সালাত

কুরআনের আলোকে সালাত

বিশ্বপ্রভুর বিধানের নিবিড় অনুসরণমূলক আনুষ্ঠানিক ও বাস্তবমুখী সংযোগ কর্মসূচী

পরিশিষ্ট ১: সালাত শব্দের নির্ঘণ্ট

আল কুরআনের পারিভাষিক শব্দসমূহের মধ্যে সালাত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা। সালাত শব্দটির শব্দমূল হলো সদ লাম ওয়াও। এ শব্দমূল থেকে গঠিত সালাত শব্দটি বিভিন্ন শব্দরূপে যেসব স্থানে ব্যবহৃত হয়েছে (সর্বমোট ৯৯ স্থানে) নিম্নে তার বিস্তারিত নির্ঘণ্ট (Concordance) উল্লেখ করা হলো:

(১) সালাত (বিশেষ্য) ব্যবহৃত হয়েছে ৭৮ স্থানে: ২:৩:৫, ২:৪৩:২, ২:৪৫:৩, ২:৮৩:২০, ২:১১০:২, ২:১৫৩:৬, ২:১৭৭:৩৩, ২:২৩৮:৪, ২:২৭৭:৭, ৪:৪৩:৬, ৪:৭৭:১০, ৪:১০১:১১, ৪:১০২:৬, ৪:১০৩:৩, ৪:১০৩:১৩, ৪:১০৩:১৫, ৪:১৪২:১০, ৪:১৬২:১৬, ৫:৬:৭, ৫:১২:১৮, ৫:৫৫:৯, ৫:৫৮:৪, ৫:৯১:১৭, ৫:১০৬:৩১, ৬:৭২:৩, ৬:৯২:২১, ৬:১৬২:৩, ৭:১৭০:৫, ৮:৩:৩, ৮:৩৫:৩, ৯:৫:১৮, ৯:১১:৪, ৯:১৮:১১, ৯:৫৪:১৪, ৯:৭১:১২, ৯:১০৩:১১, ১০:৮৭:১৪, ১১:৮৭:৩, ১১:১১৪:২, ১৩:২২:৭, ১৪:৩১:৬, ১৪:৩৭:১৫, ১৪:৪০:৪, ১৭:৭৮:২, ১৭:১১০:১৫, ১৯:৩১:৭, ১৯:৫৫:৪, ১৯:৫৯:৬, ২০:১৪:১০, ২০:১৩২:৩, ২১:৭৩:১০, ২২:৩৫:১২, ২২:৪১:৭, ২২:৭৮:৩৪, ২৩:২:৪, ২৪:৩৭:১১, ২৪:৪১:১৬, ২৪:৫৬:২, ২৪:৫৮:১৭, ২৪:৫৮:২৬, ২৭:৩:৩, ২৯:৪৫:৮, ২৯:৪৫:১০, ৩০:৩১:৫, ৩১:৪:৩, ৩১:১৭:৩, ৩৩:৩৩:১০, ৩৫:১৮:২৬, ৩৫:২৯:৭, ৪২:৩৮:৫, ৫৮:১৩:১৫, ৬২:৯:৬, ৬২:১০:৩, ৭০:২৩:৪, ৭০:৩৪:৪, ৭৩:২০:৫৪, ৯৮:৫:১১, ১০৭:৫:৪। 

(২) সালাওয়াত (সালাত এর বহুবচন) ব্যবহৃত হয়েছে ৫ স্থানে: ২:১৫৭:৩, ২:২৩৮:৩, ৯:৯৯:১৪, ২২:৪০:২১, ২৩:৯:৪।  

দ্রষ্টব্য: ‘সালাওয়াত’ শব্দটি তিনভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। (ক) আনুষ্ঠানিক সালাত এর বহুবচন হিসেবে ২:২৩৮, ২৩:৯। (খ) সালাতের স্থানসমূহ অর্থে ২২:৪০। (গ) আল্লাহর ও রসূলের পক্ষ থেকে অনুগ্রহ বা সংযোগমূলক কর্মসূচীসমূহ অর্থে ২:১৫৭, ৯:৯৯।

(৩) সল্লা (ক্রিয়া, আদেশ-নিষেধ, ক্রিয়ারূপ ২) ব্যবহৃত হয়েছে ১২ স্থানে: ৩:৩৯:৫, ৪:১০২:২২, ৪:১০২:২৩, ৯:৮৪:২, ৯:১০৩:৮, ৩৩:৪৩:৩, ৩৩:৫৬:৪, ৩৩:৫৬:১০, ৭৫:৩১:৪, ৮৭:১৫:৪, ৯৬:১০:৩, ১০৮:২:১। 

(৫) মুসল্লা (কর্ম Object, ক্রিয়ারূপ ২, অর্থ: যে বিষয়কে সালাত করা হয়েছে, সালাতকৃত বিষয়, সালাত সম্বলিত বিষয়, সালাতযোগ্য বিষয়) ব্যবহৃত হয়েছে ১ স্থানে: ২:১২৫:১১। 

(৬) মুসল্লীন (কর্তা Subject, ক্রিয়ারূপ ২, মুসল্লি এর বহুবচন, অর্থ: সালাতকারী), ব্যবহৃত হয়েছে ৩ স্থানে: ৭০:২২:২, ৭৪:৪৩:৫, ১০৭:৪:২। 

আল কুরআনে সালাত শব্দটি এর বিভিন্ন শব্দরূপসহ যেসব আয়াতে ব্যবহৃত হয়েছে (৯০ টি আয়াত) তার সমন্বিত তালিকা নিম্নরূপ: 

২:৩, ২:৪৩, ২:৪৫, ২:৮৩, ২:১১০, ২:১২৫, ২:১৫৩, ২:১৫৭, ২:১৭৭, ২:২৩৮, ২:২৭৭, ৩:৩৯, ৪:৪৩, ৪:৭৭, ৪:১০১, ৪:১০২, ৪:১০৩, ৪:১৪২, ৪:১৬২, ৫:৬, ৫:১২, ৫:৫৫, ৫:৫৮, ৫:৯১, ৫:১০৬, ৬:৭২, ৬:৯২, ৬:১৬২, ৭:১৭০, ৮:৩, ৮:৩৫, ৯:৫, ৯:১১, ৯:১৮, ৯:৫৪, ৯:৭১, ৯:৮৪, ৯:৯৯, ৯:১০৩, ১০:৮৭, ১১:৮৭, ১১:১১৪, ১৩:২২, ১৪:৩১, ১৪:৩৭, ১৪:৪০, ১৭:৭৮, ১৭:১১০, ১৯:৩১, ১৯:৫৫, ১৯:৫৯, ২০:১৪, ২০:১৩২, ২১:৭৩, ২২:৩৫, ২২:৪০, ২২:৪১, ২২:৭৮, ২৩:২, ২৩:৯, ২৪:৩৭, ২৪:৪১, ২৪:৫৬, ২৪:৫৮, ২৭:৩, ২৯:৪৫, ৩০:৩১, ৩১:৪, ৩১:১৭, ৩৩:৩৩, ৩৩:৪৩, ৩৩:৫৬, ৩৫:১৮, ৩৫:২৯, ৪২:৩৮, ৫৮:১৩, ৬২:৯, ৬২:১০, ৭০:২২, ৭০:২৩, ৭০:৩৪, ৭৩:২০,  ৭৪:৪৩, ৭৫:৩১, ৮৭:১৫, ৯৬:১০, ৯৮:৫, ১০৭:৪, ১০৭:৫, ১০৮:২।

পরিশিষ্ট ২: রুকূ'

রুকূ' শব্দটি বিভিন্ন শব্দরূপে যেসব স্থানে ব্যবহৃত হয়েছে তা নিম্নরূপ :

রাকি (রুকূ'কারী) ব্যবহৃত হয়েছে ১ স্থানে: ৩৮:২৪:৩১।

রাকিয়ূন (রাকি / রুকূ'কারী শব্দের বহুবচন) ব্যবহৃত হয়েছে ৪ স্থানে: ২:৪৩:৭, ৩:৪৩:৭, ৫:৫৫:১৩, ৯:১১২:৫।

রুককা (রাকি / রুকূ'কারী শব্দের বহুবচন) ব্যবহৃত হয়েছে ৩ স্থানে: ২:১২৫:২১, ২২:২৬:১৫, ৪৮:২৯:১২।

ইয়ারকায়ু (ক্রিয়া, ক্রিয়ারূপ ১) ব্যবহৃত হয়েছে ৫ স্থানে: ২:৪৩:৫, ৩:৪৩:৫, ২২:৭৭:৪, ৭৭:৪৮:৪, ৭৭:৪৮:৬।

রুকূ' শব্দটি বিভিন্ন শব্দরূপে যেসব আয়াতে ব্যবহৃত হয়েছে তার সমন্বিত তালিকা নিম্নরূপ: 

২:৪৩, ২:১২৫, ৩:৪৩, ৫:৫৫, ৯:১১২, ২২:২৬, ২২:৭৭, ৩৮:২৪, ৪৮:২৯, ৭৭:৪৮।

নিচে রুকূ' শব্দ ধারণকারী আয়াতসমূহের অনুবাদ দেয়া হলো।

২:৪৩ :: এবং তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা করো এবং তোমরা যাকাত প্রদান করো এবং তোমরা রুকূ' করো রুকূ'কারীগণের সাথে।

২:১২৫ :: এবং (উল্লেখ্য) যখন আমি আল বাইত’কে (অনন্য প্রতিষ্ঠানকে) স্থাপন করেছি মানবজাতির জন্য সমাবর্তনস্থলরূপে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থারূপে। এবং তোমরা ইবরাহীমের আদর্শিক অবস্থান (মাক্বামে ইবরাহীম) থেকে সালাত সম্বলিত বিষয় (মুসল্লা) গ্রহণ করো /  তোমরা ইবরাহীমের আদর্শিক অবস্থানকে সালাত সম্বলিত বিষয় হিসেবে গ্রহণ করো। এবং আমি ফরমান দিয়েছি ইবরাহীমকে এবং ইসমাইলকে (এ মর্মে) যে, আমার (নির্ধারিত) প্রতিষ্ঠানকে পরিচ্ছন্ন রাখো তাওয়াফকারীদের জন্য, তিকাফকারীদের জন্য, রুকূ'কারীদের জন্য এবং সাজদাহকারীদের জন্য।

৩:৪৩ :: হে মারইয়াম, তুমি বিনয় প্রকাশ (ক্বুনূত) করো তোমার প্রভুর উদ্দেশ্যে, এবং তুমি সাজদাহ করো, এবং তুমি রুকূ' করো রুকূ'কারীগণের সাথে।

৫:৫৫ :: নিশ্চয় তোমাদের বন্ধু ও অভিভাবক হচ্ছেন আল্লাহ এবং তাঁর রসূল ও তারাই যারা বিশ্বাস করে এবং যারা সালাত প্রতিষ্ঠা করে এবং যাকাত প্রদান করে, এ অবস্থায় যে, তারা রুকূ'কারী।

৯:১১২ :: যারা তাওবাহকারী, ইবাদাতকারী, (আল্লাহর) প্রশংসাকারী, (আল্লাহর সন্তুষ্টির কাজে) বিচরণকারী, রুকূ'কারী, সাজদাহকারী, ন্যায়কাজের আদেশকারী, অন্যায়কাজের নিষেধকারী এবং আল্লাহর দেয়া সীমাসমূহ হেফাযতকারী; (এ ধরনের) মু’মিনদেরকে তুমি সুসংবাদ দাও।

২২:২৬ :: এবং (উল্লেখ্য) যখন আমি নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম ইবরাহীমের জন্য ‘আল বাইতের’ (কা’বাঘরের) স্থান। এ নির্দেশসহ যে, ‘আমার সাথে কোন সত্তাকেই শরীক সাব্যস্ত করো না। এবং আমার ঘরকে পবিত্র রাখো তাওয়াফকারীদের জন্য, ক্বিয়ামকারীদের জন্য (যারা দাঁড়ায় তাদের জন্য), রুকূ'কারীদের জন্য ও সাজদাহকারীদের জন্য’।

২২:৭৭ :: হে মু’মিনগণ, তোমরা রুকূ' করো, সাজদাহ করো, তোমাদের প্রভুর ইবাদাত করো এবং কল্যাণকর কাজ করো; যেন তোমরা সফল হতে পারো।

৩৮:২৪ :: দাউদ বলেছিলো, “তোমার দুম্বাটিকে তার দুম্বাগুলোর সাথে যুক্ত করার দাবি করে সে তোমার প্রতি যুলুম করেছে। নিশ্চয় যারা একসাথে বসবাস করে তারা অনেক সময় একে অন্যের প্রতি বাড়াবাড়ি করে। যারা বিশ্বাস করে ও সৎকর্ম করে তারা ছাড়া। এবং এমন লোক সংখ্যায় খুবই কম”। এবং (তারপর) দাউদ অনুমান করেছিলো যে, (এ ঘটনার মাধ্যমে) আমি তাকে পরীক্ষা করেছি। তখন সে তার প্রভুর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলো এবং রুকূ'তে ঝুঁকে পড়েছিলো এবং (আল্লাহর দিকে) ফিরে এসেছিলো।

৪৮:২৯ :: মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ এবং যারা তার সাথে আছে তারা কাফেরদের প্রতি কঠোর এবং তাদের নিজেদের মধ্যে দয়ালু। তুমি তাদেরকে দেখবে রুকূ'কারী ও সাজদাহকারী, আল্লাহর পক্ষ থেকে অনুগ্রহ (হালাল জীবিকা) ও (তাঁর) সন্তুষ্টি অন্বেষণকারী। তাদের লক্ষণ তাদের মুখমন্ডলে / চেহারায় (ফুটে থাকে) সাজদাহর চিহ্ন থেকে (সাজদাহর প্রভাবে)। উহাই তাওরাতে তাদের দৃষ্টান্ত। এবং ইনজীলে তাদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে, যেন একটি চারাগাছ যা বের করে তার অংকুর, তারপর উহাকে পুষ্টি যোগায়, তারপর উহা শক্ত হয়, তারপর উহা তার কান্ডের উপর দৃঢ়ভাবে দাঁড়ায়, তখন উহা চাষীদেরকে আনন্দ দেয়। (এভাবে আল্লাহ মু’মিনদেরকে মজবুতি দেন) যেন তাদের কারণে কাফেরদের গা জ্বালা করে। যারা বিশ্বাস করে এবং তাদের মধ্য থেকে যারা সৎকর্ম করে আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার দেয়ার ওয়াদা করেছেন।

৭৭:৪৮ :: যখন তাদেরকে (মিথ্যা সাব্যস্তকারীদেরকে) বলা হয়, রুকূ' করো’, তখন তারা রুকূ' করে না।

রুকূ' সম্পর্কে মৌলিক পয়েন্টস

১. সালাত, যাকাত ও রুকূ'কারীদের সাথে রুকূ' (২:৪৩)

২. ক্বুনূত, সাজদাহ ও রুকূ'কারীদের সাথে রুকূ' (৩:৪৩)

৩. সালাত, যাকাত ও রুকূ' বা রুকূ’রত অবস্থা (২:৪৩, ৫:৫৫)

৪. রসূলুল্লাহ দাউদ রুকূ'তে ঝুঁকে গেলেন(৩৮:২৪)

৫. রুকূ'রত ও সাজদাহরত দেখা এবং চেহারায় সাজদাহর চিহ্ন (৪৮:২৯)

৬. তাওয়াফ, ই'তিকাফ, ক্বিয়াম, রুকূ', সাজদাহ (২:১২৫, ২২:২৬)

৭. রুকূ' করতে আদেশ অথচ (মিথ্যা সাব্যস্তকারীরা) তা করে না (৭৭:৪৮)

রুকূ' বিষয়ক আলোচনা

১. সাধারণত সালাতের একটি অংশ হিসেবে রুকূ' করার রীতি প্রচলিত থাকলেও আল কুরআন থেকে বুঝা যায় যে, রুকূ' একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ কাজ এবং এজন্য বিশেষভাবে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ৭৭:৪৭-৪৮, ২২:৭৭-৭৮, ২:৪৩, ৫:৫৫।

২. রুকূ' শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে দুর্বলতাজনিত কারণে ঝুঁকে পড়া। কুরআনের ব্যবহার থেকেও এ আভিধানিক অর্থের মিল পাওয়া যায়।  ২:৪৩, ৫:৫৫, ৭৭:৪৭-৪৮ ও ৩৮:২১-২৫ অনুযায়ী পর্যালোচনা করে রুকূ'র সংজ্ঞা নির্ণয় করা যায়।

রুকু’ সম্পর্কিত আয়াতসমূহের সমন্বিত অধ্যয়ন অনুসারে, রুকূ' বলতে বুঝায়: (ক) আত্মপর্যালোচনার মাধ্যমে স্বীয় সিদ্ধান্ত ও শক্তির দুর্বলতার স্বীকৃতি এবং হিদায়াতের মুখাপেক্ষিতার অভিব্যক্তি; (খ) নিজস্ব বুঝ ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা চিহ্নিতকরণ এবং তৎ প্রেক্ষিতে আল্লাহর বিধান থেকে হিদায়াত গ্রহণের প্রয়াস; (গ) নিজের বা নিজেদের কর্মধারা মূল্যায়নপূর্বক গ্রহণীয় ব্যবস্থার সাথে সমন্বয়ের অভিব্যক্তিস্বরূপ কুর্নিশ করা; (ঘ) আল্লাহর বিধান পরিপালনের (সালাত প্রতিষ্ঠা ও যাকাত প্রদানের) ক্ষেত্রে স্বত:স্ফূর্ত ঝোঁক প্রবণতা বজায় রাখা।

৩. সালাতের মধ্যে রুকূ' বাধ্যতামূলক নয়, কিন্তু ২২:২৬ আয়াতে ক্বিয়াম ও সাজদাহর মধ্যবর্তীতে উল্লেখ থাকায় সালাতের মধ্যে একটি নির্বাহী রীতি হিসেবে অনুশীলন করা হয়, যাতে আপত্তির কিছু নেই। কারণ- কুরআনের বিধির ভিতরে থেকে নির্বাহী রীতি-নীতি অবলম্বনই ইসলামী জীবনব্যবস্থার মূল তাৎপর্য।

৪. ২২:২৬ আয়াতে ক্বিয়াম ও সাজদাহর মধ্যবর্তীতে রুকূ'র উল্লেখ করা হয়েছে এবং প্রচলিত সালাতের কাঠামোতেও দেখা যায় যে, ক্বিয়াম ও সাজদাহর মধ্যবর্তী স্তরে রুকূ' সম্পাদন করা হয়। এছাড়া বর্তমানে রুকূ'র যে রূপ দেখা যায়- দুই হাঁটুতে দুই হাতের কব্জি রেখে সামনে ঝুঁকে থাকা এবং সাজদাহর যে রূপ দেখা যায়- কপালকে ভূমির কাছাকাছি নিয়ে প্রণত হওয়া- এ বিষয়টি উপরোক্ত শর্ত পরিপূরণ করে (অবশ্য মাটিতে কপাল ঠেকানো আবশ্যক নয়, এটি সাজদাহ অবস্থায় সহজতার উদ্দেশ্যে করা যেতে পারে)।  রুকূ' ও সাজদাহর প্রচলিত ধরণকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে এবং তা পরম্পরাগতভাবে দৃশ্যমান জ্ঞানের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। তাই রুকূ' বা সাজদাহর আনুষ্ঠানিক ধরনের জন্য কোন হাদীসগ্রন্থের প্রয়োজন নেই। বরং তা মানবসমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত বিষয় যেমন সুপ্রতিষ্ঠিত বিষয় শামছ বলতে সূর্যকে এবং ক্বামার বলতে চাঁদকে বুঝানো হয়। (অবশ্য প্রতিষ্ঠিত কোনো বিষয়ের ক্ষেত্রে কুরআন থেকে ভিন্ন তথ্য জানা গেলে প্রতিষ্ঠিত বিষয়টির ভুল প্রমাণিত হওয়ার কারণে তা থেকে সরে আসতে হবে)।

৫. রুকূ' হচ্ছে সালাত ও যাকাতের সাথে সম্পাদিতব্য একটি ব্যাপক কাজ (২:৪৩, ৫:৫৫)। ক্বিয়াম সালাতের সাথে সম্পর্কিত (৫:৬,৪:১০২) আবার একটি ব্যাপক কাজ (২:২৩৮)। সাজদাহ সালাতের সাথে সম্পর্কিত (৪:১০২) আবার একটি ব্যাপক কাজ (২২:৭৭-৭৮)। ক্বিয়াম ও সাজদাহর মত রুকূ'ও বাইতুল্লাহর সাথে সম্পর্কিত (২২:২৬)। তাই বাইতুল্লাহতে আনুষ্ঠানিক সালাত কায়েমের অংশ হিসেবে ক্বিয়াম ও সাজদাহ করার মত রুকূ' করার পদ্ধতি পরম্পরাগত অনুশীলন হিসেবে চালু রয়েছে। সুতরাং সালাতে রুকূ' করার জন্য প্রত্যক্ষ নির্দেশ না থাকলেও সালাতের মাধ্যমে রুকূ' করার নির্দেশকে আনুষ্ঠানিকভাবেও পরিপালনের ক্ষেত্রে সেটিকে সালাতের অংশ হিসেবে অনুশীলন করা হয়।

৬. প্রকৃতপক্ষে ক্বিয়াম, রুকূ' ও সাজদাহ হচ্ছে এমন বিষয় যা মূলত মনোভাবগত তিনটি বিশেষ অবস্থা যা কার্যক্রমের ধরনের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠে। কিন্তু একই সাথে উহাকে মনোভাবগত মূল বৈশিষ্ট্যের সাথে সম্পর্কিত করে শারীরিক অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে প্রকাশিত করাকেই আনুষ্ঠানিক ক্বিয়াম, রুকূ' ও সাজদাহ বলা হয়। আল কুরআনে সালাতের বিষয়ে যেসব শর্ত ও পদ্ধতি উল্লেখ করা হয়েছে তাতে এই আনুষ্ঠানিক অভিব্যক্তিকেও বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। তবে মানসিক সংযোগ বিহীন রুকূ' সাজদাহ প্রকৃত রুকূ' সাজদাহ নয়।

৭. সালাতে রুকূ' না করে বরং সালাতের আগে বা পরে বিচ্ছিন্নভাবেও তথা অন্য সময়েও রুকূ' করা যেতে পারে। জুমুআর সালাতের পরপর জমিনে ছড়িয়ে পড়ার আদেশ থাকায় (৬২:১০) সেই সময়কে আনুষ্ঠানিক রুকূ' করার সময় বলা যায় না। আবার অযু করার পর সালাতের আগে কোনো আনুষ্ঠানিক রুকূ' করার জন্যও কোন নির্দেশনা দেয়া নেই। সালাতের আগে অযু করা বাধ্যতামূলক (৫:৬) কিন্তু রুকূ' ও সাজদাহর জন্য অযু করা বাধ্যতামূলক নয়। সালাতের সময় নির্ধারিত (৪:১০৩) কিন্তু রুকূ' ও সাজদাহর সময় নির্ধারিত নয়।

৮. সালাতে রুকূ' ও সাজদাহর প্রচলিত অবস্থান সংস্কার: ক্বিয়াম ও সাজদাহর মধ্যবর্তী অবস্থানে রুকূ'র উল্লেখ থাকায় (২২:২৬) সালাতে ক্বিয়াম ও সাজদাহর মধ্যবর্তীতে রুকূ' করা গ্রহণযোগ্য হলেও সালাতে রুকূ' করাকে বাধ্যতামূলক বলা যায় না।

রুকূ'র তাৎপর্যের প্রেক্ষিতে রুকূ' করার আগে স্বীয় কর্মধারা মূল্যায়নস্বরূপ (ব্যক্তিগত সালাতের ক্ষেত্রে) মানসিকভাবে আত্মপর্যালোচনা বা (সমষ্টিগত সালাতের ক্ষেত্রে) পারস্পরিক আলোচনা করার পর রুকূ করা যেতে পারে। তারপর কুরআন থেকে ক্বিরায়াত করে (সূরা ফাতিহা এবং অন্য সূরা বা আয়াত পড়ে) সাজদাহ করা যেতে পারে। এভাবে রুকূ'র অবস্থান ক্বিয়াম ও সাজদাহর মধ্যবর্তীতেই থেকে যাবে, সেই সাথে ক্বিরায়াতের পরে সাজদাহ করার নির্দেশনাও হুবহু পরিপালন করা যাবে।

সূরা ফাতিহা ও তারপর অন্য সূরা পড়ে তারপর রুকূ' এবং তারপর সাজদাহ এই পদ্ধতিটি কুরআন নির্ধারণ করে দেয়নি। তাই এটি সাংবিধানিক পদ্ধতি নয়, বরং নির্বাহী পদ্ধতি। এক্ষেত্রে নির্বাহী পদ্ধতির অবকাশ রয়েছে। এবং নির্বাহী পদ্ধতি যেহেতু সাংবিধানিক পদ্ধতি নয় (আবার সেই সাথে যেহেতু প্রচলিত নির্বাহী পদ্ধতিটিই কি রসূলের প্রবর্তিত হুবহু নির্বাহী পদ্ধতি, নাকি তাতে কিছু পরিবর্তন ঘটেছে তা নিশ্চিত নয়), তাই যৌক্তিক সমন্বয়ের খাতিরে উহাতে কিছুটা পুনর্বিন্যাস সাধন মোটেই দোষনীয় নয়, বরং যৌক্তিক সমন্বয়ের খাতিরে এরূপ পুনর্বিন্যস্ত নির্বাহী রীতি প্রবর্তন করলে তাতে খটকা সৃষ্টির কোনো অবকাশ নেই।

অবশ্য এরূপ সংস্কার অনিবার্য প্রয়োজনীয় বিষয় নয়। বরং বর্তমানে যেভাবে কুরআন থেকে ক্বিরায়াতের পরে সাজদাহ করার ক্ষেত্রে প্রথমে রুকূ করে তারপর সাজদাহ করা হয় সেটাও অগ্রহণযোগ্য নয়। কারণ এর মাধ্যমে রকূ’কে সাজদাহর সাথে সমন্বিত করা হয়েছে মাত্র এবং রুকূ ও সাজদাহ একটি অন্যটির সাথে সঙ্গতিশীল দুটি বিষয়, যা সামান্য ভিন্নরূপ তাৎপর্য প্রকাশ করে। অন্য কথায়, এভাবেও ভাবার অবকাশ আছে যে, রুকূ যেন এক প্রকার সাজদাহ এবং সাজদাহ যেন এক প্রকার রুকূ

৯. বর্তমান সালাত কাঠামোর বিষয়ে কিছু প্রশ্ন যৌক্তিকভাবে উপস্থাপিত হয়ে থাকে। যেমন, (ক) এক রাকায়াতে রুকূ' একটি কিন্তু সাজদাহ দুইটি করার কারণ কী? অর্থাৎ প্রতি রাকায়াতে একটিমাত্র রুকূ'র মত একটিমাত্র সাজদাহ না করার কারণ কী? (খ) এছাড়া সাধারণত প্রত্যেক উঠাবসায় আল্লাহু আকবার বলা হয়, কিন্তু রুকূ' থেকে উঠার সময় সামিয়াল্লাহু লিমান হামিদা, রব্বানা ওয়া লাকাল হামদ পড়া হয়; এ পার্থক্যটিরও কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ নেই, যদিও ইহা বাধ্যতামূলকও নয়, দোষও নয়। আসলে সবসময় শুধু আল্লাহু আকবার বলেই উঠা-বসার পর্ব সম্পন্ন করতে হবে এমন কোনো কথা নেই, বরং তাকবীর, সাব্বিহ, হামদির পর্যায়ে পড়ে এমন যে কোনো বাক্য বলা যেতে পারে এবং একেক সময় এরূপ একেক বাক্য বলা যেতে পারে। যেমন কখনো সাজদাহয় যাওয়ার সময় একটি বাক্য বলা হলো, আবার কখনো অন্য একটি বাক্য বলা হলো, এতে কোনো ত্রুটি নেই।

১০. বর্তমানে রুকূ'র মধ্যে প্রচলিত তাসবীহ হচ্ছে সুবহানা রব্বিয়াল আযীম তথা ‘আমি পবিত্রতা প্রকাশ করছি আমার প্রভুর যিনি মহাশক্তিমান’। যেহেতু রুকূ' অবস্থাটি হচ্ছে কোনো মানুষের নিজের মধ্যে বিনয় সৃষ্টির ও বিনয় প্রকাশের উপযোগী সবচেয়ে দুর্বল অবস্থা, তাই এক্ষেত্রে এরূপ তাসবীহ সেট করা অবশ্যই যুক্তিযুক্ত হয়েছে। আবার বর্তমানে সাজদাহর মধ্যে প্রচলিত তাসবীহ হচ্ছে সুবহানা রব্বিয়াল আলা তথা ‘আমি পবিত্রতা প্রকাশ করছি আমার প্রভুর যিনি সমুচ্চ’। যেহেতু সাজদাহ অবস্থাটি হচ্ছে কোনো মানুষের নিজের মধ্যে বিনয় সৃষ্টির ও বিনয় প্রকাশের উপযোগী সবচেয়ে নিচু অবস্থা, তাই এক্ষেত্রে এরূপ তাসবীহ সেট করা অবশ্যই যুক্তিযুক্ত হয়েছে। এ দুটি তাসবীহ হচ্ছে কুরআন নির্দেশিত দুটি তাসবীহ (৫৬:৭৪, ৫৬:৯৬, ৬৯:৫২, ৮৭:১)। তাসবীহ দুটি যেমন সালাতে রুকূ' ও সাজদাহয় করা যেতে পারে তেমনি সালাতের বাহিরেও করা যেতে পারে। যদি রুকূ'তে সুবহানা রব্বিয়াল আলা এবং সাজদাহয় সুবহানা রব্বিয়াল আযীম (অর্থাৎ প্রচলিত রীতির বিপরীত) পড়া হয় বা একেক সময় একেকভাবে পড়া হয় বা রুকূ'তেও উভয় তাসবীহ পড়া হয় এবং সাজদাহতেও উভয় তাসবীহ পড়া হয় বা এ তাসবীহগুলোসহ বা এ তাসবীহগুলো ছাড়া রুকূ' ও সাজদাহতে অন্য তাসবীহ পড়া হয়, তবে এসবের কোনো ক্ষেত্রে দোষ হবে না। কারণ এ বিষয়ে আল কুরআনে কিছু বাধ্যতামূলক করে দেয়া হয়নি। সাজদাহয় একটি বিশেষ তাসবীহ হতে পারে, সুবহানা রব্বিনা, ইন কানা ওয়াদু রব্বিনা লামাফঊলা (১৭:১০৭-১০৮)।

রুকূ' প্রসঙ্গে কয়েকটি বিশেষ জিজ্ঞাসার জবাব

জিজ্ঞাসা-১. রুকূ' ও সাজদাহর যদি দুই ধরনের অর্থ থাকে, আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক / ব্যাপকভিত্তিক, তাহলে কোন ক্ষেত্রে কোন অর্থ তা কিভাবে বুঝা যাবে?

