
১৯৫০ সালের পরে প্রাণহানির দিক থেকে তুরস্ক-সিরিয়ার ৬ই ফেব্রুয়ারীর ভূমিকম্প অন্যতম বৃহৎ। ভূমিকম্পের ৭ দিন পর মোট মৃতের সংখ্যা ত্রিশ হাজার ছাড়িয়ে গেছে বলে মিডিয়ার রিপোর্ট করছে। প্রকৃত মৃত্যুর সংখা আরো বাড়বে এবং সঠিক হিসাব জানতে হয়তো আরো সময় লেগে যাবে কেননা অনেক বিল্ডিং এখনো ধ্বংসস্তুপ যেগুলো সরাতে দীর্ঘ সময় লাগবে।
স্মরণকালের এই ভয়াবহ ভূমিকম্প মিডিয়ার কল্যানে অনেক কাভারেজ পেয়েছে। টিভিতে, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রায় ২৪ ঘন্টাই বিশ্ববাসী ভূমিকম্পের পরের দৃশ্য, হতাহতের উদ্ধার কাজ, অগ্রগতি ইত্যাদি দেখেছে।
স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বাসীদের অনেকেই অন্যান্য প্রাকৃতিক দূর্যোগের মতো এই ভূমিকম্পকে ”আল্লাহর গজব” আখ্যায়িত করার দিকে ঝুঁকেছে। অথচ এই ভূমিকম্পের প্রকৃত বাস্তবতা ভিন্ন যা প্রধান প্রধান কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত মিডিয়াগুলোতে আসেনি (তেল ও গ্যাস কোম্পানী পৃথিবীর সবেচেয়ে প্রভাবশালী কোম্পানী ও সবচেয়ে ধনী হওয়ায় তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধের কিছুই তারা মেইনস্ট্রিম নিউজে আসতে দেয় না।)। আর সে কারনটি হলো হাইড্রোলিক ফ্র্যাকচারিং বা সংক্ষেপে ফ্র্যাকিং নামের এক বিপজ্জনক ও বিতর্কিত তেল গাস অনুসন্ধান পদ্ধতি। তুরস্কে যেখানে ভূমিকম্প হয়েছে সেগুলো সবই তেল ও গ্যাস খনিগুলোর খুব কাছাকাছি যেখানে ২০১৯ সাল থেকে হাইড্রোলিক ফ্র্যাকচারিং বা সংক্ষেপে ফ্র্যাকিং পদ্ধতি চালু হয়েছে।
ফ্র্যাকিং যে ইনডিউসড ভূমিকম্প তৈরী করে তা প্রমাণিত এবং ভালোভাবে ডকুমেন্টেড।
হাইড্রোলিক ফ্র্যাকচারিং কি?
হাইড্রোলিক ফ্র্যাকচারিং, যা সাধারণত ফ্র্যাকিং নামে পরিচিত, গভীর ভূগর্ভস্থ গঠন থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস এবং তেল আহরণের একটি পদ্ধতি। এতে উচ্চ চাপে পানি, বালি এবং রাসায়নিক পদার্থের মিশ্রণকে ভূমি গর্ভের শিলার গভীরে প্রবেশ করানো হয় যাতে ফাটল তৈরি হয়, যা আটকে থাকা গ্যাস বা তেলকে কূপের দিকে আরও অবাধে প্রবাহিত করতে দেয়।

খাবার পানির উৎসে দূষণ, বায়ু দূষণ এবং শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস মিথেন নিঃসরণ সহ পরিবেশের উপর এর প্রভাব সম্পর্কে উদ্বেগের কারণে প্রক্রিয়াটি বিতর্কিত। মাটিতে উচ্চচাপে প্রচুর পরিমাণে পানি পাম্প করার কারণে হাইড্রোলিক ফ্র্যাকচারিংয়ে ভূমিকম্পের ঝুঁকিও তৈরী হয় এটা বিজ্ঞানী মহলে স্বীকৃত। এ নিয়ে তদন্ত, গবেষনা ও রিপোর্ট যথেস্ট রয়েছে।
কিভাবে ফ্র্যাকিং ভূমিকম্প তৈরী করে?
