরনের পরিস্থিতিতে এবং যে উদ্দেশ্যে নারীদেরকে ‘জিলবাব’ পরতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে সেই প্রেক্ষিতে ‘জিলবাব’ এর অর্থ দাঁড়ায় “এমন চাদর, অতিরিক্ত পরিধেয় প্রশস্ত কাপড় বা বিশেষ ধরনের পরিচায়ক বাইরের পোশাক যা হুমকি প্রতিরোধক হতে পারে এবং নৈরাজ্যকারীদেরকে হুমকির সম্মুখীন করতে পারে”।

আয়াতটিতে (৩৩:৫৯) নবীর স্ত্রী ও কন্যাদের সাথে মু’মিন নারীদেরকেও জিলবাব পরিধানের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মু’মিনদের ক্ষমতায়নের সময়কালে মু’মিনরা মূলত রসূলের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও পরামর্শ পরিষদেরই সদস্য, যা অন্যান্য সাধারণ নাগরিকদের তুলনায় প্রাধিকার দাবি করে। বস্তুত রসূল ও মু’মিন নারীরা যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার মতো পরিস্থিতি এমন একটি পরিস্থিতিকেই প্রকাশ করে, যাতে একটি রাষ্ট্র অকার্যকর রাষ্ট্র হিসেবে পরিগণ্য হয়। যারা রাষ্ট্রের সর্বাধিক নিরাপত্তায় থাকার কথা তাদের নিরাপত্তা বিনষ্ট হওয়া রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়ার লক্ষণ। তাই এক্ষেত্রে নবীর স্ত্রী, কন্যাগণ ও মু’মিন নারীদেরকে নিজেদের সুরক্ষার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

সুতরাং এ আয়াতগুলো কিছু জরুরি পরিস্থিতি ও বিশেষ প্রোটোকল বা মর্যাদার সাথে সম্পর্কিত, যা যেকোনো সাধারণ পরিস্থিতিতে সমান কঠোরতার সাথে প্রয়োগের উপযোগিতা দাবি করে না।

জিলবাব (চাদর) পরিধান বলতে নারীদের সমস্ত শরীর ঢাকা এবং মাথা, চুল ও মুখ ঢাকাকে বুঝায় না

৩৩:৫৯ আয়াতে নারীদেরকে জিলবাব পরিধানের বিষয়ে দেয়া নির্দেশনাতে বলা হয়েছে “ইউদনীনা আলাইহিন্না মিন জালাবীবিহিন্না” (তাদেরকে নিকটবর্তী করতে/ টেনে নিতে/ জড়িয়ে রাখতে/ ঝুলিয়ে দিতে হবে তাদের উপরে তাদের জিলবাব/ চাদর)।

নির্দেশনাটি বুঝার জন্য কয়েকটি লক্ষণীয় বিষয় হলো:

১. আয়াতে ব্যবহৃত ‘জালাবীব’ শব্দটি হলো ‘জিলবাব’ (চাদর) শব্দের বহুবচন।
২. আয়াতে তাদের উপর চাদর জড়িয়ে নেয়ার জন্য ব্যবহৃত শব্দ হলো ‘আলাইহিন্না’ যার অর্থ হলো ‘তাদের (নিজেদের) উপর’।
৩. চাদর জড়িয়ে নেয়ার জন্য দেয়া নির্দেশের শব্দটি হলো ‘ইউদনীনা’। ইউদনীনা শব্দটির মূল অক্ষরসমূহ হলো ‘দাল নূন ওয়াও’। এ মূল অক্ষরসমূহ থেকে গঠিত শব্দের অর্থ হলো ‘নিকটবর্তী, কম, ঝুলন্ত’। এ মূল অক্ষরসমূহ থেকে গঠিত যেসব শব্দ কুরআনে ব্যবহৃত হয়েছে তা হলো:
(ক) দান (دَان) ও দানিয়াহ (دَانِيَة), যার অর্থ হলো: নিকটবর্তী, ঝুলন্ত।
(খ) দুনিয়া (دُّنْيَا), যার অর্থ হলো: দুনিয়া, পার্থিব, ইহলোক, নিকটবর্তী
(গ) আদনা (أَدْنَىٰ), যার অর্থ হলো: অধিক নিকটবর্তী।
(ঘ) দানা (دَنَا), ক্রিয়া, ক্রিয়ারূপ ১, যার অর্থ হলো: সে নিকটবর্তী হলো।
(ঙ) ইউদনীনা (يُدْنِينَ), ক্রিয়া, ক্রিয়ারূপ ৪, যার অর্থ হলো: তারা নিকটবর্তী করবে, তারা জড়িয়ে নিবে, তারা টেনে নিবে, তারা ঝুলিয়ে দেবে ইত্যাদি।