জবাব: রুকূ' শব্দটি তার ব্যুৎপত্তিগত অর্থ অনুসারে ব্যাপকভিত্তিক তাৎপর্য বহন করে। যদি কোনো ক্ষেত্রে বক্তব্য প্রসঙ্গ (Context) অনুসারে এটিকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেয়ার প্রতি নির্দেশনা পাওয়া যায় সেক্ষেত্রে এটি আনুষ্ঠানিক অর্থেও প্রযোজ্য হবে। রুকূ'র একটি আনুষ্ঠানিক রূপ দেয়া দোষণীয় নয়, কিন্তু এটিকে আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ করার অবকাশ নেই।

জিজ্ঞাসা-২. রুকূ এবং সাজদাহর মধ্যে অর্থগত পার্থক্য কী? এর একটি কি অন্যটির চেয়ে অধিক বিনয় প্রকাশক? তাহলে যেটি অধিক বিনয় প্রকাশক শুধু সেটি কেন যথেষ্ট নয়?

জবাব: রুকূ' এবং সাজদাহ উভয়টির সাথে বিনয়ের সম্পর্ক থাকলেও বিনয়ের দিক থেকে এর একটির সাথে অন্যটির তুলনা প্রয়োজনীয় নয়। কারণ উভয়টির একই বিষয়ের (বিনয়ের) দুটি রূপ নয়। যদিও উভয়টির সাথে বিনয় (ক্বুনূত) জড়িত কিন্তু এর কোনোটির সরাসরি অর্থ বিনয় নয়। বরং রুকূ' মানে ব্যক্তিগত চিন্তা ও কর্মের সাধারণ রীতি-অবস্থার দুর্বলতার স্বীকৃতিস্বরূপ অধিকতর যথাযথ ব্যবস্থাকে গ্রহণ করে নেয়ার অভিব্যক্তি। এবং সাজদাহ অর্থ হলো কারো কর্তৃত্বকে মেনে নিয়ে তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও তার নির্দেশনাকে বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে তা পরিগ্রহণের অভিব্যক্তি।

জিজ্ঞাসা-৩. সালাতে রুকূ' করা বাধ্যতামূলক কিনা? সালাতে বা সালাতের বাহিরে রুকূ' করার পদ্ধতি কী?

জবাব: সালাতে রুকূ' করা বাধ্যতামূলক নয়। সালাতে বা সালাতের বাহিরে রুকূ' করার আনুষ্ঠানিক পদ্ধতি হিসেবে দণ্ডায়মান অবস্থায় আজানু কুর্নিশ করার রীতি প্রচলিত রয়েছে। এবং এর অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতি হলো মানসিক সচেতনতার সাথে স্বীয় অহংবোধ ত্যাগ করে বা বিনয়ের সাথে কোনো করণীয় কাজ সম্পাদন করা।

জিজ্ঞাসা-৪. রুকূ' যদি সালাতের অংশ হয়, তাহলে সালাতের আদেশের পাশাপাশি রুকূ' করার আদেশ আলাদাভাবে বলা হয়েছে কেন?

জবাব : রুকূ' সালাতের অংশ নয়। তবে সাজদাহ যেমন সালাতের বাহিরেও থাকা সত্ত্বেও সালাতের অংশ হিসেবে সাজদাহর সংযোজন ঘটেছে, অনুরূপভাবে সালাতের অংশ হিসেবে রুকূ'র সংযোজন আপত্তিকর নয়, যদি এটিকে বাধ্যতামূলক হিসেবে সাব্যস্ত করা না হয়।

পরিশিষ্ট ৩: সাজদাহ

আল কুরআনে সাজদাহ শব্দটি (মাসজিদ শব্দটি ছাড়া) যেসব শব্দরূপে ব্যবহৃত হয়েছে তা নিম্নরূপ:

সুজূদ (সাজদাহ শব্দের প্রতিশব্দ, ক্রিয়াবিশেষ্য ক্রিয়ারূপ ১) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে ৪ স্থানে:  ৪৮:২৯:২৪, ৫০:৪০:৫, ৬৮:৪২:৭, ৬৮:৪৩:৯।

সাজিদ (সাজদাহকারীকর্তাক্রিয়ারূপ ) ব্যবহৃত হয়েছে ১ স্থানে: ৩৯:৯:৬।

সাজিদূন (সাজিদ/সাজদাহকারী এর বহুবচন) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে ১১ স্থানে: ৭:১১:১৬, ৭:১২০:৩, ৯:১১২:৬, ১২:৪:১৫, ১৫:২৯:৯, ১৫:৩১:৭, ১৫:৩২:৮, ১৫:৯৮:৬, ২৬:৪৬:৩, ২৬:২১৯:৩, ৩৮:৭২:৯।

সুজ্জাদ (সাজিদ/সাজদাহকারী এর বহুবচন) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে ১১ স্থানে: ২:৫৮:১৩, ৪:১৫৪:৯, ৭:১৬১:১৫, ১২:১০০:৭, ১৬:৪৮:১৪, ১৭:১০৭:১৮, ১৯:৫৮:২৮, ২০:৭০:৩, ২৫:৬৪:৪, ৩২:১৫:৯, ৪৮:২৯:১৩।

সুজূদ (সাজিদ/সাজদাহকারী এর বহুবচন) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে ২ স্থানে: ২:১২৫:২২, ২২:২৬:১৬।

সাজাদা (ক্রিয়া, ক্রিয়ারূপ ১) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে ৩৫ স্থানে: ২:৩৪:৪, ২:৩৪:৬, ৩:৪৩:৪, ৩:১১৩:১৪, ৪:১০২:১৪, ৭:১১:৮, ৭:১১:১০, ৭:১২:৫, ৭:২০৬:১১, ১৩:১৫:২, ১৫:৩০:১, ১৫:৩৩:৪, ১৬:৪৯:২, ১৭:৬১:৪, ১৭:৬১:৬, ১৭:৬১:১০, ১৮:৫০:৪, ১৮:৫০:৬, ২০:১১৬:৪, ২০:১১৬:৬, ২২:১৮:৫, ২২:৭৭:৫, ২৫:৬০:৪, ২৫:৬০:৯, ২৭:২৪:৩, ২৭:২৫:২, ৩৮:৭৩:১, ৩৮:৭৫:৬, ৪১:৩৭:৮, ৪১:৩৭:১২, ৫৩:৬২:১, ৫৫:৬:৩, ৭৬:২৬:৩, ৮৪:২১:৬, ৯৬:১৯:৪।

সাজদাহ শব্দটি বিভিন্ন শব্দরূপসহ (মাসজিদ শব্দটি ছাড়া) যেসব আয়াতে আছে তার সমন্বিত তালিকা নিম্নরূপ:

০২:৩৪, ০২:৫৮: ০২:১২৫, ০৩:৪৩, ০৩:১১৩, ০৪:১০২, ০৪:১৫৪, ০৭:১১, ০৭:১২, ০৭:১২০, ০৭:১৬১, ০৭:২০৬, ০৯:১১২, ১২:০৪, ১২:১০০, ১৩:১৫, ১৫:২৯, ১৫:৩০, ১৫:৩১, ১৫:৩২, ১৫:৩৩, ১৫:৯৮, ১৬:৪৮, ১৬:৪৯, ১৭:৬১, ১৭:১০৭, ১৮:৫০, ১৯:৫৮, ২০:৭০, ২০:১১৬, ২২:১৮, ২২:২৬, ২২:৭৭, ২৫:৬০, ২৫:৬৪, ২৬:৪৬, ২৬:২১৯, ২৭:২৪, ২৭:২৫, ৩২:১৫, ৩৮:৭২, ৩৮:৭৩, ৩৮:৭৫, ৩৯:০৯, ৪১:৩৭, ৪৮:২৯, ৫০:৪০, ৫৩:৬২, ৫৫:০৬, ৬৮:৪২, ৬৮:৪৩, ৭৬:২৬, ৮৪:২১, ৯৬:১৯।

নিচে বিভিন্ন শব্দরূপে সাজদাহ শব্দ ধারণকারী আয়াতসমূহের অনুবাদ উপস্থাপন করা হলো:

২:৩৪ :: যখন আমি ফেরেশতাদেরকে বলেছিলাম, ‘আদমের জন্য সাজদাহ করো’, তখন তারা সাজদাহ করলো। ইবলিস ছাড়া। সে অস্বীকার করলো ও অহংকার করলো। এবং সে কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত হলো।

২:৫৮ :: যখন আমি বলেছিলাম, ‘তোমরা এই জনপদে প্রবেশ করো। এবং তোমরা উহার যেখান থেকে ইচ্ছা করো স্বাচ্ছন্দ্যে খাও। এবং তোমরা সাজদাহরত অবস্থায় ফটকদ্বার দিয়ে প্রবেশ করো। এবং তোমরা বলো, হিত্তাতুন (ক্ষমা চাই)। তাহলে আমি তোমাদের গুনাহখাতা ক্ষমা করে দেবো। এবং সুন্দর আচরণকারীদেরকে (আমার অনুগ্রহ) বাড়িয়ে দেবো।

২:১২৫ :: এবং (উল্লেখ্য) যখন আমি আল বাইত’কে (অনন্য প্রতিষ্ঠানকে) স্থাপন করেছি মানবজাতির জন্য সমাবর্তনস্থলরূপে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থারূপে। এবং তোমরা ইবরাহীমের আদর্শিক অবস্থানকে (মাক্বামে ইবরাহীম) সালাত সম্বলিত নীতি-ব্যবস্থাপনা (মুসল্লা) হিসেবে গ্রহণ করো। এবং আমি ফরমান দিয়েছি ইবরাহীমকে এবং ইসমাইলকে (এ মর্মে) যে, আমার (নির্ধারিত) প্রতিষ্ঠানকে পরিচ্ছন্ন রাখো তাওয়াফকারীদের জন্য, তিকাফকারীদের জন্য, রুকূ'কারীদের জন্য এবং সাজদাহকারীদের জন্য।

৩:৪৩ :: হে মারইয়াম, তুমি বিনয় প্রকাশ (ক্বুনূত) করো তোমার প্রভুর উদ্দেশ্যে, এবং তুমি সাজদাহ করো, এবং তুমি রুকূ' করো রুকূ'কারীগণের সাথে।

৩:১১৩ :: তারা সবাই এক রকম নয়। কিতাবীদের মধ্যে ক্বিয়ামকারী একটি উম্মাহ আছে। তারা রাতের বেলায় আল্লাহর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে এবং তারা সাজদাহ করে।

৪:১০২ :: এবং ‘(কাফিরদের কর্তৃক ফিতনায় পড়ার আশংকাগ্রস্ত অবস্থায়) যখন তুমি (রাসূল) তাদের মধ্যে থাকো, এবং তুমি তাদের জন্য (= তাদের নেতৃত্বমূলক ভূমিকায় থেকে) সালাত প্রতিষ্ঠা কর; তখন যেন দাঁড়ায় তাদের মধ্যকার একদল তোমার সাথে। এবং তারা যেন তাদের অস্ত্র সাথে নিয়ে সতর্ক থাকে। তারপর যখন তারা সাজদাহ করবে, তখন তারা যেন তোমাদের পেছনে সরে যায়। এবং যেন আসে অন্য দল যারা সালাত করেনি। তখন তারা যেন সালাত করে তোমার সাথে। তারাও যেন ঠিক রাখে তাদের সতর্কতা এবং তাদের অস্ত্র। এবং যারা কুফর করেছে তারা কামনা করে, যদি তোমরা গাফেল হয়ে যাও তোমাদের অস্ত্র থেকে এবং তোমাদের সাজসরঞ্জাম থেকে! তাহলে তারা আক্রমণ করবে তোমাদের উপর, একটাই চরম আক্রমণ। এবং কোনো গুনাহ নেই তোমাদের উপর, যদি তোমাদের কষ্ট হয় বৃষ্টির কারণে অথবা তোমরা হয়ে পড়ো অসুস্থ, সেই অবস্থায় সরিয়ে রাখলে তোমাদের অস্ত্র। এবং তোমরা অবলম্বন করো তোমাদের সতর্কতা। নিশ্চয় আল্লাহ প্রস্তুত করে রেখেছেন কাফিরদের জন্য অপমানকর শাস্তি।

৪:১৫৪ :: এবং আমি তাদের অঙ্গীকারের পরিপ্রেক্ষিতে তূরকে তাদের উপর সমুচ্চে তুলে ধরেছিলাম। এবং আমি তাদেরকে বলেছিলাম, “তোমরা সাজদাহরত অবস্থায় ফটকদ্বার দিয়ে প্রবেশ করো”। এবং তাদেরকে বলেছিলাম, “সাবতের (বিশ্রাম দিবসের / সপ্তম দিনের / শনিবারের) বিষয়ে সীমালংঘন করো না। এবং আমি তাদের থেকে মজবুত অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম।

৭:১১ :: এবং নিশ্চয় আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি। তারপর আমি তোমাদেরকে (মানুষের) আকৃতিদান করেছি। তারপর (এক পর্যায়ে)। আমি ফেরেশতাদেরকে বলেছি, ‘আদমের জন্য সাজদাহ করো’। তখন তারা সাজদাহ করলো। ইবলিস ছাড়া। সে সাজদাহকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

৭:১২ :: তিনি (আল্লাহ) বললেন, ‘কিসে তোমাকে মানা করেছে যে, তুমি সাজদাহ করোনি, যখন আমিই তোমাকে আদেশ দিয়েছি?’ সে বললো, ‘আমি তার চেয়ে উত্তম। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন আগুন থেকে। এবং আপনি তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে’।

৭:১২০ :: এবং ঐ ঘটনা নত করে দিয়েছিলো যাদুকরদেরকে সাজদাহকারী হিসাবে।

৭:১৬১ :: যখন তাদেরকে বলা হয়েছিলো, ‘তোমরা এই জনপদে বাস করো। এবং তোমরা উহার যেখান থেকে ইচ্ছা করো খাও। এবং তোমরা বলো, হিত্তাতুন (ক্ষমা চাই); এবং তোমরা সাজদাহরত অবস্থায় ফটকদ্বার দিয়ে প্রবেশ করো। তাহলে আমি তোমাদের গুনাহখাতা ক্ষমা করে দেবো। এবং সুন্দর আচরণকারীদেরকে (আমার অনুগ্রহ) বাড়িয়ে দেবো।

৭:২০৬ :: নিশ্চয় যারা তোমার রবের নিকট আছে তারা (ফেরেশতাগণ) তাঁর দাসত্ব করার প্রসঙ্গে অহংকার করে না। এবং তারা তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করে এবং তারা তাঁর জন্য সাজদাহ করে।

৯:১১২ :: যারা তাওবাহকারী, ইবাদাতকারী, (আল্লাহর) প্রশংসাকারী, (আল্লাহর সন্তুষ্টির কাজে) বিচরণকারী, রুকূ'কারী, সাজদাহকারী, ন্যায়কাজের আদেশকারী, অন্যায়কাজের নিষেধকারী এবং আল্লাহর দেয়া সীমাসমূহ হেফাযতকারী; (এ ধরনের) মু’মিনদেরকে তুমি সুসংবাদ দাও।

১২:৪ :: যখন ইউসুফ তার পিতাকে বলেছিলো, ‘হে আমার আব্বা, নিশ্চয় আমি (স্বপ্নে) দেখেছি এগারোটি গ্রহ এবং সূর্য ও চন্দ্রকে। আমি ঐসবকে দেখেছি আমার জন্য সাজদাহকারী অবস্থায়’।

১২:১০০ :: এবং সে তার পিতামাতাকে রাজকীয় আসনের উপরে উঠিয়ে নিলো। এবং তারা (ইউসুফের পিতা, মাতা ও ১১ ভাই) তার জন্য (ইউসুফের জন্য) সাজদাহতে ঝুঁকে পড়লো। এবং সে বললো, ‘হে আমার আব্বা, ইহাই আমার স্বপ্নের ব্যাখ্যা, যা আমি আগে দেখেছিলাম। নিশ্চয় আমার প্রভু উহাকে সত্য ঘটনায় পরিণত করেছেন। এবং নিশ্চয় তিনি অনুগ্রহ করেছেন আমার প্রতি, যখন তিনি আমাকে বের করেছেন কারাগার থেকে এবং আপনাদেরকে এনেছেন মরুভূমি থেকে, উহার পরে যে, শয়তান বিরোধ লাগিয়েছিলো আমার ও আমার ভাইদের মধ্যে। নিশ্চয় আমার প্রভু যা ইচ্ছা করেন তা সম্পাদনের উপায় সম্পর্কে সূক্ষদর্শী। নিশ্চয় তিনি মহাজ্ঞানী ও মহাবিজ্ঞ’।

১৩:১৫ :: এবং আল্লাহর জন্য সাজদাহ করে যা কিছু আছে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে ইচ্ছায় হোক এবং অনিচ্ছায় হোক, এবং তাদের ছায়াগুলোও সকালে ও বিকালে।

১৫:২৯ ::  তারপর যখন আমি তাকে সুঠাম করবো এবং আমি ফুঁকে দেবো তার মধ্যে আমার রুহ থেকে তখন তোমরা হয়ো তার জন্য সাজদাহকারী।

১৫:৩০ :: তারপর (যথাসময়ে) সাজদাহ করলো ফেরেশতাগণ, সবাই একত্রে।

১৫:৩১ :: ইবলিস ছাড়া। সে সাজদাহকারীদের সাথে থাকতে অস্বীকার করলো।

১৫:৩২ :: তিনি (আল্লাহ) বললেন, ‘হে ইবলিস, তোমার কী হয়েছে যে, তুমি সাজদাহকারীদের সাথে অন্তর্ভুক্ত হওনি?’

১৫:৩৩ :: সে (ইবলিস) বললো, ‘আমি মানুষের জন্য সাজদাহ করতে সম্মত নই, যাকে আপনি সৃষ্টি করেছেন গন্ধযুক্ত কাদা থেকে তৈরি শুকনো ঠনঠনে মাটি থেকে’।

১৫:৯৮ :: তুমি তোমার প্রভুর প্রশংসাজ্ঞাপনসহ তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করো। এবং সাজদাহকারীদের অন্তর্ভুক্ত হও।

১৬:৪৮ :: তারা কি দেখেনি ঐসব কিছুর অবস্থা যা আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন, বিভিন্ন বস্তুর মধ্য থেকে? ফিরে আসে উহার ছায়া ডানদিক থেকে ও বামদিক থেকে, আল্লাহর জন্য সাজদাহকারী অবস্থায়, এবং তারা বিনয়ী।

১৬:৪৯ :: এবং আল্লাহর জন্য সাজদাহ করে যা কিছু আছে আকাশমন্ডলীতে এবং যা কিছু আছে পৃথিবীতে, জীবজন্তু এবং ফেরেশতাগণ এবং তারা (ফেরেশতাগণ) অহংকার করে না।

১৭:৬১ :: যখন আমি ফেরেশতাদেরকে বললাম, ‘আদমের জন্য সাজদাহ করো’। তখন তারা সাজদাহ করলো। ইবলিস ছাড়া। সে বললো, ‘আমি কি তার জন্য সাজদাহ করবো যাকে আপনি সৃষ্টি করেছেন কাদা মাটি থেকে?’

১৭:১০৭ :: বলো, ‘তোমরা উহার প্রতি বিশ্বাস করো অথবা বিশ্বাস না করো, নিশ্চয় যাদেরকে (আসমানী কিতাবের) জ্ঞান দেয়া হয়েছে তোমাদের আগে; যখন উহা (আল কুরআন) তাদের কাছে পাঠ করা হয়, তখন তারা চিবুকসমূহের উপর সাজদাহয় ঝুঁকে পড়ে।

১৮:৫০ :: যখন আমি ফেরেশতাদেরকে বললাম, ‘আদমের জন্য সাজদাহ করো’। তখন তারা সাজদাহ করলো। ইবলীস ছাড়া। সে জিনদের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। তখন সে তার প্রভুর আদেশের প্রতি অবাধ্যতা করলো। তবে কি তোমরা আমার পরিবর্তে তাকে এবং তার বংশধরদেরকে আওলিয়া / অভিভাবক হিসাবে গ্রহণ করছো? অথচ তারা তোমাদের জন্য শত্রু। যালিমদের এই বদল (আল্লাহর বদলে শয়তান ও তার বংশধরদেরকে অভিভাবক হিসাবে গ্রহণ) অত্যন্ত নিকৃষ্ট।

১৯:৫৮ :: তারাই ঐসব লোক যাদের উপর আল্লাহ নিয়ামতদান করেছেন, যারা ছিলো নবী, যারা আদমের বংশধর, এবং তাদের মধ্যকার ব্যক্তি যাদেরকে আমি আরোহন করিয়েছিলাম নূহের সাথে (নূহের নৌকায়), এবং ইবরাহীমের ও ইসরাইলের বংশধর, এবং যাদেরকে আমি হিদায়াত করেছিলাম, এবং আমি মনোনীত করেছিলাম। যখন তিলাওয়াত করা হতো তাদের কাছে দয়াময়ের আয়াতসমূহ, তখন তারা সাজদাহতে এবং কান্নাতে ঝুঁকে পড়তো।

২০:৭০ :: তারপর (মূসার উপস্থাপনের পর) যাদুকরগণ সাজদাহয় নত হয়ে গেলো। তারা বললো, ‘আমার ঈমান/ বিশ্বাস করেছি হারূন ও মূসার প্রভুর প্রতি’।

২০:১১৬ :: যখন আমি ফেরেশতাদেরকে বললাম, ‘আদমের জন্য সাজদাহ করো’। তখন তারা সাজদাহ করলো। ইবলীস ছাড়া। সে অমান্য করলো।

২২:১৮ :: তুমি কি ভেবে দেখোনি যে, আল্লাহ এমন সত্তা, তাঁর জন্য সাজদাহ করে যারা আছে আকাশমন্ডলীতে এবং যারা আছে পৃথিবীতে এবং সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্রমন্ডলী, পাহাড়সমূহ, গাছ-গাছালি, প্রাণীসমূহ এবং মানুষের মধ্য থেকে অনেকে। এবং অনেক মানুষ নিজের উপর আযাবের হক্বদার হয়ে গেছে। এবং যাকে আল্লাহ অপমানিত করেন তাকে সম্মানদাতা কেউ নেই। নিশ্চয় আল্লাহ করে থাকেন যা তিনি করার ইচ্ছা করেন।

২২:২৬ :: এবং (উল্লেখ্য) যখন আমি নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম ইবরাহীমের জন্য আল বাইতের (কা’বাঘরের) স্থান। এ নির্দেশসহ যে, ‘আমার সাথে কোন সত্তাকেই শরীক সাব্যস্ত করো না। এবং আমার ঘরকে পবিত্র রাখো তাওয়াফকারীদের জন্য, ক্বিয়ামকারীদের জন্য (যারা দাঁড়ায় তাদের জন্য), রুকূ'কারীদের জন্য ও সাজদাহকারীদের জন্য’।

২২:৭৭ :: হে মু’মিনগণ, তোমরা রুকূ' করো, সাজদাহ করো, তোমাদের প্রভুর ইবাদাত করো এবং কল্যাণকর কাজ করো; যেন তোমরা সফল হতে পারো।

২৫:৬০ :: এবং যখন তাদেরকে বলা হয়, ‘দয়াময়ের জন্য সাজদাহ করো’। তখন তারা বলে, ‘দয়াময় আবার কে? আমরা কি সাজদাহ করবো যার জন্য তুমি বলবে?’ এবং উহা তাদের মধ্যে বিমুখতা বাড়িয়ে দেয়।

২৫:৬৪ :: এবং তারা (দয়াময় আল্লাহর বান্দারা) রাত কাটায় তাদের প্রভুর জন্য সাজদাহ অবস্থায় ও ক্বিয়াম (= দাঁড়ানো) অবস্থায়।

২৬:৪৬ :: তারপর (মূসার উপস্থাপনের পর) যাদুকরগণ সাজদাহয় নত হয়ে গেলো।

২৬: ২১৮-২১৯ :: তিনি তোমাকে দেখেন যখন তুমি ক্বিয়াম করো (দাঁড়াও)। এবং (তিনি দেখেন) সাজদাহকারীদের মধ্যে তোমার গতিবিধি।

২৭:২৪ :: (হুদহুদ বললো), ‘এবং আমি পেয়েছি তাকে (সাবার রানীকে) ও তার ক্বওমকে এরূপ যে, তারা আল্লাহর জন্য সাজদাহ করার পরিবর্তে সূর্যের জন্য সাজদাহ করে। এবং শয়তান তাদের কাছে তাদের কাজগুলোকে সুশোভিত করে দিয়েছে এবং তাদেরকে সঠিক পথ থেকে বিরত রেখেছে। তাই তারা হিদায়াত পায় না।

২৭:২৫ :: (শয়তান তাদেরকে প্ররোচিত করেছে) যেন না তারা আল্লাহর জন্য সাজদাহ করে, যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর গুপ্ত জিনিসগুলোকে বের করেন এবং তোমরা যা গোপন করো ও যা প্রকাশ করো তার সবই জানেন।

৩২:১৫ ::  নিশ্চয় আমার আয়াতসমূহের প্রতি তারাই বিশ্বাস করে যারা এমন যে, যখন তাদেরকে উহা দ্বারা উপদেশ দেয়া হয় তখন সাজদাহয় ঝুঁকে পড়ে এবং তাদের প্রভুর প্রশংসাজ্ঞাপনসহ পবিত্রতা বর্ণনা করে এবং তারা অহংকার করে না।

৩৮:৭২ :: তারপর যখন আমি তাকে (আদমকে) সুষমভাবে পূর্ণমাত্রায় গঠন করবো এবং আমার রূহ থেকে ফুঁকে দেবো তখন তোমরা তার জন্য সাজদাহকারী হবে।

৩৮:৭৩ :: তারপর (যথাসময়ে) সাজদাহ করলো ফেরেশতাগণ, সবাই একত্রে।

৩৮:৭৪-৭৫ :: ইবলিস ছাড়া। সে অহংকার করলো এবং কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত হলো। তিনি (আল্লাহ) বললেন, ‘কিসে তোমাকে মানা করেছে যে, তুমি তার জন্য সাজদাহ করোনি, যাকে আমি আমার দুহাত দ্বারা সৃষ্টি করেছি। তুমি কি অহংকার করলে নাকি তুমি উচ্চমর্যাদাসম্পন্নদের অন্তর্ভুক্ত?