তুরস্কে ফ্র্যাকিং
তেল ও গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর একটি পদ্ধতি হিসেবে হাইড্রোলিক ফ্র্যাকচারিং ১৯৪০এর দশক থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। হাইড্রোলিক ফ্র্যাকিং-এর আধুনিক সংস্করণ ১৯৯০ দশকে হ্যালিবার্টন কোম্পানীর হাতে হালনাগাদ রূপ লাভ করে। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে প্রক্রিয়াটি প্রথম বাণিজ্যিকীকরণ করা হয়েছিল এবং তারপর থেকে এটি তুলনামূলক অগম্য জায়গাগুলো থেকে তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনের জন্য ব্যবহৃত হয়। হাইড্রোলিক ফ্র্যাকিংয়ের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি করেছে এবং প্রযুক্তিটি পৃথিবীর অন্যান্য যেসব দেশে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তার মধ্যে তুরস্ক অন্যতম।
গত প্রায় ২০ বছর ধরে তুরস্কে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান বৃদ্ধি করা হয়েছে যেন তুরস্কে যে তেল ও গ্যাস উৎপাদন পরিমান বৃদ্ধি করা যায়। শুরুতে পাইলট আকারে অল্প পরিমান ফ্র্যাকিং চালু করা হয়। পরে পুরোপুরি অফিসিয়ালি হাইড্রোলিক ফ্র্যাকিং চালু করার সময়ে তুরস্কে যথেষ্ট বিতর্ক হয়। পরিবেশ বিপর্যয়ের আশংকাসহ ভূমিকম্পের সম্ভাবনাকে এক ধরনের উপেক্ষা করেই তুর্কি সরকার দেশের শক্তির স্বাধীনতা বাড়ানো এবং আমদানি করা শক্তির উপর নির্ভরতা কমানোর উপায় হিসাবে হাইড্রোলিক ফ্র্যাকিংয়ের ব্যবহারকে প্রচার করছে।

ফ্র্যাকিং থেকে ভূমিকম্পের ঝুঁকি তুরস্কের কাছে অজানা ছিলো না
তুরস্কে তেল ও গ্যাসের উৎপাদনে ফ্র্যাকিংয়ের খরচ / ঝুঁকি / উপকারীতা নিয়ে অতীতে দেশটির পেট্রোলিয়াম কোম্পানীর শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা এর আগেও তাদের আপত্তি ও শংকা প্রকাশ করেছে। কয়েক বছর ধরে আনাতোলিয়ান বেসিনের নীচে দাদাস শেলের নীচে আটকা পড়া তেল ও গ্যাস উত্তোলনের জন্য ফ্র্যাকিং ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এই দাদাস শেলে ফ্র্যাকিং ছিলো যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ।
দাদাস শেল তুরস্কের একটি শিলা গঠন যা প্রাকৃতিক গ্যাসের উল্লেখযোগ্য মজুদ রয়েছে বলে মনে করা হয়। গঠনটি দেশের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত এবং প্রায় ৫০,০০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে রয়েছে। তুর্কি সরকার দাদাস শেলকে নিজস্ব শক্তির একটি সম্ভাব্য উৎস হিসেবে চিহ্নিত করার পর, এই অঞ্চলের শেল গ্যাস সম্পদের অন্বেষণ ও উন্নয়নকে উৎসাহিত করেছে।তুরস্কের পেট্রোলিয়াম জিওগ্রাফি খুব ভালোভাবেই ম্যাপিং হয়ে আছে, যার ফলে সরকার এক সময়ে সিদ্ধান্ত নেয় কোথায় শেল বেসিক রয়েছে এবং সেখান থেকে ঝুকিপূর্ণ হলেও তেল গ্যাস ফ্র্যাকিং করা হবে।