সুতরাং আয়াতটিতে তাদের নিজেদের উপর চাদরকে নিকটবর্তী করা বা জড়িয়ে নেয়া বা ঝুলিয়ে দেয়ার কথা বলা হয়েছে। এতে তাদের মাথার উপর থেকে পা পর্যন্ত ঢেকে দেয়ার কথা বলা হয়নি। বরং স্বাভাবিক বক্তব্যভঙ্গি থেকে সাধারণভাবে শরীরকে জড়িয়ে নেয়ার কথা বুঝা যায়, যা ঘাড় বা কাঁধ থেকে নিচের দিকে প্রলম্বিত হতে পারে। সুতরাং জিলবাব বা চাদর পরিধান করার নির্দেশের মাধ্যমে মাথা, চুল ও মুখ ঢাকাকে বাধ্যতামূলক করা হয়নি।

জিলবাব পরিধানের নির্দেশটির উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে যে, “এটাই এ সম্ভাবনার নিকটতর যে, তাদেরকে চিনতে পারা যাবে, ফলে তাদেরকে কষ্ট দেয়া (হয়রানি করা) হবে না।”। এ থেকে স্পষ্ট হয় যে, জিলবাব পরিধানের নির্দেশটি এমনভাবে পরিপালন করতে বলা হয়নি যাতে তাদেরকে চেনা না যায়। বরং জিলবাব পরিধান অবস্থায় তাদেরকে মার্জিত ব্যক্তিত্বসম্পন্না বা বিশেষ মর্যাদার ব্যক্তিত্ব হিসেবে চেনা যাবে, এমনভাবে জিলবাব পরিধান করতে হবে।

যারা মুখ ঢেকে ফেলে তাদেরকে অনিবার্যভাবে চেনা সহজ নয়। কারণ কেউ ভুলবশত ধর্মীয় নির্দেশনা মনে করে যেমন মুখ ঢেকে রাখে, অনুরূপভাবে যারা অশালীনতায় যুক্ত কিন্তু নিজেকে সবার কাছে ব্যক্তিগতভাবে চেনাতে চায় না যে, সে কে? কার মা, বোন বা কন্যা?- তারাও মুখ ঢেকে রাখে। অন্যদিকে যারা সত্যিই শালীনতা রক্ষা করে তারা কখনোই পোশাক-আশাক ও চালচলনে অশালীন হয় না এবং নিয়মিত শালীন পোশাক পরে থাকে।

সুতরাং জিলবাব পরিধানের উদ্দেশ্য সম্পর্কিত বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয় যে, এটি নারীরা বিশেষ প্রোটোকল বা মর্যাদার সাথে বাইরে যাতায়াতের সাথে সম্পর্কিত এবং তারা এমনভাবে জিলবাব পরিধান করবে যাতে তাদেরকে চেনা যায় এবং এমন শালীন ও উন্নত ব্যক্তিত্ত্বসম্পন্না হিসেবে চেনা যায় যার ফলে তাদেরকে হয়রানি না করার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

>>  পরবর্তী পৃষ্ঠায় যাওয়ার জন্য ক্লিক করুন