৩৯:৯ :: নাকি যে বিনীত (ক্বুনূতকারী), রাতের বেলায় সাজদাহকারী ও ক্বিয়ামকারী, আখিরাতকে ভয় করে এবং তার প্রভুর দয়ার আশা করে। বলো, ‘যারা জ্ঞানার্জন করে এবং যারা জ্ঞানার্জন করে না তারা উভয়ে কি সমান? নিশ্চয় (যথানিয়মে) চিন্তাশীলগণই উপদেশ গ্রহণ করে।

৪১:৩৭ :: এবং তাঁর আয়াতসমূহের মধ্যে আছে রাত, দিন, সূর্য ও চাঁদ। তোমরা সূর্যের জন্য ও চাঁদের জন্য সাজদাহ করো না এবং আল্লাহর জন্যই সাজদাহ করো যিনি ঐগুলোকে সৃষ্টি করেছেন, যদি তোমরা শুধু তাঁরই ইবাদাত করো।

৪৮:২৯ :: মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ এবং যারা তার সাথে আছে তারা কাফেরদের প্রতি কঠোর এবং তাদের নিজেদের মধ্যে দয়ালু। তুমি তাদেরকে দেখবে রুকূ'কারী ও সাজদাহকারী, আল্লাহর পক্ষ থেকে অনুগ্রহ (হালাল জীবিকা) ও (তাঁর) সন্তুষ্টি অন্বেষণকারী। তাদের লক্ষণ তাদের মুখমন্ডলে / চেহারায় (ফুটে থাকে) সাজদাহর চিহ্ন থেকে (সাজদাহর প্রভাবে)। উহাই তাওরাতে তাদের দৃষ্টান্ত। এবং ইনজীলে তাদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে, যেন একটি চারাগাছ যা বের করে তার অংকুর, তারপর উহাকে পুষ্টি যোগায়, তারপর উহা শক্ত হয়, তারপর উহা তার কান্ডের উপর দৃঢ়ভাবে দাঁড়ায়, তখন উহা চাষীদেরকে আনন্দ দেয়। (এভাবে আল্লাহ মু’মিনদেরকে মজবুতি দেন) যেন তাদের কারণে কাফেরদের গা জ্বালা করে। যারা বিশ্বাস করে এবং তাদের মধ্য থেকে যারা সৎকর্ম করে আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার দেয়ার ওয়াদা করেছেন।

৫০:৩৯-৪০ :: তারা যা বলছে উহার ব্যাপারে তুমি সবর করো এবং তোমার প্রভুর প্রশংসাজ্ঞাপনসহ তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করো সূর্য উদয়ের আগে এবং সূর্য অস্তের আগে। এবং রাতের কিছু অংশে। তুমি তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করো সাজদাহসমূহের পরেও।

৫৩:৬২ :: তোমরা আল্লাহর জন্য সাজদাহ করো এবং তাঁর ইবাদাত (দাসত্ব, উপাসনা) করো।

৫৫:৬ :: নক্ষত্র ও গাছ উভয়ে সাজদাহ করে।

৬৮:৪২ :: যেদিন পায়ের গোছা উন্মোচিত করা হবে (কঠিন সময় উপস্থিত হবে) এবং তাদেরকে আহবান করা হবে সাজদাহ করার দিকে তখন তারা (সাজদাহ করতে) পারবে না।

৬৮:৪৩ :: তাদের চোখসমূহ অবনত (খুশু) অবস্থায় থাকবে এবং অপমান তাদেরকে আচ্ছাদিত করবে। এবং নিশ্চয় তাদেরকে আহবান করা হতো সাজদাহ করার দিকে, এ অবস্থায় যে, তারা সুস্থ ও নিরাপদ ছিলো (তবুও তারা সাজদাহ করতো না)।

৭৬:২৬ :: এবং রাতের বেলায় তাঁর জন্য সাজদাহ করো এবং রাতের দীর্ঘ সময় তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করো।

৮৪:২০-২১ :: তাদের কি হলো যে, তারা ঈমান (বিশ্বাস) করে না? এবং যখন তাদের কাছে আল কুরআন পাঠ করা হয় তখন তারা সাজদাহ করে না?

৯৬:১৯ :: কক্ষনো না। তুমি তাকে মান্য করো না এবং (আল্লাহর জন্য) সাজদাহ করো এবং (তাঁর) নেকট্য অর্জন করো।

সাজদাহ সম্পর্কে মৌলিক আলোচ্য পয়েন্ট

১. সাজদাহ সালাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ বিষয় নয়, এটি সালাতের সাথেও সম্পৃক্ত আবার বিযুক্ত অবস্থায়ও আছে। (২২:৭৭-৭৮, ৪:১০২)

২. সাজদাহ সম্পর্কিত আয়াতসমূহের সমন্বিত অধ্যয়ন অনুসারে, সাজদাহ বলতে বুঝায়: (১) কারো সম্মানার্থে মাথা ঝোঁকানো (যা চেয়ারে বসেও করা যায়), (২) পরম প্রণতি বা প্রণিপাত, (৩) কোনো কর্তৃত্বের প্রতি পূর্ণ সম্মান জ্ঞাপন বা কোনো তথ্য-নির্দেশকে সম্পূর্ণ ঐকান্তিকভাবে মেনে নেয়া, (৪) কারো কর্তৃত্বের প্রতি স্বীকৃতির সাথে সম্পর্কিত তাৎক্ষণিক ও ধারাবাহিক ভূমিকা পালনের অভিব্যক্তি, (৫) উপাসনামূলক সম্মান/ভক্তি প্রদর্শন।

৩. কেউ কেউ যত স্থানে সাজদাহ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে তার সর্বত্র এর অর্থ ‘মান্য করা’ অনুবাদ করার প্রয়াস পান। কিন্তু কুরআনে দাসত্বের জন্য ইবাদাত এবং আদেশ মান্য করার জন্য ইতায়াত শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। সাজদাহ এর অর্থের মধ্যে আদেশ শুনা ও মানার দিকটিও অন্তর্ভুক্ত, কিন্তু এটিই সাজদাহ শব্দের সরাসরি অর্থ নয়। সাজদাহর মাধ্যমে কোনো কর্তৃত্বকে মেনে নেয়া ও তার নির্দেশনার যথাযথ বাস্তবায়ানার্থে তা গ্রহণ করার অভিব্যক্তি প্রকাশ পায়। কিন্তু সাজদাহ শব্দটি দ্বারা এরুপ আনুষ্ঠানিক কর্মও বুঝায়, যা সাধারণভাবে আদেশ মান্য করা নয় এবং কখনো কখনো যার সাথে কোন আদেশের সম্পর্ক নেই বরং শুধু ভক্তি প্রকাশের উপায় হিসাবেও সাজদাহ করা হতে পারে (৪১:৩৭, ২৭:২৪, ৬৮:৪২-৪৩)। আবার ২৬:২১৮-২১৯, ২৫:৬৪ ও ৩৯:৯ অনুযায়ী, সাজদাহ ও ক্বিয়াম দুটি স্বতন্ত্র অবস্থা যার মধ্যে অবস্থান্তর প্রক্রিয়া কার্যকর রয়েছে তথা একটি অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় যেমন ক্বিয়াম থেকে সাজদাহয় এবং সাজদাহ থেকে ক্বিয়ামে যাওয়ার মাধ্যমে অবস্থার পরিবর্তন ঘটে।

৪. আনুষ্ঠানিক ক্বিয়াম / দাঁড়ানো এবং সাজদাহ / প্রণিপাত করার স্বাভাবিক পদ্ধতি একটি সুপরিজ্ঞাত বিষয়, এটিকে হুবহু সুনির্দিষ্ট করে কোনো জটিলতা আরোপ করা হয়নি। কুরআন মানুষের ব্যবহারিক ভাষায় নাযিল হয়েছে এবং এ কারণে মানুষের ব্যবহারিক ভাষা অনুযায়ী কুরআনের বক্তব্য অনুধাবন করতে হবে। অবশ্য কুরআনে শব্দসমূহকে উহার শব্দমূল ভিত্তিক মৌলিক সংগতিপূর্ণ অর্থে বা ভাবার্থে ব্যবহার করা হয়েছে যে কারণে উহা যিকির বা পুন:পুন স্মরণ ও উপদেশ গ্রহণের জন্য সহজ হয়েছে। সাজদাহর প্রচলিত প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি গ্রহণযোগ্য, যদিও উহাই একমাত্র পদ্ধতি হিসাবে কুরআনে সীমাবদ্ধ করা হয়নি, বরং এক্ষেত্রে নির্বাহী অবকাশ দেয়া হয়েছে। রুকূ'র ক্ষেত্রেও অনুরূপ কথা।

সাজদাহর পদ্ধতি যে মানুষের মনস্তত্ত্বে অন্তর্নিহিত করা আছে নবী মূসার সময়ে যাদুকরদের সাজদাহ থেকে তা স্পষ্ট। তাদেরকে কোনো হাদীসগ্রন্থের মাধ্যমে সাজদাহর পদ্ধতি শিখানো হয়নি এবং তারা যে পদ্ধতিতে সাজদাহ করেছে আল্লাহর নিকট সেটিই তাদের সাজদাহ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়েছে। এক্ষেত্রে তাদের পা, কোমর, কপাল কিভাবে ছিলো না ছিলো এসব নিয়ে আপত্তি কিংবা চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়নি। প্রাসঙ্গিক আয়াত: ৭:১২০, ২০:৭০, ২৬:৪৬।

সুতরাং আনুষ্ঠানিক সাজদাহর স্বরূপ কী হবে তা পরম্পরাগত অনুশীলন থেকে উপলব্ধি করা যেতে পারে, আল্লাহর প্রতি ভক্তি প্রকাশার্থে যে ধরনের শারীরিক ভাষা (Body Language) বা শারীরিক মুভমেন্ট করা যেতে পারে বলে মানুষের মনস্তত্ত্বে অন্তর্নিহিত রয়েছে সে অনুসারে সাজদাহ করা যেতে পারে। তবে কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের মাধ্যমে যাচাই করে নিয়ে সেটির স্বরূপকে পরিশীলিত করে নিতে হবে। যেমন শুধুমাত্র দাঁড়ানো অবস্থায় মাথা নিচু রাখলে সেটিই সাজদাহ হিসেবে যথেষ্ট সাব্যস্ত হবে কিনা, বিষয়টি যাচাই সাপেক্ষ। এ বিষয়ে পরবর্তী একটি পয়েন্টে আলোচনা করা হবে।

৫. যখন সালাত ও যাকাতের সাথে রুকূ'র কথা বলা হয়, তখন তা সালাতের অন্তর্ভুক্ত রুকূ' নয়, স্বতন্ত্র রুকূ'। যখন সালাত ও যাকাতের পাশাপাশি সাজদাহর কথা বলা হয়, সেক্ষেত্রেও অনুরূপ কথা প্রযোজ্য। অর্থাৎ এসব ক্ষেত্রে তা সালাত ও যাকাতের মতই একটি স্বতন্ত্র কাজ।

৬. মানসিক সংযোগ বিহীন রুকূ' ও সাজদাহ প্রকৃত রুকূ' ও সাজদাহ নয়। রুকূ'-সাজদাহ এর অনানুষ্ঠানিক বা ব্যাপকভত্তিক অর্থের ক্ষেত্রে এর আধ্যাত্মিক দিকটিকেই সরাসরি হাইলাইট করা হয়। অন্যদিকে আনুষ্ঠানিক রুকূ'-সাজদাহর ক্ষেত্রে এর আধ্যাত্মিক দিকটির সাথে সমন্বয় না থাকলে তা নিছক আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়ে প্রকৃত রুকূ'-সাজদাহ হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা হারায় বা মূল্যহীন হয়ে যায়। আলোচনার প্রসঙ্গ (Context) অনুসারে কোথায় রুকূ'-সাজদাহর আনুষ্ঠানিক দিকটিও অন্তর্ভুক্ত হবে তা চিহ্নিত করা সম্ভব।

৭. নক্ষত্র ও উদ্ভিদ সাজদাহ করে, বস্তুসমূহের ছায়া ডানে বামে সরে গিয়ে সাজদাহ করে। এক্ষেত্রে সূর্য হলো ছায়ার দলীল যে, কোনদিকে ছায়া পড়বে তা নির্ধারিত হবে সূর্য কোনদিক থেকে আলো দিচ্ছে তার উপর। অন্য কথায়, আল্লাহর দেয়া ফর্মুলা অনুসারে যখন মুভমেন্ট হয় সেটাই সাজদাহ

আবার এর মানে এটাও নয় যে, মানুষের ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক সাজদাহর কোনো অবকাশ নেই। কারণ অন্যান্য সৃষ্টির সৃষ্টি-প্রকৃতির সাথে মানুষের সৃষ্টি-প্রকৃতির অনেক মিল থাকার পাশাপাশি অমিলও রয়েছে। মানুষকে যে ধরনের মনোদৈহিক গঠন-প্রকৃতি দেয়া হয়েছে সেই সাপেক্ষে মানুষের সাজদাহর ক্ষেত্রে একটি আনুষ্ঠানিক রূপ থাকলে অন্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সাজদাহর সাথে তার আক্ষরিক মিল অনুসন্ধান করতে হবে এমনটি অপরিহার্য নয়।

৮. কুরআন ক্বিরায়াত শুনে সাজদাহ করতে হয়। এর মানে হলো মনোযোগ দিয়ে তা শুনতে হবে এবং তার নির্দেশনাগুলো মানতে হবে। অন্য কথায়, সাজদাহ হলো ‘শুনা ও মানা’ এর সমার্থক শব্দ। এছাড়াও কুরআন ক্বিরায়াত শেষে আনুষ্ঠানিক সাজদাহ করা যেতে পারে।

৯. সাজদাহরত অবস্থায় ফটকদ্বার দিয়ে প্রবেশ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এর মানে হলো আল্লাহর প্রতি ভক্তিপ্রবণ থেকে ফটকদ্বার দিয়ে প্রবেশ করতে হবে।

১০. চন্দ্র ও সূর্যকে সাজদাহ নয়। অর্থাৎ চন্দ্র ও সূর্যকে কোনো ক্ষেত্রে স্বাধীন প্রভাব বিস্তারকারী মনে করে এর উপাসনা করা যাবে না, এর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা যাবে না।

১১. আদমকে এবং ইউসুফকে সাজদাহ করার মানে হলো আদম ও ইউসুফকে আল্লাহ যে কর্তৃত্ব দিয়েছেন উহার স্বীকৃতি প্রদান করে তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। এটা তাদের উপাসনামূলক সাজদাহ নয়, বরং এটা সাধারণ সম্মান প্রদর্শনমূলক অভিব্যক্তি। সুতরাং এক্ষেত্রে অঙ্গভঙ্গি তেমন হওয়ার কথা নয় যা আল্লাহর প্রতি উপাসনামূলক সাজদাহর ক্ষেত্রে হয়। এ বিষয়ে নমুনাস্বরূপ ইউসুফের প্রতি যে সাজদাহ সেক্ষেত্রে তাঁর পিতামাতা সিংহাসনে বসা অবস্থায় সাজদাহ করেছিলেন। সুতরাং এ সাজদাহ চেয়ারে বসে সামান্য মাথা ঝুঁকানোর মাধ্যমে সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমেই সম্পাদিত হয়ে যায়। এমনকি এ অর্থে ছাত্ররা যখন শিক্ষকের সম্মানার্থে দাঁড়ায় তাকেও সাজদাহ বলা যেতে পারে। তবে একটি বিশেষ লক্ষণীয় বিষয় হলো, আদমের প্রতি সাজদাহ আল্লাহর সরাসরি নির্দেশে সংঘটিত হয়েছে। এবং ইউসুফের প্রতি সাজদাহও আল্লাহর পক্ষ থেকে দেখানো একটি স্বপ্নের বাস্তবায়নগত রূপের উপলব্ধি (তাভীল) অনুসারে তাঁর পিতামাতা ও তাদের অনুকরণে তাঁর ১১ ভাইয়ের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু এছাড়া কোনো মানুষকে অন্য মানুষরা সাজদাহ করার জন্য কুরআনে কোনো নির্দেশ দেয়া হয়নি। সুতরাং বর্তমানে আমরা কাউকে সাজদাহ করার জন্য নির্দেশপ্রাপ্ত নই। এমনকি কুরআনে রসূলের সমকালেও মু’মিনদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়নি যে, তোমরা রাসূলকে সাজদাহ করো। তাই আদম ও ইউসুফের সাজদাহকে সামনে এনে মানুষ মানুষকে সাজদাহ দিতে হবে এরূপ কোনো নিয়ম প্রবর্তন করা যেতে পারে না। এছাড়া আদম ও ইউসুফের সাজদাহর একটি বিশেষ তাৎপর্য হলো, তাঁদেরকে আল্লাহ প্রদত্ত কর্তৃত্ব মেনে নিয়ে তাঁরা যেন নির্বিঘ্নে সেই কর্তৃত্ব চর্চার মাধ্যমে আল্লাহর অনুমোদিত সীমারেখায় কার্যক্রম সম্পাদন করতে পারেন সেজন্য সহযোগিতামূলক পরিবেশ বজায় রাখা এবং সেজন্য তাঁদেরকে তাওফীক্ব প্রদানের জন্য আল্লাহর কাছে আবেদন করার অভিব্যক্তি। অর্থাৎ এক্ষেত্রে ‘আদমের জন্য সাজদাহ’ মানে ‘আদমের কর্তৃত্বের প্রতি অনুকূল মনোবৃত্তির প্রকাশস্বরূপ আল্লাহকে সাজদাহ’ এর অর্থ প্রকাশ পায়। অর্থাৎ কোনোক্রমেই আদম ও ইউসুফকে সাজদাহর স্বরূপ আল্লাহর জন্য যে সাজদাহ সেটির অনুরূপ হতে পারে না। আল্লাহর জন্য সাজদাহ হলো উপাসনামূলক। অন্যদিকে আদমের জন্য ও ইউসুফের জন্য সাজদাহ কোনোক্রমেই তাঁদের প্রতি উপাসনামূলক হতে পারে না। কারণ উপাসনা পাওয়া একমাত্র আল্লাহর অধিকার। এবং তাই উপাসনামূলক সাজদাহ পাওয়াও একমাত্র আল্লাহর অধিকার। সুতরাং আগে সাজদাহয়ে তাজিমি (সম্মানজনক সাজদাহ) হিসেবে মানুষকে সাজদাহ দেয়া বৈধ ছিলো, এখন নেই; এ কথা বলা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ কুরআন এ ধরনের তথ্য দেয়নি। যদি সাজদাহ বলতে সাধারণ সম্মান প্রদর্শন যেমন কাউকে স্যালুট করা বুঝানো হয়, তা পূর্বে ও পরে সবসময় বৈধ, কারণ এটিকে নিষিদ্ধ করা হয়নি। কিন্তু যদি সাজদাহ বলতে যেভাবে ষষ্ঠাংগ প্রণিপাত করে আল্লাহর উপাসনা করা হয় তা বুঝায় তবে হুবহু একই বাহ্যিক কাঠামোর সাজদাহ মানুষের জন্য তা’জিমি অর্থে বৈধ বলার অবকাশ নেই। বিশেষ করে কুরআনে কোথাও ‘তোমরা নবী-রসূলকে বা অমুক ধরনের কোনো মানুষকে সাজদাহ করো’ এরূপ কোনো নির্দেশ নেই।

১২. বিভিন্ন সৃষ্টিকে সাজদাহ করতে দেখার তাৎপর্য হলো বিভিন্ন সৃষ্টি আল্লাহর তৈরি ফর্মুলা অনুসারে যথাযথ মুভমেন্ট অব্যাহত রাখে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা।

১৩. চিবুকের উপর সাজদাহ করা ও কান্না করার তাৎপর্য হলো: চিবুককে অবনমিত করে সাজদাহ করা ও কান্না করা। দাঁড়িয়ে, বসে এবং উপাসনামূলক সাজদাহর সময় সর্বাবস্থায় চিবুককে অবনত করে কান্না করা যেতে পারে। তবে শুধুমাত্র চিবুক অবনত করাকেই সাজদাহ বলা হয় না। চিবুক উপরের দিকে উঠালে উন্নত শির হয় এবং চিবুককে অবনমিত করলে নতশির হয়। ষষ্ঠাংগ প্রণিপাতের সময়ও চিবুক অবনমিত করা হয় এবং সেক্ষেত্রে একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে মাটিতে কপাল ঠেকে যায়। লক্ষ্য করলে বুঝা যায় যে, কপালের গঠন মাটিতে ঠেকিয়ে সাজদাহ করার সাথে সামঞ্জস্যশীল। তাই পরম সত্তার প্রতি আনুষ্ঠানিক সাজদাহর স্বরূপ হিসেবে পরম্পরাগত অনুশীলন ষষ্ঠাংগ প্রণিপাত সাজদাহর আনুষ্ঠানিক রূপ হিসেবে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণযোগ্য।

১৪. রুকূ'রত ও সাজদাহরত দেখার তাৎপর্য হলো: নিরহংকার ও আল্লাহর প্রতি ভক্তিপ্রবণ হিসেবে দেখা, বিনীতভাবে আল্লাহর বিধানের অনুবর্তী হিসেবে দেখা। এবং চেহারায় সাজদাহর চিহ্ন থাকার তাৎপর্য হলো: সাজদাহ তথা আল্লাহর প্রতি ভক্তিপ্রবণ থাকার প্রভাবে চেহারায় নম্রতা-ভদ্রতার ছাপ থাকা। সাজদাহর প্রভাবে চেহারার মধ্যে চিহ্ন থাকা বলতে কোনো স্থুল চিহ্নকে বুঝায় না। যেমন- কোনো মুনাফিক্বও বাহ্যিক সাজদাহর মাধ্যমে কপালে দাগ লাগাতে পারে। এখানে আন্তরিক সাজদাহর প্রভাবে চেহারায় যে (জীবনপদ্ধতির) পবিত্রতার আভা / দীপ্তি / ছাপ থাকে, যা দার্শনিক দৃষ্টিতে ধরা পড়ে, তার কথাই বুঝানো হয়েছে।

১৫. ক্বিয়ামাত দিবসে সাজদাহ করার নির্দেশ অথচ তা না পারার তাৎপর্য হলো যারা পৃথবীতে শারীরিকভাবে বাহ্যিক সাজদাহ করলেও প্রকৃতপক্ষে আধ্যাত্মিকভাবে সাজদাহ করেনি তাদের এরূপ অবস্থার প্রমাণ উপস্থাপনস্বরূপ সেদিন শারীরিকভাবে সাজদাহ করতে আদেশ দেয়া হবে অথচ তারা তা পারবে না। এর মাধ্যমে তাদের পার্থিব কর্মকাণ্ডে তারা কিরূপ ছিলো তার প্রমাণ পাওয়া যাবে। নিম্নে বিষয়টি ভালোভাবে অনুধাবনের সুবিধার্থে প্রাসঙ্গিক আয়াতসমূহ উল্লেখ করা হলো:

সূরা কলম ৬৮: ৪২-৪৩ :: যেদিন পায়ের গোছা অনাবৃত করা হবে / তারা কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন হবে এবং সাজদাহ করার জন্য ডাকা হবে, সেদিন এসব লোক সাজদাহ করতে পারবে না। তাদের দৃষ্টি নত থাকবে, অপমান তাদের উপর ছেয়ে থাকবে। এবং নিশ্চয় (পৃথিবীতে) সুস্থ থাকা অবস্থায় তাদেরকে সাজদাহ করার জন্য আহবান করা হয়েছিল (এবং তারা তা করেনি)।

সূরা সাজদাহ ৩২:১২ :: তুমি যদি ঐ সময় দেখ যখন অপরাধীরা মাথা ঝুঁকিয়ে তাদের রবের সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে। (তখন তারা বলতে থাকবে) হে আমাদের রব, আমরা খুব দেখলাম ও শুনলাম। এখন আমাদেরকে ফেরত পাঠিয়ে দাও, আমরা নেক আমল করবো। এখন আমাদের ইয়াক্বীন এসে গেছে।

আয়াতদুটি থেকে এ কথা স্পষ্ট যে, সাজদাহর একটি আনুষ্ঠানিক রূপ আছে এবং তা অবশ্যই শুধু দৃষ্টি নিচু করা বা মাথা ঝুঁকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নয়। কেননা যদি তা হতো তবে তা করা সত্ত্বেও অপরাধীরা সাজদাহ করতে পারবে না কথাটি অর্থবহ হতো না। আল্লাহ যেহেতু পরম সত্তা সেহেতু তাঁর উদ্দেশ্যে সাজদাহ হবে পরমভাবে প্রণত হওয়া। তাই সামান্য মাথা ঝুঁকানো তাঁর উদ্দেশ্যে সাজদাহ হিসাবে যথেষ্ট নয়।

পৃথিবীর আধ্যাত্মিক অবস্থা আখিরাতে বস্তুগত রূপ লাভ করবে। যেমন পৃথিবীতে যারা সত্যের ব্যাপারে অন্ধসদৃশ ছিলো তারা এর প্রতিক্রিয়াস্বরূপ ক্বিয়ামাত দিবসে অন্ধসদৃশ হয়ে দণ্ডায়মান হবে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে এ সাজদাহর মাধ্যমে সাজদাহর আনুষ্ঠানিক দিকের ধারণা লাভ করা যায়। যারা সাজদাহ করে সঠিক মনোভাব ও শিক্ষাগ্রহণ ছাড়া তাদের সাজদাহ সাজদাহই নয়। তাই যারা পৃথিবীতে সাজদাহ করেনি বলতে যারা যথাযথ সাজদাহ করেনি তাদেরকেই বুঝায়। পৃথিবীতে সাজদাহ না করার প্রতিক্রিয়ায় ক্বিয়ামাত দিবসে শারীরিকভাবে সাজদাহ করার ক্ষেত্রে অক্ষম হওয়া অসম্ভব নয়।