পূর্বে দুইজন ইতালিয়ান জিওলজিস্ট তোলাস পর্বতে ড্রিলিং করার বিরুদ্ধে সতকর্তা প্রদান করেছে এর উচ্চমাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টির সম্ভাবনার কারনেই। ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির একজন গবেষক যুক্তরাষ্ট্র এবং ইতালীর তেল ও গ্যাস ড্রিলিংয়ের সাথে ৬ মাত্রা পর্যন্ত ভূমিকম্পের সরাসরি সম্পর্ক দেখিয়েছে যা মাটির অভ্যন্তরে ড্রিলিংয়ের ফলে সৃষ্ট এনার্জির ফলে সৃষ্ট হয়। যুক্তরাষ্ট্রের আরকানসাস, ওহাইও, ওকলোহামা, টেক্সাস এসব অঙ্গরাজ্য যেখানে প্রচুর ফ্র্যাকিং করা হয় সেসব জায়গায় প্রচুর ছোট ছোট ভূমিকম্প হওয়ার রেকর্ড রয়েছে।
যে এলাকায় তুরস্কে ভূমিকম্প হয় তার মধ্যে দিয়ারবাকির ও গাজিয়ানতেপ অন্যতম। এই এলাকায় প্রায় ২৭টি তেল-গ্যাস ফিল্ড আছে। অন্যান্য যেসব জায়গায় এই তেল গ্যাসের খনি অবস্থিত তার মধ্যে কাহরামানমারাসও রয়েছে যেটি ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৩ এর ভূমিকম্পের এপিসেন্টার। ২০১৬ থেকেই এসব ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় তেল গ্যাসের অনুসন্ধান এবং ২০১৯ এর পরে থেকে বিতর্কিত ফ্র্যাকিং পদ্ধতিতে তেল গ্যাস উত্তোলন শুরু হয় যেটি মূলত এই ভয়ংকর ভূমিকম্পের জনক। এই ফ্র্যাকিংয়ের ফলে যে উচ্চমাত্রার এনার্জী টেকটনিক প্লেটে জমে থাকে সেটিই ভূমিকম্প জন্ম দিয়ে থাকে। মুনাফাকে মূল লক্ষ্য করে এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও ঝুঁকি প্রতিরোধ না করে তেল ও গ্যাস উৎপাদনে হঠকারিতার সাথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য তুরস্কের সাধারন মানুষকে খুব উচ্চমূ্ল্য দিতে হলো।
‘We want to extend this [fracking] method even more, and we will continue to open new wells,’ – President Recep Tayyip Erdogan (source)
এই ভয়াবহ ভূমিকম্পের জন্য তুরস্কের রাষ্ট্র প্রধান এবং এনার্জী পলিসির ও সিদ্ধান্তের পেছনে মূল হোতারাই দায়ী কেননা তারাই ঝুকি সত্বেও কেবল মুনাফার লোভে এই ঝুকিপূর্ণ ফ্র্যাকিং পদ্ধতিকে যাচ্ছেতাই ভাবে ব্যবহার করেছে।
সুতরাং মানুষের হঠকারি সিদ্ধান্তের ফলে যে পরিবেশ বিপর্যয় এবং বিপদ মানুষ নিজে ডেকে আনে সেটাকে “স্রষ্টার গজব” বলে চাপিয়ে দেওয়া কতখানি যুক্তিসংগত সেটাই বিশ্বাসীদের ভেবে দেখার দরখাস্ত রইলো।
প্রকৌশলী সাদিক মোহাম্মদ আলম
Email: sadiq.alam@gmail.com
ফ্র্যাকিং ও তুরস্কের কিছু সর্ম্পকিত লিংক:
Hydraulic fracking sees Turkey enter new energy era
Turkey starts producing oil with fracking: Erdogan
How Fracking Creates Earthquakes in Oklahoma
Do Fracking Activities Cause Earthquake – Ohio
Tectonic Plates under Turkey
Turkish Syria Earthquakes
কুরআন থেকে বার্তা
স্থলে ও জলে মানুষের কৃতকর্মের দরুন বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। আল্লাহ তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের শাস্তি আস্বাদন করাতে চান, যাতে তারা ফিরে আসে। – আল–কোরআন, সুরা-৩০ রুম, আয়াত: ৪১
তোমরা এমন ফিতনাকে ভয় করো, যা বিশেষ করে তোমাদের মধ্যে যারা জালিম (অত্যাচারী-অপরাধী) কেবল তাদিগকেই ক্লিষ্ট করবে না (বরং সকলকেই আক্রান্ত করবে) এবং জেনে রাখো নিশ্চয়ই আল্লাহ শাস্তি প্রদানে কঠোর। – সুরা-৮ আনফাল, আয়াত: ২৫