১৬. সাজদাহর পর পিছনে সরে যাওয়ার প্রসঙ্গানুসারে সাজদাহর আনুষ্ঠানিক স্বরূপ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। সাজদাহ যদি শারীরিক অঙ্গভঙ্গির সাথে সম্পর্কিত না হয় তবে কিভাবে বুঝা যাবে যে, তারা সাজদাহ করেছে এবং তারা পিছনে চলে যাবে ও অন্য দল আসবে? এ থেকে এটাও বুঝা যায় যে, সাজদাহ নিছক সার্বক্ষণিক বিষয় নয়। বরং প্রসঙ্গানুসারে এটি আনুষ্ঠানিক সাজদাহর অর্থেও প্রযোজ্য হয়।

১৭. তাওয়াফ, ক্বিয়াম, রুকূ', সাজদাহ, ই'তিকাফ: তাওয়াফ হলো: (১) আল্লাহর বিধান পরিপালনার্থে কোনো পয়েন্টে বারবার ঘুরাফিরা করা (২) কা’বাঘরের চতুর্দিকে আবর্তন করা। ক্বিয়াম হলো: (১) আল্লাহর বিধান অনুসারে কোনো কাজের জন্য উদ্যোগ নেয়া (২) সালাতের জন্য দাঁড়ানো। রুকূ' হলো: (১) নিরহংকারের সাথে বা বিনীতভাবে এবং স্বীয় চিন্তা ও কর্মের দুর্বলতার স্বীকৃতিস্বরূপ যেকোনো বিষয়ে আল্লাহর বিধানকে গ্রহণ করে নেয়া (২) দণ্ডায়মান অবস্থায় দুই জানুতে দুই হাত ঠেকিয়ে দেহের কোমর থেকে উপরের অংশ কোমর বরাবর সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে কুর্নিশ করা। ই'তিকাফ হলো: (১) আল্লাহর বিধান পালনের জন্য আত্মনিয়োজিত ও ধ্যানমগ্ন হওয়া (২) কোনো সময়কাল নির্দিষ্ট করে নিয়ে সে দিনগুলোতে মাসজিদে ধ্যানমগ্ন থাকা এবং সাধারণ দিনগুলোর যে ধরনের ব্যস্ততা নিতান্তই প্রাকৃতিক নয়, বরং তা স্থগিত রাখা যেতে পারে, তা থেকে বিরত থাকা।

১৮. সাজদাহ প্রসঙ্গে দুটি বিশেষ নির্দেশনা হলো: (ক) তিলাওয়াত শুনে সাজদাহ করা (৮৪:২০-২১) এবং (খ) সাজদাহকারীদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া (১৫:৯৮)।

পরিশিষ্ট ৪: মাসজিদ ও এর ভূমিকা

আল কুরআনে মাসজিদ বলতে কী বুঝানো হয়েছে বা এর তাৎপর্য ও ভূমিকা কী তা অনুধাবনের জন্য প্রথমত আল কুরআনে মাসজিদ শব্দ ধারণকারী আয়াতসমূহের সমন্বিত অধ্যয়ন করা প্রয়োজন।

মাসজিদ শব্দটি একবচনে ও বহুবচনে কুরআনে যেসব স্থানে ব্যবহৃত হয়েছে তা নিচে উল্লেখ করা হলো।

মাসজিদ (সাজদাহর প্রতিষ্ঠান) শব্দটি ২২ স্থানে ব্যবহৃত হয়েছে: ২:১৪৪:১৩, ২:১৪৯:৭, ২:১৫০:৭, ২:১৯১:১৫, ২:১৯৬:৬৫, ২:২১৭:১৭, ৫:২:৩৪, ৭:২৯:৯, ৭:৩১:৭, ৮:৩৪:৯, ৯:৭:১৩, ৯:১৯:৫, ৯:২৮:৯, ৯:১০৭:৩, ৯:১০৮:৫, ১৭:১:৭, ১৭:১:১০, ১৭:৭:১৫, ১৮:২১:৩২, ২২:২৫:৮, ৪৮:২৫:৬, ৪৮:২৭:৮।

মাসাজিদ (মাসজিদ এর বহুবচন) শব্দটি ৬ স্থানে ব্যবহৃত হয়েছে: ২:১১৪:৫, ২:১৮৭:৫৩, ৯:১৭:৬, ৯:১৮:৩, ২২:৪০:২২, ৭২:১৮:২।

মাসজিদ শব্দটি একবচনে ও বহুবচনে যেসব আয়াতে ব্যবহৃত হয়েছে তার সমন্বিত তালিকা নিম্নরূপ:

০২:১১৪, ০২:১৪৪, ০২:১৪৯, ০২:১৫০, ০২:১৮৭, ০২:১৯১, ০২:১৯৬, ০২:২১৭, ০৫:০২, ০৭:২৯, ০৭:৩১, ০৮:৩৪, ০৯:০৭, ০৯:১৭, ০৯:১৮, ০৯:১৯, ০৯:২৮, ০৯:১০৭, ০৯:১০৮, ১৭:০১, ১৭:০৭, ১৮:২১, ২২:২৫, ২২:৪০, ৪৮:২৫, ৪৮:২৬, ৭২:১৮।

মাসজিদ শব্দ ধারণকারী আয়াতসমূহের অনুবাদ নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

২:১১৪ :: এবং তার চেয়ে বড় যালিম কে হতে পারে যে আল্লাহর মাসজিদসমূহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে উহাতে তাঁর নামের স্মরণ / আলোচনা করতে এবং উহাকে খারাব / বিনষ্ট করার প্রচেষ্টা করে। তারাই ঐসব লোক যাদের কোন অধিকারই নেই যে, উহাতে প্রবেশ করবে ভীত সন্ত্রস্ত অবস্থায় ছাড়া। তাদের জন্য আছে দুনিয়াতে লাঞ্চনা এবং তাদের জন্য আছে আখিরাতে মহাশাস্তি।

২:১৪৪ :: নিশ্চয় আমি দেখেছি তোমার চেহারাকে আকাশের দিকে বারবার ফিরাতে। সুতরাং আমি তোমাকে ফিরিয়ে দেবো তোমার পছন্দের ক্বিবলাতে। সুতরাং তুমি আল মাসজিদুল হারামের দিকে তোমার মুখ ফিরাও। এবং যেখানেই তোমরা থাকো উহার দিকে মুখ ফিরাও। এবং নিশ্চয় যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তারা জানেই যে, উহাই (অর্থাৎ আল মসজিদুল হারামকে ক্বিবলা নির্ধারণ) তাদের প্রভুর পক্ষ থেকে সঠিক। এবং তাদের আমলের বিষয়ে আল্লাহ উদাসীন নন।

২:১৪৯ :: এবং যেখান থেকেই তুমি বের হও আল মাসজিদুল হারামের দিকে তোমার মুখ ফিরাও। এবং নিশ্চয় উহাই (আল মাসজিদুল হারাম ক্বিবলা হওয়ার বিষয়টি) তোমার প্রভুর পক্ষ থেকে সঠিক। এবং আল্লাহ তোমাদের আমলের বিষয়ে উদাসীন নন।

২:১৫০ :: এবং যেখান থেকেই তুমি (রসূল) বের হও (তোমার বর্তমান কার্যনির্বাহ যেখান থেকেই করো না কেন), আল মাসজিদুল হারামের দিকে তোমার মুখ ফিরাও। এবং যেখানেই তোমরা থাকো উহার দিকে মুখ ফিরাও। যেন না থাকে মানুষের নিকট তোমাদের বিরুদ্ধে কোন বিতর্কের অবকাশ। কিন্তু তাদের মধ্যকার যারা যুলুম করেছে (তারা বিতর্ক করবেই)। সুতরাং তোমরা তাদেরকে ভয় করো না, আমাকেই ভয় করো। যেন আমি সম্পূর্ণ করি আমার নিয়ামাত তোমাদের উপর। এবং যেন তোমরা হিদায়াত পাও।

২:১৮৭ :: তোমাদের জন্য সিয়ামের রাতে তোমাদের স্ত্রীদের প্রতি দাম্পত্য-আবেগ উদ্দীপক ঘনিষ্ঠতা বৈধ করা হয়েছে। তারা তোমাদের পোশাক এবং তোমরা তাদের পোশাক। আল্লাহ জানেন যে, তোমরা তোমাদের নিজেদের প্রতি খিয়ানত করছো। তারপর তিনি তোমাদের তাওবাহ কবুল করেছেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। সুতরাং এ পর্যায়ে তোমরা তাদের সাথে সহবাস করো এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য যা বিধিবদ্ধ করে দিয়েছেন তা অন্বেষণ করো। এবং তোমরা খাও ও পান করো যতক্ষণ না তোমাদের জন্য দিগন্তের কালো রেখা থেকে ফজরের সাদা রেখা স্পষ্ট হয়। তারপর তোমরা তোমরা রাত (রাতের সূচনা) পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ করো। এবং তোমরা যখন মাসজিদে আকিফূন (ই'তিকাফরত / আত্মনিয়োজিত, ধ্যান ও গভীর চিন্তামগ্ন এবং অবস্থানকারী) থাকো, তখন (ই'তিকাফের দিনগুলোতে দিনে-রাতে কখনো) তাদের সাথে সহবাস করো না। এগুলো আল্লাহর স্থিরিকৃত সীমাসমূহ। সুতরাং তোমরা তা লংঘনের কাছেও যেও না। এভাবে আল্লাহ তাঁর আয়াতসমূহ মানবজাতির জন্য সুষ্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন যেন তারা স্রষ্টা-সচেতন হতে পারে।

২:১৯১ :: (যুদ্ধ পরিস্থিতিতে) তোমরা তাদেরকে হত্যা করো (যুদ্ধক্ষেত্রের) যেখানেই তোমরা তাদের নাগাল পাও। এবং তোমরা তাদেরকে বের করে দাও যেখান থেকে তারা তোমাদেরকে বের করে দিয়েছে। ফিতনা (ধর্মীয় স্বাধীনতা হরণ এবং ভিন্ন ধর্ম অবলম্বনের কারণে নির্যাতন) হত্যার চেয়ে গুরুতর। তোমরা আল মাসজিদুল হারামের কাছে তাদের সাথে যুদ্ধ করো না যতক্ষণ না তারা তাতে তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে। কিন্তু যদি তারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাহলে তাদেরকে হত্যা করো। (অর্থাৎ তাদেরকে প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিহত করো এবং আন্তর্জাতিক আদালত প্রতিষ্ঠা করে বিচারিক প্রক্রিয়ায় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করো)। এরূপই (যুদ্ধের নৈতিক বিধি প্রত্যাখ্যানকারী) কাফিরদের প্রতিফল।

২:১৯৬ :: এবং তোমরা আল্লাহর (সন্তুষ্টি অর্জনের) উদ্দেশ্যেই হজ্জ ও উমরা পূর্ণ করো। তবে যদি তোমরা বাধাপ্রাপ্ত হও, তাহলে (তোমাদের জন্য কা’বায় পৌঁছানোর) হাদিয়া (উপহার) হিসেবে যা সহজ হয় (তাই যথেষ্ট)। এবং তোমরা মাথামুণ্ডন করো না যতক্ষণ না হাদিয়া যথাস্থানে পৌঁছে। তোমাদের মধ্য থেকে যে অসুস্থ হয় বা তার মাথায় কষ্টদায়ক কিছু হয় তাহলে ফিদইয়া (মুক্তিপণ) হবে সিয়াম করা (অর্থাৎ রোজা রাখা) বা সদাক্বাহ দেয়া বা নুসুক করা (অর্থাৎ ধর্মীয় বা সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে পশু উৎসর্গ ও সংহতিমূলক রীতি পালন করা)। অন্যদিকে যখন তোমরা নিরাপদ থাক তখন যে ব্যক্তি হজ্জ পর্যন্ত উমরা করার সুযোগ নেয়, তাহলে (তার জন্য কা’বায় পৌঁছানোর) হাদিয়া হিসেবে যা সহজ হয় (তাই যথেষ্ট)। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তা পায় না (অর্থাৎ হাদিয়া পায় না বা হাদিয়া দেয়াতে অংশগ্রহণের সামর্থ্য পায় না) তাহলে (দায়িত্ব হচ্ছে) হজ্জের মধ্যে তিন দিন সিয়াম করা (রোজা রাখা) এবং সাতদিন যখন তোমরা ফিরে যাবে তখন। (তার ক্ষেত্রে) এভাবেই হবে পূর্ণ দশ। এ অবকাশ তার জন্য যার পরিবার পরিজন আল মাসজিদুল হারামের উপস্থিতি নয় (অর্থাৎ হারাম এলাকার বাসিন্দা নয়)। তোমরা স্রষ্টা-সচেতন হও। এবং জেনে রাখো যে, নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর।

২:২১৭ :: তারা তোমাকে জিজ্ঞাসা করে হারাম মাস (অর্থাৎ বিধিবদ্ধ যুদ্ধ বিরতির ও সংরক্ষিত মাস) সম্পর্কে, সেটাতে যুদ্ধ করা প্রসঙ্গে। বলো, “সেটাতে (তথা কোনো হারাম মাসে) যুদ্ধ করা অনেক বড় গুনাহ। এবং আল্লাহর পথ থেকে বাধা দেয়া ও তাঁর প্রতি কুফর (অবিশ্বাস ও অকৃতজ্ঞতা) করা এবং আল মাসজিদুল হারাম থেকে বাধা দেয়া এবং সেটির যথোপযুক্ত ব্যক্তিদেরকে তা থেকে বহিষ্কার করা আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বড় গুনাহ। এবং ফিতনা (ধর্মীয় স্বাধীনতা হরণ এবং ভিন্ন ধর্ম অবলম্বনের কারণে নির্যাতন) হত্যার চেয়েও গুরুতর গুনাহ। এবং তারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা থেকে থামবে না, যতক্ষণ না তোমাদেরকে তোমাদের দ্বীন (জীবনব্যবস্থা) থেকে ফিরিয়ে দিতে পারে, যদি তাদের সাধ্যে কুলায়। এবং তোমাদের মধ্য থেকে যে তার দ্বীন (জীবনব্যবস্থা) থেকে ফিরে যাবে তারপর কাফির (সত্য প্রত্যাখ্যানকারী) অবস্থায়ই মৃত্যুবরণ করবে, তারাই এমন লোক যাদের আমলসমূহ দুনিয়াতে ও আখিরাতে বরবাদ হয়ে যাবে। এবং তারাই (দোযখের) আগুনে শাস্তিপ্রাপ্ত হবে। তারা তাতে স্থায়ী হবে।

৫:২ :: হে মু’মিনগণ, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে নির্ধারিত নিদর্শনসমূহকে এবং কোনো হারাম মাসকে (অর্থাৎ বিধিবদ্ধ যুদ্ধ বিরতির ও সংরক্ষিত মাসকে) এবং (কা’বায় পৌঁছানোর) হাদিয়াকে এবং ক্বালায়িদকে (বিভিন্ন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ও ব্যবস্থাপনা প্রতিনিধিদেরকে) অবমাননা / অবমূল্যায়ন করো না। এবং আল বাইতুল হারামের (সংরক্ষিত প্রতিষ্ঠানের) অভিযাত্রীদেরকেও অবমাননা করো না, যারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি অন্বেষণ করে। এবং যখন তোমরা হুরুম (হারাম মাসসমূহ) এর বাহিরে থাকো তখন (স্থলভাগের) শিকার করতে পার। আর কোনো সম্প্রদায়ের এরূপ শত্রুতা যে, তারা তোমাদেরকে আল মাসজিদুল হারামে গমনে বাধা দিয়েছিল, তা যেন তোমাদেরকে অপরাধপ্রবণ না করে যে, তোমরা বাড়াবাড়ি করে ফেল। আর তোমরা সদাচার ও স্রষ্টা-সচেতনতার বিষয়ে একে অন্যকে সহযোগিতা করো এবং পাপ ও সীমালংঘনের কাজে একে অন্যকে সহযোগিতা করো না। আর আল্লাহর বিষয়ে সচেতন হও। নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর।

৭:২৯ :: বলো, ‘আমার প্রভু আদেশ করেছেন ন্যায়বিচার করার জন্য’। এবং তোমরা প্রত্যেক মাসজিদে তোমাদের (যথার্থ) লক্ষ্যকে / ব্যক্তিত্বকে প্রতিষ্ঠা করো। এবং তাঁকে (আল্লাহকে) ডাকো তাঁরই জন্য জীবনব্যবস্থাকে একনিষ্ঠ করে নিয়ে। যেভাবে তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন সেভাবে তোমরা ফিরে আসবে।

৭:৩১ :: হে আদম সন্তান, তোমরা প্রত্যেক মাসজিদে তোমাদের সৌন্দর্য (সুন্দর পোশাক) গ্রহণ করো। এবং খাও ও পান করো এবং অপচয় করো না। নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদেরকে ভালবাসেন না।

৮:৩৪ :: তবে এখন তাদের কী অধিকার আছে যে, তিনি তাদেরকে আযাব দিবেন না এ অবস্থায় যে, তারা বাধা দিচ্ছে আল মাসজিদুল হারাম থেকে? অথচ তারা উহার তত্ত্বাবধায়ক নয়। কেউই উহার তত্ত্বাবধায়ক নয়, স্রষ্টা-সচেতনগণ ছাড়া। কিন্তু তাদের অধিকাংশই (আসমানী কিতাবের) কোন জ্ঞান রাখে না।

৯:৭ :: আল্লাহ ও তাঁর রসূলের কাছে কিভাবে মুশরিকদের জন্য কোনো চুক্তি বহাল থাকবে? তাদের সাথে ছাড়া, যাদের সাথে তোমরা আল মাসজিদুল হারামের প্রাঙ্গনে চুক্তি করার পর (তারা তা ভঙ্গ করে নি), সুতরাং যতক্ষণ তারা তোমাদের জন্য (চুক্তির উপর) প্রতিষ্ঠিত থাকে, তোমরাও তাদের জন্য (চুক্তির উপর) প্রতিষ্ঠিত থাক। নিশ্চয় আল্লাহ তো স্রষ্টা-সচেতনদেরকেই ভালবাসেন।

৯:১৭ :: মুশরিকদের অধিকার নেই যে, তারা আল্লাহর মাসজিদসমূহের ব্যবস্থাপনা করবে। অথচ তারা নিজেরাই নিজেদের কুফরের (আল্লাহর বিধানের পরিবর্তে পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য অনুসরণের) সাক্ষ্য দেয়। তারাই এমন লোক যাদের আমলসমূহ বরবাদ হয়ে গেছে। এবং তারা (জাহান্নামের) আগুনে স্থায়ী হবে।

৯:১৮ :: নিশ্চয় তারাই আল্লাহর মাসজিদসূহের ব্যবস্থাপনা করবে (ব্যবস্থাপনার অধিকার রাখে) যারা আল্লাহর প্রতি ও আখিরাত দিবসের প্রতি ঈমান রাখে এবং সালাত প্রতিষ্ঠা করে এবং যাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করে না। আশা করা যায় যে, তারাই পথনির্দেশ গ্রহণকারীদের অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

৯:১৯ :: তোমরা কি হাজীদেরকে পানি পান করানো এবং আল মাসজিদুল হারামের ব্যবস্থাপনা করাকে ঐ ব্যক্তির কাজের সমান বিবেচনা করেছো যে আল্লাহর প্রতি ও আখিরাত দিবসের প্রতি ঈমান (সুদৃঢ় বিশ্বাস) করে এবং (এর ভিত্তিতে) আল্লাহর পথে (তথা আল্লাহ প্রদত্ত বিধি-ব্যবস্থা বাস্তবায়নে) সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করে। তারা আল্লাহর কাছে সমান নয়। এবং আল্লাহ জালিম সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।

৯:২৮ :: হে মু’মিনগণ, নিশ্চয় মুশরিকগণ (মানসিকভাবে) অপবিত্র। সুতরাং তারা যেন তাদের এই চান্দ্রবর্ষের পরে এবং আল মাসজিদুল হারামের কাছে আসতে না পারে। এবং যদি তোমরা দরিদ্রতার আশংকা করো, তবে শীঘ্রই আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর অনুগ্রহ দ্বারা স্বচ্ছল করে দিবেন, যদি তিনি ইচ্ছা করেন। নিশ্চয় আল্লাহ মহাজ্ঞানী ও মহাবিজ্ঞ।

৯: ১০৭ :: এবং যারা মাসজিদকে গ্রহণ করেছে ক্ষতি সাধন, কুফর (সত্য প্রত্যাখ্যান) এবং মু’মিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার (তথা ঐক্যের মূলনীতিকে উপেক্ষা করার) উদ্দেশ্যে এবং সেই ব্যক্তির ঘাঁটি হিসাবে ব্যবহার করার উদ্দেশ্যে যে আগে থেকেই আল্লাহর এবং তাঁর রসূলের (উপস্থাপিত মতাদর্শের) সাথে সাংঘর্ষিকতায় লিপ্ত হয়েছে। এবং তারা কসম করে বলবে, “আমরা উত্তম কিছু করা ছাড়া অন্যরূপ ইচ্ছা করিনি”। এবং আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, নিশ্চয় তারা মিথ্যাবাদী।

৯: ১০৮ :: তুমি কখনোই তাতে (তথা তাদের অধিগৃহীত মাসজিদে) দাঁড়াবে না। নিশ্চয় যে মাসজিদ প্রথম দিন থেকেই স্থাপিত হয়েছে স্রষ্টা-সচেতনতার উপর (ভিত্তি করে), সেটাই অধিক উপযোগিতা রাখে যে, তুমি সেটাতেই দাঁড়াবে। সেটাতে ঐ লোকেরা (আত্মনিয়োজিত) রয়েছে যারা পছন্দ করে যে, তারা (জীবন যাপনের ক্ষেত্রে) পবিত্রতা অর্জন করবে। এবং আল্লাহ পবিত্রতা অর্জনকারীদেরকেই ভালবাসেন।

১৭:১ :: পবিত্র সেই সত্তা যিনি ভ্রমণে নিয়েছেন (ইসরা করিয়েছেন) তাঁর বান্দাকে একটি রাতে, আল মসজিদুল হারাম থেকে আল মসজিদুল আকসা দিকে, যার চারপাশকে বরকতময় করা হয়েছে, যেন আমি তাকে আমার নিদর্শনসমূহের থেকে দেখাই। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।

১৭:৭ :: যদি তোমরা ভালো কাজ করে থাকো, তাহলে তোমরা ভালো কাজ করেছো তোমাদের নিজেদের জন্য। এবং যদি তোমরা মন্দকাজ করে থাকো, তাহলে উহাও (করেছো তোমাদের নিজেদেরই বিরুদ্ধে)। তারপর যখন এসেছে দ্বিতীয় ওয়াদার সময় (তখন আমি আমার বান্দাদেরকে প্রেরণ করেছিলাম ১৭:৫), তারা কালিমাময় করার জন্য তোমাদের মুখমন্ডলকে, এবং তারা মসজিদে প্রবেশ করার জন্য যেমনভাবে উহাতে (মাসজিদে) প্রবেশ করেছে প্রথম বারে (পাঠানো বান্দাগণ); এবং তারা ধ্বংস করার জন্য, যা-ই তাদের আয়ত্তে আসে।

১৮:২১ :: এবং এভাবে আমি (মানুষকে) জানিয়ে দিয়েছিলাম তাদের (আসহাবে কাহাফের) ব্যাপারে। যেন তারা জানতে পারে যে, আল্লাহর ওয়াদা সত্য। এবং এও যে, শেষ ঘণ্টা আসবেই, উহাতে কোন সন্দেহ নেই। (উল্লেখ্য) যখন (আসহাবে কাহাফের মৃত্যুর পরবর্তীতে এ ঘটনার প্রকৃত শিক্ষা বিস্মৃত হয়ে) তারা (জনসাধারণ) তাদের করণীয় বিষয়ে পরস্পর বিবাদ করছিলো। তখন তারা (কয়েকজন) বলেছিলো, “তাদের স্মরণার্থে একটি স্মৃতিসৌধ বানাও। তাদের প্রভুই ভাল জানেন তাদের (মর্যাদা) সম্পর্কে”। (কিন্তু) যারা তাদের করণীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিজয়ী হয়েছে তারা বলেছিলো, “অবশ্যই আমরা গ্রহণ / নির্মাণ করবো তাদের স্মরণার্থে একটি মাসজিদ”।

২২:২৫ :: নিশ্চয় যারা কুফর (সত্য অবিশ্বাস ও প্রত্যাখ্যান) করেছে এবং আল্লাহর পথ থেকে বাধা দেয় এবং আল মাসজিদুল হারাম থেকেও বাধা দেয়, যেটিকে আমি সেটির ক্ষেত্রে আত্মনিয়োজিত/ স্থানীয়দের (৯) জন্য এবং সেটিতে গমনাগমনকারী / অস্থানীয়দের জন্য (প্রবেশাধিকার, নিরাপত্তা বিধান ও বরকত বণ্টন বিষয়ে) সমান করেছি, এবং যে সেটির মধ্যে অন্যায়-অত্যাচার করতে ইচ্ছা করে আমি তাকে কষ্টদায়ক শাস্তির (অর্থাৎ জাহান্নামের) স্বাদ আস্বাদন করাবো।

(৯) আকিফ বলতে বুঝায় আল মাসজিদুল হারামে ই’তিকাফকারী বা ধ্যানমগ্ন ও আত্মনিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ। এখানে পরবর্তী শব্দ গমনাগমনকারীর তুলনায় আকিফ বলতে বিশেষ করে স্থানীয়ভাবে বসবাসরত কর্মচারী প্রশাসনকে বুঝায়।

২২:৪০ :: যাদেরকে তাদের নিজেদের ঘরবাড়ি থেকে অন্যায়ভাবে বের করে দেয়া হয়েছে শুধু এ কারণে যে,তারা বলে,‘রব্বুনাল্লাহ’ (আল্লাহ আমাদের প্রভু)। এবং যদি আল্লাহ (তাঁর বিধানের বা প্রাকৃতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে) মানুষকে প্রতিহত না করতেন তাদের একদল দ্বারা অন্য দলকে, তাহলে অবশ্যই বিধ্বস্ত করা হতো আশ্রম/মঠ (সওয়ামি’) (১০) , আন্তর্জাতিক চুক্তি ও বাণিজ্যকেন্দ্র (বিয়া’) (১১) , উপাসনালয় (সালাওয়াত) (১২) এবং মাসাজিদ (১৩) যেগুলোতে আল্লাহর নাম অধিক স্মরণ করা হয়। এবং নিশ্চয় আল্লাহ তাকে সাহায্য করেন যে তাঁকে সাহায্য করে। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমতাবান, শক্তিমান।

(১০) নৈতিক সংশোধন ও প্রশিক্ষণমূলক স্বল্পকালীন অবস্থানের কেন্দ্রসমূহ, খৃস্টান ধর্মাবলম্বী ও অন্যান্যদের আশ্রম/মঠ

(১১) ক্রয়বিক্রয় চুক্তি, অঙ্গীকার ও শপথ অনুষ্ঠানের কেন্দ্রসমূহ

(১২) যোগাযোগ ও সমর্থন যোগানোর কেন্দ্রসমূহ, ভজন-মন্দির, বিশেষ করে ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের উপাসনাগৃহ (সালাতের স্থান)

(১৩) মাসজিদসমূহ, সাজদাহ সম্পাদনের কেন্দ্রসমূহ, আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নের প্রতিষ্ঠানসমূহ

৪৮:২৫ :: তারাই এমন লোক যারা কুফর (সত্য অবিশ্বাস ও প্রত্যাখ্যান) করেছে এবং তোমাদেরকে আল মাসজিদুল হারাম থেকে বাধা দিয়েছে এবং (কা’বায় পৌঁছানোর) হাদিয়াকে সেটার যথাস্থানে পৌঁছানো থেকে আটকে দেয়া হয়েছে। এবং যদি না থাকতো এমন মু’মিন পুরুষ ও মু’মিন নারী, যাদেরকে তোমরা (মু’মিন হিসেবে) জানতে না, তাই তোমরা তাদেরকে পর্যুদস্ত করতে, তাই তাদের প্রেক্ষিতে তোমরা অজ্ঞতাবশত কলংকযুক্ত হতে, (তাহলে তিনি বিরত রাখতেন না)। (তিনি বিরত রেখেছিলেন) যেন আল্লাহ তাকে তাঁর রহমতের মধ্যে প্রবেশ করান যাকে তিনি ইচ্ছা করেন। যদি তারা পৃথক থাকতো তাহলে আমি (যুদ্ধ থেকে বিরত না রেখে) তাদের মধ্যকার কাফিরদেরকে (সত্য অবিশ্বাস ও প্রত্যাখ্যানকারীদেরকে) কষ্টদায়ক শাস্তি দিতাম।

৪৮:২৬ :: যখন কাফিরেরা (সত্য অবিশ্বাস ও প্রত্যাখ্যানকারীরা) তাদের অন্তরে উগ্রতা জাগিয়ে তুললো, জাহেলিয়াতের উগ্রতা, তখন আল্লাহ রসূলের ও মু’মিনদের উপর প্রশান্তি নাজিল করলেন এবং তাদের জন্য কালিমাতুত তাক্বওয়াকে (স্রষ্টা-সচেতনতা অবলম্বনের নির্দেশ বাণীকে) অপরিহার্যরূপে কার্যকর করে দিলেন। এবং তারাই ছিল এর সবচেয়ে বেশি হক্বদার এবং এর যোগ্য অধিকারী। এবং আল্লাহ সকল বিষয়ে জ্ঞানী।

৭২:১৮ :: নিশ্চয় মাসজিদসমূহ আল্লাহর জন্য। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে দুআ করো না।

# মাসজিদ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যের জন্য আল বাইত সম্পর্কিত আয়াতসমূহও অধ্যয়ন করা প্রয়োজন। তাই নিম্নে এ সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো:

আল বাইত ব্যবহৃত হয়েছে ৭ স্থানে: ২:১২৫:৩, ২:১২৭:৬, ২:১৫৮:৯, ৩:৯৭:১৪, ৮:৩৫:৫, ২২:২৬:৫, ১০৬:৩:৪। একে আল হারাম (সংরক্ষিত) বিশেষণ যোগ করে আল বাইতুল হারাম (সংরক্ষিত প্রতিষ্ঠান) বলা হয়েছে ২ স্থানে: ৫:২:১৭, ৫:৯৭:৪। এছাড়া একে আওয়ালা বাইত (প্রথম প্রতিষ্ঠান) বলা হয়েছে ১ স্থানে: ৩:৯৬:৩। আল বাইতিল আতীক্ব (প্রাচীন, চিরায়ত ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান) বলা হয়েছে ২ স্থানে: ২২:২৯:৭, ২২:৩৩:১০। আল বাইতুল মামূর (আবাদকৃত, সঞ্জীবিত, প্রাণবন্ত প্রতিষ্ঠান) বলা হয়েছে ১ স্থানে: ৫২:৪:১।

কাবা বা আল বাইতকে আল্লাহ বাইতিয়া (আমার বাইত) বলে উল্লেখ করেছেন মর্মে এসেছে ২ স্থানে:  ২:১২৫:১৮, ২২:২৬:১২ এবং ইবরাহীম (সা.) বাইতিকাল মুহাররাম (আপনার সংরক্ষিত বাইত) বলে উল্লেখ করেছেন মর্মে এসেছে ১ স্থানে: ১৪:৩৭:১১।

ক্বিবলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত একাধিক বাইতকে বুঝাতে বুয়ূত (বাইতসমূহ/প্রতিষ্ঠানসমূহ) ব্যবহৃত হয়েছে ২ স্থানে: ১০:৮৭:৯, ২৪:৩৬:২।

আল বাইতুল হারাম এর প্রাঙ্গনে এর পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনার জন্য যে প্রতিষ্ঠান তাকে আল মাসজিদুল হারাম বলা হয়। আল মাসজিদুল হারাম শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে ১৫ স্থানে: ২:১৪৪:১৩, ২:১৪৯:৭, ২:১৫০:৭, ২:১৯১:১৫, ২:১৯৬:৬৫, ২:২১৭:১৭, ৫:২:৩৪, ৮:৩৪:৯, ৯:৭:১৩, ৯:১৯:৫, ৯:২৮:৯, ১৭:১:৭, ২২:২৫:৮, ৪৮:২৫:৬, ৪৮:২৭:৮।

কাবা, আল বাইত ও আল মাসজিদুল হারাম সম্পর্কিত আয়াতের সমন্বিত তালিকা নিম্নরূপ:

২:১২৫, ২:১২৭, ২:১৪৪, ২:১৪৯, ২:১৫০, ২:১৫৮, ২:১৯১, ২:১৯৬, ২:২১৭, ৩:৯৬, ৩:৯৭, ৫:২, ৫:৯৫, ৫:৯৭, ৮:৩৪, ৮:৩৫, ৯:৭, ৯:১৯, ৯:২৮, ১০:৮৭, ১৪:৩৭, ১৭:১, ২২:২৫, ২২:২৬, ২২:২৯, ২২:৩৩, ২৪:৩৬, ৪৮:২৫, ৪৮:২৭, ৫২:৪, ১০৬:৩।

কাবা হচ্ছে বাইতুল্লাহ তথা আল্লাহর নির্ধারিত স্থানে আল্লাহর নির্দেশে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান,  মানবজাতির জন্য প্রতিষ্ঠিত আওয়ালা বাইত বা আদি গৃহ (প্রথম প্রতিষ্ঠান), বাইতুল আতিক বা সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার প্রতীকবহ চিরায়ত মহতী প্রতিষ্ঠান, আল বাইত বা পবিত্র প্রতিষ্ঠান, আল বাইতুল হারাম বা বিশেষ সংরক্ষিত প্রতিষ্ঠান। আল্লাহর নির্দেশিত স্থানে নবী ইবরাহীম ও ইসমাইল (সালামুন আলাইহিম) আল বাইত (কাবা) নির্মাণ / পুন:নির্মাণ করেন।

কাবাকে ঘিরে প্রতিষ্ঠিত মাসজিদটিকে বা প্রতিষ্ঠানকে আল মাসজিদুল হারাম বলা হয়। কাবা ও আল মাসজিদুল হারামের চতুর্দিকের এলাকাকে হারাম বা সংরক্ষিত এলাকা বলা হয়। এ এলাকাটিকে নবী ইবরাহীম তাঁর আদর্শিক অবস্থান গ্রহণের অঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন, যার ফলে এটার ক্ষেত্রে মাক্বামে ইবরাহীম বা ইবরাহীমের আদর্শিক অবস্থানকে একটি নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

মাসজিদ শব্দের অর্থ এবং মাসজিদের ভূমিকা

মাসজিদ শব্দটির অর্থ হলো ‘সাজদাহর স্থান, আল্লাহর বিধিবিধান শুনা ও মানার অনুশীলন করার প্রতিষ্ঠান’। মাসজিদ সম্পর্কিত আয়াতসমূহের সমন্বিত অধ্যয়ন থেকে বুঝা যায় যে, মাসজিদ শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক সালাত করার স্থান নয়, বরং এটি আল্লাহর বিধানকে বাস্তবায়ন করার সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার সাথে সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠান।

মাসজিদের ভূমিকা সম্পর্কে আয়াতসমূহের নির্দেশনা নিম্নরূপ:

(১) মাসজিদসমূহ আল্লাহর জন্য, তাই এতে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে দুআ করা যাবে না। অর্থাৎ মাসজিদকে যাবতীয় শিরকের অনুপ্রবেশ থেকে পবিত্র রাখতে হবে।

(২) যারা মাসজিদের সঠিক প্রকৃতিকে বিনষ্ট করে আল কুরআনে তাদেরকে সবচেয়ে বড় জালিম বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। আল্লাহ যেভাবে তাঁর নাম স্মরণ করতে নির্দেশনা দিয়েছেন তথা আল কুরআনে যেভাবে আল্লাহর পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে মাসজিদে সেভাবে আল্লাহকে স্মরণ করতে যারা বাধা দেয় তাদের কোনো অধিকারই নেই যে, তারা মাসজিদে প্রবেশ করবে। তবে এরূপ অপপ্রয়াস করলে ধরাশায়ী হবে বলে ভীত-সন্ত্রস্ত থাকার পরিস্থিতিতেই শুধু তাদেরকে মাসজিদে প্রবেশের সুযোগ দেয়া যাবে।

(৩) বিশ্বব্যাপী বিশ্বাসীদের আদর্শিক বিশ্বকেন্দ্র (ক্বিবলা) হিসেবে আল মাসজিদুল হারামকে নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে, যেটিকে বিশ্বব্যাপী মানবজাতির মধ্যে বিশ্বপ্রভুর বিধান বাস্তবায়নের জন্য মূল প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্থাপন করা হয়েছে। তাই বিশ্বাসীরা পৃথিবীর যে দেশেই অবস্থান করুক না কেন তাদেরকে এ কেন্দ্রের দিকে মুখ ফিরাতে হবে তথা এটিকে সাংবিধানিক কেন্দ্রের মর্যাদায় গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে বিতর্ককারীদের বিতর্ককে উপেক্ষা করে আল্লাহ প্রদত্ত হিদায়াত অনুযায়ী কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে। এছাড়াও প্রত্যেক মাসজিদে স্বীয় লক্ষ্যকে সঠিক জীবনব্যবস্থার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত রাখতে হবে। অর্থাৎ সকল মাসজিদকেই ক্বিবলারূপে (উপকেন্দ্ররূপে) গ্রহণ করতে হবে। মাসজিদে গমনের ক্ষেত্রে যথাসাধ্য সুন্দর পোশাক (proper dress etiquette, official decorum and maintain of dress code) পরিধান করা উচিত।

(৪) ইতিকাফের স্থান হিসেবেও মাসজিদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের জন্য কিছু আত্মনিয়োজিত ব্যক্তিকে স্বল্পকালীন ক্রমাগত অবস্থানের তথা দিন-রাত বিশেষ কর্মসূচী বাস্তবায়নে নিমগ্ন থাকা প্রয়োজন হলে তারা মাসজিদে অবস্থান করবে। এছাড়া আল্লাহর বিধি-বিধান বুঝার বা আল্লাহর স্মরণের জন্য কিছুদিন বিশেষভাবে ধ্যানমগ্নতার সাথে অতিবাহিত করতে চাইলে মাসজিদে অবস্থান করবে। এ বিষয়টিকে ইতিকাফ বলে। তিকাফ উপলক্ষে মাসজিদে অবস্থানকালে স্ত্রী সহবাস করা যাবে না।

(৫) আল মাসজিদুল হারামকে ইতিকাফকারী (তাতে ধ্যানচর্চাকারী ও কোনো নির্দিষ্ট সময়কালে সার্বক্ষণিক আত্মনিয়োজিত), তাওয়াফফারী (গমনাগমনকারী), ক্বিয়ামকারী (এর নীতি আদর্শ বাস্তবায়নকারী), রুকূ'কারী (এর আদর্শের প্রতি বিনত) ও সাজদাহকারীদের (এর নীতিমালা মান্যকারী ও সম্মান প্রদর্শনকারীদের) জন্য পবিত্র রাখতে হবে অর্থাৎ নীতি আদর্শ পরিপন্থী কিছু যেন তাতে সংঘটিত হতে না পারে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। তাই মাসজিদ হলো এসব কর্মকাণ্ড সম্পাদনের স্থান। মুসলিম উম্মাহর যাবতীয় কার্যক্রম মাসজিদ কেন্দ্রিক আবর্তিত হবে। যেমন, এতে সালাত সম্পাদনের পাশাপাশি সালাত শেষে উত্তরাধিকার বণ্টনের জন্য ওয়াসিয়্যাতের বিষয়ে সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে (সূরা মায়িদাহ ৫:১০৬)। এরূপ প্রতিষ্ঠানে সকাল সন্ধ্যায় আল্লাহর তাসবীহ / পবিত্রতা বর্ণনা, কুরআন তিলাওয়াত ও সালাতের ব্যবস্থা থাকতে হবে অর্থাৎ শিক্ষা-প্রশিক্ষণমূলক কর্মসূচী থাকতে হবে। আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য অনুদান তহবিল থেকে বণ্টন এবং পারস্পরিক বিবাদ-বিসম্বাদের বিচার-মীমাংসার ব্যবস্থা থাকতে হবে। মাসজিদ বা আল বাইত, হজ্জ ও হাদিয়া সম্পর্কিত নির্দেশনা থেকে বুঝা যায় যে, মাসজিদে পর্যটকদের ও সাময়িক আশ্রয় গ্রহণকারীদের (তথা সর্বপ্রকার ই'তিকাফকারীর) আপ্যায়নের ব্যবস্থাও থাকবে। এতে সমষ্টিগত কার্যক্রমের জন্য নিয়মিত ও বিশেষ পরামর্শসভার ব্যবস্থা থাকবে।

(৬) আল মাসজিদুল হারাম বা সংরক্ষিত প্রতিষ্ঠানটির সাথে সম্পর্কিত বিশেষ নির্দেশ হলো ‘আল মাসজিদুল হারামের কাছে যুদ্ধ করা যাবে না, তবে যদি প্রতিপক্ষ সেখানে হামলা করে বসে তাহলে প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধ করা যাবে’। প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধের মাধ্যমে তাদেরকে প্রতিহত করার পর আন্তর্জাতিক যুদ্ধনীতি লংঘন করার কারণে আন্তর্জাতিক আদালতের বিচার প্রক্রিয়ায় তাদেরকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করতে হবে।

(৭) আল মাসজিদুল হারামের প্রাঙ্গনে আন্তর্জাতিক যুদ্ধ বিরতির চুক্তি সম্পাদন করতে হবে। যারা ঐ চুক্তি লংঘন করবে না তাদের সাথে চুক্তির মেয়াদ পর্যন্ত যথানিয়মে চুক্তির শর্তাদি রক্ষা করতে হবে। মেয়াদান্তে পরিস্থিতি অনুসারে চুক্তি নবায়ন করা যেতে পারে।

(৮) আল মাসজিদুল হারামের অভিযাত্রীদেরকে অবমাননা করা যাবে না এবং তাদেরকে অন্যায়ভাবে বাধা প্রদান করা যাবে না। এমনকি যদি অতীতে তারা বাধা প্রদান করেছিলো এরূপ হয়, তবুও তাদের প্রতি বিদ্বেষবশত ন্যায়ের সীমালংঘন করে তাদেরকে অবমাননা করা যাবে না। কোনো জনগোষ্ঠীকে অন্যায়ভাবে আল মাসজিদুল হারাম থেকে বাধা প্রদান করলে তারা বাধা প্রদানকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অধিকার প্রাপ্ত হবে।

(৯) মাসজিদের ব্যবস্থাপনার অধিকার তারাই রাখে যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে এবং শিরক করে না, আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে এবং এর ভিত্তিতে আল্লাহর পথে জান-মাল দিয়ে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করে। তাই এ ধরনের ব্যক্তিদের মধ্য থেকে পরামর্শক্রমে যোগ্য ব্যক্তিদেরকে মাসজিদের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত করতে হবে। লক্ষণীয় যে, আল মাসজিদুল হারামের ব্যবস্থাপনার বাহ্যিক কার্যক্রম সম্পন্ন করা, হাজীদেরকে পানি পান করানো ইত্যাদি বিষয়ের তুলনায় মাসজিদের ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্যগত বিষয়ে তথা প্রকৃত নীতিমালার ভিত্তিতে কল্যাণ কার্যক্রমের বিষয়ে ভূমিকা রাখা এবং আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখা অধিক গুরুত্ব ও মর্যাদার বিষয়।

(১০) আল মাসজিদুল হারামের ব্যবস্থাপনাগত দায়িত্ব পালন এবং তাতে নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকারের দিক থেকে সেটির স্থানীয় কর্মচারী প্রশাসন এবং অস্থানীয় গমনাগমনকারী প্রতিনিধিদের অধিকার সমান থাকবে।

(১১) ফাসাদ (নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা) সৃষ্টিকারীদেরকে প্রতিহত না করলে তারা মাসজিদসমূহকে বিধ্বস্ত করে দেয়। তাই মাসজিদের সুরক্ষার প্রয়োজনে ফাসাদকারীদেরকে প্রতিহত করার জন্য তথা শান্তির জন্য যুদ্ধ পরিচালনা করা জরুরি হলে ফিতনার অবসান ঘটার পূর্ব পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। সুতরাং মাসজিদের ব্যবস্থাপনাগত কাজের অন্যতম একটি দিক হলো বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য শান্তি মিশন হিসেবে যুদ্ধ প্রশিক্ষণ ও অভিযান পরিচালনা করা।

(১২) মাসজিদ থেকে বাধা প্রদানকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ক্ষেত্রে অবশ্যই বেসামরিক লোকজনের ক্ষয়ক্ষতি এড়িয়ে যুদ্ধ করার পরিস্থিতি না থাকলে যুদ্ধ না করে অন্যভাবে পরিস্থিতির মোকাবেলা করা যায় কিনা সেদিকেই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে লক্ষ রাখতে হবে।

(১৩) মাসজিদ বলতে কী বুঝায় এবং মাসজিদের ভূমিকা কিরূপ, তা নির্ণয়ের ক্ষেত্রে মাসজিদে দিরার বা ‘মানবজাতির ক্ষতি সাধনের উদ্দেশ্যে নির্মিত মাসজিদ’ সম্পর্কেও অনুধাবন করা প্রয়োজন। যে মাসজিদটি ‘প্রকৃত ঐক্যসূত্রকে বিনষ্ট করে বিভেদ সৃষ্টির জন্য, মানুষের ক্ষতি সাধনের জন্য এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলের উপস্থাপিত জীবনাদর্শের বিরুদ্ধতাকারী নেতৃত্বের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহারের জন্য’ নির্মিত হয়েছে তাকে ‘মাসজিদে দিরার’ বলা হয়। এ থেকে বুঝা যায় যে, নেতিবাচকভাবে এমন মাসজিদও হতে পারে, যা আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধতা করার জন্য স্থাপন করা হয়, সুতরাং ইতিবাচকভাবে সেই প্রতিষ্ঠানগুলোই ‘আল্লাহর মাসজিদে’ পরিণত হতে পারে যা আল্লাহর বিধি-বিধান চর্চার কেন্দ্র হিসেবে কার্যকর থাকে।

আল মাসজিদুল হারাম এবং অন্যান্য মাসজিদের সম্পর্ক ও পার্থক্য

মাসজিদ সম্পর্কিত আয়াতসমূহ থেকে সাধারণ মাসজিদসমূহ এবং আল মাসজিদুল হারাম এর মধ্যে যে সম্পর্ক ও পার্থক্য জানা যায় তা নিম্নরূপ:

আল মাসজিদুল হারাম হচ্ছে মানবজাতির জন্য আল্লাহর নির্ধারিত বিশ্বকেন্দ্র বা মানবজাতির জাতীয় কেন্দ্র, পবিত্র প্রতিষ্ঠান এবং অনুরূপভাবে পৃথিবীর অন্যান্য যাবতীয় মাসজিদ হচ্ছে উপকেন্দ্র তথা স্থানীয় কেন্দ্র। এটাই হচ্ছে ‘আল মাসজিদুল হারামের সাথে অন্যান্য মাসজিদসমূহের স্বাভাবিক ও সাধারণ সম্পর্ক। ‘আল মাসজিদুল হারামের স্থান যেভাবে আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত ও সংরক্ষিত, অন্যান্য মাসজিদের স্থানের ক্ষেত্রে তা নয়। বরং অন্যান্য মাসজিদ কোথায় নির্মিত হবে তা বাস্তব  প্রয়োজন বা উপযোগিতার প্রেক্ষিতে মু’মিনদের পরামর্শভিত্তিক সিদ্ধান্তক্রমে নির্ধারিত হবে।

যদি কোনো মাসজিদের প্রকৃতি নষ্ট করা হয় বা কোনো মাসজিদকে গ্রহণ করা হয় মানবজাতির ধর্মীয় ক্ষতিসাধনের জন্য, মুসলিমদের বিরুদ্ধে ভাবাদর্শগত দ্বন্দ্বে লিপ্ত কারো ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করার জন্য এবং মু’মিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির জন্য তথা আল মাসজিদুল হারামের ঐক্যের মূলনীতির পরিপন্থী অনুশীলনের জন্য তাহলে সেই মাসজিদে দাঁড়ানো যাবে না। বরং যেই মাসজিদ নির্মিত হয় তাক্বওয়ার (স্রষ্টা-সচেতনতার) ভিত্তিতে এবং যাতে আল মাসজিদুল হারামের ঐক্যের মূলনীতি অনুশীলন করা হয় সেই মাসজিদেই দাঁড়াতে হবে। সেই মাসজিদ এমন হবে যে, তাতে যারা জীবন যাপনে পবিত্রতা অর্জন করতে পছন্দ করে তারা আত্মনিয়োজিত থাকবে।

অন্যদিকে আল মাসজিদুল হারামকে সংরক্ষিত রাখা হবে, তাতে মুশরিকদের ব্যবস্থাগত অধিকার থেকে বহিষ্কৃত করে মু’মিনদের অধিভুক্ত করতে হবে, যেহেতু তা আল্লাহর নির্ধারিত বিশ্বকেন্দ্র, তাতে উপস্থিত ব্যবস্থাপনা যার হাতেই থাকুক না কেন হজ্জ থেকে বিরত না হয়ে তাতে হজ্জের জন্য যেতে হবে এবং সেটির প্রাঙ্গনে যারাই হামলা করবে তাদেরকে প্রতিহত করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক আদালত প্রতিষ্ঠা করে বিচারিক প্রক্রিয়ায় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করতে হবে।

তাহলে সাধারণ মাসজিদ এবং আল মাসজিদুল হারামের ক্ষেত্রে মু’মিনদের অবস্থানগত নীতিতে পার্থক্য রয়েছে। আল মাসজিদুল হারাম কেন্দ্রীয় মাসজিদ হওয়ার প্রেক্ষিতে অকেন্দ্রীয় মাসজিদসমূহের থেকে সেটির এ পার্থক্য তৈরি হয়েছে।

(প্রাসঙ্গিক আয়াতসমূহ: ৩:৯৬-৯৭, ২:১২৫, ২২:২৫-২৮, ৯:২৮, ২:২১৭, ২:১১৪, ৯:১০৭-১০৮)।

পরিশিষ্ট ৫: তাসবীহ

আল কুরআনে সালাত ও তাসবীহ সম্পর্কিত আয়াতসমূহ থেকে উভয়টির মধ্যে এক ধরনের সামঞ্জস্য প্রতীয়মান হয় কিন্তু তা সত্ত্বেও উভয়টি হুবহু একই বিষয় নয়। এ বিষয়ে ২৪:৪১ আয়াতটি লক্ষণীয়। সালাত ও তাসবীহের মধ্যে সম্পর্কের পাশাপাশি এর পার্থক্যও রয়েছে। যেমন, সালাত এরূপ আনুষ্ঠানিক শর্তসম্পন্ন যে, সেজন্য ওজু-গোসল-তায়াম্মুমের শর্ত রয়েছে এবং এর নির্দিষ্ট কাঠামো রয়েছে। কিন্তু তাসবীহ বিষয়টি সেরূপ নয়। তবে সালাতের জন্য যেমন কিছু ওয়াক্তের নির্দেশনা রয়েছে, তাসবীহের ক্ষেত্রেও তেমনি কিছু ওয়াক্তের নির্দেশনা রয়েছে। তাই অনেকে তাসবীহের ওয়াক্তসমূহকে সালাতের ওয়াক্তসমূহ হিসেবে হুবহু সমানভাবে হিসেব করে থাকেন। কিন্তু কুরআনে সালাতের ওয়াক্তের ক্ষেত্রে ওয়াক্তের পরিসীমা এবং তাসবীহের ওয়াক্তের ক্ষেত্রে ওয়াক্তের পরিসীমা ভিন্নরূপ। তাই সালাতের ওয়াক্ত সংখ্যার চেয়ে একই সময়সীমার মধ্যে তাসবীহের সাপেক্ষে ওয়াক্ত সংখ্যা আরো বেশি বলে প্রতীয়মান হয়। তাই এখানে তাসবীহের বিষয়টিও ভালোভাবে বুঝে নেয়ার জন্য এ বিষয়ের তথ্য সমন্বয় করা হলো।

তাসবীহ শব্দের অর্থ

তাসবীহ শব্দটি ছাব্বাহা ক্রিয়া (ক্রিয়ারূপ ২) এর মাসদার (ক্রিয়াবিশেষ্য) হিসেবে ব্যবহৃত। তাসবীহ শব্দটির অর্থ ‘(আল্লাহর) পবিত্রতা বর্ণনা করা’।

আল্লাহর তাসবীহ করা বা সুবহানাল্লাহ বলার তাৎপর্য

কুরআনের বিভিন্ন আয়াত থেকে তাসবীহ করার বা সুবহানাল্লাহ বলার যে তাৎপর্য বুঝা যায় তা নিম্নরূপ:

১. আল্লাহ শিরক থেকে পবিত্র। (৯:৩১, ১০:১৮, ১২:১০৮, ১৬:১, ২৮:৬৮, ৩০:৪০, ৫২:৪৩, ৫৯:২৩)

২. তারা যে শিরকমূলক কথা বলে বা রচনা করে তা থেকে তিনি পবিত্র। (১৭:৪৩, ২১:২২, ২৩:৯১, ৩৭:১৫৯, ৪৩:৮২)

৩. তাঁর সন্তান হবে, তা থেকে তিনি পবিত্র। (২:১১৬, ৪:১৭১, ১০:৬৮, ৩৯:৪)

৪. উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি করা থেকে তিনি পবিত্র। (৩:১৯১)

৫. সাধারণভাবে এর অর্থ হচ্ছে যাবতীয় দুর্বলতা, প্রশ্নবিদ্ধতা, ত্রুটি থেকে তিনি পবিত্র।

কুরআনের কিছু আয়াতে সুবহানাহু ওয়া তায়ালা শব্দগুচ্ছ উল্লেখ রয়েছে। আয়াতসমূহ হলো: ৬:১০০, ১০:১৮, ১৬:১, ১৭:৪৩, ৩০:৪০, ৩৯:৬৭। তায়ালা মানে ‘ঊর্ধ্বে অবস্থান করা’। এর দ্বারা বিশেষ করে আল্লাহ শিরকের ঊর্ধ্বে থাকার তাৎপর্য প্রকাশ পায়।

তাসবীহ ও তাক্বদীস এর পার্থক্য

সূরা বাক্বারাহ ২:৩০ আয়াতে একই সাথে তাসবীহ ও তাক্বদীস এর প্রসঙ্গ এসেছে। এ উভয় শব্দ একটি অন্যটির প্রতিশব্দ। কিন্তু এর মধ্যে কিছুটা তাৎপর্যগত পার্থক্য রয়েছে। তাসবীহ অর্থ হলো ‘পবিত্রতা বর্ণনা করা’ (to glorify)। এবং তাক্বদীস অর্থ হলো ‘মাহাত্ম ঘোষণা বা পবিত্রতার স্বীকৃতি দেয়া’ (to sanctify)। সুবহান অর্থ হলো ‘যে পবিত্র’। এবং ক্বুদস অর্থ হলো ‘যার পবিত্রতার স্বীকৃতি দিতে হয়, যার পবিত্রতার প্রতি স্বীকৃতিমূলক আচরণ করতে হয়’। আল কুরআনে তাসবীহ ও তাক্বদীস সম্পর্কিত আয়াতসমূহকে তুলনামূলক অধ্যয়ন করলে এ সূক্ষ্ম পার্থক্যটি প্রতিভাত হয়। তবে সাধারণভাবে এ উভয়টিকে সমার্থক শব্দ হিসেবে ধরা হয়। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, ত্বহারাত শব্দের অর্থ হলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়া বা থাকা। সুতরাং ত্বহারাত শব্দটি তাসবীহ বা তাক্বদীস শব্দের প্রতিশব্দ নয়।

সালাত ও তাসবীহের তুলনা

সালাত ও তাসবীহের পার্থক্য হলো: (১) আনুষ্ঠানিক সালাতের জন্য ওজু (গোসল) ও তায়াম্মুমের শর্ত রয়েছে, কিন্তু তাসবীহের জন্য তার উল্লেখ নেই। (২) সালাতের একটি আনুষ্ঠানিক কাঠামো রয়েছে, কিন্তু তাসবীহের জন্য তা নেই। তবে সালাত ও তাসবীহের ক্ষেত্রে একটি Common দিক হচ্ছে, সালাতের জন্যও কিছু সময়সীমার উল্লেখ রয়েছে এবং তাসবীহের জন্যও কিছু সময়সীমার উল্লেখ রয়েছে। এ কারণে অনেকে তাসবীহের ওয়াক্তসমূহের মাধ্যমে সালাতের ওয়াক্তসমূহ নির্ণয় করার চেষ্টা করেন। অথচ তাসবীহের ওয়াক্তসমূহ এবং সালাতের ওয়াক্তসমূহের মধ্যে কিছু মিল ও কিছু অমিল রয়েছে।

সাজদাহয় এবং সাজদাহর পরে তাসবীহের নির্দেশ বা নির্দেশনা রয়েছে এবং সালাতের সাথেও সাজদাহর সম্পর্ক রয়েছে। এ কারণেও অনেকে সালাত ও তাসবীহকে অভিন্ন হিসেবে সাব্যস্ত করেন। অথচ সাজদাহ যেমন সালাতের সাথে সম্পর্কযুক্ত অবস্থায় আছে, তেমনি আবার সালাতের সাথে সম্পর্কমুক্ত এবং ব্যাপক ও বিভিন্ন ধরনের সাজদাহও রয়েছে। বিশেষ করে ২৪:৪১ আয়াতে বলা হয়েছে, প্রত্যেকেই জেনে নিয়েছে তার সালাত এবং তার তাসবীহ। সুতরাং সালাত ও তাসবীহ একই বিষয় নয়। সুতরাং সালাতের ওয়াক্তসমূহ ও তাসবীহের ওয়াক্তসমূহ একই হওয়া জরুরি নয়। বরং আয়াতসমূহ থেকে যদি একই সময়সীমা পাওয়া যায় তবে একই সময়সীমায়, নাহলে যেক্ষেত্রে যেভাবে সময়সীমা পাওয়া যায় সেক্ষেত্রে সেভাবে পালন করতে হবে।

আল কুরআনে তাসবীহ শব্দ ধারণকারী আয়াতসমূহ

তাসবীহ শব্দটির মূল অক্ষরসমূহ হলো ছীন বা হা। ছীন বা হা থেকে গঠিত ছাবহুন (ক্রিয়ারূপ ১ এর মাসদার) এর অর্থ ‘সাঁতার কাটা, কর্মব্যস্ততা’। ছাবহুন শব্দটি আল ব্যবহৃত হয়েছে ২ স্থানে: ৭৩:৭:৫ এবং ৭৯:৩:২। শব্দটির ক্রিয়ারূপ-১ ইয়াসবাহূনা (সাঁতার কাটে) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে ২ স্থানে: ২১:৩৩:১১ এবং ৩৬:৪০:১৫। এছাড়া আল কুরআনে শব্দটির ক্রিয়ারূপ-১ এর কর্তাবিশেষ্য ছাবিহাত (স্ত্রীলিঙ্গ, বহুবচন) একবার ব্যবহৃত হয়েছে। ৭৯:৩:১।

আরবি ক্রিয়ারূপের পার্থক্যের ক্ষেত্রে অর্থগত পার্থক্যের দুটি প্রধান ধরন হচ্ছে, (১) ক্রিয়ারূপ-১ এর অর্থের সাথে সঙ্গতি রেখে নতুন অর্থ তৈরি হয়। (২) ক্রিয়ারূপ-১ এর অর্থের সাথে সঙ্গতি ছাড়া নতুন অর্থ তৈরি হয়।

ছীন বা হা মূল অক্ষরগুলো থেকে গঠিত ক্রিয়ারূপ-১ এর মাসদার (ক্রিয়াবিশেষ্য) ছাবহুন অর্থ ‘সাঁতার কাটা, কর্মব্যস্ততা’। এবং এর ক্রিয়ারূপ-২ এর মাসদার (ক্রিয়াবিশেষ্য) তাসবীহ অর্থ ‘পবিত্রতা জ্ঞাপন করা’। সুবহান শব্দটি তাসবীহ এর সম্পূরক অর্থে ব্যবহৃত হয়। নিম্নে তাসবীহ এর সাথে সম্পর্কিত শব্দাবলির নির্ঘণ্ট উল্লেখ করা হলো:

১. সুবহান শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে ৪১ স্থানে: ২:৩২:২, ২:১১৬:৫, ৩:১৯১:১৮, ৪:১৭১:৩৯, ৫:১১৬:১৭, ৬:১০০:১২, ৭:১৪৩:৩৬, ৯:৩১:২১, ১০:১০:৩, ১০:১৮:২৬, ১০:৬৮:৫, ১২:১০৮:১২, ১৬:১:৬, ১৬:৫৭:৪, ১৭:১:১, ১৭:৪৩:১, ১৭:৯৩:২০, ১৭:১০৮:২, ১৯:৩৫:৮, ২১:২২:৮, ২১:২৬:৫, ২১:৮৭:১৯, ২৩:৯১:২১, ২৪:১৬:১১, ২৫:১৮:২, ২৭:৮:১১, ২৮:৬৮:১০, ৩০:১৭:১, ৩০:৪০:১৯, ৩৪:৪১:২, ৩৬:৩৬:১, ৩৬:৮৩:১, ৩৭:১৫৯:১, ৩৭:১৮০:১, ৩৯:৪:১২, ৩৯:৬৭:১৪, ৪৩:১৩:১২, ৪৩:৮২:১, ৫২:৪৩:৬, ৫৯:২৩:১৬, ৬৮:২৯:২।

২. তাসবীহ (ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য, ক্রিয়ারূপ ২) ব্যবহৃত হয়েছে ২ স্থানে: ১৭:৪৪:১৭, ২৪:৪১:১৭।

৩. মুছাব্বিহূন (কর্তৃবাচক বিশেষ্য, ক্রিয়ারূপ ২) (২ বার)। ৩৭:১৪৩:৫, ৩৭:১৬৬:৩।

৪. ছাব্বাহা (ক্রিয়া, ক্রিয়ারূপ ২) ব্যবহৃত হয়েছে ৪২ স্থানে: ২:৩০:১৯, ৩:৪১:১৮, ৭:২০৬:৯, ১৩:১৩:১, ১৫:৯৮:১, ১৭:৪৪:১, ১৭:৪৪:১২, ১৯:১১:৯, ২০:৩৩:২, ২০:১৩০:৫, ২০:১৩০:১৬, ২১:২০:১, ২১:৭৯:১১, ২৪:৩৬:১০, ২৪:৪১:৫, ২৫:৫৮:৭, ৩২:১৫:১০, ৩৩:৪২:১, ৩৮:১৮:৫, ৩৯:৭৫:৭, ৪০:৭:৬, ৪০:৫৫:৮, ৪১:৩৮:৬, ৪২:৫:৭, ৪৮:৯:৬, ৫০:৩৯:৫, ৫০:৪০:৩, ৫২:৪৮:৬, ৫২:৪৯:৩, ৫৬:৭৪:১, ৫৬:৯৬:১, ৫৭:১:১, ৫৯:১:১, ৫৯:২৪:৯, ৬১:১:১, ৬২:১:১, ৬৪:১:১, ৬৮:২৮:৭, ৬৯:৫২:১, ৭৬:২৬:৫, ৮৭:১:১, ১১০:৩:১।

নিম্নে তাসবীহ এর সাথে সম্পর্কিত উপর্যুক্ত শব্দাবলি যেসব আয়াতে ব্যবহৃত হয়েছে (৮৩টি আয়াত) তার সমন্বিত তালিকা নিম্নরূপ:

২:৩০, ২:৩২, ২:১১৬, ৩:৪১, ৩:১৯১, ৪:১৭১, ৫:১১৬, ৬:১০০, ৭:১৪৩, ৭:২০৬, ৯:৩১, ১০:১০, ১০:১৮, ১০:৬৮, ১২:১০৮, ১৩:১৩, ১৫:৯৮, ১৬:১, ১৬:৫৭, ১৭:১, ১৭:৪৩, ১৭:৪৪, ১৭:৯৩, ১৭:১০৮, ১৯:১১, ১৯:৩৫, ২০:৩৩, ২০:১৩০, ২১:২০, ২১:২২, ২১:২৬, ২১:৭৯, ২১:৮৭, ২৩:৯১, ২৪:১৬, ২৪:৩৬, ২৪:৪১, ২৫:১৮, ২৫:৫৮, ২৭:৮, ২৮:৬৮, ৩০:১৭, ৩০:৪০, ৩২:১৫, ৩৩:৪২, ৩৪:৪১, ৩৬:৩৬, ৩৬:৮৩, ৩৭:১৪৩, ৩৭:১৫৯, ৩৭:১৬৬, ৩৭:১৮০, ৩৮:১৮, ৩৯:৪, ৩৯:৬৭, ৩৯:৭৫, ৪০:৭, ৪০:৫৫, ৪১:৩৮, ৪২:৫, ৪৩:১৩, ৪৩:৮২, ৪৮:৯, ৫০:৩৯, ৫০:৪০, ৫২:৪৩, ৫২:৪৮, ৫২:৪৯, ৫৬:৭৪, ৫৬:৯৬, ৫৭:১, ৫৯:১, ৫৯:২৩, ৫৯:২৪, ৬১:১, ৬২:১, ৬৪:১, ৬৮:২৮, ৬৮:২৯, ৬৯:৫২, ৭৬:২৬, ৮৭:১, ১১০:৩।

নিম্নে তাসবীহ এর সাথে সম্পর্কিত আয়াতসমূহের অনুবাদ উপস্থাপন করা হলো:

২:৩০ :: এবং (সেই সময়ের কথা উল্লেখ্য) যখন তোমার প্রভু ফেরেশতাদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘নিশ্চয় আমি পৃথিবীতে খলিফা (আধিপত্যে স্থলাভিষিক্ত) প্রতিস্থাপনকারী’। তারা বললো, ‘আপনি কি উহাতে প্রতিস্থাপন করবেন (এমন প্রজাতি) যে উহাতে ফাসাদ (বিপর্যয় সৃষ্টি / অশান্তি সৃষ্টি) করবে এবং (একে অন্যের) রক্ত ঝরাবে? এবং আমরা আপনার প্রশংসার সাথে পবিত্রতা বর্ণনা করি এবং আপনার পবিত্রতার স্বীকৃতি প্রদান করি।  তিনি বললেন, ‘নিশ্চয় আমি জানি যা তোমরা জানো না’।

২:৩২ :: তারা বললো, ‘আপনি পবিত্র। আমাদের কোনো জ্ঞান নেই, যা আপনি আমাদেরকে শিখিয়েছেন তা ছাড়া। নিশ্চয় আপনিই মহাজ্ঞানী, মহাবিজ্ঞ’।

২:১১৬ :: এবং তারা বললো, ‘আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন’। তিনি তো এসব থেকে পবিত্র (সুবহানাহু)। বরং আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা সবই তাঁরই অধিকারভুক্ত। সকলেই তাঁর উদ্দেশ্যে বিনয়ী।

৩:৪১ :: সে বললো, ‘আমার প্রভু, আমার জন্য কোনো নিদর্শন ঠিক করে দিন’। তিনি বললেন, ‘তোমার নিদর্শন হবে এই যে, তুমি মানুষের সাথে কথা বলবে না তিন দিন, ইংগিতে কথা বলা ব্যতীত। এবং তোমার প্রভুকে বেশি বেশি স্মরণ করো এবং তাঁর তাসবীহ করো রাতের প্রথমাংশে (ইশার সময়) ও দিনের প্রথমাংশে (ইবকারে)।

৩:১৯১ :: যারা আল্লাহকে স্মরণ করে দাঁড়ানো অবস্থায় এবং বসে থাকা অবস্থায় এবং তাদের কাত হয়ে শুয়ে থাকা অবস্থায়। এবং তারা চিন্তা-গবেষণা (ফিকির) করে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি সম্পর্কে। (তারা বলে) ‘আমাদের প্রভু, আপনি ইহাকে উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি করেননি। আপনি পবিত্র। আমাদেরকে (জাহান্নামের) আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।

৪:১৭১ :: হে আহলে কিতাব, তোমরা তোমাদের জীবনব্যবস্থার (দ্বীনের) ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না। এবং তোমরা আল্লাহর ব্যাপারে সত্য ছাড়া বলো না। নিশ্চয় মাসীহ ঈসা ইবনে মারইয়াম হচ্ছে আল্লাহর রসূল এবং তাঁর একটি বাণী, তিনি তা প্রেরণ করেছেন মারইয়ামের প্রতি; এবং তাঁর পক্ষ থেকে একটি রুহ। সুতরাং তোমরা বিশ্বাস করো আল্লাহর প্রতি এবং তাঁর রসূলগণের প্রতি। এবং তোমরা বলো না ‘তিন ইলাহ’। তোমরা বিরত হও। বিরত হওয়াই তোমাদের জন্য কল্যাণকর। নিশ্চয় আল্লাহ একক ইলাহ। তিনি পবিত্র এ থেকে যে, তাঁর সন্তান হতে পারে (আল্লাহর সন্তান থাকার যে শিরক তা থেকে তিনি পবিত্র)। তাঁরই অধিকারভুক্ত যা আছে আসমানসমূহে এবং যা আছে জমিনে। এবং আল্লাহই কার্যনির্বাহক হিসাবে যথেষ্ট।

৫:১১৬ :: এবং যখন আল্লাহ বলবেন, “হে ঈসা ইবনে মারইয়াম, তুমি কি বলেছো মানবজাতিকে, ‘তোমরা গ্রহণ করো আমাকে এবং আমার মাকে দুইজন ইলাহ হিসাবে আল্লাহকে ছাড়াও’?”। সে বলবে, “আপনি পবিত্র। আমার জন্য সঙ্গত নয় যে, আমি বলবো যা বলার আমার কোন অধিকার নেই। যদি আমি তা বলতাম তাহলে নিশ্চয় আপনি তা জানতেন। আপনি জানেন আমার মনে কী আছে। এবং আমি জানি না, আপনার মনে কী আছে। নিশ্চয় আপনিই অদৃশ্য বিষয়সমূহ জানেন।

৬:১০০ :: এবং তারা জিনদেরকে আল্লাহর শরীক বানিয়ে নিয়েছে। অথচ তিনিই তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। এবং তারা অজ্ঞতা সত্ত্বেও তাঁর জন্য পুত্র-কন্যা আরোপ করেছে। তিনি পবিত্র ও উহার ঊর্ধ্বে যা তারা রচনা করে।

৭:১৪৩ :: এবং যখন মূসা আমাদের নির্ধারিত সময়কালে উপস্থিত হলো এবং তার সাথে তার প্রভু কথা বললেন। সে বললো, “হে আমার প্রভু, আমাকে দেখা দিন, যেন আমি আপনাকে দেখি”। তিনি (আল্লাহ) বললেন, “তুমি কখনোই আমাকে দেখবে না। কিন্তু তুমি পাহাড়টির দিকে লক্ষ্য করো, যদি তা তার স্থানে স্থির থাকে, তাহলে তুমি আমাকে দেখতে পারো”। তারপর যখন তার প্রভু পাহাড়টিতে নূরের তাজাল্লি (আলোর ঔজ্জল্য) প্রকাশ করলেন, তখন তা চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেলো এবং মূসা বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেলো। তারপর যখন সে চেতনা ফিরে পেলো তখন সে বললো, “আপনি পবিত্র। আমি তাওবা করছি আপনার কাছে। এবং আমিই প্রথম মু’মিন’।

৭:২০৬ :: নিশ্চয় যারা তোমার প্রভুর নিকটবর্তীতায় রয়েছে তারা (ফেরেশতাগণ) তাঁর দাসত্বের বিষয়ে অহংকার করে না। এবং তারা তাঁর পবিত্রতা জ্ঞাপন করে এবং তাঁরই জন্য সাজদাহ করে।

৯:৩১ :: তারা আল্লাহকে ছাড়াও তাদের আহবার ও রুহবানকে (ধর্মগুরুদেরকে) বিধাতা হিসেবে গ্রহণ করে। এবং মাসীহ ইবনে মারইয়ামকেও (বিধাতা হিসেবে গ্রহণ করে)। অথচ তাদেরকে এছাড়া আদেশ দেয়া হয়নি যে, তারা একজনমাত্র ইলাহের (শুধুমাত্র আল্লাহর) দাসত্ব করুক। তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ (সার্বভৌমত্বের অধিকারী, সর্বময় প্রয়োজন পূর্ণকারী ও উপাস্য) নেই।  তারা তাঁর সাথে যে শরীক সাব্যস্ত করে তিনি তা থেকে পবিত্র।

১০:১০ :: সেখানে (জান্নাতে) তাদের দুআ হবে, “সুবহানাকা আল্লাহুম্মা” (হে আল্লাহ, আপনি পবিত্র)। এবং সেখানে তাদের তাহিয়্যাত (পরস্পরের হায়াতের জন্য শুভ কামনা / অভিবাদন) হবে ‘সালামুন’। এবং তাদের আখেরি দুআ হবে এই যে, “আল হামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামীন” (সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি সমগ্র মহাবিশ্বের প্রভু)।

১০:১৮ :: এবং তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন সত্তার দাসত্ব করে যারা তাদের অপকারও করতে পারে না এবং উপকারও করতে পারে না। এবং তারা বলে, “এরা আল্লাহর কাছে আমাদের জন্য শাফায়াতকারী/ সুপারিশকারী”। বলো, “তোমরা কি আল্লাহকে এমন কিছুর সংবাদ দিচ্ছো তিনি আকাশমণ্ডলীতে ও পৃথিবীতে যার অস্তিত্ব সম্পর্কে তিনি জানেন না?” তিনি পবিত্র। এবং যে শিরক তারা করছে তিনি উহার বহু ঊর্ধ্বে।

১০:৬৮ :: তারা বলে, “আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন”। তিনি পবিত্র। তিনি অভাবমুক্ত। যা কিছু আছে আকাশমণ্ডলীতে ও যা কিছু আছে পৃথিবীতে সব তাঁরই অধিকারভুক্ত। তোমাদের এ দাবির (আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করার দাবির) পক্ষে তোমাদের কাছে প্রমাণ (সুলতান) নেই। তোমরা কি আল্লাহর বিষয়ে এমন কথা বলছো যা (সত্য কিনা তা) তোমরা জানো না?

১২:১০৮ :: বলো, “এ-ই হলো আমার অনুসৃত পথ। আমি আল্লাহর দিকে আহবান করি, পর্যবেক্ষণ শক্তির (বাসীরাতের) ভিত্তিতে, আমি এবং সে সে ব্যক্তি যে যে আমার অনুসরণ করে। এবং আল্লাহ পবিত্র। এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই।

১৩:১৩ :: এবং মেঘের গর্জন (আল্লাহর) পবিত্রতা ঘোষণা করে তাঁর প্রশংসা সহকারে। এবং ফেরেশতাগণও তাঁর ভয়ের ভিত্তিতে তাঁর প্রশংসা ঘোষণা করে। এবং তিনি গর্জনকারী বজ্রসমূহ প্রেরণ করেন এবং তা দ্বারা তিনি যাকে ইচ্ছা করেন তাকে আঘাত করেন। এবং তারা আল্লাহর সম্পর্কে বিতর্ক করে। এবং তিনি প্রবল শক্তিমান।

১৫:৯৮ :: সুতরাং তোমার প্রভুর প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা জ্ঞাপন করো। এবং সাজদাহকারীদের অন্তর্ভুক্ত হও।

১৬:১ :: আল্লাহর আদেশ কাছে এসে গেছে। সুতরাং তোমরা সেটাকে ত্বরান্বিত করতে চেয়ো না। তিনি পবিত্র। এবং তারা যে শিরক করে তিনি উহার বহু ঊর্ধ্বে।

১৬:৫৭ :: এবং তারা আল্লাহর জন্য কন্য সন্তানদেরকে নির্ধারণ করে। তিনি পবিত্র। এবং তাদের জন্য সেটাই যা (পুত্রসন্তান) তারা কামনা করে!

১৭:১ :: পবিত্র সেই সত্তা যিনি ভ্রমণে নিয়েছেন (ইসরা করিয়েছেন) তাঁর বান্দাকে একটি রাতে, আল মসজিদুল হারাম থেকে আল মসজিদুল আকসা দিকে, যার চারপাশকে বরকতময় করা হয়েছে, যেন আমি তাকে আমার নিদর্শনসমূহের থেকে দেখাই। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।

১৭:৪৩ :: তিনি পবিত্র এবং তারা যা (যে শিরক ধরনের কথা) বলে তিনি তা থেকে ঊর্ধ্বে। তিনি সমুচ্চ, সুমহান।

১৭:৪৪ :: সাত আকাশ ও পৃথিবী এবং সেগুলোর মধ্যে যারা আছে তারা তাঁরই (অর্থাৎ আল্লাহর) পবিত্রতা জ্ঞাপন করছে। এবং কোনো কিছুই নেই এছাড়া যে, তারা তাঁরই প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা জ্ঞাপন করছে। কিন্তু তোমরা তাদের পবিত্রতা জ্ঞাপন বুঝো না। নিশ্চিয় তিনি সহনশীল, ক্ষমাশীল।

১৭:৯৩ :: (তারা আরো বলে), “অথবা তোমার জন্য স্বর্ণনির্মিত ঘর হবে অথবা তুমি আকাশে আরোহন করবে। এবং আমরা কখনো তোমার আরোহনকেও বিশ্বাস করবো না, যতক্ষণ না তুমি আমাদের উপর একটি কিতাব নাযিল করবে, যা আমরা পাঠ করবো”। বলো, “আমার প্রভু পবিত্র। আমি মানুষ রসূল ছাড়া অন্য কিছু?”

১৭:১০৮ :: এবং তারা (সাজদাহয়) বলে, ছুবহানা রব্বিনা, ইন কানা ওয়াদু রব্বিনা লামাফঊলা (আমাদের প্রভু পবিত্র, যদি থাকে আমাদের রবের কোন ওয়াদা তাহলে তা অবশ্যই বাস্তবায়িত হয়েই থাকে)।

১৯:১১ :: তারপর (যথাসময়ে ওহী প্রাপ্ত হয়ে) সে তার ব্যক্তিগত কক্ষ (মিহরাব) থেকে তার সম্প্রদায়ের কাছে বের হয়ে এলেো। তার সে তাদেরকে ওহী করলো (ইঙ্গিতে বললো), “তোমরা (আল্লাহর) পবিত্রতা জ্ঞাপন করো দিনের প্রথমাংশে (বুকরাতানে) এবং রাতের প্রথমাংশে (ইশার সময়)।

১৯:৩৫ :: আল্লাহর জন্য শোভনীয় নয় যে, তিনি কোনো সন্তান গ্রহণ করবেন। তিনি পবিত্র। যখন তিনি কোনো কাজের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তখন প্রকৃতপক্ষে তিনি উহার উদ্দেশ্যে বলেন ‘হও’, সুতরাং তা হয়।

২০:৩৩ :: যেন আমরা অধিক পরিমাণে আপনার পবিত্রতা জ্ঞাপন করতে পারি। (এটি রসূলুল্লাহ মূসার দুআর অংশ)

২০:১৩০ :: তারা যা বলে সে বিষয়ে ধৈর্য ধরো এবং তোমার প্রভুর প্রশংসাসহ পবিত্রতা জ্ঞাপন (হামদ ও তাসবীহ) করো সূর্য উদয়ের আগে এবং সেটার (সূর্যের) অস্তের আগে। এবং রাতের বিভিন্ন প্রহরে (আনাআল লাইলে) এবং দিনের বিভিন্ন ভাগে (আতরফান্নাহার), যেন তুমি সন্তুষ্ট হতে পারো।

২১:২০ :: তারা তাঁর পবিত্রতা জ্ঞাপন করে রাতে ও দিনে। এবং তারা তাতে অলসতা করে না।

২১:২২ :: যদি তাদের উভয়ের মধ্যে (আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে) আল্লাহ ছাড়া আরো ইলাহ থাকতো, তাহলে উভয়ের শৃঙ্খলা ব্যবস্থা বিনষ্ট হয়ে যেতো। সুতরাং আরশের প্রভু আল্লাহ তা থেকে পবিত্র যা (যে শিরক ধরনের কথা) তারা বর্ণনা করে।

২১:২৬ :: এবং তারা বলে, “দয়াময় (আল্লাহ) সন্তান গ্রহণ করেছেন”। তিনি পবিত্র। বরং (তারা যাদেরকে আল্লাহর সন্তান আখ্যায়িত করে সেই ফেরেশতারা তো) সম্মানিত বান্দা।

২১:৭৯ :: তখন আমি সুলাইমানকেও তা বুঝিয়ে দিয়েছি। এবং (তাদের) প্রত্যেককেই আমি বিচার-ক্ষমতা ও জ্ঞান দিয়েছি। এবং আমি দাউদের সাথে পাহাড়সমূহকে নিয়োজিত করেছি, সেগুলো (তার সাথে) তাসবীহ করতো (সেগুলোতে তাঁর তাসবীহের প্রতিধ্বনি তৈরি হতো); এবং পাখিদেরকেও (তার সাথে নিয়োজিত করেছি)। এবং আমরাই এসবের সম্পাদনকারী ছিলাম।

২১:৮৭ :: এবং (সাহায্য করেছি) যুন নূনকেও (ইউনুসকেও), যখন সে ক্রদ্ধ হয়ে চলে গেলো। যখন সে ধারণা করলো যে, (তার এ কাজের বিষয়ে) আমি তাকে দায়ী করতে পারবো না। তারপর (নিজের ভুল বুঝতে পারার পর) সে অন্ধকারের মধ্যে (আমাকে) ডাকলো, এ কথা বলে যে, লা ইলাহা ইল্লা আনতা, সুবহানাকা, ইন্নী কুনতু মিনায যলিমীন (আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, আপনি পবিত্র, নিশ্চয় আমি যালিমদের অন্তর্ভুক্ত)।

২৩:৯১ :: আল্লাহ কোনো সন্তান গ্রহণ করেননি। এবং তাঁর সাথে কোনো ইলাহ নেই। যদি থাকতো, তবে অবশ্যই প্রত্যেক ইলাহ নিজ নিজ সৃষ্টিকে নিয়ে যেতো এবং তাদের প্রত্যেকে প্রত্যেকের উপর প্রাধান্য বিস্তার করতো। তারা যা (যে শিরক ধরনের কথা) রচনা করে তিনি তা থেকে আল্লাহ পবিত্র।

২৪:১৬ :: এবং কেন যখন তোমরা উহা শুনেছো তখন বলনি, “আমাদের জন্য সঙ্গত নয় যে, আমরা এ ধরনের কথা বলবো। (হে আল্লাহ) আপনি পবিত্র। ইহা তো অনেক বড় মিথ্যা দোষারোপ”।

২৪:৩৬ :: (তাঁর নূরের দিকে হিদায়াতপ্রাপ্ত ব্যক্তি পাওয়া যায়) সেই ঘরগুলোতে, আল্লাহ অনুমতি দিয়েছেন যেগুলোকে সমুন্নত করতে এবং তাতে তাঁর নাম স্মরণ / আলোচনা করতে। তার তাতে তাঁর পবিত্রতা জ্ঞাপন করে (সকালে (গুদুব্বে) ও (বিকালে (আসালে)।

২৪:৪১ :: তুমি কি ভেবে দেখনি যে,আল্লাহরই তাসবীহ (পবিত্রতা জ্ঞাপন) করছে যারা আছে আকাশমন্ডলীতে ও পৃথিবীতে এবং সারিবদ্ধভাবে উড়ন্ত পাখি। প্রত্যেকেই জেনেছে তার সালাত এবং তার তাসবীহ। এবং তারা যা করে আল্লাহ তা সম্যক পরিজ্ঞাত।

২৫:১৮ :: তারা বলবে, “আপনি পবিত্র। আমাদের জন্য সম্ভব ছিলো না যে, আমরা আপনাকে ছাড়া কোনো অভিভাবককে গ্রহণ করবো। কিন্তু আপনি তাদেরকে ভোগসামগ্রী দিয়েছিলেন এবং তাদের বাপদাদাদেরকেও (ভোগসামগ্রী দিয়েছিলেন), যতক্ষণ না তারা স্মরণীয় উপদেশ-সংবিধান (যিকর) ভুলে গিয়েছিলো। এবং তারা হয়েছিলো এক ধ্বংসপ্রাপ্ত ক্বওম।

২৫:৫৮ :: এবং তুমি ভরসা করো সেই চিরজীবন্ত সত্তার উপর যিনি কখনো মৃত্যুবরণ করবেন না। এবং তাঁর প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা জ্ঞাপন করো। এবং তাঁর বান্দাদের পাপসমূহ সম্পর্কে খবর রাখনেওয়ালা হিসেবে তিনিই যথেষ্ট।

২৭:৮ :: তারপর যখন সে (মূসা) সেখানে আসলো, তখন তাকে ডেকে বলা হলো যে, “যে এ আগুনের মধ্যে আছে সে (মূসা) বরকতময় এবং (তারাও বরকতময়) যারা সেটার চারপাশে আছে (মূসার পরিবার)। এবং আল্লাহ রব্বুল আলামীন পবিত্র সত্তা।

২৮:৬৮ :: এবং তোমার প্রভু সৃষ্টি করেন যা তিনি (সৃষ্টি করার) ইচ্ছা করেন। এবং তিনি মনোনীত করেন (যাকে তিনি ইচ্ছা করেন)। (এসব কাজে) তাদের কোনো ইখতিয়ার নেই। আল্লাহ পবিত্র এবং তারা যে শিরক করে তা থেকে বহু ঊর্ধ্বে।

৩০:১৭-১৮ :: সুতরাং আল্লাহর পবিত্রতা জ্ঞাপন করো যখন তোমরা সন্ধ্যায় উপনীত হও সেই সময় এবং যখন তোমরা প্রভাতে উপনীত হও সেই সময়। এবং তাঁরই জন্য প্রশংসা আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে। এবং আশিয়্যানে (ইশার প্রথমদিকের সময়) এবং যখন তোমরা যোহরে (দুপুরে) উপনীত হও সেই সময়।

৩০:৪০ :: আল্লাহই সেই সত্তা যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তারপর তোমাদেরকে জীবিকা দিয়েছেন তারপর তোমাদেরকে মৃত্যু দিবেন তারপর তোমাদেরকে জীবিত করবেন। তোমাদের (কল্পিত) শরিকদের মধ্য থেকে কেউ আছে কি যে করতে পারে এসবের কোনো কিছু? তিনি পবিত্র এবং তারা যে শিরক করে তা থেকে তিনি অনেক ঊর্ধ্বে।

৩২:১৫ :: নিশ্চয় আমার আয়াতসমূহের প্রতি তারাই বিশ্বাস করে যারা এমন যে, যখন তাদেরকে উহার মাধ্যমে স্মরণ করিয়ে দেয়া হয় / উপদেশ দেয়া হয় তখণ তারা সাজদাহয় ঝুঁকে পড়ে এবং তাদের প্রভুর প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা জ্ঞাপন করে এবং তারা অহংকার করে না।

৩৩:৪২ :: এবং তাঁর পবিত্রতা জ্ঞাপন করো সকালে (বুকারাতানে) ও বিকালে (আসীলায়)।

৩৪:৪১ :: তারা বলবে, “আপনি পবিত্র। আপনি আমাদের অভিভাবক, তারা নয়। বরং তারা জিনদের উপাসনা করতো। তাদের অধিকাংশই তাদের প্রতি বিশ্বাসী ছিলো।

৩৬:৩৬ :: পবিত্র সেই সত্তা যিনি সৃষ্টি করেছেন জোড়ায় জোড়ায় সবকিছুকে যা কিছু আছে পৃথিবীতে, এবং তাদের নিজেদের মধ্য থেকেও, এবং যা কিছুকে এখনো তারা জানে না।

৩৬:৮৩ :: সুতরাং পবিত্র সেই সত্তা যাঁর হাতে সবকিছুর আধিপত্য (মালাকুত)। এবং তাঁরই কাছে তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে।

৩৭:১৪৩ :: যদি সে (ইউনুস) না হতো (আল্লাহর) পবিত্রতা জ্ঞাপনকারীদের অন্তর্ভুক্ত।

৩৭:১৫৯ :: তারা যা (যে শিরক ধরনের কথা) বর্ণনা করে তা থেকে আল্লাহ পবিত্র।

৩৭:১৬৬ :: আমরা (আল্লাহর) পবিত্রতা জ্ঞাপনকারী।

৩৭:১৮০ :: তোমার প্রভু পবিত্র। তারা যা আরোপ করছে তার মোকাবেলায় তিনিই সম্মান দেয়ার প্রভু।

৩৮:১৮ :: নিশ্চয় আমরা তার সাথে পাহাড়সমূহকে নিয়োজিত করেছিলাম। সে ইশার সময় ও ইশরাক্বের (সূর্যোদয়ের) সময় (আল্লাহর) পবিত্রতা জ্ঞাপন করতো।

৩৯:৪ :: যদি আল্লাহ ইচ্ছা করতেন যে, তিনি সন্তান গ্রহণ করবেন, তাহলে তিনি যাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তাদের মধ্য থেকে যাকে তিনি ইচ্ছা করতেন তাকে মনোনীত করতেন। তিনি পবিত্র। তিনিই আল্লাহ, একজনই এবং একচ্ছত্র ক্ষমতাধর।

৩৯:৬৭ :: এবং তারা যথাযথভাবে হক্ব আদায় করে আল্লাহর ক্বদর (মর্যাদাদান ও মাহাত্ম্যপ্রকাশ) করেনি। অথচ ক্বিয়ামাত দিবসে সমস্ত পৃথিবী তাঁর মুঠিতে থাকবে এবং আকাশমণ্ডলী তাঁর ডান হাতে পেঁচানো অবস্থায় থাকবে। তিনি পবিত্র। এবং তারা যে শিরক করে তিনি তা থেকে অনেক ঊর্ধ্বে।

৩৯:৭৫ :: এবং তুমি ফেরেশতাদেরকে (আল্লাহর) আরশের চারপাশে ঘিরে অবস্থান করতে দেখবে। তারা তাদের প্রভুর প্রশংসাসহ পবিত্রতা জ্ঞাপন করতে থাকবে। এবং তাদের মধ্যে যথাযথ সত্য সহকারে ফায়সালা করে দেয়া হবে। এবং বলা হবে, আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন (সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি সমগ্র মহাবিশ্বের প্রভু)।

৪০:৭ :: যারা (যে ফেরেশতারা) আরশ বহন করে এবং যারা (যে ফেরেশতারা) সেটির চারপাশে থাকে, তারা তাদের প্রভুর প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা জ্ঞাপন করে। এবং তারা তাঁর প্রতি ঈমান রাখে। এবং যারা ঈমান রাখে তাদের জন্য তারা (ফেরেশতারা) ক্ষমা প্রার্থনা করে। (তারা বলে), “হে আমাদের প্রভু, আপনি সবকিছুকে দয়া দ্বারা ও জ্ঞান দ্বারা পরিব্যাপ্ত করে আছেন। সুতরাং যারা তাওবাহ করেছে এবং আপনার পথের অনুসরণ করেছে তাদেরকে ক্ষমা করে দিন এবং তাদেরকে জাহীমের (জাহান্নামের) শাস্তি থেকে বাঁচান”।

৪০:৫৫ :: সুতরাং সবর করো (ধৈর্য ধরো)। নিশ্চয় আল্লাহর ওয়াদা সত্য। এবং তুমি তোমার গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো। এবং তোমার প্রভুর প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা জ্ঞাপন করো ইশার সময় (রাতের প্রথমাংশে) এবং ইবকারে (দিনের প্রথমাংশে)।

৪১:৩৮ :: তারপর যদি তোমরা অহংকার করো (তাতে কোন পরোয়া নেই)। তবে যারা তোমার প্রভুর কাছে আছে তারা তাঁর পবিত্রতা জ্ঞাপন করে রাতে ও দিন, এবং তারা ক্লান্তিবোধ করে না।

৪২:৫ :: (তাঁর সাথে শিরক করার কারণে) আকাশমণ্ডলী উপর থেকে ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়, এবং ফেরেশতাগণ তাদের প্রভুর প্রশংসাসহ পবিত্রতা জ্ঞাপন করে, এবং তারা পৃথিবীতে যারা আছে তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। জেনে রাখো, নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়াশীল।

৪৩:১৩ :: যেন তোমরা উহার (আনআমের / গবাদি পশুর) পিঠের উপর চড়ে বসতে পারো। তারপর তোমরা স্মরণ করো তোমাদের প্রভুর নেয়ামত, যখণ তোমরা উহার উপর চড়ে বসো, এবং তোমরা বলো, “তিনি পবিত্র, যিনি আমাদের জন্য ইহাকে নিয়োজিত করে দিয়েছেন। আমরা (নিজে থেকে) উহাকে বশীভূতকারী ছিলাম না”।

৪৩:৮২ :: আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর প্রভু, আরশের প্রভু, তারা যা (যে শিরক ধরনের কথা) রচনা করে তা থেকে পবিত্র।

৪৮:৯ :: যেন তোমরা বিশ্বাস করো আল্লাহর প্রতি ও তাঁর রসূলের প্রতি এবং তোমরা তাকে (রসূলকে) সাহায্য করো ও  তোমরা তাকে (রসূলকে) সম্মান করো এবং তোমরা তাঁর (আল্লাহর) পবিত্রতা জ্ঞাপন করো বুকরাতানে (সকালে) ও আসীলায় (বিকালে)।

৫০:৩৯ :: সুতরাং তারা যা বলে সে বিষয়ে (প্রতিক্রিয়া হিসেবে) তুমি সবর করো (ধৈর্য ধরো) এবং তোমার প্রভুর প্রশংসাসহ পবিত্রতা জ্ঞাপন করো, সূর্য উদয়ের আগে ও সূর্য অস্তের আগে।

৫০:৪০ :: এবং রাতের কিছু অংশে তাঁর পবিত্রতা জ্ঞাপন করো এবং সাজদাহসমূহের পরেও।

৫২:৪৩ :: নাকি তাদের জন্য আল্লাহ ছাড়াও কোনো ইলাহ আছে? তারা যে শিরক করছে তা থেকে আল্লাহ পবিত্র।

৫২:৪৮ :: এবং তুমি সবর করো (ধৈর্য ধরো) তোমার প্রভুর হুকুমের জন্য। নিশ্চয় তুমি আমাদের চোখের সামনে আছো। এবং তুমি তোমার প্রভুর প্রশংসাসহ পবিত্রতা জ্ঞাপন করো, তুমি ক্বিয়াম করার (তাঁর উদ্দেশ্যে দাঁড়াবার) সময়।

৫২:৪৯ :: এবং রাতের কিছু অংশেও তুমি তাঁর পবিত্রতা জ্ঞাপন করো। এবং নক্ষত্রসমূহের অস্তগমনের সময়েও (তাঁর পবিত্রতা জ্ঞাপন করো)।

৫৬:৭৪ :: সুতরাং তোমার মহান প্রভুর নামের পবিত্রতা জ্ঞাপন করো।

৫৬:৯৬ :: সুতরাং তোমার মহান প্রভুর নামের পবিত্রতা জ্ঞাপন করো।

৫৭:১ :: আল্লাহর পবিত্রতা জ্ঞাপন করছে যা কিছু আছে আকাশমন্ডলীতে এবং পৃথিবীতে। এবং তিনি মহাশক্তিমান, মহাবিজ্ঞ।

৫৯:১ :: আল্লাহর পবিত্রতা জ্ঞাপন করছে যা কিছু আছে আকাশমন্ডলীতে এবং পৃথিবীতে। এবং তিনি মহাশক্তিমান, মহাবিজ্ঞ।

৫৯:২৩ :: তিনিই সেই সত্তা যিনি এমন যে, কোনো ইলাহ নেই তিনি ছাড়া। তিনি আধিপত্যের অধিকারী (মালিক), পবিত্র সত্তা (ক্বুদ্দুস), শান্তিদাতা (সালাম), নিরাপত্তাদাতা (মুমিন), সংরক্ষক (মুহায়মিন), মহাশক্তিমান (আযীয), প্রবল (জাব্বার), শ্রেষ্ঠ (মুতাকাব্বির)। তারা যে শিরক করছে আল্লাহ তা থেকে পবিত্র।

৫৯:২৪ :: তিনিই সৃষ্টিকর্তা (খালিক্ব), উদ্ভাবনকর্তা (বারি), আকৃতি দানকারী (মুসাব্বির)। তাঁর জন্য আছে সুন্দর নামসমূহ (আসমাউল হুসনা)। তাঁরই পবিত্রতা জ্ঞাপন করে যা কিছু আছে আকাশমণ্ডলীতে ও পৃথিবীতে। এবং তিনিই মহাশক্তিমান, মহাবিজ্ঞ।

৬১:১ :: আল্লাহর পবিত্রতা জ্ঞাপন করছে যা কিছু আছে আকাশমন্ডলীতে এবং যা কিছু আছে পৃথিবীতে। এবং তিনি মহাশক্তিমান, মহাবিজ্ঞ।

৬২:১ :: আল্লাহর পবিত্রতা জ্ঞাপন করছে যা কিছু আছে আকাশমন্ডলীতে এবং যা কিছু আছে পৃথিবীতে। তিনি অধিপতি (মালিক), পবিত্র (ক্বুদ্দুস), মহাশক্তিমান (আযীয) ও মহাবিজ্ঞ (হাকীম)।

৬৪:১ :: আল্লাহর পবিত্রতা জ্ঞাপন করছে যা কিছু আছে আকাশমন্ডলীতে এবং যা কিছু আছে পৃথিবীতে। তাঁরই আয়ত্তে রাজত্ব-আধিপত্য এবং তাঁরই জন্য প্রশংসা। এবং তিনিই সবকিছুর উপর সর্বশক্তিমান / নিয়ন্ত্রক / প্রাকৃতিক নিয়ম নির্ধারক।

৬৮:২৮ :: তাদের মধ্যকার মধ্যমপন্থী ব্যক্তিটি বলেছিলো, “আমি কি তোমাদেরকে বলিনি, কেন তোমরা (আল্লাহর) পবিত্রতা জ্ঞাপন করছো না?”

৬৮:২৯ :: তখন তারা বলেছিলো, “আমাদের প্রভু পবিত্র। নিশ্চয় আমরা ছিলাম যালিম”।

৬৯:৫২ :: সুতরাং তোমার মহান প্রভুর পবিত্রতা জ্ঞাপন করো।

৭৬:২৫-২৬ :: এবং তোমার প্রভুর নামের স্মরণ করো সকালে ও বিকালে। এবং রাতের অংশবিশেষে তাঁরই জন্য সাজদাহ করো এবং তাঁরই পবিত্রতা জ্ঞাপন করো দীর্ঘ রাত।

৮৭:১ :: তোমার মহান প্রভুর নামের পবিত্রতা জ্ঞাপন করো।

১১০:৩ :: তখন তুমি তোমার প্রভুর প্রশংসাসহ পবিত্রতা জ্ঞাপন করো এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয় তিনি তাওবাহ কবুলকারী।

তাসবীহ প্রসঙ্গে দিন-রাতের যেসব সময়কে নির্দিষ্ট করা হয়েছে

৩:৪১ আশিয়্য, ইবকার। (সন্ধ্যা, সকাল)

১৯:১১ বুকরাত, আশিয়্য। (সকাল, সন্ধ্যা)

২০:১৩০ ক্বাবলা তুলুয়িশ শামস, ওয়া ক্বাবলা গুরুবিহা, ওয়া মিন আনায়িল লাইল, ওয়া আতরফান নাহার। (সূর্য উদয়ের আগে, সূর্য অস্তের আগে, রাতের বিভিন্ন প্রহরে, দিনের বিভিন্ন ভাগে)

২৪:৩৬ গুদুব্ব, আসাল। (সকালে, বিকালে)

৩০:১৭-১৮ হীনা তুমছূনা, ওয়া হীনা তুসবিহূনা, ওয়া আশিয়্য, ওয়া হীনা তুযহিরূনা। (সূর্যাস্তের অব্যবহিত পূর্বের সময়, সূর্যোদয়ের অব্যবহিত পূর্বের সময়, সন্ধ্যা পরবর্তী মধ্যরাতের দিকে প্রলম্বিত সময়, মধ্যাহ্নের সময়)

৩৩:৪২ বুকরাত, আসীল। (সকালে, বিকালে)

৩৮:১৮ আশিয়্য, ইশরাক। (সন্ধ্যায়, সূর্যোদয়ের অব্যবহিত পরের সময়)

৪০:৫৫ আশিয়্য, ইবকার। (সন্ধ্যায়, সকালে)

৪৮:৯ বুকরাত, আসীল। (বিকালে, সকালে)

৫০:৩৯-৪০ ক্বাবলা তুলুয়িশ শামস, ওয়া ক্বাবলা গুরুব, ওয়া মিনাল লাইল, ওয়া আদবারাস সুজূদ। (সূর্যোদয়ের পূর্বে, সূর্যাস্তের পূর্বে, রাতের কিছু অংশে, সাজদাহসমূহের পরে)

৫২:৪৮-৪৯ হীনা তাক্বূমু, ওয়া মিনাল লাইল, ওয়া ইদবারান নুজূম। (ক্বিয়াম / দণ্ডায়মান হওয়ার সময়, রাতের কিছু অংশে এবং নক্ষত্রসমূহের অস্তগমনের সময়)

৭৬:২৫-২৬ বুকরাত, ওয়া আসীল, ওয়া মিনাল লাইলি ফাছজুদ লাহু, ওয়া ছাব্বিহহু লাইলান তওয়িলান। (সকালে, বিকালে, রাতের কিছু অংশে সাজদাহ এবং দীর্ঘ রাত তাসবীহ)

দিন-রাতের বিভিন্ন সময়সীমা অধ্যায়ে তাসবীহের সময়সীমাসমূহ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। সেই প্রেক্ষিতে তাসবীহের সকল সময়সীমা হয় নিম্নরূপ:

১. সূর্যোদয়ের আগে, ২. সূর্যোদয়ের অব্যবহিত পরে, ৩. মধ্যাহ্ণের অব্যবহিত পূর্বে, ৪. মধ্যাহ্নে, ৫. সূর্যাস্তের অব্যবহিত পূর্বে, ৬. সন্ধ্যায়, ৭. মধ্যরাতের দিকে, ৮. রাতের শেষভাগে।

এই বিভিন্ন সময়সীমার মধ্য থেকে একেক আলোচনাক্রমে একেক সময়সীমাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন সময়সীমার উপর অধিক গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। তবে সব মিলিয়ে যেহেতু এই সময়সীমাগুলো নির্ণিত হয়, তাই সাধারণভাবে এ সময়সীমাগুলোতে তাসবীহ করার অনুশীলন করা উচিত।

পরিভাষা

ক্বিবলাহ  قِبْلَة ক্বিবলাহ শব্দের অর্থ হলো ‘যে স্থানকে কেন্দ্রীয় মর্যাদা দেয়া হয়, যে স্থানকে ধর্মমন্দির হিসেবে কবুল বা গ্রহণ করা হয়, যে স্থানের দিকে মুখ ফিরানো হয়, কেন্দ্রীয় উপাসনাগৃহ’। একেক ধর্মের অনুসারীরা একেক ক্বিবলাহর (অর্থাৎ নিজস্ব ধর্মীয় আদর্শ) দিকে মুখ ফিরায় এবং একে অন্যের ক্বিবলাহর অনুসরণ করে না। মুসলিমদের কর্তব্য হলো আল্লাহর আয়াতের মাধ্যমে সর্বশেষ চূড়ান্ত ক্বিবলাহ হিসেবে নির্ধারণ করে দেয়া আল মাসজিদুল হারামের (আল্লাহর বিধান শুনা ও মানার সংরক্ষিত প্রতিষ্ঠান) দিকে মুখ ফিরানো এবং স্পষ্ট জ্ঞান প্রাপ্তির পরও অন্যদের খেয়াল খুশির অনুসরণ করা যাবে না। সেই সাথে কল্যাণকর পন্থা পদ্ধতি অবলম্বনকেই মুল নীতি হিসেবে স্থির করে কল্যাণকর্মে প্রতিযোগিতা করার রাজপথ অবলম্বন করতে হবে।

ক্বিবলাহ শব্দের মাধ্যমে ‘কেন্দ্র বা রাজধানী’ বুঝায়। কুরআনের বক্তব্য অনুসারে, একই মূল ক্বিবলাহর সাথে সম্পর্কিত যত প্রতিষ্ঠানই স্থাপন করা হোক না কেন, তাতে একই ক্বিবলাহর বৃত্তেই পরিবৃত থাকা হয়। তাই বলা যেতে পারে ক্বিবলাহ দুই প্রকার, (১) মূল ক্বিবলাহ, মূল কেন্দ্র বা মূল রাজধানী এবং (২) মূল ক্বিবলাহর সাথে সম্পর্কিত স্থানীয় ক্বিবলাহ, উপকেন্দ্র বা উপরাজধানী। নবী মূসা ও হারূনকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো যে, তাঁরা যেন মিসরে কয়েকটি গৃহ নির্মাণ করেন এবং সেগুলোকে ক্বিবলাহ বানান। এই প্রেক্ষিতে বলা যায়, মুসলিম উম্মাহর জন্য ‘আল মাসজিদুল হারাম’ হলো মূল ক্বিবলাহ এবং অন্য সব মাসজিদ হলো স্থানীয় ক্বিবলাহ বা উপকেন্দ্র। কুরআনে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেন প্রত্যেক মাসজিদের অনুকুলেই স্বীয় চেহারাকে প্রতিষ্ঠিত রাখা হয় এবং সুন্দর পোশাক গ্রহণ করা হয়। সংক্ষেপে বলা যায় যে, যে গৃহ বা প্রতিষ্ঠানকে (বাইত) আল্লাহ প্রদত্ত বিধি-বিধানের সমষ্টিগত অনুশীলনের জন্য মাসজিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয় সেটাকেই মু’মিনরা তাদের ক্বিবলাহ বা কেন্দ্র হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। ক্বিবলাহর দিকে চেহারা ফিরানোর আনুষ্ঠানিক রূপ হিসেবে আনুষ্ঠানিক সালাত সম্পাদনের সময় ক্বিবলাহর দিকে চেহারা ফেরানো হয়। কিন্তু এর ব্যাপক তাৎপর্য হলো: ‘আল মাসজিদুল হারাম’কে সাংবিধানিক কেন্দ্র হিসেবে গ্রহণ করা এবং কার্যকর করার জন্য লক্ষ্য স্থির করা। এ বিষয়ে প্রাসঙ্গিক আয়াতসমূহ হলো: ২:১৪২-১৫০, ৭:২৯-৩১, ১০:৮৭।

ক্বিয়াম  قِيَام ক্বিয়াম শব্দের শাব্দিক অর্থ দাঁড়ানো। শব্দটির রূপান্তরিত অর্থ হিসেবে ইতিবাচক তাৎপর্য হলো ‘কোনো কাজের বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করা’ এবং নেতিবাচক তৎপর্য হলো ‘কোনো বিষয়ে পথ চলতে গিয়ে থমকে দাঁড়ানো’। যেমন ২:২০ আয়াতে শব্দটি ‘থমকে দাঁড়ানো’ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আবার ৪:১২৭ আয়াতে ইয়াতীম ছেলেমেয়েদের প্রতি ন্যায়সঙ্গতভাবে দায়-দায়িত্ব পালনের জন্য দাঁড়াতে তথা উদ্যোগ নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ৪:১৩৫ ও ৫:৮ আয়াতে ন্যায় সাক্ষ্য দেয়ার দায়িত্বশীলতা নিয়ে দাঁড়াতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ২:২৩৮ আয়াতে আল্লাহর উদ্দেশ্যে বিনীতভাবে দাঁড়াতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সালাতে আনুষ্ঠানিকভাবে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রেও বিনীতভাবে দাঁড়ানো এই নির্দেশ পালনের একটি দিক। আবার একই সাথে এটি ব্যাপকার্থেও প্রযোজ্য। সালাতে আনুষ্ঠানিকভাবে দাঁড়ানোর বিষয়টি ৩:৩৯ ও ৪:১০২ আয়াত থেকে স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়। আবার ব্যাপকার্থে সালাতে দাঁড়ানোর বিষয়টি আল্লাহর বিধানের নিবিড় অনুসরণের জন্য দাঁড়ানোকে বা নিজেকে নিয়োজিত করাকে বুঝায়।

ক্বুনূত قُنُوْت ক্বুনূত শব্দের অর্থ ‘বিনয়’। ২:২৩৮ আয়াতে আল্লাহর উদ্দেশ্যে বিনয়ের সাথে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ২:১১৬ ও ৩০:২৬ আয়াতে জানানো হয়েছে যে, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সকলে আল্লাহর প্রতি বিনীত, অর্থাৎ মানুষের কর্তব্য হলো অন্য সব সৃষ্টির মতো আল্লাহর প্রতি বিনীত থাকা। মু’মিন নারী-পুরুষের অন্যতম গুণ হলো তারা আল্লাহর প্রতি বিনীত (৩:১৭, ৩৩:৩৫)।

খুশূ خُشُوع খুশূ’ শব্দটির অর্থ হলো কোনো কিছুর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবে বিনীত বা অবনমিত হওয়া। ৪২:৪৫, ৫৪:৭, ৬৮:৪৩, ৭০:৪৪, ৭৯:৯, ৮৮:২ প্রভৃতি আয়াতে শব্দটি ‘অপমানে অবনমিত হওয়া, অপমানে অবনমিত নেত্র হওয়া, অপমানে মুখমণ্ডলকে অবনমিত করা’ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অন্যদিকে শব্দটির ইতিবাচক অর্থ হলো ‘আল্লাহর নিকট জবাবদিহিতার অনুভূতিতে বিনীত থাকা, আল্লাহর প্রতি বিনীত থাকা’। ২৩:২ আয়াতে মু’মিনদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, “তারা তাদের সালাতে বিনীত থাকে’। ২:৪৫-৪৬ আয়াতে জানানো হয়েছে যে, যারা বিনীত তাদের জন্য সালাত কোনো বড় ধরনের মানসিক চাপ অনুভবের বিষয় নয়; এবং বিনীত তারাই যারা জবাবদিহিতার জন্য আল্লাহর সম্মুখীন হবে বলে নিশ্চিত ধারণা রাখে। ৩৩:৩৫ আয়াতে যাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার রয়েছে তাদের গুণাবলি হিসেবে ‘বিনীত’ হওয়ার উল্লেখ করা হয়েছে। ১৭:১০৭-১০৯ আয়াত অনুসারে, কুরআনের আয়াত জ্ঞানীদের বিনয় বৃদ্ধি করে। ৫৭:১৬ আয়াতে প্রশ্ন রাখা হয়েছে যে, আল্লাহর স্মরণে ও আল্লাহ যে সত্য নাযিল করেছেন তাতে অন্তর বিনম্র হওয়ার সময় কি আসে নি? এবং আয়াতটিতে বিনম্র অন্তরের বিপরীতে শক্ত অন্তরের প্রসঙ্গ উল্লেখিত হয়েছে। সুতরাং খুশূ’ তথা আল্লাহর প্রতি বিনীতভাব ও অন্তরের নম্রতা মু’মিনদের জন্য অন্যতম অর্জনীয় গুণবিশেষ।

জুমুয়াহ جُمُعَة জুমুয়াহ শব্দের অর্থ ‘একত্রিত হওয়া, দলবদ্ধ হওয়া’। যখন দুটি পরস্পর বিরোধী দল মোক্বাবিলার জন্য একত্রিত হয় তখন তাকে বলা হয় ইয়াওমাল তাক্বাল জাময়ান (৩:১৫৫, ৩:১৬৬, ৮:৪১)। অন্যদিকে দলীয় ভিত্তিতে একত্রিত হওয়ার দিনকে ইয়াওমুল জুমুয়াহ বলা হয়। ৬২:৯ আয়াতে ইয়াওমুল জুমুয়াহতে সালাতের জন্য আহবান (নিদা) করা হলে ব্যবসা কার্যক্রম স্থগিত রেখে আল্লাহর স্মরণের দিকে দ্রুত ধাবিত হওয়ার জন্য এবং সালাত শেষ হলে কর্মক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সাধারণত ইয়াওমুল জুমুয়াহ এর অনুবাদ করা হয় ‘শুক্রবার’। এর ফলে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, এটি সপ্তাহের ষষ্ঠ দিনের বিশেষ্য বা নামবাচক শব্দ এবং সপ্তাহের যে দিনকে যে নামে বিশ্বব্যাপী চিহ্নিত করা হচ্ছে তার মধ্যে সর্বত্র এই একই দিন ইয়াওমুল জুমুয়াহ হিসেবে পালন করা বাধ্যতামূলক। অথচ প্রকৃতপক্ষে ইয়াওমুল জুমুয়াহ একটি বৈশিষ্ট্যগত নাম এবং এটি পরিস্থিতি সাপেক্ষে পরামর্শভিত্তিক সিদ্ধান্তক্রমে একেক স্থানে একেক দিন নির্ধারণ করে তাতে সালাতের জন্য আহবান করার সুযোগ রয়েছে। আল কুরআনে কোনো বিধানগত জটিলতা নেই এবং অতীতে ইয়াওমুস সাবত বা ‘সপ্তম দিনকে বিশ্রাম দিবস হিসেবে পালন’ এর যে বিধান ছিলো, কুরআনে সে বিধানকে বহাল রাখা হয়নি, বরং এতে ইয়াওমুল জুমুয়াহ এর বিধান দেয়া হয়েছে, যাতে জুমুয়াহর সালাতের আহবান থেকে শুরু করে সালাত সমাপ্ত হওয়া পর্যন্ত ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে, কিন্তু তার আগে পরে ব্যবসায়িক কার্যক্রম যথারীতি চালু থাকার অবকাশ আছে। জুমুয়াহর দিনে জুমুয়াহ বা জামায়াতের সাথে সালাত সম্পাদন করা ব্যবসা তথা উপার্জনমূলক কাজে জড়িত সকল মু’মিন নারী-পুরুষের জন্য বাধ্যতামূলক। এদিনটিকে জামায়াতের সাথে সালাত সম্পাদনের পাশাপাশি সপ্তাহের পূর্বনির্ধারিত বিশেষ দিন হিসেবে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহযোগিতা, ভ্রাতৃত্ব বন্ধন দৃঢ় করা, পারস্পরিক বিবাদ-বিসম্বাদের বিচার-মীমাংসা এবং উলিল আমরের বিশেষ ভূমিকার মাধ্যমে সদাক্বাহর বণ্টনের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে।

তাসবীহ  تَسْبِيح তাসবীহ শব্দের অর্থ হলো ‘পবিত্রতা জ্ঞাপন করা’। শব্দটির দ্বারা প্রকৃতপক্ষে ‘আল্লাহর পবিত্রতা জ্ঞাপন করা’ বুঝায়। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবকিছুই আল্লাহর পবিত্রতা জ্ঞাপন করে। তবে মানুষের পক্ষে তাদের কর্তৃক আল্লাহর পবিত্রতা জ্ঞাপন করার প্রকৃতি হুবহু অনুভব করা সম্ভব নয়। অনেক মানুষ আল্লাহর শরীক সাব্যস্ত করে এবং আল্লাহর নামে এমন কথা রচনা করে যাতে আল্লাহর উপর কোনো না কোনো দুর্বলতা আরোপ করা হয়। অথচ আল্লাহ শিরক থেকে এবং যাবতীয় দুর্বলতা থেকে পবিত্র। আল্লাহ তাঁর বিধান প্রণয়নে কাউকে শরীক করেন না। তাই তাসবীহের মূল তাৎপর্য হলো শিরক হয় বা আল্লাহর নামে কোনো দুর্বলতা আরোপ করা হয় এমন সকল কথা ও কাজ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা। সকাল-সন্ধ্যায় তথা সারাদিন আল্লাহর তাসবীহ করতে হবে এবং দিন-রাতের বিভিন্ন সময়সীমায় আল্লাহর তাসবীহ করা তথা আল্লাহর পবিত্রতা জ্ঞাপনমূলক তথ্য স্মরণ বা উচ্চারণ করা আমাদের একটি বিশেষ দায়িত্ব। এর মাধ্যমে কার্যক্ষেত্রেও আমরা আল্লাহর সাথে শিরক হয় এমন কাজ থেকে বিরত থাকতে পারবো।

ত্বহারাত  طَهَارَة ত্বহারাত শব্দের অর্থ হলো ‘পবিত্রতা’। আনুষ্ঠানিক সালাতের জন্য ত্বহারাত বা পবিত্রতা অর্জনকে পূর্বশর্ত করা হয়েছে। এর উপায় হিসেবে ওজু-গোসল-তায়াম্মুমের বিধান দেয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে জানানো হয়েছে যে, এ বিধান দেয়ার উদ্দেশ্য আমাদেরকে একটি কষ্ট দেয়া নয়, বরং এর দ্বারা আমাদেরকে পবিত্র করা এবং আমাদের প্রতি নেয়ামতকে পূর্ণ করাই উদ্দেশ্য, যেন আমরা আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি। সুতরাং এটি আমাদের জন্য পরিচ্ছন্ন থাকার শিক্ষামূলক বিষয়ও বটে। পরিচ্ছন্ন থাকার মাধ্যমে আমরা বিভিন্ন রোগ-জীবাণুর সংক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা করতে পারবো এবং ফলস্বরূপ সুস্থতার নিয়ামত উপভোগ করতে পারবো এবং সেজন্য আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারবো। ত্বহারাত শব্দটি যেমন বাহ্যিক পবিত্রতা বুঝায়, তেমনি এটি আত্মিক বা আধ্যাত্মিক পবিত্রতার অর্থেও ব্যবহৃত হয়। আধ্যাত্মিক পবিত্র ব্যক্তি বাহ্যিক (শারীরিক) অপবিত্র অবস্থায় থাকার সময়ও পবিত্র থাকে। অন্যদিকে আধ্যাত্মিকভাবে অপবিত্র ব্যক্তি শারীরিকভাবে পবিত্র থাকা অবস্থায়ও অপবিত্র থাকে। ৩:৪২, ৫:৪১, ৯:১০৩, ৩৩:৩৩, ৯:১০৮, ৩:৫৫, ২:২৫, ৩:১৫, ৪:৫৭ প্রভৃতি আয়াতে আধ্যাত্মিক পবিত্রতার কথা বলা হয়েছে। ৯:২৮ আয়াতে মুশরিকদেরকে আধ্যাত্মিকভাবে / মানসিকভাবে অপবিত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

দুআ  دُعَاء দুআ শব্দের অর্থ হলো ‘প্রার্থনা করা, ডাকা, আহবান করা, কোনো মর্মকথা তুলে ধরা’। ৭২:১৮ আয়াতে বলা হয়েছে যে, ‘নিশ্চয় মাসজিদসমূহ আল্লাহর জন্য। সুতরাং তাঁর কাছে ছাড়া কারো কাছে দুআ করো না। কুরআনে বিভিন্ন আয়াতে আল্লাহর কাছেই দুআ করার জন্য আদেশ দেয়া হয়েছে এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে দুআ করতে নিষেধ করা হয়েছে। আবার দুআ শব্দের আরেকটি অর্থ হলো ‘কাউকে কোনো তথ্যপূর্ণ বক্তব্যের মাধ্যমে কোনো দিকে আহবান করা’। যেমন অনেক আয়াতে আল্লাহর পথে আহবান করার বিষয়ে দুআ শব্দের প্রয়োগ ঘটেছে।

নিদা نِدَاء নিদা শব্দের অর্থ ‘কোনো নির্দিষ্ট দিকে বা বিষয়ে ডাকা বা আহবান করা’। ৬২:৯ আয়াতে ইয়াওমুল জুমুয়াতে সালাতের জন্য নিদা (আহবান) করা হলে ব্যবসা স্থগিত রেখে তাতে সাড়া দিয়ে আল্লাহর যিকিরের দিকে দ্রুত ধাবিত হওয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ২:১৭১ আয়াত অনুযায়ী নিদা শব্দটি দুআ শব্দের সমার্থক হলেও এর মধ্যে কিছুটা তাৎপর্যগত ভিন্নতা রয়েছে। যেমন, রাখাল যদি তার গবাদি পশুকে নাম ধরে ডাকে সেটা দুআ এবং যদি এমন কোনো পরিচিত আওয়াজের মাধ্যমে ডাকে যাতে ঐ পশু বুঝতে পারে যে, তাকে কোনো নির্দিষ্ট দিকে ডাকা হচ্ছে তাহলে তা হলো নিদা। কিন্তু যদি ঐ পশু ছাড়া অন্য পশুকে কোনো নাম ধরে ডাকা হয় বা কোনো আওয়াজ দিয়ে ডাকা হয় যেটি এ বিষয়ে প্রশিক্ষিত নয়, তাহলে সেই দ্বিতীয় পশুটি শুধু দুআ ও নিদা শুনবে কিন্তু তার তাৎপর্য বুঝবে না। সুতরাং সালাতের জন্য কিভাবে নিদা বা আহবানের কাজটি সম্পাদন করতে হবে তা পরামর্শক্রমে নির্ধারিত হতে পারে।

মাক্বামু ইবরাহীমمَقَامُ إِبْرَاهِيم : মাক্বাম শব্দের অর্থ হলো ‘অবস্থান’। তবে বস্তুগত অবস্থানের অর্থে মুক্বাম শব্দ ব্যবহৃত হয়, যার অর্থ হলো ঐ স্থান যেখানে একজন ব্যক্তি মুক্বীম বা প্রতিষ্ঠিত পর্যায়ে থাকে, মুসাফির বা সফররত পর্যায়ে নয়। অন্যদিকে মাক্বাম শব্দটি অবস্তুগত অর্থে ব্যবহৃত হয়। মাক্বাম দ্বারা বুঝায় আদর্শগত অবস্থান, মর্যাদাগত অবস্থান, জবাবদিহিমূলক অবস্থান, মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান প্রভৃতি। সুতরাং মাক্বামে ইবরাহীম বলতে বুঝায় নবী ইবরাহীমের আদর্শগত অবস্থান তথা তিনি যে আদর্শের পরিমণ্ডলে স্বীয় ব্যক্তিত্বকে প্রতিষ্ঠিত রেখেছেন, যে ধরনের আদর্শিক কর্মসূচী সম্পাদনের জন্য আত্মনিবেদিত ছিলেন। ২:১২৫ এবং ৩:৯৭ আয়াতে মাক্বামে ইবরাহীমের প্রসঙ্গ আলোচিত হয়েছে। প্রচলিত কথা হলো মাক্বামে ইবরাহীম বলতে একটি পাথরখণ্ডকে বুঝায় যাতে নবী ইবরাহীমের পায়ের ছাপ আছে। কিন্তু কুরআনে মাক্বাম শব্দের ব্যবহার এবং মাক্বামে ইবরাহীম সম্পর্কিত বক্তব্য অনুসারে এ প্রচলিত মতটি গ্রহণযোগ্য নয়। মাক্বামে ইবরাহীম বলতে নবী ইবরাহীমের আদর্শিক কর্মউদ্যোগকে বুঝায়। কাবার সাথে সম্পর্কিত নিদর্শনসমূহের মধ্যে এর আবাদের জন্য নবী ইবরাহীমের আদর্শিক অবস্থান অন্যতম নিদর্শনস্বরূপ। মাক্বামে ইবরাহীমকে তথা নবী ইবরাহীমের আদর্শিক অবস্থানকে মুসল্লা হিসেবে তথা সালাত সম্বলিত নীতি-ব্যবস্থাপনা হিসেবে গ্রহণ করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অন্য কথায় যে নবী ইবরাহীমের আদর্শকে ধারণ করবে সেই প্রকৃত সালাতকারী হিসেবে সাব্যস্ত হবে।

মাসজিদ  مَسْجِد মাসজিদ শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো ‘সাজদাহর স্থান’। আল কুরআনে সাজদাহ বলতে কী বুঝায় এবং মাসজিদের কর্মকাণ্ড কী হতে পারে তা নির্ণয়ের জন্য মাসজিদ শব্দ ধারণকারী আয়াতসমূহকেও অধ্যয়ন করা জরুরি। অনুরূপভাবে মাসজিদ বলতে কী বুঝায় তা নির্ণয়ের জন্যও সাজদাহ শব্দ ধারণকারী আয়াতসমূহকেও অধ্যয়ন করা জরুরি। আল কুরআনে মাসজিদের ব্যাপকভিত্তিক ভূমিকার উল্লেখ রয়েছে। যাবতীয় মাসজিদের মূল কেন্দ্র হিসেবে আল মাসজিদুল হারামের অবস্থান। আল মাসজিদুল হারামের ব্যবস্থাপনার বিষয়সমূহের মধ্যে রয়েছে সাময়িক আশ্রয়ের জন্য বা ধ্যানমগ্নতার উদ্দেশ্যে স্বল্পকালীন অবস্থান (ই'তিকাফ), নৈরাজ্য বা ফাসাদ প্রতিরোধ এবং নিরাপত্তা প্রচেষ্টার কর্মসূচী, ফিতনা বা ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতি হুমকি মোকাবিলা, ন্যায়বিচারের ব্যবস্থাকরণ, শান্তিচুক্তি, কুরবানির ব্যবস্থা, জমাকৃত হাদিয়ার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কল্যাণ কর্মসূচী বাস্তবায়ন ও সমৃদ্ধির সম্প্রসারণ এবং আল্লাহর বিধান শুনার ও মানার প্রক্রিয়া চালু রাখার প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভূমিকা পালন ইত্যাদি। সুতরাং মাসজিদকে বর্তমানে যেভাবে শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক সালাতের জন্য নির্ধারিত ঘর মনে করা হয়, সেটা মাসজিদের আসল স্বরূপ ও প্রকৃতি নয়। মাসজিদের প্রকৃত স্বরূপ হলো এটা মানবজাতির জন্য ঐক্য, শৃঙ্খলা, একত্ববাদী উপাসনা ও সমষ্টিগতভাবে আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নের কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান। সংক্ষেপে বলা যায়, সাজদাহ শব্দের প্রাথমিক অর্থ ‘মান্য করা, মেনে নেওয়া’। এবং মাসজিদ হলো সেই সাংবিধানিক কেন্দ্র বা প্রতিষ্ঠান যেখানে স্রষ্টার বিধান সংরক্ষণ করা হয় বা সংবিধানের কার্য নির্বাহ করা হয়।

যিকর  ذِكْر যিকর শব্দের অর্থ হলো ‘স্মরণ, স্মরণীয় বিষয়, উপদেশ, আল্লাহর বিধানগ্রন্থ, আল্লাহকে স্মরণ করার উপায়মূলক কাজ, স্মরণীয় ধরনের আলোচনা’। আল কুরআনে যিকরুল্লাহ বা ‘আল্লাহর স্মরণ’ দ্বারা যেসব বিষয়কে বুঝানো হয়েছে তা হলো: মনে মনে আল্লাহকে স্মরণ করা, আল্লাহর স্মরণবোধক বাক্য উচ্চারণ, আল্লাহর স্মরণমূলক আলোচনা, আল্লাহর স্মরণমূলক উপদেশ, আল্লাহর স্মরণমূলক বিধানগ্রন্থ, আল কুরআন, সালাত ইত্যাদি। আল্লাহর স্মরণের উদ্দেশ্যেই সালাত প্রতিষ্ঠা করতে আদেশ দেয়া হয়েছে। সালাতকে আল্লাহর স্মরণের অন্যতম রূপ বা প্রকার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আল্লাহর স্মরণকে সবচেয়ে বড় স্মরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল কুরআন অনুসারে একমাত্র আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমেই অন্তর প্রশান্তি লাভ করে। তাই আল্লাহর স্মরণ ছাড়া কেউ অন্তরের প্রশান্তি পেতে পারে না। বাহ্যত মানুষ অন্যত্র শান্তি পাবে বলে ধারণা করলেও দিন শেষে তা মরিচিকা হিসেবে প্রমাণিত হয়। আল্লাহর স্মরণের উপায় হিসেবে কুরআন তিলাওয়াত করতে হবে, সালাত প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং সর্বোপরি এ থেকে শিক্ষা নিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আল্লাহর বিধান অনুসারে মানুষের জন্য কল্যাণকর্ম ও ন্যায়বিচার বাস্তবায়িত করতে হবে, নিজ নিজ কর্তব্য কর্ম যথানিয়মে সম্পাদন করতে হবে।

রুকূرُكُوْع রুকূ' শব্দের অর্থ হলো ‘স্বীয় দুর্বলতার প্রেক্ষিতে শক্তিমান সত্তার প্রতি বিনীত থাকা ও সশ্রদ্ধভাবে তাঁর নির্দেশনাকে গ্রহণ করে নেয়া’। রকূ’ মূলত একটি মানসিক অবস্থার কর্মগত বহির্প্রকাশ বা কর্মের ধরনের মাধ্যমে আত্মগরিমা পরিহারের অভিব্যক্তি। কুরআনের নির্দেশনা হলো, সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদেরকে রুকূ' করার আদেশ দিলেও তারা রুকূ' করে না। রুকূ'কারীদের সাথে রুকূ' করতে হবে তথা রুকূ'কারীদের থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখা যাবে না। রুকূ'রত অবস্থায় সালাত ও যাকাত করতে হবে। প্রচলিত ধারণা হলো রুকূ' মানে সালাতে ক্বিয়াম ও সাজদাহর মাঝখানে সামনের দিকে এমনভাবে ঝোঁকা যে, দুই হাতের তালু দিয়ে দুই পায়ের হাঁটুকে ধরা হয় এবং এ অবস্থায় কোমর থেকে মাথা পর্যন্ত ভূমির সমান্তরালে রাখা হয়। কুরআনে একবার প্রসঙ্গক্রমে ক্বিয়াম ও সাজদাহর মধ্যবর্তীতে রুকূ' শব্দের উল্লেখ থাকায় এবং ক্বিয়াম মানে দাঁড়ানো ও সাজদাহ মানে সমুচ্চ সুমহান স্রষ্টার প্রতি পরম ভক্তিভরে নত হওয়ার প্রেক্ষিতে রুকূ'র এ আনুষ্ঠানিক রূপ গ্রহণযোগ্য এবং পরম্পরাগতভাবে অনুশীলনকৃত। কিন্তু এটাই রুকূ'র একমাত্র রূপ নয়। কুরআনে রুকূ'র জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক রূপকে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়নি। সালাতে ক্বিয়াম ও সাজদাহর মাঝে রুকূ' করা সঙ্গত হলেও এটিকে সালাতের মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক পদ্ধতিতে সম্পাদন করাকে বাধ্যতামূলক করা হয়নি। প্রকৃতপক্ষে সালাতে আনুষ্ঠানিকভাবে রুকূ' করা যেতে পারে কিন্তু এটাই রুকূ'র একমাত্র অর্থ নয়, বরং রকূ’ একটি ব্যাপকভিত্তিক বিষয়।

সাজদাহ  سُجُود সাজদাহ শব্দের অর্থ হলো: মাথা নত করা, ষষ্ঠাংগ প্রণিপাত করা, উপাসনামূলক সম্মান / ভক্তি প্রদর্শন করা, কোনো কর্তৃত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা, কোনো কর্তৃত্বকে স্বীকৃতি প্রদানমূলক ভূমিকা পালন করা, কোনো কর্তৃত্বের পক্ষ থেকে আসা তথ্য-নির্দেশ গ্রহণ ও ভক্তিভরে মান্য করা। কুরআন অনুসারে আকাশমন্ডলীতে ও পৃথিবীতে যারা আছে এবং সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্রমন্ডলী, পাহাড়সমূহ, গাছ-গাছালি, প্রাণীসমূহ এবং অনেক মানুষ আল্লাহকে সাজদাহ করে। পক্ষান্তরে অনেক মানুষ আল্লাহকে সাজদাহ না করে শাস্তিযোগ্য অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত। সাধারণত মনে করা হয় যে, সাজদাহ এর একমাত্র অর্থ ষষ্ঠাংগ প্রণিপাত। অথচ কুরআনে সাজদাহর কোনো আনুষ্ঠানিক কাঠামো নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়নি। অর্থাৎ এক্ষেত্রে মানুষকে স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। কারণ কুরআনে মানুষকে অযথা বাধ্যবাধকতার মাধ্যমে জীবনে জটিলতাযুক্ত করতে চাওয়া হয়নি। প্রচলিত পদ্ধতির মধ্যে ষষ্ঠাংগে প্রণিপাত আল্লাহর প্রতি উপাসনা হিসেবে গ্রহণযোগ্য। সুতরাং একটি পরম্পরাগত অনুশীলন হিসেবে এটিকে আনুষ্ঠানিক সাজদাহ হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে কুরআনে সাজদাহ বলতে শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক সাজদাহকে বুঝানো হয়নি। বরং সাজদাহ একটি ব্যাপকভিত্তিক শব্দ। শুধুমাত্র যেখোনে পূর্বাপর বক্তব্য অনুসারে সাজদাহকে আনুষ্ঠানিক সাজদাহ হিসেবে সাব্যস্ত করার অবকাশ আছে, সেখানেই সাজদাহ বলতে আনুষ্ঠানিক সাজদাহ হিসেবে নেয়া যাবে।

সালাত  صَلَاة সালাত শব্দের অর্থ হলো ‘নিবিড় অনুসরণ, সংযোগ, যোগাযোগ, আনুকূল্য, সমর্থন, সহযোগিতা, অনুগ্রহ, আশীর্বাদ প্রার্থনা ইত্যাদি’। কুরআনে সালাত শব্দটি বহুমাত্রিক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এতে আল্লাহর বিধানের নিবিড় অনুসরণকে সালাত হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। আবার অন্য ধর্মাবলম্বিদের উপাসনা অনুষ্ঠানকেও সালাত হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। যেমন কা’বাগৃহের কাছে উলুধ্বনি ও হাততালির মাধ্যমে যে ধর্মীয় উপাসনা অনুষ্ঠান করা হতো কুরআনে এটিকে সালাত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কুরআনে এ ধরনের অর্থহীন আওয়াজ ও অর্থহীন অঙ্গ সঞ্চালনের সমালোচনা করা হয়েছে। কুরআনের আলোকে সালাত সম্পাদনের ক্ষেত্রেও মধ্যম স্বরে কিছু বলার বিষয় আছে এবং দাঁড়ানো ও প্রণিপাতের বিষয় আছে। কিন্তু এটি সালাতের উদ্দেশ্য নয়, বরং যতক্ষণ যা বলা হচ্ছে তা বুঝার মতো মন-মস্তিষ্কে থাকার পূর্বে বা অন্যমনস্ক অবস্থায় সালাতের কাছেও যেতে নিষেধ করা হয়েছে। কুরআনে আনুষ্ঠানিক সালাত সম্পাদনের জন্য কিছু শর্ত ও নিয়ম-কানুন দেয়া হয়েছে, সেই সাথে সালাতকারী হিসেবে তাদেরকেই চিহ্নিত করা হয়েছে যারা বাস্তবে আল্লাহর বিধি-বিধানের অনুসরণ করে। অন্যদিকে যারা সালাত করে অথচ বাস্তবে সালাতের শিক্ষার বিপরীত কাজ করে সেই ধরনের সালাতকারীদের জন্য জাহান্নামের দুর্ভোগের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এছাড়া যখন কোনো ব্যক্তিসত্তার প্রতি সালাত করার প্রসঙ্গ বলা হয়েছে তখন সালাত বলতে আল্লাহর পক্ষ থেকে অনুগ্রহ বা আল্লাহর কাছে অনুগ্রহের প্রার্থনা অথবা ব্যক্তিদের পরস্পরের প্রতি সহযোগিতামূলক কর্মকাণ্ডকে বুঝায়। সালাতের আনুষ্ঠানিক বা বাস্তব রূপকে বাদ দিয়ে এটিকে শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক হিসেবে গ্রহণ করা হোক বা শুধুমাত্র বাস্তব কর্মকাণ্ড হিসেবে গ্রহণ করা হোক, উভয় অবস্থায় এর ব্যাপকত্বকে সীমিত করা হয়। সালাতের আনুষ্ঠানিক দিক এর বাস্তবভিত্তিক কর্মকাণ্ডের থেকে বিচ্ছিন্ন নয় এবং এর বাস্তবভিত্তিক কর্মকাণ্ডও এর আনুষ্ঠানিক দিক থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। কোন স্থানে সালাত প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কোন দিকটিকে বুঝানো হয়েছে বা কোন স্থানে তা একই সাথে উভয় অর্থে প্রযোজ্য তা পূর্বাপর বক্তব্য এবং বক্তব্যের প্রসঙ্গ (Context) থেকে অনুধাবন করা সম্ভব। যথাযথভাবে সালাত প্রতিষ্ঠা করে এর প্রকৃত কল্যাণ অর্জনের জন্য সালাতের বহুমাত্রিক তাৎপর্য সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন।